কিশোরগঞ্জ জেলার রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস আর ঐতিহ্য। তদুপরি বাংলা সাহিত্যের মঙ্গলকাব্যের প্রথম রচয়িতা দ্বিজবংশী দাসের পুণ্যভূমি এ কিশোরগঞ্জ। তাঁরই মেয়ে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতী। তিনিই রামায়ণের সার্থক অনুবাদকারী ফোকলোর কাব্যের নায়িকা। এ জেলার মাটির পরতে পরতে লুকিয়ে আছে লোকজ সংস্কৃতি। সখিনা, মলুয়া, মদাধবী, মালঞ্চী কইন্যার অঞ্চল কিশোরগঞ্জ। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিগর্ভা কিশোরগঞ্জের বীরত্বগাথা আর বীরসন্তানদের নাম ইতিহাসের অনবদ্য অধ্যায়। কিশোরগঞ্জের ইতিহাসে তাঁদের নাম লেখা আছে স্বর্ণাক্ষরে। জেলা শহরের প্রায় সর্বত্রই কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসসমৃদ্ধ ঐতিহাসিক বসতভিটা, মন্দির, কাচারি কিংবা রঙ্গালয়।
কিশোরগঞ্জের পর্যটকপ্রিয় ঐতিহাসিক স্থান
ইতিহাসখ্যাত বিদ্রোহী বারভূঁইয়ার নেতা মসনদে আলা ঈশা খাঁ আর বীরাঙ্গনা সখিনার স্মৃতিবিজড়িত, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, নরসুন্দা, ঘোড়াউত্রা, ধেনু, ধলেশ্বরী এবং কালী নদীবিধৌত কিশোরগঞ্জে রয়েছে অনেক দর্শনীয় কীর্তি ও স্থান। ঈশা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানীখ্যাত জঙ্গলবাড়ির দুর্গ জেলা শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে করিমগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত। সেখানে রয়েছে ঈশা খাঁর বসতবাড়ি, দরবার হল, মসজিদ, দুর্গের ধ্বংসাবশেষ, বিশাল পুকুর ও স্থাপনা সুরক্ষায় তৈরি করা পরিখার অংশবিশেষ।
এ ছাড়া জিন্দা বিবির মাজার এবং তদানীন্তন সময়ের কবরস্থান। এখানে বর্তমানে ঈশা খাঁর শেষ বংশধর বলে দাবিদার আমিন দাদ খাঁ ও তাঁর পরিবার বসবাসরত। অপর দিকে পাকুন্দিয়া উপজেলার এগারসিন্দুরে রয়েছে ঈশা খাঁর দখলকৃত দুর্গের ধ্বংসাবশেষ। এখান থেকেই তিনি মোগলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে লিপ্ত হন। এর সঙ্গে রয়েছে শাহ মাহমুদের প্রাচীন মসজিদসহ বালাখানা, বেবুদ রাজার দিঘি। অন্যদিকে জেলা কেন্দ্র থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর মঠ ও তাঁর বাবা প্রথম মনসা মঙ্গলকাব্যের রচয়িতা দ্বিজবংশী দাসের মন্দিরসহ পরবর্তী বংশধরদের বাড়ি।
এ ছাড়া জেলার হাওরাঞ্চলে রয়েছে আরও বিভিন্ন পুরাকীর্তি, যা বাংলার প্রাচীন নির্মাণশৈলীর সাক্ষ্য বহন করে। এর মধ্যে ইটনা উপজেলার বিখ্যাত গুপ্তবাড়ি ও দেওয়ানবাড়ি উল্লেখযোগ্য। মিঠামইনের দিল্লির আখড়া, অষ্টগ্রামের প্রাচীন মসজিদ, নিকলীর সোয়াইজানি নদীর তীরবর্তী আখড়া বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ঘুরে-ফিরে আরও দেখা যাবে উপমহাদেশখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষের বাস্তুভিটা। স্মৃতিবিজড়িত উক্ত ভিটাবাড়ির সামনেই রয়েছে বিশাল হাতির পুকুর, খেলার মাঠ এবং স্কুল, যা অবস্থান কটিয়াদী উপজেলার মসুয়া গ্রামে। অপর দিকে কুলিয়ারচর উপজেলায় পাওয়া যাবে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর বাস্তুভিটা। মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের স্মৃতিধন্য সদর উপজেলার যশোদল বীরদামপাড়া গ্রাম। এ গ্রামে রয়েছে তাঁর পৈতৃক বাড়ি আর ব্যবহৃত জিনিসপত্রের স্মৃতি নিদর্শন। এসবের বাইরে জেলা শহরটিতে পর্যটকদের জন্য রয়েছে ইতিহাসখ্যাত মসলিন শিল্পী প্রামাণিকের বিশাল দিঘি, ঐতিহ্যবাহী পাগলা মসজিদ, শহীদী মসজিদ, দেশের বৃহত্তম ঈদগাহ শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান, হয়বতনগর সাহেব বাড়ি প্রভৃতি। জেলা শহরের অদূরে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বরইতলার গণহত্যাস্থল ও অন্যারকাল বধ্যভূমি।
ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ লোকসাহিত্যের লীলাভূমি কিশোরগঞ্জ। ষোড়শ শতাব্দীর সাংস্কৃৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত এ জেলা। ঐতিহ্যবাহী কিশোরগঞ্জের ১৩টি উপজেলার মধ্যে ছয়টি উপজেলার নয়টি প্রধান পুরাকীর্তি সংরক্ষণ করছে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। সংরক্ষিত প্রত্নতত্ত্বস্থলের মধ্যে রয়েছে অষ্টগ্রাম উপজেলা সদরের কুতুব মসজিদ, আওরঙ্গজেব মসজিদ, কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার কবি দ্বিজবংশী দাস ও কবি চন্দ্রাবতীর স্মৃতিবিজড়িত মন্দির, করিমগঞ্জ উপজেলার মসনদ-ই-আলা ঈশা খাঁর স্মৃতি জড়িত ‘জঙ্গলবাড়ি’, পাকুন্দিয়া উপজেলার এগারসিন্দুরের ‘শাদি মসজিদ’ ও শাহ মাহমুদ মসজিদ, তাড়াইল উপজেলার সাহেববাড়ি (সেকান্দরনগর) মসজিদ, নিকলী উপজেলার গুরুই মসজিদ।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন
কুতুবশাহি মসজিদ
ঐতিহাসিক কুতুবশাহি মসজিদ মোগল স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন। জেলা শহর কিশোরগঞ্জের ৪৫ কিলোমিটার পূর্বে, দক্ষিণে হবিগঞ্জের লাখাই, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার উত্তরে, মিঠামইনের পশ্চিমে বাজিতপুরের নিকলী উপজেলার ঘোড়াউত্রা নদীর সীমান্তের সম্পূর্ণ হাওর উপজেলার ভাটির রাণী অষ্টগ্রাম। চারদিকে নদ-নদী আর খাল-বিলঘেরা হাওর জনপদ। বর্ষাকালে সাময়িক দ্বীপাঞ্চলে রূপান্তরিত হওয়া এই উপজেলা সদরের প্রাচীন নিদর্শনের অন্যতম সাক্ষী ঐতিহাসিক কুতুবশাহি মসজিদ। ৩০০ বছর বয়সের দৃষ্টিনন্দন এ মসজিদ নিয়ে ইসলামিক সাধক অলি কুতুবশাহ রহমত উল্লাহর অনেক কেরামত ও ধর্মীয় ভাব-আবেগের কথা লোকশ্র“তি রয়েছে। মসজিদের পূর্ব-পশ্চিমে শায়িত হজরত শাহজালাল ইয়ামিন উল্লাহর সফরসঙ্গী হজরত শাহ কুতুব রহমত উল্লাহর নাম অনুসারে এ মসজিদের নামকরণ করা হয়েছে। বাংলায় সুলতানি ও মোগল আমলের কারুকার্যে স্থাপিত পাঁচ মসজিদের স্থাপত্যকাল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ কেউ ষোড়শ শতাব্দীর নির্মিত বললেও অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে এ মসজিদ ১৭০০ শতাব্দীতে নির্মিত। মসজিদের দেয়ালে স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যে প্রমাণিত সতেরো শতাব্দীর প্রথম দিকে সুলতানি ও মোগল স্থাপত্যের নজির। সরকার ৩০৯ খ্রিষ্টাব্দে পুরাকীর্তি হিসেবে মসজিদটিকে ঘোষণা করে। ঐতিহাসিক এ মসজিদটির আয়তাকার উত্তর-দক্ষিণে ৪৬ ফুট ১১ ইঞ্চি এবং পূর্ব-পশ্চিমে ২৭ ফুট ১১ ইঞ্চি। গ্রামীণ চৌচালা ঘরের চেয়েও এর কার্নিশগুলো অনেক বেশি বক্র। এর চারকোণে আটকোণবিশিষ্ট চারটি মিনার আছে। বাইরে রয়েছে বেরিলিংয়ের কারুকার্য। পূর্ব দেয়ালে তিনটি ও উত্তর-দক্ষিণ দেয়ালে দুটি করে চারটিসহ মোট সাতটি খিলানযুক্ত প্রবেশপত্র বা দরজা রয়েছে। পূর্ব দেয়ালের প্রবেশপথের বিপরীতে পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে বিশালাকৃতির পাঁচটি গম্বুজ। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক ওই স্থাপনার আশ্চর্য ভিত্তিতে বিশাল জায়গা নিয়ে সংরক্ষিত এলাকার প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করলেই ডান পাশের বড় শিলালিপিতে উল্লেখ রয়েছে এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। মসজিদসংলগ্ন দক্ষিণের নামফলক ছাড়াও সুলতানি ও মোগল স্থাপত্যের পাঁচটি কবর রয়েছে। পশ্চিম-উত্তরে কুতুবশাহ হাফিজিয়া মাদ্রাসা, পূর্ব দিকে উন্মুক্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যঘেরা প্রাঙ্গণ পেরিয়ে বিশাল পুকুরের ফাঁকা ঘাট। এই মসজিদে শুক্রবার জুম্মার নামাজ পড়ার জন্য বিভিন্ন এলাকার মানুষ ভিড় করে। প্রতিবছর ফাল্গুন মাসের প্রথম শুক্রবার পার্শ্ববর্তী উপজেলার হাজার হাজার নারী-পুরুষ সমবেত হয়ে শাহ কুতুব রহমত উল্লাহর ওরস উপলক্ষে। ১৯০৯ সাল থেকে বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এ মসজিদটি সংরক্ষণ করে আসছে।
আওরঙ্গজেব মসজিদ
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলা সদরের কাস্তল ইউনিয়নে অবস্থিত আওরঙ্গজেব মসজিদ। সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে (১০৮০ হিজরি ১৬৬৯ খ্রি.) নির্মাণ করা হয়। লতাপাতায় মোড়ানো অতি অলংকরণে নির্মিত মসজিদটি ১৯০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সংরক্ষণ করছে।
সাহেববাড়ি (সেকান্দরনগর) মসজিদ
কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলায় অবস্থিত সাহেববাড়ি (সেকান্দরনগর) মসজিদ। তাড়াইল উপজেলার ধলা ইউনিয়নের ঐতিহাসিক সেকান্দরনগর সাহেববাড়িতে মসজিদটি অষ্টাদশ শতাব্দীর দিকে নির্মিত। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, মসজিদটি মোগল আমলে তৈরি। ১৯৯৯ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটিকে সংরক্ষণ করছে।
শাহ মাহমুদ মসজিদ
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার এগারসিন্দুর ইউনিয়নে শাহ মাহমুদ মসজিদের অবস্থান। এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি মোগল আমলে নির্মিত। তৎকালীন প্রখ্যাত পির শাহ মাহমুদ মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। তাই একে শাহ মাহমুদ মসজিদ বলা হয়।
শাদি মসজিদ
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার এগারসিন্দুরের দ্বিতীয় মসজিদটি ‘শাদি মসজিদ’ নামে পরিচিত। এটি দেশের অন্যতম সুরক্ষিত মসজিদ। কেন্দ্রীয় মিহরাবের গায়ে সংযুক্ত একটি ফার্সি শিলালিপি থেকে জানা যায়, মোগল সম্রাট শাহজাহানের শাসনকালে জনৈক শাইখ শিরুর ছেলে শাদি ১০৬২ হিজরিতে (১৬৫২ খ্রি.) এই মসজিদ নির্মাণ করেন। বাইরে থেকে একে অষ্টকোনাকৃতি বলে মনে হবে। সামনের দিকে দেয়ালে ও ভেতরে মিহরাবে পোড়ামাটির অলংকরণ দেখা যায়।
গুরুই মসজিদ
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার গুরুই নামক গ্রামে ঐতিহাসিক গুরুই মসজিদটি অবস্থিত। এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটিতে একটি শিলালিপি রয়েছে, যার ভাষ্যানুযায়ী মসজিদটি ৮৭১ হিজরি ১৫৬৭ খ্রি. নির্মাণ করা হয়। মসজিদের জোড়া কার্নিশ ও প্যারাপেট সরলরেখায় নির্মিত। প্যারাপেটের উপরিভাগে ব্যাটলম্যান্ট দিয়ে অলংকৃত। ১৯০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটিকে সংরক্ষণ করছে।
কবি দ্বিজবংশী দাস মন্দির
কিশোরগঞ্জ শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার পূর্ব-উত্তর দিকে তৎকালীন অখণ্ড মহিনন্দ-মাইজখাপন ইউনিয়ন এক থাকাকালীন মৃত ফুলেশ্বরী নদীর তীরে কবি দ্বিজবংশী দাস মন্দির অবস্থিত। মাইজখাপনের কাচারিপাড়া গ্রামে ফুলেশ্বরী নদীর তীরে এই মনোরম মন্দিরটি কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মোগল আমলের নির্মিত এই মন্দিরটির দেয়ালে নানা পোড়ামাটির অলংকরণ একে আরও সুশোভিত করে তুলেছে। ১৯৮৭ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মন্দিরটিকে সংরক্ষণ করছে।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৭তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৫