এই পৃথিবীর যেকোনো মহার্ঘ্য বস্তুর ইতিহাস যুদ্ধ, বঞ্চনা আর রক্তপাতের। মহামূল্য শ্বেত মর্মর পাথরই-বা এর ব্যতিক্রম হবে কেন? ইতালির বিখ্যাত কারারা মার্বেলের প্রতি ইঞ্চিতে চাপা পড়েছে শত মানুষের স্বপ্ন, শ্রম আর ঘাম। জগদ্বল পাহাড়ের শরীর থেকে কেটে আনা পাথর কুঁদে নিপুণ হাতে শিল্পী ফুটিয়ে তুলেছেন চোখ ধাঁধানো সব কারুকার্য। কারারা মার্বেলের ইতিহাস সহস্রাব্দের পুরোনো। ইতালির যে পাথর এককালে শুধু রোমেরই শোভা বর্ধন করেছে, এখন তার জয়জয়কার বিশ্বজুড়ে। রোমের এই পাথর আবাদের ঐতিহাসিক মূল্য কম নয়। প্রাচীন রোমের সম্রাটের শৌর্যবীর্যের প্রতীকও ছিল এই মার্বেল পাথর। সম্রাট অগাস্টাস তাই বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত ইটের রোমকে মার্বেলের রোমে পরিণত করেছিলেন নিজের সাফল্য প্রমাণে। রোমের সেই শৌর্যের প্রতীক মার্বেল আজ কোথায় নেই? আভিজাত্যের ছোঁয়া দিতে মানুষ জাদুঘরে ঠাঁই পাওয়া ভাস্কর্য থেকে কবরের স্তম্ভ, অট্টালিকা, রান্নাঘরের তাক থেকে আসবাবÑসর্বত্রই মার্বেলকে স্থান দিয়েছে।
যে শ্বেত মর্মরের উজ্জ্বলতায় আমরা আজ মুগ্ধ, তার শুরুটা হয়েছিল শত সহস্রাব্দ আগে অন্ধকার গহ্বরে। অগণিত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীব-অণুজীব জীবনাবসনের পর চাপা পড়েছে কালের গহ্বরে। আদিম যুগের সমুদ্রতটে, অভিকর্ষের টানে সময়ের পরিক্রমায় পরতের পর পরত জমতে জমতে একদিন শক্ত পাথরে পরিণত হয়েছে। যা ছিল প্রাণীর পচনশীল দেহ, তা-ই একদিন শুভ্রতর পাথরে রূপ নিয়েছে। আজ যাকে আমরা নাম দিয়েছি মর্মর পাথর বা মার্বেল, যার দাম নির্ধারণ করেছি আকাশচুম্বী। অবশ্য সমুদ্রতট থেকে সেই শ্বেতপাথরের পাহাড়টিও আকাশ ফুঁড়েই উঠে এসেছে। আপুয়ান আল্পসের কারার পাথরের অংশ কোথাও কোথাও ৬০০০ ফুট উঁচু। তবে পাথর যতই দামি হোক, পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকলে মানুষ তাকে দামি ভাবে না। পাথরের দাম বাড়ে পাহাড়ের বা আকরের থেকে সে যত দূরে ভ্রমণ করতে পারে।
কারার মার্বেল হচ্ছে পৃথিবীর সব থেকে দামি মার্বেলের মধ্যে অন্যতম। এই মার্বেলের একটা স্লাবের দাম কত হতে পারে বলে আপনার ধারণা? ইউএস ডলারে প্রায় ৪০০ প্রতি বর্গমিটারে (আনুমানিক ৩৪,০০০ টাকা)। কারারা মার্বেলের তৈরি হয়েছে নান্দনিক সব দালান আর ভাস্কর্য। রোমের বিখ্যাত প্যান্থিওন মন্দির কিংবা মাইকেলেঞ্জেলোর বিখ্যাত ভাস্কর্য ডেভিড এই কারারা মার্বেল দিয়েই তৈরি। আর এই অভিজাত কারারা মার্বেল আসে আপুয়ান আল্পস থেকে। আপুয়ান পর্বতশ্রেণিটির অবস্থান নর্দান তুস্কানিতে (ইতালিতে অবস্থিত)। পর্বতশ্রেণিটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ৫৮ কিলোমিটার আর উচ্চতায় গড়ে ২,০০০ মিটার। আপুয়ানের এই আকর থেকে সেই প্রাচীন রোমান রাজ্যত্বকাল থেকেই পাথর আহরণ করা হচ্ছে, আর তা এখনো অব্যাহত আছে। সম্ভবত এই আকর থেকেই সব থেকে বেশি পাথর আহরিত হয়েছে। কারারা মার্বেলের বাজারটি এক বিলিয়ন ইউরোর সমান আর প্রতি বছর এখান থেকে প্রায় চার মিলিয়ন টন মার্বেল উত্তোলন করা হয়।
কারারা মার্বেলের খনির ছবি যদি দেখেন, তাহলে আপনার মনে হবে এ যেন বিচ্ছিন্ন আর ভারী আলাদা রকমের জগৎ। সুন্দর, কিন্তু আমাদের চেনা জগতের বাইরে। যেখানে কতক মানুষ তাদের আঙুলের ইশারায় অর্কেস্ট্রার সুরের বদলে ট্রাকটর নেচে নেচে ঘুরে ঘুরে বাজন শোনাচ্ছে। সেখানে বসবাসরত মানুষেরা সাদার শহরে থাকে, সাদা ধুলোয় শ্বাস নেয় আর নিজস্ব উপভাষায় কথা বলে। কারারার চারপাশে আভিজাত্য আর গর্বের ইতিহাস, যে ইতিহাসে সমানভাবে মিশে আছে অরাজকতা আর বিদ্রোহও। আপনার যদি সিনেমা দেখার নেশা থাকে তাহলে কারারা মার্বেল খনির ঝলক হয়তো দেখে ফেলেছেন। জেমস বন্ডের সিনেমায় (কোয়ান্টাম অব সোলেইস) ডেনিয়েল ক্রেইগ তাঁর অভিজাত এস্টন মার্টিন ডিবিএসের গাড়িটা এই কারারা মার্বেলের আকরের মধ্যেই ছুটিয়েছেন।
সময়ের পরিবর্তনে পাথর তোলার যন্ত্রের ছেনি, হাতুড়ি থেকে ট্রাক্টর আর ডায়মন্ড টুথের করাতÑপরিবর্তন হলেও এর পেছনের মর্মার্থের কোনো পরিবর্তন হয়নি; বিশাল এক টুকরো পাথর, সেটি কুঁদে, আকার দিয়ে দূর-দূরান্তে পৌঁছানো হলো আর সেই পাথরের টুকরোটি হয়ে গেল আভিজাত্য, ক্ষমতা আর বিত্তের প্রতীক। সোনার মতো এই মর্মর পাথরও এক চোখ ধাঁধানো সম্পদ, আদতে যার কোনো ব্যবহারিক কার্য নেই। ইতালির মার্বেল পাথরের ভ্রমণের ইতিহাসে নজর রাখুন, আপনি সেই প্রাচীন রোম কিংবা লন্ডনের ভিক্টোরিয়ান যুগ অথবা এই বিংশ শতাব্দীর আমেরিকা; সম্পদের স্থানান্তরের ইতিহাসটাও পেয়ে যাবেন।
প্রাচীনকালের মতো ইতালির মার্বেল এখন শুধু রোম কিংবা লন্ডনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই পাথর এখন রপ্তানি হয় আবুধাবি থেকে মুম্বাই কিংবা চীনÑপৃথিবীর সর্বত্রই। গত কয়েক শতক এই মার্বেলের জয়জয়কার ছিল মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষত সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে। সৌদি বিনলাদিন গ্রুপ ২০১৪ সালে কারারা আকরের অন্যতম বড় একটি চালান কেনে। এই মার্বেল এখন কেবল ভাস্কর্যের জন্য নয়, বড় বড় অবকাঠামো যেমন মসজিদ, প্রাসাদ, বাণিজ্য বিতান, হোটেল ইত্যাদি তৈরিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। এখন কথা হচ্ছে, এই আকর আর কত দিন পাথরের জোগান দিয়ে যাবে? উত্তর মেরুর বরফের মতো তো কারারা পাথর তো আর অফুরান নয়। আর নতুন করে আবার পাথর জন্মাতেও তো আবার সেই সহস্রাব্দের হিসাব। আপাত মূল্যহীন অগণিত প্রাণের জীবাশ্ম আবার কোটি কোটি বছর জমে থেকে; চাপা থেকে ধীরে ধীরে পরিণত হবে দামি মর্মরে। তবে যত দিন কারারা আকরে বুক খুঁড়ে মানুষ পাথর কেটে আনতে পারবে, কারারা মার্বেল তার স্বমহিমায় ধরণির বুকে রাজত্ব করবে, তা বলাই বাহুল্য।
কারারা মার্বেলের মূল্যের অবশ্য তারতম্য আছে এর ধরন আর রঙের ভিন্নতার জন্য। কারারা মার্বেল ধবধবে সাদা থেকে কিছুটা ম্রিয়মাণ সাদা হতে পারে। এর কোনো কোনো স্লাবের বর্গমিটার প্রতি দাম তাই ১১,০০০ ইউরো পর্যন্ত হয়। এই মার্বেলের বিশেষত্ব হচ্ছে, এটি অতটাই শক্ত, যেটুকু হলে সেটি টিকবে শতাব্দীর পর শতাব্দী। আবার ততটাই নমনীয়, যতটা হলে সেটি কেটে আপনি দিতে পারবেন নান্দনিক সব কারুকার্যের ছোঁয়া।
প্রাচীন রোমের বিখ্যাত প্রসার্পিনা ও প্যান্থিওন মন্দির, ট্রাজানের কলাম, মার্কাস অর্লিয়সের কলাম, মাইকেলেঞ্জোলর ডেভিড ছাড়াও আরও অনেক আধুনিক স্থাপত্য আর ভাস্কর্যে কারারার মার্বেল পাথর ব্যবহৃত হয়েছে। এর মধ্যে কারার পাথরের তৈরি উল্লেখযোগ্য স্থাপনা-
- মার্বেল আর্ক, লন্ডন
- ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, লন্ডন
- স্পেনের ভ্যালেন্সিয়াতে মার্কাস দি দ’স আগাসের প্রাসাদের কিছু অংশ
- প্রেমমন্দির, বৃন্দাবন, ভারত
- দ্যু’ম দি সিয়েনা, ইতালি
- ম্যানিলা ক্যাথেড্রিয়াল, ফিলিপাইন
- ফার্স্ট কানাডিয়ান প্যালেস, কানাডা
- শেখ জায়েদ মসজিদ, সৌদি আরব
- হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল বিল্ডিং, বোস্টন
- অসলো অপেরা হাউস, নরওয়ে
- নরম্যান্ডি আমেরিকান সিমেট্রি অ্যান্ড মেমোরিয়াল, ফ্রান্স
- পিস মনুমেন্ট, ওয়াশিংটন ডিসি
- কিং অষ্টম অ্যাডোয়ার্ড মেমোরিয়াল, বার্মিংহাম
- অক্ষার্ধাম, দিল্লি, ভারত
- রব্বা ফাউনটেইন, স্লোভেনিয়া
- ফিনল্যান্ডিয়া হল, ফিনল্যান্ড
- পালাসিও লেজিস্ল্যাটিভো, উরুগুয়ে পার্লামেন্ট প্রভৃতি।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১২০তম সংখ্যা, এপ্রিল-আগস্ট ২০২০।