নির্মাণ একটি জটিল, একই সঙ্গে সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। নির্মাণের সঙ্গে জড়িত থাকে অসংখ্য মানুষ, প্রতিষ্ঠান, উপকরণ ও নির্মাণ কর্মকাণ্ড। একটি ধারাবাহিক ও সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়াই সম্পন্ন হয় নির্মাণকাজ। নির্মাণকাজের প্রতিটি পর্বই সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ভুলের কোনো স্থান নেই। আর তাই প্রতিটি নির্মাণ প্রকল্পে প্রয়োজন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও প্রতিনিয়ত তদারকি। নির্মাণ প্রকল্পের বিশাল কর্মযজ্ঞ সার্বক্ষণিকভাবে যিনি দেখভাল করেন তিনি একজন নির্মাণ সুপারভাইজার। নকশা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নে সাইট ইঞ্জিনিয়ারের নির্দেশনা মিস্ত্রি, লেবার, মালামাল সরবরাহকারীকে বুঝিয়ে সুষ্ঠুভাবে কাজ সম্পন্ন করা তাঁর অন্যতম দায়িত্ব। একজন নির্মাণ সুপারভাইজারের ওপরেই নির্ভর করে একটি নির্মাণ প্রকল্পের সফল সমাপ্তি।
সুপারভাইজারের আওতাধীন কাজ
একটি নির্মাণ প্রকল্প সুষ্ঠুভাবে এবং বিনির্দেশ (Specification) অনুযায়ী নির্মাণ এবং সংরক্ষণের কাজ নিশ্চিত করতে একজন সুপারভাইজার রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার, সাইট ইঞ্জিনিয়ার, সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারদের তত্ত্বাবধান এবং পরিদর্শনে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে একজন সুপারভাইজার শুধু প্রকল্প সাইটেই কর্মরত থেকে নির্মাণকাজ তদারকি করেন। কিন্তু আদতে তা ঠিক নয়। তাঁর কাজের আওতা ও পরিধি বেশ বিস্তৃত। সুপারভাইজারের কাজের মধ্যে রয়েছে-
সুপারভাইজারের শ্রেণিবিন্যাস
সব ধরনের নির্মাণে সুপারভাইজার অতি আবশ্যকীয় ব্যক্তি। ছোট-বড় সব ধরনের নির্মাণকাজ ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কাজে রয়েছে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা। যেসব খাতে সুপারভাইজার জড়িত থাকেন, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম খাতসমূহ হচ্ছে-
সুপারভাইজারের দায়িত্ব
নির্মাণ প্রকল্পে সুপারভাইজারের দায়িত্ব অপরিসীম। নির্মাণ বা সংরক্ষণকাজের প্রতিটি অংশই দায়িত্বরত প্রকৌশলী অথবা সাইট ম্যানেজারের পরিদর্শন ও অনুমতি ছাড়া কোনো কাজ শুরু করা যায় না। কোনো নির্মাণ বা সংরক্ষণকাজই নির্দিষ্ট বা অনুমোদিত কর্মকর্তার পরিদর্শনের আগে সমাপ্তি ছাড়পত্র পায় না। যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভবনের ছাদ, বাঁধ বা সেতুর পায়ার, বড় ভবন প্রভৃতির কংক্রিট ঢালাইয়ের আগে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরিদর্শনের ব্যবস্থা করতে হয়। তিনি সমস্ত রেইনফোর্সমেন্ট ডিজাইন ও নিয়ম মেনে করা হয়েছে কি না তা পরীক্ষা করে দেখেন। পরিদর্শনকালে তিনি কোনো বিষয়ে অসামঞ্জস্য দেখলে তা সংশোধন করতে বা পুনরায় করার জন্য নির্দেশ দিতে পারেন। পরিদর্শনকারী কর্মকর্তা কর্তৃক সন্তোষজনক ছাড়পত্র পেলেই কাজের পরবর্তী ধাপ সম্পাদন করা যায়। এ ছাড়া সুপারভাইজারের কর্তব্যের মধ্যে রয়েছে-
- বিনির্দেশ, বিভাগীয় কার্যপদ্ধতি নিয়মনীতি ও নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন করা
- কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে সর্বদা নজর রাখা এবং অগ্রগতি মন্থর হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ
- ত্রুটিযুক্ত বা খারাপ কাজ চিহ্নিত করা এবং ঠিকাদার কর্তৃক তা অপসারণের ব্যবস্থা করা
- নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের নির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো শুরুর প্রাক্কালে পরিদর্শন করা। যেমন- ভবনের ছাদের আরসিসি কাজ, সেতুর পায়ার, বড় ভবন ইত্যাদি
- কাজের গুরুত্বপূণর্ণ বিষয়গুলো ডায়েরিতে লেখা এবং তা হালনাগাদ করা
- সাইটের যেকোনো অসংগতি সমাধানের চেষ্টা করা এবং ব্যর্থ হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো
- তাঁর দায়িত্বে থাকা সরকারি সম্পত্তি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া
- লেবার-মিস্ত্রিদের সব ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ
- কাজের সঠিক মাপ নেওয়া
- নিয়মানুযায়ী বিলের জন্য সুপারিশ করা
- কাজ সম্পর্কিত ধারাবাহিক রিপোর্ট তৈরি ও তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো
- নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ
- সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষাকরণ।
সুপারভাইজারের দৈনন্দিন কাজ
সুপারভাইজারের জন্য একটি দৈনন্দিন কাজের বিবরণ রাখা বাঞ্ছনীয়। কাজের সাপ্তাহিক অথবা মাসিক অগ্রগতির রিপোর্ট হালনাগাদ রাখতে একটি ব্যক্তিগত ডায়েরিতে সব ধরনের প্রয়োজনীয় তথ্য সংক্ষেপে লিখতে হয়। তা ছাড়া কোনো মতবিরোধ, মৌখিক নির্দেশ, কর্মীদের সম্পর্কে মন্তব্য, আবহাওয়া, কাজের অগ্রগতি ও অন্যান্য বর্ণনা লিখে রাখা উচিত। এসব কাজের বর্ণনা ব্যক্তিগত রেকর্ডমাত্র, তা কোনো প্রামাণ্য দলিল নয়। তবে নিজের সুবিধার জন্য অথবা মতবিরোধ দেখা দিলে কিংবা কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সুপারভাইজার নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার ক্ষেত্রে এর যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। চুক্তিপত্র অনুযায়ী এবং বিভাগীয় কার্যপদ্ধতি অনুযায়ী নির্মাণ বা সংরক্ষণকাজ পরিদর্শন করতে হয়। দৈনন্দিন কাজের নমুনাপত্র-
সেপ্টেম্বর, ৩, ২০১৬
আবহাওয়া: পরিষ্কার ও গরম
কাজ: ফুটিংয়ে স্থাপিত রড পরীক্ষা করা হলো। বাঁধন তার দিয়ে শক্তভাবে বাঁধার জন্য প্রধান মিস্ত্রিকে নির্দেশ প্রদান। পরদিন থেকে ঢালাইয়ের শুরু করা যেতে পারে।
সেপ্টেম্বর, ৪, ২০১৬
আবহাওয়া: পরিষ্কার শুষ্ক ও গরম
কাজ: স্থাপিত রড চূড়ান্তভাবে পরীক্ষার পর ঢালাই শুরু করা হলো। সারা দিন সাইটে ছিলাম। সন্ধ্যার আগেই ঢালাই শেষ হয়। তেমন কোনো সমস্যা হয়নি।
বৃহৎ নির্মাণ প্রকল্পে কমিটি কর্তৃক প্রকল্পস্থলে একটি ‘প্রজেক্ট লগ’ বা প্রকল্প খতিয়ান রাখা উচিত। এটা দৈনিক কাজের অগ্রগতির প্রামাণ্য দলিল। এর প্রতি পাতায় কমিটির যেকোনো সদস্য প্রতিটি লিপির পাশে স্বাক্ষর করবেন। নির্মাণ স্থান পরিদর্শনের সময় সুপারভাইজার প্রজেক্ট লগ পর্যালোচনা করে কাজের অগ্রগতি, চলতি কাজ, মজুদ মালামাল, কাজে নিযুক্ত কর্মীদল এবং তাদের কাজ, কাজের বিভিন্ন পদ্ধতি ও কাজের সুষ্ঠু মান নিশ্চিত করার জন্য প্রজেক্ট লগের একটি নমুনা-
সুপারভাইজারের ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ বিষয়সমূহ
- প্রতিদিনের কাজ যা বাস্তবায়িত হচ্ছে
- যেসব মালামাল সাইটে আনা হয়েছে, সেগুলোর গুণগতমান সম্পর্কে মন্তব্য বা মালামাল সম্পর্কিত বিষয়ে ঠিকাদারকে অবহিত করা ও বুঝিয়ে দেওয়া
- মালামাল ও কাজের নানা ধরনের টেস্ট, যা করা দরকার
- সাইট পরিদর্শন করে নির্মাণ অথবা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ সম্পর্কিত ঠিকাদারের নির্দেশনাবলি লক্ষ করা
- সাইটে যন্ত্রপাতি, লোকবল, যানবাহন ইত্যাদির সংখ্যা নির্ণয়
- বির্নিদেশ-বহির্ভূত কাজ, যা গ্রহণযোগ্য নয়, এমন কাজের হিসাব বা রেকর্ড রাখা
- যেকোনো দুর্ঘটনার বিবরণ (যদি ঘটে)
- আবহাওয়ার বিবরণ
- ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মন্তব্য, পরিদর্শন নিশ্চিতকরণ।
প্রতিবেদন
সাইটের কোনো ঘটনা সম্পর্কে যথাযথ অনুসন্ধান করে প্রাপ্ত তথ্যাবলির বিচার-বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার পর সঠিক তথ্যাবলির যে ধারাবাহিক বিবৃতি বা সংক্ষিপ্ত সার্বিক বিবরণী প্রণয়ন করা হয়, তা-ই প্রতিবেদন। এটা আসলে তথ্যের দলিল। প্রতিবেদন সাধারণত হয় দুই ধরনের-
১. সাধারণ প্রতিবেদন
২. কারিগরি প্রতিবেদন।
কারিগরি পন্থা অনুসরণ না করে যেসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়, তাকে সাধারণ রিপোর্ট বলে। যেমন- অনুসন্ধান, বই, সাক্ষাৎকার, অফিস ফাইল ইত্যাদি। বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত নানা ধরনের সংবাদ, কোনো সংস্থার বার্ষিক সভায় সংস্থার নির্দিষ্ট ব্যক্তি কর্তৃক আগের বছরের কৃত কাজের ফিরিস্তি লিখিত কিংবা মৌলিক প্রদত্ত রিপোর্ট, যাকে বলা হয় বার্ষিক রিপোর্ট। বেতন কমিশন রিপোর্ট, চাকরি পুনর্গঠন তদন্ত রিপোর্ট, কর্মচারী, কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপনীয় রিপোর্ট ইত্যাদি সবই সাধারণ রিপোর্টের অন্তর্ভুক্ত।
কারিগরি (টেকনিকাল) রিপোর্ট
কারিগরি কর্মকাণ্ডে উদ্ভূত কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য সঠিক কর্মপন্থা বা উপায় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনে কোনো নির্দিষ্ট প্রকৌশলী ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ কিংবা প্রযুক্তিবিদ কর্তৃক বিশেষ প্রণালিতে উপস্থাপিত কারিগরি তথ্যাবলির যে ধারাবাহিক বিবৃতি প্রণয়ন করা হয়, তাকে কারিগরি রিপোর্ট বলে।
গঠন প্রণালি বা আকৃতিগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কারিগরি রিপোর্টের আওতায় রয়েছে
- ফরম রিপোর্ট
- স্মারক রিপোর্ট
- পত্র রিপোর্ট
- সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট
- দীর্ঘ বা ফরমাল রিপোর্ট।
কাজ পরিদর্শন
পরিদর্শনকালে যেসব বিষয় গুরুত্বসহকারে দেখভাল করা হয়-
ভাঙার কাজ (Demolition Work)
অনেক সময় আগে নির্মিত কোনো কাঠামোকে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ভাঙার প্রয়োজন হয়। একেই ডেমোলিশন কাজ বলে। এসব কাজ পরিদর্শনে বিবেচ্য বিষয়সমূহ:
- ছাদ এবং ফ্রেইমড স্ট্রাকচারের ক্ষেত্রে ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে হবে যে কাজটিতে অযথা হস্তক্ষেপ হওয়ার আশঙ্কা আছে কি না
- দেয়ালের ক্ষেত্রে ভারবাহী, পার্টিশন বা ক্রস ওয়াল কি না তা দেখতে হবে। ভারবাহী দেয়াল হলে স্ট্রাট, প্রপ, শোরিং ইত্যাদির সাহায্যে সাপোর্টের ব্যবস্থা করতে হবে
- বেইজমেন্টের ক্ষেত্রে জনসাধারণের চলাচলের ফুটপাতের নিচে অথবা সীমানার বাইরে আছে কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে হবে
- ভেঙে ফেলা কাঠামোর চারদিকে যদি প্রজ¦লনের বা বিস্ফোরক জাতীয় পদার্থ (যেমন- তেলের ড্রাম, গ্যাস সিলিন্ডার) থাকে, তবে কাজ শুরুর আগে তা অপসারণ করতে হবে
- কাঠামো ভাঙার আগে মালিক বা তার প্রতিনিধি কর্র্তৃক বিজ্ঞপ্তি প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে
- বসবাসকৃত কাঠামো ভাঙতে হলে কমপক্ষে ছয় সপ্তাহ আগে বসবাসকারীদের জানাতে হবে
- পার্শ্ববর্তী কাঠামো যাতে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে
- ভাঙার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক সরঞ্জাম ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে
- আইনগত সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে
- নিরাপত্তামূলক বেষ্টনির ব্যবস্থা করতে হবে
- কোনো কাঠামো আংশিক ভেঙে ফেলার ক্ষেত্রে- ভারবাহী দেয়ালে স্ট্রাট, প্রপ, শোরিং ইত্যাদির সাহায্যে সাপোর্টের ব্যবস্থা করতে হবে
- অযথা কাঠামোর কোনো অংশ ভাঙা যাবে না
- ভাঙার সময় জনসাধারণের চলাচলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে কি না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে হবে
- ভেঙে ফেলার কাজে বিস্ফোরক ব্যবহারের প্রয়োজন হলে আশপাশের কাঠামোগুলোর নিরাপত্তা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে
- নিরাপত্তা বিঘ্নের আশঙ্কা থাকলে নিরাপত্তা সংস্থাকে অবগত করতে হবে
- দ্রুত ধ্বংসাবশেষ অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে।
খনন কাজ
খনন কাজ পরিদর্শনের সময় যে যে দিক খেয়াল রাখতে হয়
- ভিত্তি পরিখার মাটি খননের জন্য ভিত্তির প্রশস্ততা অনুযায়ী খাড়াভাবে মাটি কাটতে হবে
- খাড়াভাবে মাটি খনন করা না গেলে ঢাল প্রদান করতে হবে অথবা শোরিং ব্যবস্থা করতে হবে
- খননকৃত মাটি পরিখার প্রান্ত থেকে ১ মিটারের মধ্যে রাখা যাবে না
- খননকৃত স্থানে গাছগুল্ম, ঘাস, লতাপাতা ইত্যাদি থাকলে তা পরিষ্কার করতে হবে
- বৃহৎ এলাকা খনন করতে হলে বেঞ্জমার্ক স্থাপনের জন্য ম্যাসনারি পিলার তৈরি করতে হবে
- সঠিক ফরমেশন লেভেল দেখানোর জন্য বাঁশ, খুঁটি, সুতা ইত্যাদির সাহায্যে প্রয়োজনীয় প্রোফাইল করতে হবে
- ফিল্ড বুকে মাটির লেভেল লিপিবদ্ধ করতে হবে
- পার্শ্ববর্তী কাঠামোর ভিত্তি তলের নিচে খননকার্য করতে হলে আন্ডারপিনিং এবং শোরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে
- সুষম ঢালু ভূমিতে ৫ থেকে ১৫ মিটার পরপর মাটির লেভেল পরিমাপ করা হয়
- খননকালে গর্তে পানি জমলে পাম্প করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে
- ভিত্তি তল সমতল হয়েছে কি না তা দেখতে হবে
- খননকৃত গর্তেও পরিমাপ গ্রহণ করতে হবে এবং এমবিতে (Measurement Book) লিপিবদ্ধ করতে হবে
- খননকৃত মাটি পরিখার প্রান্ত থেকে ১ মিটারের মধ্যে রাখা যাবে না
- খননকৃত স্থানে গাছ, ঝোপঝাড়, লতাপাতা ইত্যাদি থাকলে তা পরিষ্কার করতে হবে।
কনসিল ওয়ার্ক (Conceal Work)
- ড্রয়িং অনুযায়ী কনসিলের কাজ করা এবং ভবিষ্যতের জন্য ড্রয়িং সংরক্ষণ করতে হবে
- কনসিল পাইপকে মাঝে মাঝে ক্লাম্প দিয়ে আটকে রাখতে হবে
- ঢালাইয়ের মধ্যে পাইপ সঠিকভাবে বসাতে হবে, যাতে আরসিসি কাঠামোর ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত কভারিং থাকে
- ঢেকে দেওয়া জয়েন্ট এবং ফিটিংসগুলো ভালভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে
- দেয়ালে বৈদ্যুতিক কনসিল পাইপের জন্য হালকা রং দিয়ে লে-আউট মার্কিং করতে হবে
- পাইপে ক্ষয়রোধী আবরণ দিতে হবে
- ছাদ, বিম, কলাম প্রভৃতি আরসিসির মধ্যে পাইপ সঠিক মাপমতো বসাতে হবে যাতে পর্যাপ্ত কভারিং পাওয়া যায়।
ইটের কাজ (Brick Work)
- প্রথম শ্রেণির ইট এবং পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট ব্যবহার করতে হবে
- পরিষ্কার ও চোখা কোনাবিশিষ্ট Well Graded প্রাকৃতিক বালু (আপেক্ষিক গুরুত্ব ১.৫) ব্যবহার করতে হবে
- ইটের কাজে ১ ঃ ৬ অনুপাতের মসলা দিয়ে গাঁথুনি করতে হবে
- ব্যবহারের কমপক্ষে ছয় ঘণ্টা আগে ইট ভালোভাবে ভেজাতে হবে এবং ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে
- অন্যরূপ বিনির্দেশিত না থাকলে ইংলিশ বন্ডে গাঁথুনি করতে হবে
- প্রয়োজন ব্যতিরেকে গাঁথুনির কাজে আধলা ইট ব্যবহার করা যাবে না
- ইটের সিলমোহর ওপরে রেখে জোড়গুলো মসলা দিয়ে পূরণ করতে হবে
- জোড়ের পুরুত্ব কোনো অবস্থাতেই ১৩ মি.মি এর বেশি হবে না
- জোড়গুলো মসলা দিয়ে পূর্ণ করে সমতল করে দিতে হবে যেন কোনো ফাঁক না থাকে
- সম্পূর্ণ বেডের ওপর মসলা বিছিয়ে ইটকে আস্তে আস্তে চাপ দিয়ে বসাতে হবে, যাতে মসলার সঙ্গে লেগে যায়
- কোর্সগুলো আনুভূমিক হবে এবং খাড়া জোড়গুলো সঠিকভাবে খাড়া হবে
- একদিনে সর্বোচ্চ ১.৫ মিটারের বেশি ইটের গাঁথুনি করা উচিত নয়
- গাঁথুনির কাজ শেষ হলে সাত দিন পর্যাপ্ত কিউরিং করতে হবে
- লবণ এবং কাদামুক্ত পরিষ্কার বালু ব্যবহার করতে হবে
- মসলায় পানি দেওয়ার পর থেকে ৪৫ মিনিটের মধ্যে সম্পূর্ণ মসলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে
- প্রয়োজন ছাড়া গাঁথুনি কাজে আধলা ইট ব্যবহার করা যাবে না
- ইটের কাজের উল্লম্বতা ও সমতলা পরীক্ষা করতে হবে
- গাঁথুনিতে পর্যায়ক্রমিক কোর্সগুলোর খাড়া জোড়া (Vertical Joint) পরিহার করতে হবে
- বালুর F.M (Fineness Modulus) পরীক্ষা করতে হবে
- গাঁথুনির সময় জয়েন্টগুলো রেকিং আউট করতে হবে এবং সাইট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
রুফিং (Roofing)
আরসিসি রুফের ক্ষেত্রে
- মরিচা, রং, গ্রিজ বা বেল ইত্যাদি মুক্ত নমনীয় ইস্পাত রড প্রমাণ বিনির্দেশ অনুযায়ী হবে
- অঙ্কনের বর্ণনানুযায়ী প্রয়োজনীয় হুঁক, বেন্ড ইত্যাদি সহযোগে সব রডকে যথাযথভাবে স্থাপন করতে হবে
- রডগুলোর প্রতিচ্ছেদ বিন্দুতে ১৮ নম্বর তার দিয়ে দৃঢ়ভাবে বাঁধতে হবে
- অঙ্কন অনুসারে সিমেন্ট মসলায় ১ ঃ ২ অনুপাতে তৈরি ব্লকের সাহায্যে রডের তলদেশে ও পার্শ্বে কংক্রিট আবরণ দিতে হবে
- প্রয়োজনীয় খুঁটি, বাতা, গোঁজ ইত্যাদি সহযোগে কাঠের তক্তা বা ইস্পাত প্লেট দিয়ে এমন নিশ্চিদ্র ও মজবুত করে শাটারিং করতে হবে যেন পানি চোয়াতে না পারে
- রড জোড়া দেওয়া পরিহার করতে না পারলে আদর্শ মাপ অনুযায়ী জোড়া দিতে হবে
- ড্রয়িং মোতাবেক নির্দিষ্ট দূরত্বে এবং নির্দিষ্ট ব্যাসের এমএস রড ব্যবহার করতে হবে
- হুঁক এবং ল্যাপ প্রদানের ক্ষেত্রে আদর্শ মাপ অনুসরণ করতে হবে।
প্লাস্টারিং (Plastering)
- প্রমাণ বিনির্দেশের শর্ত পূরণকারী পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট, জৈব পদার্থ, লবণ ইত্যাদি মুক্ত বালু (আপেক্ষিক গুরুত্ব ১ ঃ ৫) এবং সুপেয় পানি ব্যবহার করতে হবে
- ইটের কাজের জোড়গুলো থেকে ১০ মিমি গভীর করে মসলা উঠিয়ে ফেলে Wire Brush দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে
- তৈলাক্ত বা শেওলা-জাতীয় পদার্থ থাকলে পরিষ্কার করে নিতে হবে
- দেয়ালের প্লাস্টারে লাগানোর কমপক্ষে ছয় ঘণ্টা আগে পৃষ্ঠকে ভালোভাবে ধৌত ও সিক্ত করতে হবে
- প্রয়োজনীয় সুষম বর্ণ লাভ না করা পর্যন্ত আনুপাতিক হারে মসলা সামগ্রীগুলো আদ্যোপান্ত শুষ্ক মিশ্রণ করতে হবে। এরপর পানি মেশাতে হবে
- সিস্টেমের প্রাথমিক সেটিং টাইমের মধ্যে মসলাকে কাজে ব্যবহার করতে হবে।
- প্লাস্টারের সমপুরুত্ব বজায় রাখার জন্য দুই মিটার পর পর ১৫-১৫ সেমি আকারের ডট ব্যবহার করতে হবে
- প্লাস্টারের পুরুত্ব বেশি হলে দুই বা তিন স্তরে করা হয়
- দেয়ালের ওপরের দিক থেকে নিচের দিক অভিমুখে প্লাস্টার করতে হয়
- প্লাস্টার করা পৃষ্ঠকে সাত দিন ধরে কিউরিং করতে হবে
- আরসিসি পৃষ্ঠে প্লাস্টারের আগে চিপিং করে নিতে হবে এবং প্লাস্টারের আগে সিমেন্ট গ্রাউটিং করতে হবে
- ব্যবহৃত বালু অবশ্যই লবণ, কাদা ও আবর্জনামুক্ত হতে হবে এবং বিনির্দেশ মোতাবেক নির্দিষ্ট এফএমের বালু ব্যবহার করতে হবে
- সিমেন্ট মসলার শুকনা মিশ্রণ সুষম বর্ণবিশিষ্ট হওয়া পর্যন্ত মিশ্রণ করতে হবে। তারপর পানি প্রয়োগের মাধ্যমে মসলা তৈরি করতে হবে।
- ইটের গাঁথুনির জয়েন্ট রেকিং আউট করে নিতে হবে।
- প্লাস্টার শুরুর কমপক্ষে ছয় ঘণ্টা আগে পৃষ্ঠকে ভালোভাবে ভিজিয়ে নিতে হবে।
প্লাম্বিং কাজ (Plumbing Work)
- ড্রয়িং অনুযায়ী পানি সরবরাহের ও অন্যান্য পাইপ লাইন স্থাপন করতে হবে।
- বিনির্দেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থানে ফিটিংস এবং ফিকচারসমূহ লাগাতে হবে।
- জয়েন্টে থ্রেড টেপ ব্যবহারের মাধ্যমে ছিদ্র (Leakage) পরিহার করতে হবে।
- ভূগর্ভস্থ পাইপ লাইনের ক্ষেত্রে পাইপে রং লাগিয়ে ব্যবহার করতে হবে।
- বেসিন, সিস্টার্ন, বাথটাব ইত্যাদি ফিকচারকে নির্দিষ্ট উচ্চতায় স্থাপন করতে হবে।
ড্রেনের কাজ (Drainage Work)
- ড্রয়িং অনুযায়ী পাইপ বা ড্রেন স্থাপন বা তৈরি করতে হবে।
- পাইপ লাইনিং কিংবা ড্রেনের নির্দিষ্ট ঢাল রক্ষা করতে হবে।
- ট্রাপ, ভেল্ট পাইপ, সিউয়ার প্রভৃতিকে সতর্কতার সঙ্গে বসাতে হবে।
- ড্রেনেজ পাইপ কনসিল করার আগে জয়েন্ট ও ঢালকে পরীক্ষা করে নিতে হবে।
- সিউয়ার পাইপ এবং ড্রেনে বাঁক পরিহার করার চেষ্টা করতে হবে।
আরসিসি ঢালাই (R.C.C Casting)
- গব কাজ অনুমোদিত প্ল্যান, ড্রয়িং, ডিজাইন, এস্টিমেট, শিডিউল ইত্যাদি অনুযায়ী চেক করতে হবে।
- সাইটে ড্রয়িং অনুযায়ী রড বিছানো হয়েছে কি না তা চেক করতে হবে।
- সেন্টারিং, শাটারিং, প্রফিং ইত্যাদি সাপোর্ট চেক করতে হবে।
- কংক্রিট ঢালাইয়ের কাজের নির্মাণসামগ্রী যেমন- পাথর, খোয়া, সিমেন্ট, বালু, স্টিল, রড ইত্যাদি মান অনুযায়ী মজুদ আছে কি না চেক করতে হবে।
- ঢালাইয়ের আগে কারিগর/মিস্ত্রি/কন্ট্রাক্টর এবং প্রয়োজনীয় লেবার হেলপারের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।
- ঢালাইয়ের জন্য যন্ত্রপাতি/মেশিন যেমন- মিকচার মেশিন, ভাইব্রেটর মেশিন, পানির পাম্প ইত্যাদি সঠিক আছে কি না যাচাই করতে হবে।
- পানি, বিদ্যুৎ সরবরাহ ইত্যাদি চেক করতে হবে।
- সাইটে প্রয়োজনীয় নির্মাণব্যয় (বাজেট) মজুদ রাখতে হবে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৮তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৬।