গৃহের অবিচ্ছেদ্য অংশ রান্নাঘর। আর রান্নাঘরের অপরিহার্য অনুষঙ্গ কিচেন সিঙ্ক। বাসন মাজা, শাকসবজি, মাছ, মাংস ধোয়ার কাজ কিচেন সিঙ্কেই করা হয়। রান্নাঘরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপরই নির্ভর করে পরিবারের সুস্বাস্থ্য। তাই নিসঃন্দেহে বলা যায় একটি জীবাণুমুক্ত পরিচ্ছন্ন সিঙ্ক সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। তা ছাড়া আধুনিক যুগে রান্নাঘরের সৌন্দর্যবর্ধনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে অত্যাধুনিক ডিজাইনের সব সিঙ্ক।
সিঙ্কের ধরন ও সাইজ
রান্নাঘরের পরিসর ও ব্যবহারকারীর চাহিদার ওপর নির্ভর করে বাজারে প্রচলিত রয়েছে নানা ধরন ও আকারের সিঙ্ক। আকৃতির দিক থেকে ডাবল রোল সিঙ্ক, এক্সট্রা জিপ রোল, স্পেশালটি সেপটেড সিঙ্ক, টপ/ওভার মাউন্টেড সিঙ্ক, আন্ডার/সাব-মাউন্টেড সিঙ্ক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে স্পেশালটি সেপটেড সিঙ্ক তুলনামূলকভাবে বেশি প্রচলিত। আকারের দিক থেকে বড় (৪০x১৮), মাঝারি (৩৬x১৮), ছোট (৩০x১৮) এই তিন ধরনের সিঙ্ক বাজারে পাওয়া যায়। তবে মাঝারি আকারের সিঙ্কের চাহিদা ক্রেতাদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি।
সিঙ্কের রকমফের
বাজারে বিভিন্ন উপকরণে তৈরি সিঙ্ক পাওয়া যায়। এর মধ্যে স্টেইনলেস স্টিল (Stainless Steel), পোরসেলিন (Porcelain), অ্যাক্রিলিক (Acrylic), সলিড সারফেস (Solid Surface) এ তৈরি সিঙ্ক উল্লেখযোগ্য। তবে স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি সিঙ্ক বহুল ব্যবহৃত ও জনপ্রিয়।
সিঙ্ক কেনার আগে
সিঙ্ক নির্বাচনের সময় কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। নিম্নমানের ক্রোমের পরত দেওয়া সিঙ্ক ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা ওসব সিঙ্ক থেকে ধাতব পদার্থ খাবারের পাত্রে ছড়িয়ে যেতে পারে। এ ধরনের সিঙ্কে শাকসবজি ও খাবার ধোয়াও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। আমেরিকান আয়রন অ্যাপ স্টিল ইনস্টিটিউট স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ সিঙ্ক বানানোর ক্ষেত্রে ধাতব পদার্থ মিশ্রণের অনুপাত নির্ধারণ করেছে। এআইএসআই ৩০৪ গ্রেডের ধাতব পদার্থ মিশ্রণ ব্যবহার করতে হবে। ১৮ শতাংশ ক্রম এবং ৮ শতাংশ নিকেলের মিশ্রণেই আদর্শ সিঙ্ক প্রস্তুত করা হয়। সুতরাং এই নিত্যপ্রয়োজনীয় অনুষঙ্গটি ভালোভাবে যাচাই করে কেনাই অধিক যুক্তিযুক্ত।
বাজারে প্রচলিত ব্র্যান্ডসমূহ
বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিঙ্ক পাওয়া যায়। এর মধ্যে গাজী, কেএমপি হর্স, ডলপিন, আরএফএল, মদিনা, কেএম, জেএসডব্লিউ (ইতালি), সুইট হোম (স্পেন) রয়েছে ক্রেতা চাহিদার শীর্ষে।
সিঙ্ক ব্যবহারে সতর্কতা
হাঁড়ি-পাতিল থেকে শুরু করে রান্নাঘরে ব্যবহৃত সবকিছুই কিচেন সিঙ্কে রেখে পরিষ্কার করা হয়। রান্নাঘরের সব ধরনের ধুলাবালুর ধকল সামলায় কিচেন সিঙ্ক। ফলে দিনের অধিকাংশ সময় এটি ভেজা থাকে। রান্নাঘরের ঝকঝকে সিঙ্কটি দেখলে কেউ কেউ ভাবতে পারে, এটা বুঝি দারুণ পরিচ্ছন্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটা হতে পারে বাড়ির সবচেয়ে জীবাণুপূর্ণ অংশ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, কিচেন সিঙ্কের ড্রেনের প্রতি ইঞ্চিতে ৫ লাখেরও বেশি ব্যাকটেরিয়া থাকে। এ ছাড়া পানির সঙ্গে ভারী ধাতু এবং ক্ষারীয় রাসায়নিক পদার্থ মিশে থাকায় স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি সিঙ্কে খুব সহজেই ময়লা জমে, যা পরে দাগে পরিণত হয়। নিত্যব্যবহার্য সিঙ্কে কোনো দাগ পড়ার আগেই সতর্ক হোন। ঝকঝকে ও জীবাণুমুক্ত রাখতে নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন এটিকে।
সিঙ্ক পরিষ্কারের নিয়মাবলি
- একটি পরিষ্কার কাপড় ভিনেগারে ভিজিয়ে নিন। পুরো সিঙ্কের ওপর রেখে এবার মুছুন। সিঙ্কের যে স্থানে বেশি ময়লা জমেছে ভিনেগারে ভেজা কাপড় দিয়ে সেই মুখটি ঘণ্টাখানেক ঢেকে রাখুন। এরপর নরম কাপড় দিয়ে স্ক্র্যাব করে নিন। ময়লা সহজেই উঠে আসবে। এরপরও কিছু ময়লা থাকলে ভিনেগারে ভেজানো কাপড়টি আরও ঘণ্টাখানেক দিয়ে রাখুন। এরপর আবারও কাপড় দিয়ে স্ক্র্যাব করে নিন। কখনো নতুন কাপড় ব্যবহার করবেন না। এতে নীলের ওপর স্ক্র্যাচ পড়তে পারে। সিঙ্ক পরিষ্কারের জন্য সব সময় নরম কাপড় ব্যবহার করুন।
- ভেজা সিঙ্কের ওপর বেকিং সোডা ছিটিয়ে দিন। এবার ব্রাশ দিয়ে ঘষে সেটিকে পেস্টের মতো ছড়িয়ে দিন। পেপার টাওয়েল ভিনেগারে ভিজিয়ে পুরো সিঙ্কে ঢেকে রাখুন ২০ মিনিট। এরপর সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
- একটি অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল দিয়ে পুরো সিঙ্ক মুড়িয়ে নিন। এরপর পুরো সিঙ্কে গরম পানি ঢেলে দিন। এবার ৩ চামচ বেকিং সোডা মিশিয়ে দিন। ১০ মিনিট অপেক্ষা করুন। পানি ঢেলে দিন এবং শুকনো কাপড় দিয়ে সিঙ্কটি ঘষে নিন। দেখবেন নতুনের মতো লাগছে আপনার পুরোনো সিঙ্কটিকে।
- সিঙ্ক পরিষ্কারে ডিশওয়াস ও নাইলনের স্ক্র্যাব ব্যবহার করুন। গ্লাস ক্লিনারও অল্প পরিমাণে ব্যবহার করতে পারেন। তবে স্টেইনলেস স্টিলে অ্যামোনিয়া ও ব্লিচ ব্যবহার করা যাবে না। প্রথমে সিঙ্কের সব জায়গায় গরম পানি ঢেলে দিন। লেবুর রস, বেকিং সোডা ও লবণ দিয়ে পেস্ট তৈরি করে ব্রাশ দিয়ে ঘষে পাঁচ মিনিট রেখে দিন। এবার পানি দিয়ে ধুয়ে একই পদ্ধতিতে ভিনেগার ঘষে নিন। ২০ মিনিট পর লিকুইড ডিশওয়াস সাবান দিয়ে স্ক্র্যাব করে ধুয়ে নিন। শেষ ধোয়াতে গরম পানি ব্যবহার করুন।
এ ছাড়া সিঙ্কের উজ্জ্বলতা ও চাকচিক্য ফিরিয়ে আনতে
- ভিনেগার ও বেকিং সোডা দিয়ে সিঙ্ক পরিষ্কারের পর লেবু বা কমলার খোসা দিয়ে পুরো সিঙ্ক মুছুন। এতে মিষ্টি সুগন্ধ ছড়াবে।
- সিঙ্ক ঝকঝকে রাখতে পেপার টাওয়েলে অলিভ ওয়েল নিয়ে মুছতে পারেন।
- সিঙ্কের ঔজ্জ্বল্য ফিরিয়ে আনতে লেবুর রসের গুণাগুণ অনস্বীকার্য। এক কাপ বোরাক্স পাউডারের সঙ্গে আধা কাপ লেবুর রস মিশিয়ে নিন। এবার এই মিশ্রণ একটি স্পঞ্জে নিয়ে পুরো সিঙ্কে লাগান। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। এবার স্পঞ্জের সাহায্যে ঘষে পরিষ্কার করুন। পানি দিয়ে ধোয়ার পর দেখবেন পুরো সিঙ্ক নতুনের মতোই চকচক করছে।
সিঙ্কের বাড়তি সুরক্ষায়
- সিঙ্কে দাগ লেগে গেলে দুই কাপ গরম পানিতে এক কাপ ভিনেগার, এক কাপ বেকিং সোডা সিঙ্কে ঢেলে দিন। দুই মিনিটেই সিঙ্কের জ্যাম খুলে যাবে।
- রোজ রাতে নিয়ম করে সিঙ্ক হোলে গরম পানি ঢাললে তা পরিষ্কার থাকবে, জীবাণু কম ছড়াবে এবং পোকামাকড়ের উৎপাতও থাকবে না।
দরদাম
সিঙ্কের দাম নির্ভর করে এর মান ও আকারের ওপর। ছোট আকারের সিঙ্ক (৩০x১৮) পাওয়া যাবে ৯৫০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকার মধ্যে। মাঝারি আকারের সিঙ্ক (৩৬x১৮) পাওয়া যাবে ১ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকার মধ্যে। বড় আকারের সিঙ্কের ক্ষেত্রে (৪০x১৮) মাঝারি আকারের সিঙ্কের তুলনায় প্রতিটিতে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি গুনতে হবে আপনাকে।
প্রাপ্তিস্থান
স্যানিটারি সামগ্রীর বিক্রয়কেন্দ্রে পাওয়া যাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় এ অনুষঙ্গটি। ঢাকার হাতিরপুল, বাংলামটর, স্টেডিয়াম মার্কেট, মিরপুর, শেওড়াপাড়া, কাজিপাড়া, গুলশানের বিভিন্ন স্যানিটারি ও বাথরুম ফিটিংস সামগ্রীর দোকানে পাবেন আপনার চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন রকম সিঙ্ক।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮২তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৭।