মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের মতো সংযুক্ত আরব আমিরাতের শহর দুবাইয়ের প্রধান আয়ের উৎস কিন্তু তেল বা খনিজ নয়। পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী ছোট্ট এ শহরের ১৬ লাখ বাসিন্দার প্রায় ৩৭ বিলিয়ন ইউএস ডলারের অর্থনীতির বেশির ভাগই আসে ট্রেড, ম্যানুফ্যাকচারিং আর ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস থেকে। কয়েক বছর ধরে বিশ্বব্যাপী দুবাইয়ের প্রতি মানুষের মনোযোগের অন্যতম কারণ এখানকার দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতি আর এর অনাগত উচ্চভিলাষী স্থাপত্য প্রকল্প। ব্যবসা আর পর্যটনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এসব সুরম্য স্থাপনা যেন পৌঁছাবে এক অবিশ্বাস্য পর্যায়ে। তাই বলে ভাববেন না যে দুবাইয়ের এই অত্যাশ্চর্য স্থাপনার নির্মাণ এখনই শেষ। বরং দিন দিন তা যেন মানুষের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয় দুবাই আসলে ভবন সম্পর্কে মানুষের কল্পনাকে আরও কত দূর বিস্তৃত করতে পারে। এখানে দুবাই আর এর আশপাশে গড়ে ওঠা, নির্মাণাধীন এবং প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর কিয়দংশই তুলে ধরা হলো। তাহলে চলুন জেনে নিই দুবাই ভবিষ্যতে বুর্জ আল খলিফাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো আর কী কী চমক আনতে চলেছে।
দ্য ক্লাউড (The Cloud)
দ্য ক্লাউড বা মেঘমালা স্থাপনাটি লেবানিজ স্থপতি নাদিম করমের প্রস্তাবনা। এটি মাটি থেকে ৩০০ মিটার ওপরে শূন্যে নির্মিত হবে। পুরো স্থাপনাটি স্লান্টিং সাপোর্ট বিমের সাহায্যে ভূমির সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করবে। দূর থেকে বিমগুলো দেখতে হবে আকাশে ভাসমান মেঘ থেকে ঝরে পড়া বৃষ্টির ধারার মতো।
দুবাই হাব ওয়ান (Dubai Hub One)
দুবাই হাব ওয়ানের নকশাকারী নোভা স্টুডিওর স্থপতি জর্জ ক্যাটড্রাইটিস। প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটি মূলত সংস্কৃতি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এখানে মিউজিয়াম, আর্ট গ্যালারি, নাটকের মঞ্চ, কবিতার পাঠস্থান, লাইব্রেরি, সংগীত মঞ্চ, ছবি প্রদর্শনী ও নিলামের মতো স্থান থাকবে। দুবাইয়ের অন্যান্য শপিং মলগুলোতে যেমন বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য কেনাবেচা হয়, ‘দুবাই হাব ওয়ান’-এ তেমনি হবে শিল্পের বিকিকিনি। দুবাই হাব ওয়ান সে অর্থে কালচারাল শপিংমল।
দুবাই পার্ল (Dubai Pearl)
দুবাই পার্লের নকশাকারী জার্মানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান শোয়েগার অ্যাসোসিয়েটেড আর্কিটেক্টস (Schweger Associated Architects)। এটি একটি কনসোর্টিয়াম, শহরের ভেতরে আরেক শহর। ২০ মিলিয়ন বর্গফুট জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা দুবাই পার্লের ৭৩ তলা সমান (৯৮৪ ফুট) চারটি টাওয়ারের প্রতিটিতে সর্বোচ্চ মানের আবাসিক রেস্টুরেন্ট, হোটেল, অফিস, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রসহ সব ধরনের সুবিধাই থাকবে। দুবাই পার্লে ১৮ হাজার আসনবিশিষ্ট একটি অডিটরিয়াম থাকবে, যেখানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। আনুমানিক ২০১৬ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরে এটি ৯ হাজার মানুষের আবাসিক সুবিধাসহ আরও ১২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেবে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে দুবাই পার্লই হতে যাচ্ছে দুবাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের নতুন ঠিকানা।
০-১৪ টাওয়ার (0-14 Tower)
২২ তলা এই বিল্ডিংটির গায়ে ১ হাজার ৩২৬টি গর্ত এঁকে এক অদ্ভুত স্পঞ্জ বা পনিরের রূপ দিয়েছে। প্রথম দর্শনে এর ছিদ্রগুলোকে দেখে মনে হবে এলোমেলোভাবে ছড়ানো। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায় আসলে তা নয়, প্রতিটি ছিদ্রই সুনির্দিষ্ট কৌণিক আকারে সাজানো। এখানে আবাসিক ও বাণিজ্যিক সুবিধার পাশাপাশি রয়েছে একটি হোটেলও।
অ্যাপেরন হোটেল (Apeiron Hotel)
বুর্জ খলিফার পরে এটিই হতে যাচ্ছে দুবাইয়ের দ্বিতীয় সেভেন স্টার হোটেল। হোটেলটিতে অবশ্য একটি আবাসিক কমপ্লেক্সও থাকবে, যেখানে থাকবে ৩৫০টি লাক্সারিয়াস অ্যাপার্টমেন্ট। পুরো হোটেলটি জঙ্গল থিমের ওপর বানানো হবে, যেখানে সবচেয়ে ওপরের দুটি তলায় প্রজাপতি আর পোকামাকড়ের সত্যিকারের জঙ্গল থাকবে। সাততারা হোটেলের সর্বপ্রকার সুবিধার পাশাপাশি এখানে আরও থাকবে পানির নিচে রেস্টুরেন্ট এবং স্পা-জিমনেশিয়াম, ব্যক্তিগত লেগুন ও বিচ, আর্ট গ্যালারি, সিনেমা হল, শপিং সেন্টার প্রভৃতি। দুবাই সমুদ্রতীর থেকে প্রায় ৩০০-৫০০ মিটার দূরবর্তী এই হোটেলে কেবল হেলিকপ্টার কিংবা বোটের মাধ্যমে যোগাযোগ করা যাবে।
অ্যারাবিয়ান ব্লেড (Arabian Blade)
তরবারি আকৃতির এই বিল্ডিংটির নকশা করা হয়েছে বৃক্ষের গঠন অনুকরণে, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন তলোয়ার আকৃতির উপাদান একসঙ্গে একটি অভিন্ন স্থাপনা হিসেবে গড়ে উঠেছে। দৃষ্টিনন্দন এই ভবনটিতে হোটেল ও বাণিজ্যিক সুবিধার পাশাপাশি থাকবে আবাসিক সুবিধাও।
আর এ কে কনভেনশন অ্যান্ড এক্সিবিশন সেন্টার (The RAK Convention and Exhibition Center)
গোলকাকৃতির এই ভবনটিতে হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের মতো থাকবে সবকিছুই। যেমন লাক্সারি অ্যাপার্টমেন্ট, অফিস, হলরুম, হোটেল, কনভেনশন সেন্টার ইত্যাদি সবকিছুই থাকবে। তবে তা এর চারপাশে গড়ে ওঠা কাচ আর স্টিলের গোলকের মধ্যে। এর ডিজাইনার হচ্ছেন মেট্রোপলিটন আর্কিটেকচারের রেইনিয়ার দ্য গ্রাফ ও রেম কুলহাস।
দুবাই সিটি টাওয়ার (Dubai City Tower)
১০০ তলাবিশিষ্ট চারটি পেঁচানো উঁচু ভবনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা দুবাই সিটি টাওয়ারটি পুরোপুরিই আবাসিক ভবন। শুধু এর মনোরম স্থাপত্য সৌন্দর্যই নয়, এর বহিরাবরণের শক্তি উৎপাদনের জন্য পেঁচানো তারের আচ্ছাদনও একে অন্যান্য হাইরাইজ আবাসিক প্রকল্প থেকে আলাদা করেছে। প্রকল্পটির কাজ শেষ হলে এতে ৪০০টি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট থাকবে। এর চারটি ভবনই একে অন্যের থেকে আলাদা। ভবনগুলোর মধ্যে সংযোগ রক্ষার জন্য থাকবে বিশেষ বুলেট ট্রেন।
দুবাই স্নোডোম (Dubai Snowdome)
দুবাই স্নোডোম সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম স্থাপত্য হতে যাচ্ছে, যা কি না এর দর্শনার্থীদের মরুভূমির শুষ্ক আবহাওয়াকে ভুলিয়ে দেবে একদম। স্নোডোম ইনডোর স্কিয়ের জন্য এক বিশাল প্রজেক্ট, এর আয়তন প্রায় ১৪ লাখ বর্গফুট। এখানে সব বয়সের সবার জন্যই বরফ-সম্পর্কিত সব ধরনের খেলাধুলা ও শোর আয়োজন থাকবে। পর্যটনের উদ্দেশে স্থাপিত এই প্রজেক্টে স্কি স্নোডোম ছাড়াও হোটেল, আবাসন, রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি সুবিধা রাখা হবে।
দুবাই হাইড্রোপোলিস (Dubai Hydropolis)
নির্মাণাধীন এই হোটেলটিই হতে যাচ্ছে পৃথিবীর সর্বপ্রথম সম্পূর্ণ পানির নিচের হোটেল। এই হোটেলটি প্রধানত তিন ভাগে বিভক্ত থাকবে। প্রথমেই থাকবে ল্যান্ডস্টেশন, এখানে আগত অতিথিদের অভ্যর্থনা জানানো হবে। এরপর থাকবে সংযোগ সুড়ঙ্গ, যার মধ্য দিয়ে ট্রেনের মাধ্যমে অতিথিদের মূল হোটেলে নেওয়া হবে। এবং সব শেষে সাবমেরিন কমপ্লেক্স, যেখানে থাকবে ২২০টি স্যুট। পুরো হোটেলটি ডুবে থাকবে ২০ মিটার পানির নিচে। এটি একটি ১০ তারা হোটেল, যেখানে সর্বাধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত স্যুটের পাশাপাশি থাকবে ভিলা, বাচ্চাদের জন্য সি-ওয়ার্ল্ড, সিনেমা থিয়েটার, রেস্টুরেন্ট, শপিংমলসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা। এর নির্মাণব্যয় ধরা হয়েছে আনুমানিক ৩০০ মিলিয়ন পাউন্ড।
ইনফিনিটি টাওয়ার (Infinity Tower)
ইনফিনিটি টাওয়ার সম্পর্কে যে প্রচারণা তাতে বলা হচ্ছে, এটি হবে পৃথিবীর প্রথম ৯০ ডিগ্রি বাঁক-সংবলিত সবচেয়ে উঁচু ভবন। ৮০ তলা তথা ৩৩০ মিটার উচ্চতাসম্পন্ন এই টাওয়ারে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ছাড়াও পুল, টেনিস কোর্ট, স্টেট অব আর্ট জিমনেশিয়াম, কনফারেন্স হল, পাশাপাশি থাকবে একটি বিলাসবহুল স্পা সেন্টার। এর নকশা অনুযায়ী প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে এর ভিউ হবে আলাদা আলাদা, যা নির্ভর করবে দর্শনার্থীর অ্যাপার্টমেন্টটি বিল্ডিংয়ের কোন অ্যাঙ্গেলে অবস্থিত তার ওপর।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৮তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৫