….পূর্ব প্রকাশের পর
ইমারত নির্মাণব্যয় নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি কাজে ব্যবহৃতব্য মালামাল, যন্ত্রপাতি, কাজের পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। ফলে একটি ইমারত নির্মাণকল্পে প্রাক্কলন তৈরি করার আগেই নির্মিতব্য ইমারটিতে কী জাতীয় এবং কী মানের মালামাল ব্যবহার করা হবে, তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এ ছাড়া কাজের কোয়ালিটি নিশ্চিত করণার্থে কাজের পদ্ধতি কী হবে? আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি কী ব্যবহার করা হবে? কাজটির নির্মাণকাল কত দিন হবে ইত্যাদি বিষয়ের ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অতীব জরুরি। এ ছাড়া একটি প্রকল্পের সামগ্রিক নির্মাণব্যয় নিয়ন্ত্রণার্থে জনশক্তি ও মালামালের অপচয় রোধ করা বিশেষ বিবেচ্য বিষয়।
সুতরাং, যেকোনো নির্মাণকাজ পরিচালনা করতে অভিজ্ঞ ও দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া অত্যাবশ্যক। এ ছাড়া কোনো কাজের জন্য কতটুকু মালামাল প্রয়োজন সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবার সম্যক ধারণা থাকা বাঞ্ছনীয়। পাশাপাশি, বিভিন্ন কাজের পরিমাপ ও পরিমাণ কীভাবে নিরূপণ করা হয়, এ সংক্রান্ত বিষয়গুলো সম্বন্ধেও জানা থাকা দরকার। প্রসঙ্গত, নির্মাণকাজের পরিমাপ ও পরিমাণ নিরূপণ করার ক্ষেত্রে সাধারণত চার ধরনের চারটি একক ব্যবহৃত হয়, যেমন- সংখ্যা (নম্বর), দৈর্ঘ্য (ফুট), ক্ষেত্রফল (বর্গফুট) ও আয়তন (ঘনফুট)। দৈর্ঘ্য, ক্ষেত্রফল ও আয়তন এই তিনটি বিষয় পরিমাপ করতে সব সময় একই ধরনের একক ব্যবহার করা হয়, যেমন-
- দৈর্ঘ্য মাপতে ইঞ্চি/ফুট/গজ অথবা মিলিমিটার/সেন্টিমিটার/মিটার,
- ক্ষেত্রফল নির্ণয় করতে বর্গইঞ্চি/বর্গফুট/বর্গগজ অথবা বর্গমিলিমিটার/বর্গসেন্টিমিটার/বর্গমিটার
- আয়তন নির্ণয় করতে ঘনইঞ্চি/ঘনফুট/ঘনগজ অথবা ঘনমিলিমিটার/ঘনসেন্টিমিটার/ঘনমিটার প্রভৃতি।
তবে, আমাদের দেশে নির্মাণকাজের পরিমাপ ও পরিমাণ নির্ণয় করার জন্য ফুট, বর্গফুট ও ঘনফুটই বহুল প্রচলিত। এ ছাড়া, সংখ্যাবাচক কোন জিনিসের ক্ষেত্রে মোট সংখ্যা বোঝাতে নম্বর ব্যবহার করা হয়।
একটি প্রকল্পের কাজের পরিমাপ ও পরিমাণ নির্ণয় করতে বিভিন্ন আইটেমের কাজ বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো একটি ইমারতের ভিত নির্মাণে যদি আরসিসি (রিইনফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিট) পাইল ব্যবহার করা হয়, সেক্ষেত্রে একটি পাইলের বিভিন্ন অবস্থার পরিমাপ ও পরিমাণ নিরূপণ পদ্ধতি;
১. পাইলের দৈর্ঘ্য (লম্বা) = ফুট
২. পাইলের আড়াআড়ি ছেদন ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল = বর্গফুট
একটি পাইলকে আড়াআড়ি ছেদন করলে তার আকৃতি অনুসারে বিভিন্নভাবে ক্ষেত্রফল নির্ণয় করা যায়। যেমন-
বর্গাকার পাইলের ক্ষেত্রে, ছেদন ক্ষেত্রের উভয় পাশের দৈর্ঘ্য x দৈর্ঘ্য = ফুট x ফুট = বর্গফুট।
গোলাকার পাইলের ক্ষেত্রে, ০.৭৮৫ ঢ ব্যাসের দৈর্ঘ্য x ব্যসের দৈর্ঘ্য = ০.৭৮৫ x ফুট x ফুট = বর্গফুট।
৩. পাইলের আয়তন (ভলিউম) = ঘনফুট
আড়াআড়ি ছেদন ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল x দৈর্ঘ্য = ঘনফুট। অর্থাৎ বর্গফুট x ফুট = ঘনফুট। বর্গাকার কিংবা গোলাকার
উভয় ক্ষেত্রেই একই নিয়মে একটি পাইলের আয়তন (ভলিউম) অর্থাৎ কংক্রিটের পরিমাণ নিরূপণ করা হয়ে থাকে।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, কাস্ট-ইন-সিটু (যা ডিজাইন অনুযায়ী সরাসরি মাটিতে হোল করে রডের খাঁচা দিয়ে কংক্রিট ঢালাই করা হয়) পাইলের ক্ষেত্রে সব সময়ই গোলাকৃতির পাইল ব্যবহার করা হয়। শুধু, প্রি-কাস্ট (যা ডিজাইন অনুযায়ী মাটির ওপর শাটারিং ও রডের খাঁচা তৈরি করে কংক্রিট ঢালাই করা এবং নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে বিভিন্ন পদ্ধতিতে মাটির ভেতর বসানো হয়) পাইলের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সেকশন ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
৪. রডের পরিমাপ ও পরিমাণ = ফুট বা মিটার ও কেজি/টন
রডের পরিমাপ ও পরিমাণ নিরূপণ করার ক্ষেত্রে দৈর্ঘ্য নির্ণয় করতে ফুট ও মিটার দুটো এককই ব্যবহার করা হয়, কিন্তু ওজন নির্ণয় করার ক্ষেত্রে কেজি অথবা টন, যেকোনো একটি একক ব্যবহার করা হয়। ওজন এক টনের কম হলে তা ‘কেজি’তে এবং বেশি হলে ‘টন’-এ প্রকাশ করা হয়। রডের ওজন নির্ণয় করার জন্য প্রতিটি রডের ডায়ামিটার (ব্যাস) অনুযায়ী ‘ইউনিট ওয়েট’ (প্রতি রানিং ফুট/মিটারের ওজন) দিয়ে সর্বমোট দৈর্ঘ্যকে গুণ করলে মোট ওজন পাওয়া যায়।
উপরোল্লিখিত বিষয়গুলো জানা থাকলে যে কারোর পক্ষেই কংক্রিট ও রডের পরিমাপ ও পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব। কিন্তু রডের পরিমাণ একবারে বের করা গেলেও হিসাবকৃত কংক্রিট তৈরি করার জন্য কী কী মালামাল কত পরিমাণে লাগবে তা নিরূপণ করা একটু কঠিন। অত্র বিষয়গুলো সাধারণত একজন প্রকৌশলী কিংবা বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোক ছাড়া বিশ্লেষণ করা সহজসাধ্য নয়। তারপরও এ ব্যাপারে সম্যক কিছু ধারণা থাকলে সবকিছুই করা সম্ভব। তাই, একটি পাইল ঢালাই করতে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন মালামালের হিসাব বের করার একটি নমুনা দেওয়া হলো।
একটি পাইল নির্মাণার্থে ডিজাইনার (ইঞ্জিনিয়ার) কর্তৃক দেওয়া ডিজাইন এবং স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী পাইলের কংক্রিটের মাপ (দৈর্ঘ্য ও ছেদন ক্ষেত্র), রডের সংখ্যা ও ব্যাসের মাপ, কংক্রিট ঢালাইয়ে ব্যবহৃতব্য মালামালের স্পেসিফিকেশন অর্থাৎ সিমেন্ট, বালু ও নুড়িপাথরের বিবরণ এবং এগুলো মিশ্রণের অনুপাত ইত্যাদি বিষয় সঠিকভাবে অনুসরণ করতে হবে।
ধরা যাক,
একটি পাইলের দৈর্ঘ্য = ৫০ ফুট, আড়াআড়ি ছেদন ব্যাস = ২০ ইঞ্চি বা ১.৬৮ ফুট, প্রধান রড = ৫/৮ ইঞ্চি ব্যাসবিশিষ্ট ৬টি এবং ৩/৮ ইঞ্চি ব্যাসবিশিষ্ট স্পাইরাল রিং ৬ ইঞ্চি পর পর। কংক্রিটের অনুপাত = ১:১.৫:৩ (সিমেন্ট, বালু ও নুড়িপাথর)। কংক্রিটের ক্লিয়ার কভার ৩ ইঞ্চি। এমন একটি পাইল ঢালাই করার জন্য প্রয়োজনীয় মালামালের হিসাব নিরূপণের পদ্ধতি;
ক. কংক্রিটের পরিমাণ নিরূপণ
- পাইলটির আড়াআড়ি ছেদন ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল,
০.৭৮৫ ঢ ব্যাসের দৈর্ঘ্য x ব্যাসের দৈর্ঘ্য = ০.৭৮৫ x ১.৬৮ x ১.৬৮ = ২.২২ (প্রায়) বর্গফুট।
- পাইলটির আয়তন (ভলিউম),
ছেদন ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল x দৈর্ঘ্য = ২.২২ বর্গফুট x ৫০ ফুট = ১১১.০০ ঘনফুট।
(অর্থাৎ উল্লেখিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী একটি পাইল ঢালাই করতে মোট ১১১.০০ ঘনফুট কংক্রিট প্রয়োজন)
খ. ১১১.০০ ঘনফুট কংক্রিটের জন্য সিমেন্ট, বালু ও নুড়িপাথরের পরিমাণ নিরূপণ
(মনে রাখা দরকার, ১০০ ঘনফুট জমাট বাঁধা কংক্রিট তৈরি করার জন্য ১৫০ ঘনফুট শুকনো মালামালের প্রয়োজন হয়, অর্থাৎ জমাট বাঁধা কংক্রিটের পরিমাণ x ১.৫০)
অতএব, ১১১.০০ ঘনফুট কংক্রিট ঢালাই করার জন্য ১ঃ১.৫ঃ৩ অনুপাতে যে পরিমাণ সিমেন্ট, বালু ও নুড়িপাথর প্রয়োজন হবে তার বিশ্লেষণ এবং পরিমাণ;
- সিমেন্ট = (১১১.০০ x ১.৫০ x ১) / (১+১.৫+৩) = ৩০.২৭ ঘনফুট = ২৪.২২ বস্তা (১ বস্তা = ১.২৫ ঘনফুট)।
- বালু = (১১১.০০ x ১.৫০ x ১.৫) / (১+১.৫+৩) = ৪৫.৪১ ঘনফুট।
- নুড়িপাথর = (১১১.০০ x ১.৫০ x ৩) / (১+১.৫+৩) = ৯০.৮২ ঘনফুট।
গ. রডের পরিমাণ নিরূপণ
৫/৬ ইঞ্চি ব্যাসবিশিষ্ট প্রধান রড,
- ৬টি x ৪৯.৫০ ফুট (লম্বা) = ২৯৭.০০ ফুট x ০.৪৭৩ কেজি (এক ফুট রডের ওজন) = ১৪০.৪৮ কেজি। (প্রধান রডের দৈর্ঘ্য নির্ণয় করতে কংক্রিটের কভারিংয়ের জন্য নিচে-ওপরে ৩” +৩” = ৬” বাদ দিতে হয়)
- ৩/৮ ইঞ্চি ব্যাসবিশিষ্ট স্পাইরাল রিং
- ১০০টি x ৩.৯১ ফুট (লম্বা) =৩৯১.০০ ফুট x ০.১৭১ কেজি (এক ফুট রডের ওজন) = ৬৬.৮৬ কেজি।
বি. দ্র. ফরমুলা অনুসারে একটি রিংয়ের মোট দৈর্ঘ্য = ৩.১৪ ঢ (২০” -৬” )= ৪৩.৯৬” + ৩” = ৪৬.৯৬ ইঞ্চি = ৩.৯১ ফুট।
এখানে উল্লেখ্য, ২০” ব্যাসবিশিষ্ট পাইলের একটি স্পাইরাল রিংয়ের দৈর্ঘ্য বের করতে চারপাশে ৩” কভারিং বাদ দিয়ে হিসাব করতে হয় এবং প্রতিটি রিংয়ের জন্য প্রাপ্ত দৈর্ঘ্যরে সঙ্গে স্পেইসিং (কত ইঞ্চি পরপর রিং বসবে) এর অর্ধেক অর্থাৎ স্পেইসিং ৬” হলে তার অর্ধেক ০.৫ x ৬” = ৩” যোগ করে একটি রিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় রডের মোট দৈর্ঘ্য বের করতে হয়।
সুতরাং, উপরোল্লিখিত বিশদ বিশ্লেষণ অনুযায়ী ২০০” (ইঞ্চি) ব্যাসবিশিষ্ট ৫০ ফুট লম্বা ১টি আরসিসি পাইল ঢালাই করার জন্য যে পরিমাণ মালামাল প্রয়োজন;
- ৫/৬” ব্যাসের রড = ১৪০.৪৮ কেজি
- ৩/৮” ব্যাসের রড = ৬৬.৮৬ কেজি
- সিমেন্ট = ২৪.২২ বস্তা
- বালু = ৪৫.৪১ ঘনফুট
- নুড়িপাথর = ৯০.৮২ ঘনফুট
উল্লেখিত মালামালের কোনো অপচয় ধরা হয়নি। অতএব, অপচয় রোধ করা জরুরি বিষয়।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, একটি পাইল ঢালাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় এই মালামালের হিসাবটি বের করতে পারলে, এখান থেকে বাজার দর অনুপাতে খরচের হিসাবটিও অতি সহজেই বের করা সম্ভব। এভাবে সম্পূর্ণ ভিত তৈরি করতে যত পাইল লাগবে, তার মোট খরচের হিসাবটিও বেরিয়ে আসবে। তবে, মনে রাখতে হবে এটা শুধু প্রয়োজনীয় মালামালের জন্য খরচের হিসাব। এর সঙ্গে অন্যান্য খরচ, যেমন-পরিবহন, যন্ত্রপাতি, লেবার ইত্যাদির জন্য যেসব খরচ আসবে তা যোগ করে পাইলিংয়ের কাজের জন্য সর্বমোট খরচের হিসাব বের করতে হবে।
চলবে…
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮২তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৭।