বিশ্বখ্যাত অদ্ভুত স্থাপনা

আমাদের চারপাশে আমরা যেসব ভবন দেখি তার সবগুলোর একটা সাধারণ প্যাটার্ন বা ধরন রয়েছে, তা সে নির্মাণশৈলীর দিক থেকেই হোক কিংবা নির্মাণসামগ্রীর দিক থেকেই বলি। বিশেষ করে শহরের ছোট বাড়ি, বড় দালান বা ভবন সবকিছুই তৈরি হয় ইট, কংক্রিট, স্টিল, পাথর, কাঠসহ নানান ধরনের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে। এ কারণেই শহরের চরিত্র বোঝাতে ‘ইট-পাথর বা কংক্রিট’-এর মতো বিশেষ ধরনের বিশেষণ ব্যবহার করা হয়। এখন নির্মাণকাজে আরও নতুন নতুন উপাদান ব্যবহৃত হচ্ছে। ঢাকা শহরের অনেক ভবন দেখলে মনে হয় এগুলো কাচেরই তৈরি। অবশ্য এখন আমরা এ ধরনের বিল্ডিং দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় হঠাৎ করে এতে  কোনো নতুনত্ব চোখে পড়ে না। তবে আকার-আকৃতিতে যদি কোনো বিশেষত্ব থাকে তাহলে হয়তো ভিন্ন কথা। যেমন, অধুনালুপ্ত ধানমন্ডির জাহাজবাড়ি বা এ রকম কোনো স্থাপনা।

সারা পৃথিবীতে আকার, আকৃতি বা অবস্থানগত কারণে এমন কিছু স্থাপনা বিখ্যাত হয়ে আছে, যার কাছে জাহাজবাড়ি বা আমাদের চেনা-জানা কোনো স্থাপনার তুলনায় হয় না। এগুলোর কিছু কিছু এমন অদ্ভুত বা উদ্ভট জায়গায় অবস্থিত যে তা রীতিমতো খবরের কাগজের শিরোনাম হয়েছে। আবার কিছু কিছু হয়তো এক কালে ছিল কোনো গোপন আস্তানা কিন্তু পরে তা পরিত্যক্ত হয়েছে। এ রকম কিছু স্থাপনা, যার কোনোটি ঐতিহাসিক বা একেবারে নতুন, কোনোটি সুরক্ষিত বা পুনরুদ্ধার হওয়া, কোনোটি হয়তো জলমগ্ন আবার কোনোটি ভাসমান, কোনোটি একসময় ছিল ঐতিহ্যমণ্ডিত, কোনোটি কালের গর্ভে ঐতিহ্য হারানো এ রকম ১৩টি স্থাপনা নিয়ে এ রচনা। এসব স্থাপনা নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হলেও সেগুলোর মধ্যে একটা সাধারণ মিল হলো, অবস্থানগত দিক থেকে এগুলো কোনোটিই স্বাভাবিক স্থাপনা নয়।

গেট টাওয়ার বিল্ডিং, ওসাকা, জাপান

জমির মালিক আর জাপানের হাইওয়ে করপোরেশন এই দুই পক্ষের বিবাদের অদ্ভুত এক সমাধানে সৃষ্ট গেট টাওয়ার বিল্ডিং। একটা উড়ালসেতুর অংশ বিশেষ গেট টাওয়ার বিল্ডিংয়ের ছয়, সাত ও আট তলার মাঝ বরাবর একদিক দিয়ে ঢুকে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। অবশ্য রাস্তার শব্দ ও কম্পন যাতে ভবনের বাসিন্দাদের ভোগান্তির কারণ না হয় সে জন্য হাইওয়ে করপোরেশন নিয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।

সম্পত্তির মালিক মেইজি শাসনামল (১৮৬৮-১৯১২) থেকে এ সম্পত্তির মালিকানায়। কিন্তু ১৯৮৩ সালে তারা যখন এখানে উঁচু ভবন নির্মাণের জন্য আবেদন করে তখন কর্তৃপক্ষ তা নাকচ করে দেয়। কারণ, হ্যানসিন এক্সপ্রেস ওয়ে সরকারের কাছ থেকে হাইওয়ে নির্মাণের অনুমতি নিয়েছে, যেটা কি না ঠিক এই জমির ওপর দিয়েই যাবে। কিন্তু জমির মালিকও নাছোড়বান্দার মতো লেগে থাকে বহুতল ভবন বানাবে বলে। প্রায় পাঁচ বছর এ টানাপোড়েন চলার পর উভয় পক্ষ অদ্ভুত এক সমাধানে আসে। সমাধান সূত্র বলছে, প্রায় ৭২ ফুট উচ্চতার সব মিলিয়ে ১৯টি ফ্লোরবিশিষ্ট এ ভবনে হ্যানসিন এক্সপ্রেস ওয়ে এখন একজন ভাড়াটিয়া মাত্র।

উইকিপিডিয়া

মেসা ভার্দ, কলরাডো, যুক্তরাষ্ট্র

স্প্যানিস শব্দ ‘মেসা ভার্দ’ অর্থ সবুজ টেবিল। ৬০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত যাযাবর পোয়েবলো ইন্ডিয়ান আদিবাসীরা তাদের বাসস্থান হিসেবে এ স্থানটি ব্যবহার করতো। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ৬০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায় বেলেপাথর ও কাদার গাঁথুনিতে তৈরি ঘরবাড়ির এই গ্রামটি পাহাড়ের গায়ে এমনভাবে অবস্থিত যা দেখলে মনে হয় এটি পাহড়ের গায়ে ঝুলে রয়েছে। আর পাহাড়ের ওপরের অংশটি প্রাকৃতিক ছাদের মতো একে ঢেকে রেখেছে। পোয়েব্লোয়ান সংস্কৃতি ৪৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৯০০ বছর স্থায়ী হয়। এখানে বেলে পাথরের তৈরি ৬০০-র মতো বাড়ি রয়েছে এবং কোনো কোনোটি বহুতলবিশিষ্ট ক্লিফ প্যালেস, কোনোটি ব্যালকনি হাউস, আবার কোনোটি চতুর্ভুজ আকৃতির টাওয়ার। এ রকম ৪ হাজার ৩০০ বিভিন্ন ধরনের বাড়ি রয়েছে এখানে। এখানে যেমন ছোট ছোট বাড়ি রয়েছে তেমনি ৫০ থেকে ২০০ ঘরের গ্রামও রয়েছে। মেসা ভার্দ প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের কারণে যতটা মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, তারচেয়ে অনেক বেশি আগ্রহ তৈরি করেছে এর অদ্ভুত অবস্থানের কারনে।  

ক্রুকড হাউস, উত্তর ক্যারোলাইনা, যুক্তরাষ্ট্র

এখনো সামনে ঝুলছে ‘ভাড়া দেওয়া হয়’ (For Rent)। উত্তর ক্যারোলাইনার সাগরের তটরেখায় কাঠের তৈরি ‘ওয়েভ ব্রেকার’ নামের এই ঘরটির একসময় এ অঞ্চলের বিশিষ্টজনদের কাছে দারুন জনপ্রিয় এক গেস্ট হাউজ হিসেবে পরিচিত ছিল। যখন এটি তৈরি করা হয় তখন এটি হয়তো পাড়েই ছিল। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার ফলে এটি এখন সমুদ্রে নেমে গেছে। সামনে থেকে তাকালে দেখা যায় এর পেছনে বিশাল আকাশ আর নীল সমুদ্র। যদিও বর্তমানে পরিত্যক্ত এই গেস্ট হাউসটি এখন তার ভাগ্য সমুদ্রের ওপর সঁপে দিয়েছে কিন্তু এখন পর্যন্ত স্যান্ডির (২০১২) মতো অনেক বড় বড় হ্যারিকেন, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলা করে এটি তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে আপন মহিমায়।

স্টোন হাউস, পর্তুগাল

পাথর দিয়ে বাড়ি তৈরি হবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু পাথরটাকেই বাড়ি বানিয়ে ফেলা হলে তা স্বাভাবিক হিসেবে নেওয়াটা একটু মুশকিল। কিন্তু ‘কাসা-দো-পেনেদো’ বা ‘হাউস অব দ্য রক’ বা ‘স্টোন হাউস’ এ রকমই এক স্থাপত্যকর্ম। উত্তর পর্তুগালের সেলোরিকো ডি বাস্ত এবং ফাফে-এর মাঝামাঝি জায়গায় এটি স্থাপিত। ১৯৭২ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৯৭৪ সালে শেষ হয়। এ বাড়ির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয় চারটি বিশাল আকৃতির বোল্ডার। শুধু তা-ই নয়, এর দেয়াল ও ছাদের কিছু অংশও এই চারটি বোল্ডার দিয়েই তৈরি। অবশ্য দরজা, জানালা ও ছাদের টালিগুলো সাধারণত যে রকম আমরা ব্যবহার করি সে রকমই। আর এখানে কংক্রিটও ব্যবহার করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বাড়িটি একটি বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে অবস্থিত হলেও এখানে কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। বাড়িটির নির্মাতা যখন এটি তৈরি করেন তখন তাঁর ইচ্ছা ছিল এখানে তাঁর ছুটির দিনগুলো নিরিবিলি পরিবেশে প্রকৃতির কাছাকাছি কাটাবেন। এ রকম ভাবনা থেকেই শহর থেকে অনেক দূরে তিনি বাড়িটি নির্মাণ করেন। এখন অবশ্য এটি অবকাশ যাপনের কাজে ব্যবহৃত হয় না। এটি এখন একটা ছোটখাটো মিউজিয়াম, যেখানে চিত্রশিল্পী পেনেদোর অনেক ছবি ও দর্শনীয় বস্তু সংগৃহীত আছে।

মউনসেল ফোর্ট, ইংল্যান্ড

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, আকাশপথের আক্রমণে নাজেহাল ইংল্যান্ডের যুদ্ধসেনা। এ সময় গাই মউনসেল নামের একজন ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার অদ্ভুত এক কৌশলের আশ্রয় নেন। তিনি সমুদ্রের মধ্যে বিমানবিধ্বংসী কিছু টাওয়ার-ফোর্ট তৈরির পরামর্শ দেন। টেমস এসচুয়ারি ডিফেন্স নেটওয়ার্ক এ ফোর্ট তৈরি করে ১৯৪২ সালে। প্রতিটি ফোর্ট সাতটি বড় বড় স্টিলের তৈরি কক্ষবিশিষ্ট এবং এই সাতটি কক্ষ একটি থেকে আরেকটি বড় কক্ষকে ঘিরে আবর্তিত। মাঝের বড় কক্ষটি থেকে সাতটি কক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করা যেতো। একটি কক্ষ ছিল আরেকটির সঙ্গে ঝুলন্ত রাস্তা দিয়ে যুক্ত। এ ফোর্টগুলোতে বিমানবিধ্বংসী কামান রাখা হয়েছিল যেন আকাশপথে কোনো শত্রু বিমান আক্রমণ করলে মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করার আগেই তা ধ্বংস করা যায়। এসব ফোর্ট আগে স্থলে তৈরি করে পরে সমুদ্রে স্থাপন করা হতো। ১৯৫০ সালে আর্মিরা এগুলো পরিত্যাগ করে। ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ‘পাইরেট রেডিও’ নামে একটি রেডিও স্টেশন এখান থেকে তাদের অনুষ্ঠান প্রচার করত। পরে রেড স্যান্ড আর্মির এই ফোর্টটির কিছু অংশ জাহাজের ধাক্কায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। আর কিছু অংশ এখনো বহাল তবিয়তে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে।

ফ্লাডেড ক্রিপ্ট অব সান ফ্রান্সিসকো, রাভেনা, ইটালি

নবম ও দশকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত ‘ব্যাসিলিকা ডি ফ্রান্সিসকো’-কে বিশ্ব সেরা স্থাপত্য কর্মসমূহের একটি বলে বিবেচনা করা হতো। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সুন্দর গির্জাগুলোর মধ্যে এর স্থান সবার ওপরে। তবে মজার বিষয় হলো, এটা যতটা না নির্মাণশৈলী ও সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত, তার চেয়ে বেশি বিখ্যাত এর ভূ-গর্ভস্থ সমাধিকক্ষটির জন্য। সুদৃশ্য খিলান ও সুন্দর কারুকার্যখচিত এ সমাধিকক্ষটি এখন কিছু গোল্ডফিশের আবাসস্থল। প্রকৃতিগতভাবেই রেভেনা শহরটি একটি নিম্ন জলাভূমির অংশবিশেষ। ফলে গির্জাটি নির্মাণের কিছুদিন পর দেখা গেল যে নিচের কক্ষটি পানিতে ভরে গেছে! এ অবস্থায় কেউ কেউ অবশ্য মনে করল শহরটি বুঝি ডুবে যাচ্ছে! আশার কথা হলো এখন পর্যন্ত ডুবে যায়নি বা নষ্টও হয়নি। অবশ্য পানি প্রবেশ বন্ধের জন্য কোনো ব্যবস্থা যে নেওয়া হয়নি তা কিন্তু নয়। অনেক রকম চেষ্টা করা হয়েছে এ অবস্থা উত্তরণের কিন্তু কোনো চেষ্টাই কাজে লাগেনি। শেষ পর্যন্ত এ অবস্থায় রেখে দেওয়া হয়। এখন এখানে বাস কিছু গোল্ডফিশের। কোনো কোনো সময় পাতিহাঁসও সাঁতরাতে দেখা যায় এখানে। দর্শনার্থীরা মাঝে মাঝে কয়েন ফেলেন এখানে, তাদের পাপমোচন বা ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য।

ফ্লোটিং হাউস, অন্টারিও, কানাডা

বিশ্বে ভাসমান বাড়ি নেই এমন কিন্তু নয়। তবে হিউরন লেকের ভাসমান দ্বিতল এ বাড়িটির বিশেষত্ব হলো লোকালয় থেকে অনেক দূরে আর এমন প্রতিকূল পরিবেশে অবস্থিত, যেখানে সাধারণ মানুষ বাস করার কথা ভাববেই পারে না। একটা পন্টুনের ওপর এ বাড়িটি নির্মিত। একটি সাধারণ বাড়িতে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকা প্রয়োজন তার সবকিছুই রয়েছে এখানে। অবশ্য এর প্রবেশপথটা একটু অন্য রকম। সাধারণত মাটিতে নির্মিত বাড়িতে প্রবেশ করতে হলে নিচতলা ব্যবহার করতে হয়, কিন্তু এই বাড়িতে সরাসরি দোতলায় প্রবেশের জন্য ডাঙা থেকে দোতলা পর্যন্ত একটি সেতু ও নিচতলায় আরেকটি সেতু ব্যবহার করতে হয়। হিউরন লেকের সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো শীতকালে এতে পানি জমে যায়। আর সারা বছর এমনভাবে এর পানির উচ্চতা বাড়ে কমে যে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা একটু কঠিন বৈ কি! ২০০৫ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়, শেষ হয় ২০০৮ সালে। বর্তমানে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে অবকাশ যাপন কেন্দ্র্র হিসেবে।

উইকিপিডিয়া

জলমহল, জয়পুর, ভারত

কৃত্রিম হ্রদের মাঝ বরাবর একটা পাঁচতলা মহল, যার চারতলা বছরের নির্দিষ্ট একটা সময় পর্যন্ত থাকে জলের নীচে। নিচের তলাগুলো কখনোই জলের বাইরে বেরিয়ে আসে না। রাজস্থানের জয়পুর শহরের এ রকম একটা ভবন যা ‘জলমহল’ নামে পরিচিত। তিন দিকে আরাবল্লি পর্বতঘেরা মন হ্রদের মাঝে মোগল ও রাজপুত স্টাইলের মিশ্র আর্কিটেকচারে তৈরি মহলটি এককথায় অসাধারণ। এ জলমহল যতটা ঐতিহাসিক কারণে বিখ্যাত তার চেয়ে বেশি বিখ্যাত এর অবস্থানগত কারণে। প্রকৃতি ও পরিবেশ এটাকে একেবারে ছবির মতো করে ফুটিয়ে তুলেছে। মহলটি তৈরি হয়েছে লাল বেলেপাথর দিয়ে। সর্ব ওপরের ছাদে রয়েছে বাগান আর প্রতি কোনায় একটি করে ছাতা আকৃতির শেড। এটার তৈরির সময় নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে রয়েছে মতপার্থক্য। তবে মহারাজা দ্বিতীয় জয় সিং এটা নির্মাণ না করলেও পুনরুদ্ধার বা পুনর্নির্মাণ করেন এ বিষয়ে সবাই একমত। প্রায় ১৮০০ শতাব্দীতে নির্মিত এই জলমহলের নামের সঙ্গে ‘মহল’ থাকলেও এটি কখনো মহল হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। অনেকে মনে করেন, সেই সময়ের মহারাজা এখানে আসতেন হাঁস শিকার করতে। তবে মহারাজা শিকারে এসে এখানে যেহেতু থাকতেন, সেহেতু কিছু রাজকীয় সুবিধা তো এখানে ছিলই।

দ্য সিন্ডার কোন, স্কামেনিয়া, ওয়াশিংটন

মানুষ তো একসময় গাছেও বাসা বাঁধত, বাস করত এখানে। কিন্তু যখন তারা (তাদের মতে) সভ্য হলো তখন গাছ ছেড়ে মাটিতে নামল আর ওঠেনি গাছে, বিশেষ করে বলতে গেলে বাড়ি বানায়নি। কিন্তু কেউ যদি আবার গাছে বাসা বাঁধে, তাহলে আমরা কী ভাবব? অসভ্য? নিশ্চয় না! কারণ, যারা এ কাজটি করছে তারা সবাই সভ্যতার মাপকাঠিতে উর্ত্তীণ দক্ষ, অভিজ্ঞ ও পেশাদার কার্পেন্টার। সঙ্গে রয়েছে নতুন কিছু শিক্ষানবিশ। ২০১৪ সালে এরা একটি ট্রি-হাউস বানানোর উদ্যোগ নেয়। যেখানে রয়েছে একটি আদর্শ বাড়ির প্রায় সবকিছুই। তারা মনে করছে, এটা মানুষের আবাসন খরচ কমিয়ে আনবে, শহর বা গ্রামে একটি বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণে যে খরচ হয় তার তুলনায় এখানে বলা যায় কোনো খরচই নেই। তা ছাড়া এটা এমন জায়গায় তৈরি যে আপনি প্রতিবেশীর ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন নিশ্চিন্তে। দুটি ফারগাছের ওপর রয়েছে ২২০ বর্গফুটের দুটি ঘর। একটি হচ্ছে লিভিং রুম অন্যটি গেস্ট হাউস। ঘর দুটি একটি ঝুলন্ত রাস্তার সাথে সংযুক্ত। এটি তৈরিতে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার!

কেরেট হাউস, পোল্যান্ড

সম্ভবত কেরেট হাউসই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সরু বাড়ি। দুই কালের দুটি ঐতিহাসিক ভবনের মাঝখানে অবস্থিত এ বাড়ির সবচেয়ে চওড়া অংশটি মাত্র ১২২ সেন্টিমিটার আর সরু অংশটি ৭২ সেন্টিমিটার। আপাতদৃষ্টিতে এটা অসম্ভব মনে হলেও তার বাস্তব রূপ দিয়েছেন পোলিশ এক স্থপতি। পোল্যান্ডের ওয়ারস শহরে এর অবস্থান। এর স্থপতি তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, এটা হচ্ছে ওয়ারসর জটিল ইতিহাসের গভীর স্মৃতিচিহ্ন। কারণ, এটা যে দুই ভবনের মাঝে অবস্থিত তার একটি হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত প্রায় ভবন, আর অন্যটি হাল আমলের অ্যাপার্টমেন্ট ভবন। ২০০৯ সালে কেরেট হাউসের নির্মাণকাজ শুরু হয়, শেষ হয় ২০১২ সালে। এটি ইসরায়েলের ভ্রমণকাহিনি লেখক এটগার কেরেটের অস্থায়ী বসবাসের জন্য তৈরি। কেরেট হাউসের কোনো জানালা নেই। অর্ধ স্বচ্ছ কিছু অংশ দিয়ে এর মধ্যে আলো প্রবেশ করে। তবে এতে বদ্ধ ঘরে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো কোনো অনুভূতি জাগায় না।   

দ্রিনা রিভার হাউস, সার্বিয়া

বলকান এলাকার সবচেয়ে সুন্দর নদীগুলোর একটি দ্রিনা। আর একে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে নদীর মাঝে পাথরের ওপর ছোট্ট কাঠের একটা বাড়ি। প্রায় অর্ধশত বছর ধরে বন্যা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, বৃষ্টি-বাদল মাথায় করে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। সার্বিয়ার বাজিনা বাস্তা শহরের কাছে এই বাড়িটি এখন পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। এ রকম একটা উদ্ভট জায়গায় কীভাবে তৈরি হলো বাড়িটি? ১৯৬৮-৬৯ সালের দিকে এক দল যুবক কারও মতে সূর্যস্নানের উপযুক্ত জায়গা খুঁজতে খুঁজতে আবিষ্কার করে পাথরটিকে, আবার কারও মতে এক দল সাঁতারু সাঁতার কাটতে কাটতে ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য জায়গা খুঁজতে গিয়ে দেখতে পায় একে। ঘটনা যেটাই হোক না কেন, তখন এটা শুধু একটা পাথরখণ্ডই ছিল। পরে তারা এখনে একটা ঘর বানানোর পরিকল্পনা করে। এক বছরের মধ্যে সেখানে কাঠের এই ঘরটি নির্মাণ করে। ঘরটি একদিন বিখ্যাত হয়ে যাবে তা ভাবেনি তারা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটু নির্বিঘ্নে যেন এখানে বিশ্রাম নেওয়া যায়।

দ্য ওল্ড মিল, ভারনন, ফ্রান্স

প্যারিস থেকে ৭৫ কিলোমিটার দূরে সিন নদীর ওপরের ব্রিজের ওপর এই প্রাচীন মিলটির অবস্থান। বলা হয়, ভারননের এই ব্রিজটি সবচেয়ে হতভাগ্য কিন্তু দীর্ঘায়ু প্রাপ্ত ব্রিজ। কারণ, ফ্রান্স তথা ইউরোপের ইতিহাস যতবার পাল্টেছে, ততবারই ব্রিজটি ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং পরে তা পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। খুব সম্ভব ১২০০ শতাব্দীর পূর্বে কোনো একসময় কাঠ দিয়ে এ ব্রিজটি নির্মিত হয় এবং বিভিন্ন সময় ভাঙাগড়ার পর শেষ পর্যন্ত রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের সময় এটি পাথর দিয়ে নির্মাণ শুরু করে। যদিও অনেকে মনে করেন নির্মাণ খরচের জোগান দিতে না পেরে, আবার অনেকের মতে সামরিক গুরুত্ব হারিয়ে ফেলার কারণে এটার স্বত্ব একটা বেসরকারি কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক না কেন তা একটি ময়দার মিল কোম্পানির মালিকানায় চলে যায়। আর এই ময়দার মিল কোম্পানি ব্রিজটিকে বিশাল আকৃতির একটি ওয়াটার মিলে রূপান্তর করে। এই মিলটিতে পানির স্রোতকে কাজে লাগিয়ে গম বা এ ধরনের শস্য থেকে ময়দা তৈরি হতো। দীর্ঘ দিন মিলটি চালু থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্রিজের মূল কাঠামোটি যেমন নষ্ট হতে থাকে এবং একসময় মিলটিও ভেঙে পড়ে। এর মোট পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে এখন একটি কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও এখন এটার ব্যবহারিক কোনো গুরুত্ব নেই, কিন্তু সময়ের সাক্ষী হিসেবে এখনো এটি পর্যটকদের কাছে দর্শনীয় স্থান।

রুফটপ রক ভিলা, বেইজিং, চীন

বিশ্বে অনেক আলোচিত স্থাপনা আছে, যেগুলো তৈরি হয়েছে যতটা না প্রয়োজনে, তারচেয়ে কোনো খেয়ালি মানুষের শখ বা ইচ্ছার কারণে। যদিও কোনোটি টিকে আছে আবার কোনোটির অস্তিত্ব হারিয়ে গেছে। এ রকম একটি নির্মাণকর্ম বেইজিংয়ের রক ভিলা। ২৬ তলা একটি ভবনের ওপর এই রক ভিলা নির্মিত। কৃত্রিম পাথর দিয়ে তৈরি হয় টিলা। গাছ আর ঝোপঝাড় দিয়ে এমনভাবে সাজানো যে দূর থেকে মনে হয় এটি সাগরপারের কোনো ক্লিফ। ৮০০ বর্গফুটের এ ভিলাটির নির্মাণশৈলী আর সৌন্দর্যের দিক বিবেচনা করলে এটি অসাধারণ একটি কাজ ছিল। ‘ছিল’ বলছি এ কারণে যে ছয় বছর ধরে নির্মিত ভিলাটি ২০১৩ সালে ভেঙে ফেলা হয়। এর নির্মাতা এতটাই খেয়ালি ছিলেন যে তিনি সরকারের অনুমোদনের তোয়াক্কা করেননি। কিন্তু সরকার তো আর উপেক্ষা করতে পারে না, তাই জনগণের আপত্তি ও নিরাপত্তার কারণে এটিকে ‘ভয়ংকর অবৈধ স্থাপনা’ (Most Outrageous Illegal Structure) আখ্যা দিয়ে ১৫ দিনের মধ্যে ভেঙে ফেলতে নির্দেশ দেয়।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৫তম সংখ্যা, মে ২০১৭।

আবু সুফিয়ান
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top