চীন একের পর এক অভিনব উদ্ভাবনের ভেল্কি দেখিয়ে বিশ্ববাসীকে তাক লাগাছে! সম্প্রতি চীন আবিষ্কার করেছে বিদুৎ উৎপাদনে সক্ষম বিশেষ একধরনের প্লাস্টিক ঘাস, যে ঘাসে বাতাস থেকেই উৎপাদিত হবে বিদ্যুৎ। এই কৃত্রিম ঘাস ভবনের ছাদে, দেয়ালে এমনকি উঠানেও স্থাপন করা যাবে। তবে হ্যাঁ, এ ক্ষেত্রে বাতাসের প্রবহমান গতি কিছুটা বেশি হতে হবে। উৎপন্ন বিদ্যুৎ দিয়ে আপাতত এলইডি (Light-Emitting Diode) বাল্ব জ্বালানো যাবে। যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে তা দিয়ে অনায়াসে বিজ্ঞাপন বোর্ড, বাল্ব জ্বালানোসহ বিভিন্ন প্রয়োজন মিটবে।
চীনের চেনডুর সাউথওয়েস্ট ঝিটং বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক দল প্লাস্টিক ঘাসের অনবদ্য বিষয়টিকে সবার সামনে তুলে এনেছে। এ দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন জং লিং ওয়ান। এ দলটির উদ্ভাবিত প্লাস্টিক ঘাসটি মূল কাজ করে ট্রাইবোইলেকট্রিক ন্যানো-জেনারেটর (TENG-টিইএনজি) নামক যান্ত্রিক উপাদানের সাহায্যে। এটি প্রযুক্তির এমন একটি রূপ, যেখানে যান্ত্রিক বা তাপীয় শক্তি বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ট্রাইবোইলেকট্রিক ন্যানো-জেনারেটর তিনটি পদ্ধতিতে কাজ করে, যথা- পাইয়েজোইলেকট্রিক (Piezoelectric), ট্রাইবোইলেকট্রিক (Triboelectric) ও পাইরোইলেকট্রিক (Pyroelectric)। প্রথম দুটোর কাজ যান্ত্রিক শক্তি উৎপন্ন আর পরেরটার কাজ তাপীয় শক্তি উৎপাদন। ট্রাইবোইলেকট্রিক ন্যানো-জেনারেটরে মূলত উপস্থাপিত হয় ফ্রি-স্ট্যান্ডিং স্ট্রিপস, যেটি তৈরি হয় পলিথিলিন টেরেফথেলেট থিন ফিল্ম (PET), যার একপাশে যুক্ত থাকে ইনডিয়াম-টিন-অক্সাইড (ITO) এবং অন্য পাশে ন্যানো ওয়্যারস, ইলেকট্রন যে দুটোর পাশে প্রতিনিয়ত আনাগোনা করে। এই প্রক্রিয়াকে এককথায় বলা হয়, ট্রাইবোইলেকট্রিক ইফেক্ট।
প্লাস্টিক ঘাস তথা টিইএনজি বায়ুপূর্ণ মেমব্রেন ভাইব্রেশন, যেটি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সেটি তখনই সক্রিয় হয়ে ওঠে যখন সঠিক নির্দেশনায় বাতাস প্রবাহিত হয়। বায়ু বিদ্যুৎ প্রবাহে আমরা যে সমস্যার সম্মুখীন হই তা হলো সঠিক নির্দেশনায় বাতাস প্রবাহিত না হওয়া। সঠিক নির্দেশনায় বাতাস না থাকলে আর যা-ই হোক ট্রাইবোইলেকট্রিক ন্যানো-জেনারেটর যন্ত্রটি সুষ্ঠুভাবে তার কার্যপথে এগোতে পারে না! ঘূর্ণন-যন্ত্র হিসেবে যদি আমরা তুলনা করতে যাই তবে ট্রাইবোইলেকট্রিক ন্যানো-জেনারেটর (টিইএনজি) তখনই শক্তি উৎপাদনে ফলপ্রসূ হয়, যখন প্রাকৃতিক বাতাস যেকোনো নির্দেশনায় প্রবাহিত হতে পারে।
প্রতিটা টিইএনজিতে একই রকম কার্যপ্রণালি (মরফোলজি) রয়েছে, যা সমুদ্রের নিচের এলাকায় অবস্থিত বাদামি শৈবালের মতো, যেখানে সামুদ্রিক শৈবালকে উচ্চ ঘনত্বে উন্নীত করা হয়, যাকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ‘গতিময় ইকোসিস্টেম’ (ইকোসিস্টেম-গাছপালা, পশুপাখির সঙ্গে তাদের প্রাণহীন পরিপার্শ্বের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া) বলা যায়। মরফোলজি অনুযায়ী, স্ট্রিপসটির স্বাধীনভাবে দুলুনিতে ‘কনটাক্ট সেপারেশন’ প্রক্রিয়ার উদ্ভব ঘটে, যার সহযোগিতায় রয়েছে প্রবহমান এই বাতাস!
একটি উচ্চগতিসম্পন্ন ক্যামেরা নিযুক্ত করা হলে এটি কাজের অবস্থা বন্দী করে এবং পরস্পর লাগোয়া দুটো টিইএনজির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন করে। টিইএনজিতে থাকা স্বাধীন স্ট্রিপসটি ১৫৪Hz(হার্জ) ভাইব্রেশন ফ্রিকোয়েন্সি তৈরি করে, যেটি হাইইলেকট্রিক আউটপুটের জন্য পর্যাপ্ত কনটাক্ট সেপারেশনের জন্য যথেষ্ট। ২৭ms-1 বায়ুস্রোত গতি তৈরি করতে ১০x২ পস স্ট্রিপ ব্যবহার করা হয়। দুটো লাগোয়া স্ট্রিপস কোনো বাড়ির ছাদের ওপরে ২x০.৭ পস রক্ষা করে চলে, যা ওপেন-সার্কিট ভোল্টেজ, শর্ট সার্কিট কারেন্ট ও ৯৮ V, ১৬.৩µA, and ২.৭৬Wm-2 পাওয়ার ডেনসিটি সরবরাহ করে, যা দিয়ে অনায়াসে একটি বিজ্ঞাপন বোর্ডকে আলোকিত করা সম্ভব। ৬০ স্ট্রিপসের টিইএনজির সারি ছাদে স্থাপন করা হলে বাতাস থেকে প্রচুর পরিমাণে শক্তি উৎপন্ন হয়। এর ফলে ২.৩৭Wm-2 পাওয়ার ডেনসিটির উদ্ভব ঘটে, যা কিনা একটি সিরিজে একই সময়ে ৬০টি এলইডি বাল্বকে জ্বালাতে সক্ষম। সাধারণত প্রতিটি বাড়ির ছাদের অংশ গড়ে ৩০০ বর্গমিটার এবং ১০ লেয়ারবিশিষ্ট লনের কাঠামোসমৃদ্ধ গড়ে টিইএনজি সরবরাহ করে ৭.১১ KW ইলেকট্রিক শক্তি, যা ২.৩৭Wm-2 পাওয়ার ডেনসিটির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
বর্তমানে প্লাস্টিক ঘাস সুদৃঢ় এক শক্তির উৎসের নাম, গৃহস্থালিতে প্রয়োজনীয় ঘরোয়া ইলেকট্রনিকস ব্যবহারে যার অবস্থান ধীরে ধীরে ‘আস্থাপূর্ণ শক্তির উৎসে’র ধাপে উন্নীত হচ্ছে বটে! যদি কম মূল্যে পলিমার থিন ফিল্ম ম্যাটারিয়ালস ডিভাইসটিতে ব্যবহৃত হতো, তবে এটি সহজেই বাজারজাত করা যেত। সেদিন আর বেশি দূরে নয় যখন ডিভাইসটি ল্যাবে আরও সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষিত হয়ে এর উন্নয়ন ঘটবে। যার ফলে প্লাস্টিক ঘাস সহজলভ্য হবে বাজারে। এমনও কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে প্লাস্টিক ঘাসের টিইএনজিকে সোলার প্যানেলের সঙ্গে সংযুক্ত করে বিদ্যুৎ শক্তির ব্যবহারে এর আরও বেশি উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব হবে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৭তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৭।