দূষণমুক্ত অন্দরের জন্য ইনডোর প্ল্যান্ট

ক্রমবর্ধমান মানুষের আবাসন চাহিদা মেটাতে শহর-নগর ঢেকে যাচ্ছে ইট-পাথরের কংক্রিটে। ফলে কমছে গাছপালা, জলাধার ও সবুজ প্রকৃতি। অন্যদিকে নগরের প্রচুর যানবাহন, কলকারখানায় শক্তি ব্যবহারের ফলে নির্গত ক্ষতিকর ধোঁয়া ও কার্বন ফুট প্রিন্ট বায়ু ও পরিবেশ দূষণের মাত্রাকে করছে ত্বরান্বিত। এ পরিস্থিতিতে নগরজুড়ে বৃক্ষায়নের মাধ্যমে পরিবেশ উন্নয়ন করা আমাদের পক্ষে ক্রমেই অসম্ভব হয়ে পড়ছে। তবে আপনার সদিচ্ছায় আপন অন্দরটিই হতে পারেন এক টুকরো সবুজ। ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতেই অনেকেই ব্যবহার করেন ইনডোর প্ল্যান্ট। কিন্তু জেনে-বুঝে যদি ইনডোর প্ল্যান্টগুলো বাছাই করা হয় তবে তা সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি ঘরের ভেতরে স্বাস্থ্যকর পরিবেশও বজায় রাখবে; ঘরে দেবে প্রশান্তির অনুভূতি।

শক্তির অত্যধিক ব্যবহার, পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাবসহ নানা কারণে ঘরের ভেতরে দূষণের সৃষ্টি হয়। আর এ জন্য দায়ী ফরমালডিহাইড, উদ্বায়ী জৈব উপাদান, কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান। এসব রাসায়নিক আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এর ফলে মাথা ব্যথা, এলার্জি, নার্ভাস সিস্টেমে ডিসঅর্ডার দেখা দেয়। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা ভবনের ভেতরকার পরিবেশ উন্নয়নবিষয়ক গবেষণায় প্রমাণ পেয়েছে, এমন কিছু ইনডোর প্ল্যান্ট রয়েছে, যা ঘরের মধ্যে থাকা দূষিত বাতাস পরিষ্কার করে ঘরকে করে তোলে বিশুদ্ধ। কিছু প্ল্যান্ট আছে যারা রাতেও অক্সিজেন ছড়ায়। বন্ধন-এর পাঠকদের জন্য থাকছে এমনই সব উপকারী ও সৌন্দর্যবর্ধক ইনডোর প্ল্যান্ট বৃত্তান্ত।

অ্যালোভেরা (Aloe Vera)

যদি ঘরে রাখা গাছের উপকারিতা নিয়ে কথা বলা হয়, তবে এই গাছটি থাকবে সবার ওপরে। যে গাছগুলো বাতাসের গুণগত মান বাড়ায় তার মধ্যে এটি সেরা। বাংলায় একে বলা হয় ঘৃতকুমারী। ঘরে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়াতে যার জুড়ি নেই। তা ছাড়া এটি ঘরের মধ্যকার কার্বন মনো-অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, ফরমালডিহাইডের (টক্সিন) মতো ক্ষতিকারক জিনিস শোষণ করে। মাত্র একটি গাছই ৯টি বায়োলজিক্যাল এয়ার পিউরিফায়ার ক্যানের মতো বাতাস পরিষ্কারের কাজ করে। অ্যালোভেরা রাতেও অক্সিজেন ছাড়ে। দীর্ঘায়ু লাভ সম্ভব এই গাছের সান্নিধ্যে। এর পাতার ভেতরের তরল অংশ রূপচর্চায় দারুন কার্যকরী। 

অর্কিড (Orchid)

অর্কিড সপুষ্পক উদ্ভিদের পরিবারভুক্ত। অত্যন্ত বর্ণিল ও সুগন্ধিযুক্ত। অর্কিডের রয়েছে হাজারো প্রজাতি, যার অধিকাংশই উপকারী। অক্সিজেন ছাড়ার পাশাপাশি এটি জাইলেন নামের একধরনের উপাদান নিঃসৃত করে, যা ঘরের পরিবেশ রাখে সতেজ। পৃথিবীর সব মহাদেশে অর্কিডের দেখা মিললেও আমাদের দেশের আবহাওয়ায় স্বল্প কিছুসংখ্যক অর্কিড টিকতে পারে। অর্কিড লাগানোটা  সহজলভ্য ব্যাপার নয়। সাধারণত অর্কিডের আলাদা ধরনের ছিদ্রযুক্ত টব পাওয়া যায়, তাতেই এটি লাগাতে হয়। কেননা, অর্কিড খুবই পানিকাতর উদ্ভিদ। এটি এমন জায়গায় রাখতে হয় যেন সারা দিন ছায়া থাকলেও শেষ বিকেলের রোদ গাছের গায়ে এসে পড়ে, কিন্তু কখনোই কড়া রোদে রাখা যাবে না।

ফাইকাস/ফিকাস (Ficus)

চমৎকার পাতাযুক্ত এই গাছটি বাতাসের টক্সিন (বিষাক্ত পদার্থ) শুষে নিয়ে বাতাসকে শুদ্ধ রাখে। এ গাছের জন্য খুব একটা আলো-বাতাসের প্রয়োজন হয় না। তবে একে শিশুদের নাগালের বাইরে রাখা উচিত। কারণ, এ গাছের পাতা শরীরে বিষক্রিয়ায় সৃষ্টি করতে পারে।

স্পাইডার প্ল্যান্ট (Spider Plants)

বড় ঘাসের মতো সবুজ লম্বা পাতার দুই পাশে সাদা রেখা, মাকড়শার পায়ের সঙ্গে মিল রেখে পাতাগুলো থাকে ছড়ানো বিন্যাসে। এ গাছে ছোট ছোট সাদা ফুল ফোটে। টব বা ঝুড়িতে লাগিয়ে ঝুলিয়ে রাখা যায়, আবার ওয়াল কার্পেটিংও করা যায় এই প্ল্যান্টে। খুব কম আলোতেও এরা সালোকসংশ্লেষ করতে পারে বিধায় অক্সিজেন জোগান দিতে সক্ষম। একটা গাছ প্রায় ২০০ বর্গ মিটার জায়গার বাতাস পরিশুদ্ধ করতে পারে। এটি স্টাইরিন, গ্যাসোলিন-জাতীয় টক্সিন, কার্বন মনোক্সাইড, বেনজিন, ফরমালডিহাইডসহ কিছু ক্ষতিকর গ্যাস শোষণ করে। গাছটিকে সরাসরি সূর্যের আলো থেকে দূরে রাখতে হয়। খুব বেশি পরিচর্যার প্রয়োজন পড়ে না। গোড়ার মাটি শুকিয়ে গেলে এরপরই পানি দিতে হয়। তবে গাছগুলোর পাতা শিশুরা মুখে দিলে তাদের ক্ষতি হতে পারে বিধায় ওদের নাগালের বাইরে রাখা উচিত।

স্নেক প্ল্যান্ট (Snake Plant)

বেড়ে ওঠার ভঙ্গি আর গায়ের রং সাপের সঙ্গে মিল থাকায় এর নাম স্নেক প্ল্যান্ট বা সর্প গাছ। আরও মজার ব্যাপার হল, এই গাছকে ‘মাদার ইন ল’স টাঙ্গ’ও (শাশুড়ির জিহ্বা) বলা হয়। বেডরুমে রাখার জন্য সব থেকে আদর্শ গাছ এটি। ঘরের আলো-আঁধারি পরিবেশের সঙ্গে চমৎকারভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। এ গাছ সহজে মরে না। টক্সিন পরিষ্কার বা অক্সিজেন সরবরাহ তো করেই, রাতেও এরা অক্সিজেন ঘরের মধ্যে ছাড়তে থাকে। তবে কড়া রোদ বা বেশি অন্ধকারে রাখা ঠিক নয়। পাতা মরে গেলে বুঝতে হবে পানি বেশি দেওয়া হচ্ছে, আবার পাতা বেঁকে বা কুঁকড়ে গেলে বুঝতে হবে পানি কম দেওয়া হচ্ছে।

পিস লিলি (Peace Lily)

আপনার অন্দরের সৌন্দর্যে প্ল্যান্টটি অনন্য। গাঢ় সবুজের মধ্যে সাদা ফুলগুলো দেখতে দারুণ লাগে। চমৎকার বায়ু পরিশোধক উদ্ভিদ এটি। বেনজিন, ট্রাইক্লোরোথাইলিন এবং ফরমালডিহাইড-জাতীয় টক্সিন শুষে বাতাস রাখে পরিষ্কার। অল্প আলোতেই এই গাছ ভালো থাকে। তাই সরাসরি সূর্যের আলোতে রাখা ঠিক নয়। গাছের পাতায় হলুদ রং দেখা দিলেই বুঝতে হবে সে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রোদ পাচ্ছে। নিয়মিত শুধু পানি দেওয়াই যথেষ্ট। শিশু, কুকুর, বিড়ালের কাছ থেকে গাছটিকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা উচিত। কারণ, এটাও কচুগাছের মতোই গলায় বা পেটে গেলে চুলকায়।

মানিপ্ল্যান্ট (Money Plant)

ঘর সাজাতে মানিপ্ল্যান্টের তুলনা হয় না। যেকোনো পরিবেশেই উদ্ভিদটি বাঁচতে পারে। তেমন একটা যত্নের প্রয়োজন হয় না। টবে কিংবা বোতলে ভরে জানালার তাক বা টেবিলে রেখে দিতে পারেন কিংবা ঝুলিয়েও রাখা যায় লতানো এই গাছটি। এটি বাতাস থেকে বেনজিন, ট্রাইক্লোরোইথিলিন, ফরমালডিহাইড, জায়লিন প্রভৃতি গ্যাস শোষণ করে ঘরকে রাখে ফ্রেশ ও বাসযোগ্য। সবচেয়ে বড় বিষয়, এই গাছ মাটিতে যেমন বাঁচে, তেমনি এটিকে পানির জারে রেখে দিলেও দিব্যি টিকে থাকে।

আইভি (Ivy)

লতানো গুল্মধর্মী এই উদ্ভিদটি ঘরের বাতাসের ৬০ শতাংশ টক্সিন এবং ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত দুর্গন্ধ শুষে নিতে সক্ষম ঘরে আনার মাত্র ৬ ঘণ্টার মধ্যে। ঘরের সুবিধামতো স্থানে রাখা যায়। এর পাতাগুলো দেখতে খুবই চমৎকার।

ক্যাকটাস (Cactus)

ঘরের শোভা বাড়াতে ক্যাকটাস অনন্য। বিভিন্ন আকৃতির বৈচিত্র্যময় প্রজাতিগুলো বাকিসব গাছ থেকে আলাদা। অধিকাংশ ক্যাকটাসেরই দেহভর্তি কাঁটা। কয়েক প্রজাতিতে আবার ফুলও ফোটে। সুন্দর ছোট ছোট চারা পাওয়া যায়, সাজিয়ে রাখার জন্য চমৎকার। মরুভূমির উদ্ভিদ বলে প্রচুর সূর্যালোক পছন্দ করে। সে জন্য বেশি আলো পড়ে এমন জানালার কাছে গাছটি রাখতে হয়। মাটি শুকনো হলে পানি দিতে হবে। তবে পানি যেন কিছুতেই ক্যাকটাসের গায়ে না লাগে, তাতে ওই স্থানে ফাংগাসের আক্রমণ হতে পারে। তেমন যত্নের প্রয়োজন না হলেও চারা লাগানো আর পরিচর্যার সময় সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। ছায়ায় রাখা ক্যাকটাসে ফুল ফোটে না। কাঁটাযুক্ত গাছ বিধায় অবশ্যই বাচ্চাদের কাছ থেকে দূরে রাখতে হবে।

খেজুর পাম (Date Palm)

পাম গোত্রের গাছের মধ্যে খেজুর পাম ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে সহায়ক। ঘরের মধ্যে শীতল পরিবেশ বজায় রাখতে পাম বেশ কার্যকরী। এটি খুব ধীরে বাড়ে এবং সর্বোচ্চ ৮ ফুট লম্বা হয়ে থাকে। বাচ্চাদের খেলার স্থান থেকে এটি দূরে রাখা ভালো কেননা এর দেহকাণ্ড কাঁটাযুক্ত। যেকোনো ধরনের শুষ্ক পরিবেশে এটি বাঁচতে সক্ষম।

এরেকা পাম (Areca Palm)

এটি ইনডোর প্ল্যান্ট হিসেবে বেশ পরিচিত। একে বাটারফ্লাই পামও বলা হয়। এই গাছগুলো উচ্চতায় সাধারণত ১০ ফুটের মতো। ঘরের ভেতরের আর্র্দ্রতাপূর্ণ পরিবেশ এদের বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

লেডি পাম (Lady Palm)

সাধারণত এটি রাপিস নামে পরিচিত। ঘরের ভেতরের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে অন্যতম পরিচিত বৃক্ষ এটি। লেডি পাম খুব ধীরে বাড়ে। এ ছাড়া এগুলো উচ্চতায় সর্বোচ্চ ১ ফুট কিংবা দেড় ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে।

চায়নিজ এভারগ্রিন (Chinese Evergreen)

চায়নিজ এভারগ্রিন দেখতে চিরচেনা কচুগাছের মতো। এরা অল্প আলোতে থাকতে ভালোবাসে, তাই সরাসরি সূর্যের আলোতে না রাখাই উত্তম। সবচেয়ে ভালো হয় উত্তর দিকের জানালার পাশে রাখলে। এর টবের মাটি খুব বেশি শুকাতে দেওয়া যাবে না আবার খুব বেশি ভেজাও রাখা যাবে না। সাধারণত নিয়মিত পানি দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিশেষ পরিচর্যার প্রয়োজন নেই। চায়নিজ এভারগ্রিন গাছটি ঘরের বাতাস থেকে বেনজিন, ফরমালডিহাইড-জাতীয় ক্ষতিকর গ্যাস শুষে নিয়ে ঘরের পরিবেশ শুদ্ধ রাখে। গাছটি শিশু আর পোষা প্রাণীদের থেকে দূরে রাখাই শ্রেয়।

ড্রাসিনা (Dracena)

ড্রাসিনা সর্বোচ্চ ১০ ইঞ্চির মতো লম্বা হয়ে থাকে আর প্রায় ৩ ইঞ্চি জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। সরাসরি আলো প্রয়োজন এদের বৃদ্ধিতে। এ ছাড়া ঘরের ভেতরের আর্দ্রতাপূর্ণ পরিবেশ এদের জন্য দারুন সহায়ক।

চন্দ্রমল্লিকা (Chrysanthemum)

এই গাছটির নাম যেমন সুন্দর, তেমনই তার ফুলটিও চমৎকার। গাছটি রাতে অক্সিজেন দেবে আর শুষে নেবে কার্বন ডাই-অক্সাইড। এ ছাড়া ডিটারজেন্ট, গ্লু, পেইন্ট বা প্লাস্টিক থেকে নির্গত দূষিত গ্যাসও শুষে নেয় চন্দ্রমল্লিকা। বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকে। তাই ঘরের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে ফুলের গাছ নির্বাচন করতে পারেন। তবে এই গাছের যত্নের ব্যাপারে একটু বেশিই সচেতন থাকতে হয়। এর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা থাকতে হবে ভালো। সঙ্গে পর্যাপ্ত আলো পাওয়ার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। তবে এমন জায়গায় রাখা যাবে না, যেখানে সারা দিন সূর্যের আলো পড়ে।

রাবার প্ল্যান্ট (Rubber Plant)

ফরমালডিহাইড শোষণে গাছটিরও জুড়ি মেলা ভার। তেমন একটা পরিচর্যার দরকার হয় না, বেশ ঠান্ডা পরিবেশেও সহনশীল। দিনে কয়েক ঘণ্টা আলো পাবে এমন জায়গায় রেখে প্রয়োজনমতো পানি দিলেই হয়। সাধারণত ঘরের ভেতরের যে অংশগুলোতে সামান্য সূর্যালোক পড়ে সেসব অংশ এর বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। এই গাছ উচ্চতায় ৮ ইঞ্চি থেকে ৫ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে।

যেভাবে সাজাবেন ইনডোর প্ল্যান্টগুলোকে

যেসব গাছ ঘরে রাখলে তাদের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয় না, মূলত সেগুলোকেই ইনডোর প্ল্যান্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্কয়ারফিটের ছোট পরিসরেই আটকে গেছে আমাদের জীবন। অন্দর আর বারান্দা ছাড়া গাছ লাগানোর সুযোগ যেহেতু নেই সেহেতু ওই স্থানেই গাছগুলোকে এমনভাবে রাখতে হবে যেন এতে ঘরের সৌন্দর্য বাড়ে। ঘরের আসবাব ও অন্যান্য সামগ্রীর সঙ্গে মানানসই উদ্ভিদ ও টব বাছাই করতে হবে। সাধারণত ছায়ায় ভালো জন্মায় এমন গাছই ঘরের জন্য নির্বাচন করা উচিত। ঘরের কোণে একটা অংশজুড়ে রাখতে পারেন মাঝারি আকারের গাছ। যে গাছগুলো ছায়ায় বা সরাসরি সূর্যের আলো ছাড়াও বাঁচে সেগুলো ঘরের কোণে রাখতে পারেন। অপেক্ষাকৃত ছোট গাছ রাখা যায় শোবার ঘরে (অর্কিড, ফার্ন, ক্যাকটাস), বিভিন্ন প্রজাতির পাম, পাতাবাহার, তুলসী রাখা যায় খাবার ঘরে। ছোট ছোট মাটি, প্লাস্টিক বা বাঁশের তৈরি টবে করে জানালা ও বারান্দার গ্রিলে ঝুলিয়ে দেওয়া যায় বিভিন্ন প্রকার ফার্ন ও লতানো উদ্ভিদ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সুবিধার্থে ঘরের আসবাব ও গাছের মাঝখানে যথেষ্ট পরিমাণ ফাঁকা জায়গা রাখতে হবে। তবে এলোমেলো অবস্থা এড়াতে আগেই পরিকল্পনা করে সে অনুযায়ী ঘর সাজাতে হবে। মনে রাখবেন, সাময়িকভাবে সুন্দর দেখতে পাওয়াই কিন্তু সব নয়, ঘরের ভেতর গাছ রাখলে নিতে হবে এর বিশেষ যত্ন, তা না হলে আপনার ঘর অপরিষ্কার দেখাবে আর বাঁচবে না গাছগুলোও।

দরকারি টিপস

  • ইনডোর প্ল্যান্ট নিয়মিত পরিচর্যা করুন ও পানি দিন। তবে সরাসরি গাছের গোড়ায় না দিয়ে চারপাশে অল্প করে পানি ঢালুন।
  • টবের নিচের অংশে ছিদ্র রাখুন, যাতে অতিরিক্ত পানি বেরিয়ে যেতে পারে।
  • অতিরিক্ত আলোয় গাছের রং বিবর্ণ হয়। তাই ঠান্ডা ও আলো কম পৌঁছায় এমন জায়গায় গাছটিকে রাখুন।
  • সপ্তাহে দু-একবার সকালের মিষ্টি রোদে গাছগুলোকে রাখুন। তবে দুপুরের কড়া রোদে নয় একদমই।
  • ইনডোর প্ল্যান্ট বেশি বড় করবেন না। এতে ঘরকে অন্ধকার লাগবে। তাই নিয়মিত গাছের ডাল ও পাতা ছেঁটে দিন।
  • গাছের ধুলা পরিষ্কার করতে পানি ব্যবহার করাই শ্রেয়। সে ক্ষেত্রে গাছের পাতা হালকাভাবে নরম ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে দিতে হবে অথবা স্প্রে বোতলে পানি নিয়ে ধুয়ে ফেলতে পারেন।
  • গাছগুলো ঘরের এক জায়গায় না রেখে মাঝে মাঝে স্থান পরিবর্তন করতে পারেন। তাতে ঘরের সাজে নতুনত্ব আসবে।
  • ইনডোর প্ল্যান্ট এসি বা কুলারের খুব কাছে রাখবেন না, এতে গাছ খুব জলদি শুকিয়ে যায়।
  • টবে বেলে-দো-আঁশ মাটি ব্যবহার করাই উত্তম। মাসে অন্তত দুইবার মাটি একটু ওলট-পালট করে দিন, তাতে মাটির ভেতর জমে থাকা ক্ষতিকর গ্যাস বেরিয়ে যাবে। তবে খুবই সাবধানে কাজটি করতে হবে, যাতে গাছের শিকড়ের কোনো ক্ষতি না হয়।
  • গাছের গোড়ায় রাসায়নিক সারের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব জৈবসার (শুকনো গোবর, চা পাতি) ব্যবহার করাই ভালো। চা পাতা ও ডিমের খোসা গুঁড়ো করে একসঙ্গে মিশিয়ে সাত-আট দিন রোদে শুকিয়ে মিশ্রণটি সার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
  • প্লাস্টিকের চেয়ে মাটির টব গাছের জন্য বেশি উপকারী।
  • যাঁদের অ্যাজমা বা অ্যালার্জির সমস্যা আছে, তাঁদের ঘরে এসব উদ্ভিদ না রাখাই ভালো।
  • শিশুদের ঘরেও স্যাঁতসেঁতে টব রাখা ঠিক নয়। তাদের কাছ থেকে কাঁটাযুক্ত গাছ দূরে রাখুন।
  • বর্ষাকালে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ নানা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। বিশেষ করে টবে জমা পানি থেকে এডিস মশার উৎপত্তি হয়ে থাকে। এ জন্য টবের অতিরিক্ত পানি ফেলে দিন। সপ্তাহে একবার গাছে উপযোগী মেডিসিন দিন, তাহলে পোকামাকড় ও রোগের প্রকোপ থেকে রেহাই পাওয়া যাবে সহজেই।

যেখানে পাবেন

সম্প্রতি ঢাকাসহ সারা দেশের শহরগুলোতে ফুলগাছ বিক্রির নার্সারি গড়ে উঠেছে। এসব নার্সারিতে বাহারি ফুলের গাছ ছাড়াও মাটি, টব ও জৈব সার পাওয়া যায়। রাজধানীর ঢাকা কলেজের গেট, দোয়েল চত্বর, আগারগাঁও, মিরপুর ২, ধানমন্ডি, উত্তরাসহ বিভিন্ন স্থানে গাছ ছাড়াও চমৎকার ডিজাইনের টব পাবেন। বর্ণিল গ্রাফটিং ক্যাকটাসের সংগ্রহ পাবেন গুলশান-তেজগাঁও লিঙ্ক রোডের ব্র্যাকের নার্সারিতে। এ ছাড়া প্রতিবছরের বৃক্ষমেলাতেও মিলবে এ সব। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্লাস্টিকের টব পাবেন ক্রোকারিজের দোকানে। এ ছাড়া ঘর সাজানোর নানামাত্রিক দোকান যেমন, যাত্রা, আড়ং, আইডিয়াল ক্রাফট, হোমটেক্স ইত্যাদিতে বিভিন্ন আকারের দেশি-বিদেশি অনেক রকমের মাটি, প্লাস্টিক বা সিরামিকের আউটার পট পাওয়া যায়।

দরদাম

ইনডোর তথা হাউস প্ল্যান্ট গাছের কোনো নির্দিষ্ট দাম নেই। আকার ও প্রজাতির ওপরেই দাম নির্ভর করে। সাধারণত ১০ টাকা থেকে শুরু করে হাজার টাকারও গাছ মিলবে। তবে ৩০ টাকা থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে ইনডোর প্ল্যান্ট, ৩০ টাকা থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে টব, ৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকার মধ্যে মাটি ও সার পাওয়া যায়।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯০তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৭।

কাজী গোলাম মোর্শেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top