সিসিটিভি সদর দপ্তর
সুনিপুণ স্থাপত্যের মাস্টার পিস

২০০৮ সাল; চীনের বেইজিং-এ অনুষ্ঠিত হয় ২৯তম অলিম্পিক গেমস। এ উপলক্ষেই গোটা শহর সাজে নববধূর সাজে। বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীকে ঠাঁয় দিতে; তাদের মনোরঞ্জনে গড়ে ওঠে অসংখ্য স্থাপনা। সর্বত্রই বর্ণিল আলোকসজ্জা, ঝাঁ-চকচকে পথঘাটসহ আরও কত-কী! এই অনন্য অপরূপ সৌন্দর্যের সাজকে পরিপূর্ণতা দিতে আরও এক ধাপ এগিয়ে এল যে স্থাপনাটি, সেটি এক অনন্য স্থাপনা, নাম যার ‘চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন ভবন’, যা সিসিটিভি নামেই পরিচিত। সুনিপুণ স্থাপত্যশিল্পের মাস্টার পিস হিসেবে সিসিটিভি ভবন আর দশটা ভবন থেকে নিজেকে ধরা দেয় ভিন্ন আঙ্গিকে। স্বনামে খ্যাত সুবিশাল এ স্থাপনাটি সারা চীনে টিভি প্রোগ্রাম, অলিম্পিকের যাবতীয় খেলার খবরাখবরসহ সংবাদ সম্প্রচারে হয়ে উঠেছিল আদর্শ স্থানীয়।

এই বিশাল দৈত্যাকৃতি স্থাপনাটি চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের গুয়ানগুয়া রোডে অবস্থিত। স্থাপনাটি এমনভাবে নির্মিত, যার দু’পাশ থেকে দুটি দৈত্যাকৃতির ভবন একসঙ্গে মাটি ফুঁড়ে উঠে গেছে আকাশ বরাবর। একদম ওপরের তলায় উঠে ভবন দুটি হাত দুই দিক থেকে বাড়িয়ে একে অন্যকে যেন ‘হ্যন্ডশেক’-এর ভঙ্গিতে মিশে গেছে। ইংরেজি বর্ণমালা Z আকৃতির এ স্থাপনাটি ২০ হেক্টর জায়গাজুড়ে স্থাপিত। স্থাপনার বড় টাওয়ারটির উচ্চতা ২৩৪ মিটার এবং মেঝের আয়তন ৪ লাখ ৬৫ হাজার বর্গমিটার। অপর পাশের টিভিসিসি টাওয়ারটির উচ্চতা ১৯৪ মিটার এবং মেঝের আয়তন ৯৫ হাজার বর্গকিলোমিটার।

উইকিপিডিয়া

সিসিটিভি ভবনটি মিডিয়া জগতে বিশালাকৃতির পার্ক হিসেবে বিবেচিত। জনসাধারণের জন্য বিনোদন ও চলমান দৃশ্য ধারণ করার সুবিধার্থে এ স্থানটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে। মিডিয়া পার্ক ছাড়াও এখানে রয়েছে সিনেমা হল, থিয়েটার কক্ষ, প্রদর্শনী কক্ষ, সম্প্রচার কেন্দ্র, ১ হাজার ৫০০ আসনবিশিষ্ট পাবলিক মঞ্চ, ডিজিটাল কনফারেন্স হলসহ নানা আয়োজন। এখানে রয়েছে ৩০০ কক্ষবিশিষ্ট ম্যানডেরিন ওরিয়েন্টাল হোটেল, যেখানে রয়েছে দুটো রেস্টুরেন্ট, বার ও চারদিকে পানিবেষ্টিত বলরুম।

বেইজিং অলিম্পিকের শুরুতেই সিসিটিভি সদর দপ্তর উদ্বোধন করা হয়। যদিও পুরো এ কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজটি শেষ হয় মে, ২০১২ সালে। ২০০২ সালে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় স্থাপনাটির ডিজাইন নির্বাচনে। এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয় বিখ্যাত আর্কিটেকচারাল ফার্ম OMA Rem koolhaas, যার সঙ্গে যুক্ত আছেন ইঞ্জিনিয়ার ফার্ম Arup এবং পূর্ব চায়নার আর্কিটেকচার ডিজাইন ইনস্টিটিউট। প্রকল্পটির কর্মযজ্ঞ শুরু হয় ২০০৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সরকারি একদল চীনা ডিজাইন বিশেষজ্ঞের চুলচেরা বিশ্লেষণের পর।

কেন বিখ্যাত এই দৈত্যাকৃতি স্থাপনাটি? সিসিটিভি নেটওয়ার্কটিতে ৪৫টি চ্যানেল একসঙ্গে একই সময়ে সম্প্রসারিত হয়, যেখানে পৃথিবীজুড়ে একই সঙ্গে সব প্রান্ত থেকে এক বিলিয়ন দর্শক দেখতে পায় একযোগে প্রচারিত অনুষ্ঠান, ছয়টি আলাদা আলাদা ভাষায়। বেশির ভাগ অনুষ্ঠানই খবর, ডকুমেন্টারি, সামাজিক শিক্ষা, কৌতুক, বিনোদনভিত্তিক। যেগুলো চীনের নিজস্ব সংস্কৃতি ও বিনোদনকে উপস্থাপন করে। তিনটি ভাগে বিভক্ত State Administration of Radio Film  Television, যা কি না স্টেট কাউন্সিল অব চায়না দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। একজন ভাইস মিনিস্টার (স্টেট কাউন্সিল) সিসিটিভির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। সংস্থাটির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে স্থানীয় টেলিভিশন স্টেশনের সঙ্গে, যা স্থানীয় সরকার কর্তৃক পরিচালিত হয়। বিশাল এই অর্গানাইজেশনটি পরিচালিত হয় ১০ হাজার কর্মী দ্বারা।

উইকিপিডিয়া

স্থাপনাটিকে দিনে একই রকম লাগে; সূর্যের আলো আর সম্প্রসারিত অনুষ্ঠানমালার ছবিতে। কিন্তু রাতের সিসিটিভি ভবনটি নববধূর সাজে সেজে ওঠে বর্ণিল আলোকচ্ছটায়। বিভিন্ন রঙের বাতি সংযুক্ত হয়ে নানা কর্নার থেকে নানা রঙের লাল, সবুজ, কমলা আলোকচ্ছটায় চারদিক ধাঁধিয়ে যায় এর অনাবিল সৌন্দর্যে। চোখ ফেরাতে মন চাইবে না কিছুতেই মোহনীয় আলোকময় এ স্থাপত্য থেকে। নিঃসন্দেহে স্থাপনাটিতে যাঁদের আগ্রহ, তাঁরা অসংখ্যবার ফিরে ফিরে দেখেন  ৫১তলাবিশিষ্ট সুউচ্চ এ ভবনটি। যার নির্মাণশৈলীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হবেন আপনিও নিজের অজান্তেই।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮০তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৬।

খন্দকার নাসরিন আখতার
+ posts