সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের মাত্র এক শতাংশ আসে বিকল্প জ্বালানি থেকে। আর এই এক শতাংশ বিদ্যুতের সিংহভাগ উৎপাদিত হচ্ছে গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনার্জির পরিচালক অধ্যাপক সাইফুল হক মনে করেন শহরের মানুষকেই আগ্রহী করে তুলতে হবে বিকল্প জ্বালানির প্রতি। কারণ, তারাই বিদ্যুতের বিশাল অংশের ভোক্তা। বিকল্প জ্বালানির প্রতি নির্ভরতা বাড়াতে সরকার নিয়ম করেছিল যেকোনো নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে হলে সেখানে অবশ্যই সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কিন্তু বর্তমানে সেটা আর কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে না।
অবশ্য শহরের বাড়িগুলোতে কিছু সমস্যাও রয়েছে। বিশেষ করে জায়গার অপ্রতুলতা। শহরের অধিকাংশ বহুতল ভবনগুলোতে ব্যবহারযোগ্য জায়গা বলতে থাকে শুধু ছাদটাই। এ ছাড়া তেমন কোনো ফাঁকা জায়গা পাওয়া যায় না। আর এই জায়গাটাও যদি সৌর বিদ্যুৎ দখল করে, তবে মানুষ কীভাবে বাস করবে? তবে সব ক্ষেত্রেই যে এ সমস্যা রয়েছে তা কিন্তু নয়। তা ছাড়া সৌর বিদ্যুৎ প্যানেলগুলো দেখতেও তেমন আকর্ষণীয় নয়। সত্যি বলতে কি আমরা যে ধরনের প্যানেল ব্যবহার করি, সেগুলোতে সৌন্দর্যবর্ধনের ন্যূনতম উপাদান নেই। ন্যাশনাল রিনিউয়াবল এনার্জি ল্যাবরেটরির সিনিয়র সায়েন্টিস্ট বাটি টেন্যাস্ট বলেন, যখন ফটো ভোলটাইক (সোলার এনার্জি) তৈরি শুরু হয়, তখন এর নান্দনিক দিকটিকে উপেক্ষা করা হয়। আর এটি ঠিক যে কোনো অসুন্দরই কেউ তার বাড়িতে রাখতে চাইবে না।
সৌর বিদ্যুৎ প্যানেলের এই দুর্বলতাকে কাটিয়ে উঠতে অনেকেই কাজ করছে। তবে এখন পর্যন্ত সার্থকতার মুখ দেখেছে ইলন মাস্ক, যিনি টেপসা কোম্পানির পরিচালক ও সোলারসিটি কোম্পানির চেয়ারম্যান। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তারা এমন একধরনের টাইলস তৈরি করেছেন, যেটি ছাদে ব্যবহার করা হলে সেখান থেকে তা সৌরশক্তি ব্যবহার করে যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে।
টেপসা ও সোলার সিটি প্রাথমিক পর্যায়ে চারটি ডিজাইনের টাইলস তৈরি করেছে, সেগুলো নান্দনিক ও দৃষ্টিনন্দন। প্রচলিত টাইলসের মতোই ছাদে ব্যবহারযোগ্য। কাচের তৈরি এসব টাইলসের মধ্যে সোলার প্যানেলকে এমনভাবে বসানো যে বাইরে থেকে মোটেও বোঝা যায় না। শুধুই দেখতে সুন্দর হলে চলবে না। যখন এটাকে ছাদ হিসেবে ব্যবহার করা হবে তখন অনেক কিছুই মাথায় রাখতে হয়। ছাদে অযাচিতভাবে মাথায় ক্রিকেট বলের আঘাত এটা নতুন কিছু নয়। কাল বৈশাখী বা শিলাবৃষ্টি ও বিবেচনায় রাখতে হয়। তা ছাড়া পাশের বাড়ির ছাদ থেকে ভারী কিছুর পতনও অসম্ভব নয়। এসব কিছু সহ্য করে নতুন এই টাইলস কতটুকু টিকতে পারবে তা চিন্তার ব্যাপার।
ইলন মাস্ক অবশ্য এক টুইটার বার্তায় জানান, এই এসবেস্ট টাইলসের ওপর আপনি যেমন স্বচ্ছন্দ্যে হেঁটে যেতে পারবেন তেমনি এই নতুন টাইলের ওপর দিয়েও সমানে হেঁটে যেতে পারবেন। সাধারণ টাইলের মতো এটিও সব ধরনের প্রাকৃতিক সমস্যার সামনে দাঁড়াতে সক্ষম। অন্য একটি ই-মেইল বার্তায় সোলার সিটি জানায়, এই সোলার রুফ সোলার প্যানেল ও ঘরের ছাদের সব ধরনের মান রক্ষা করে তৈরি করা হচ্ছে। বিল্ডিংয়ের এনার্জি ইফিসিয়েন্সি, জলরোধ করার ক্ষমতা, বিদ্যুৎ ও অগ্নি নিরাপত্তা, ঝড়, শিলা, বৃষ্টি বা তুষারপাতসহ সব ধরনের সমস্যায় উপযোগী হবে এই টাইলস।
মাস্ক অবশ্য আরও একটু বেশি চিন্তা করে ফেলেছেন। তিনি মনে করেন এই টাইলসে হয়তো তাপ উৎপন্নকারী কিছু যোগ করা হবে, যাতে এটি শীতকালে যেমন ঘর গরম রাখতে পারবে তেমনি ছাদে জমে যাওয়া তুষার বা বরফ আপনা-আপনি গলে নিচে পড়ে যাবে। যদি বাস্তবে এ রকম হয় তাহলে তো অবশ্যই তা প্রশংসার দাবিদার। তবে এ অপার সূচনা হিসেবে তারা ইতিমধ্যে একটি পরীক্ষা জনসাধারণকে দেখিয়েছে, যেখানে দেখা যায় ১ দশমিক ২ পাউন্ডের একটি লোহার বল ওপর থেকে পড়লেও এই টাইলস অক্ষত থাকছে অথবা সচরাচর যে টাইলস ব্যবহার হয়ে থাকে; যেমন পোড়ামাটি, অ্যাসফল্ট বা মেঝের টাইলস এ পরিমাণ আঘাতে ভেঙে যায়।
এত সুবিধার পরও একটি লক্ষণীয় অসুবিধা অবশ্য রয়েছে নতুন এ টাইলসের। আর তা হলো এর কর্মদক্ষতায়। সোলার সিটির বর্তমানে যেসব সোলার প্যানেল বাজারে পাওয়া যায়, তা চেয়ের কর্মদক্ষতা দুই ভাগ কম। কাচের তৈরি এই টাইলসের ডিজাইন ও এতে ব্যবহৃত কোটিংয়ের কর্মক্ষমতা কমিয়েছে। তবে এটাই যেহেতু চূড়ান্ত ডিজাইন নয়, সেহেতু আশা করা যায় যখন এটা বাজারে ছাড়া হবে তখন এই সীমাবন্ধতা দূর করেই ছাড়া হবে।
অবশ্য আরেকটি বিষয় বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে তা হলো সাধারণত যেসব সোলার প্যানেল বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে সেগুলো বসানোর সময় একটি লোহার ফ্রেমের ওপর বসানো হয়। ফলে দিনের পর দিন দীর্ঘ সময় ধরে খোলা আকাশের নিচে রৌদ্রের তাপে উত্তপ্ত হতে থাকে। কিন্তু নিচের দিকে খালি জায়গা যথেষ্ট পরিমাণে থাকায় প্রচুর বায়ু চলাচল করতে পারে। তাই এটি যে পরিমাণে উত্তপ্ত হওয়ার কথা সে পরিমাণে হয় না। সোলার প্যানেলের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো এটি যত বেশি উত্তপ্ত হবে, তত বেশি কর্মক্ষমতা হারাবে। কিন্তু বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা থাকলে ঠান্ডা হওয়ারও সুযোগ থাকে, তাই খুব বেশি কর্মক্ষমতা হারায় না।
নতুন এই টাইলস যেহেতু ছাদ হিসেবে ব্যবহৃত হবে, সেহেতু নিচ দিকে বায়ু চলাচলের কোনো ব্যবস্থা থাকবে না। ফলে উত্তপ্ত হয়ে আরও কর্মক্ষমতা কমে যাবে কি না সে বিষয়ে সোলারসিটি কিংবা টেপসা কর্তৃপক্ষ এখনো বিশেষ কিছু জানায়নি। আগামী বছর বাজারে আসার আগেই হয়তো এসব কিছুর একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সুবিধা-অসুবিধা যা-ই থাক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয় হলো এর দাম। এটা স্থাপনে কী রকম খরচ পড়বে তা সবারই জানার আগ্রহ থাকে। তাদের দেওয়া তথ্য মতে, এখানে যে ব্যাটারি ব্যবহার করা হবে তা তৈরি করেছে টেপসা বা সোলার সিটি নিজেই। পাওয়ার ওয়াল নামের দুইটি ব্যাটারির দাম ধরা হয় ৫ হাজার ৫০০ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা। এটি মূলত সূর্য থেকে টাইলসের মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুৎকে জমা রাখবে। ব্যাটারি স্থাপনের খরচ ধরা হচ্ছে এক হাজার ডলার বা প্রায় ৮০ হাজার টাকা। আর ছাদ তৈরির জন্য আরও কয়েক হাজার ডলার। অবশ্য ছাদের খরচটি অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। যেমন এর আয়তন কত হবে, আকৃতি কেমন হবে, শ্রমিকের খরচ এবং কী ধরনের টাইলস ব্যবহার করা হবে তার ওপর।
এখানে বলে রাখা ভালো, টেপসা বা সোলারিম এখন পর্যন্ত চার ধরনের টাইলস তৈরি করেছে। টাসকান গ্লাস টাইলস, স্মুথ গ্লাস টাইলস, টেক্সচার্ড গ্লাস টাইলস ও স্লেট গ্লাস টাইলস। এসব গ্লাস টাইলস কোয়ার্টজের তৈরি টেম্পার্ড গ্লাস দিয়ে যা স্টিলের মতো শক্ত এবং তাত্ত্বিকভাবে এটি অসীম সময়ের জন্য তৈরি আবহাওয়া ও প্রকৃতির মাঝে টিকে থাকতে সক্ষম বলে দাবি করছে এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।
যা হোক খরচের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট করে কিছু না জানালেও তাদের দাবি হচ্ছে যদি ইলেকট্রিক বিল, ছাদের নির্মাণ খরচ ও এর স্থায়িত্ব বিবেচনা করা হয় তবে উন্নতমানের টেরাকোটা, স্লেট বা পাথরের তৈরি টাইলসে যে ধরনের খরচ হয় তার চেয়ে বেশি খরচ হবে না। অবশ্য টেপসা মনে করে খরচ যা-ই হোক না কেন, উন্নতমানের দামি টাইলস দিয়ে তৈরি একটি ছাদ শুধু যে মানুষকে নিরাপদ রাখবে তা-ই নয়, বরং এটা তার অভিজাত্যের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হবে। এ থেকে কিছুটা অনুমান করা যায় যে এটা সাধারণ মানুষ বা আমজনতার জন্য আপাতত নাও হতে পারে। তবে উৎপাদন বাড়লে বা অন্য কোনো উপায়ে যদি এর উৎপাদন খরচ কমে আসে, তখন অবশ্য দাম কমে সাধারণ মানুষের নাগলে আসবে বলে আশা করা যায়।
সোলার সিটি তাদের পুরোনো সিস্টেমের সোলার প্যানেল যেভাবে দিয়ে থাকে সেই রকম কোনো একটা ব্যবস্থা করলেও সাধারণ মানুষ হয়তো কিছুটা উপকৃত হতে পারে। যেমন ভাড়া হিসেবে অথবা দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে। যেভাবেই দিক না কেন এ মুহূর্তে এটা আমাদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই থাকছে। তারপরও আশা করতে দোষ কি! একদিন ঢাকা শহরের বাড়িগুলোর ওপর শোভা পাবে চকচকে দামি কিন্তু দারুণ কার্যকর এ টাইলস।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮১তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৭।