সাহেব বিবি মসজিদ, চট্টগ্রাম। ছবি: আদার ব্যাপারি

সাহেব বিবি মসজিদ

মোগল শাসকগণ চট্টগ্রামে যেসব মসজিদ নির্মাণ করেন তার মধ্যে অন্যতম আরেকটি মসজিদ সাহেব বিবি। রাউজান উপজেলার বিনাজুরী ইউনিয়নের লেলেঙ্গারা গ্রামে এই মসজিদটি। মোগল আমলে আমির মোহাম্মদ চৌধুরী নামের এক জমিদার তাঁর স্ত্রী সাহেব বিবির নামে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি এই স্থাপনা নির্মাণ করেন। এ মসজিদে মুসল্লিদের জন্য পাশেই খনন করে দিয়েছিলেন একটি বিশাল পুকুর। সাহেব বিবি ছিলেন চট্টগ্রামের লোককাহিনি মালকা বানুর মা।

মসজিদটি নির্মিত হয় ১৬১২ খ্রিষ্টাব্দে। অন্যান্য পাকা স্থাপনার মতো এটিও নির্মিত হয়েছিল চুন-সুরকির গাঁথুনিতে। বিভিন্ন রকম কারুকার্য, টেরাকোটার নকশা, গম্বুজ সব মিলিয়ে মসজিদটি দেখতে অপরূপ মনে হয়। ধারণা করা হয়, মসজিদটি বিদেশি শ্রমিক দিয়ে ডিমের আঠা ও চুন-সুরকি দিয়ে নির্মাণ করা হয়। মসজিদের চারপাশ এতই মনোরম যে যেকোনো মানুষের নজর কাড়বে। চারপাশে সারি সারি গাছ, সবুজ মাঠ, নানা রঙের ফুল, লতাপাতা সব মিলিয়ে মসজিদটিকে অনন্য রূপ দান করেছে। মসজিদের দৈর্ঘ্য ৬০ ফুট ও প্রস্থ ২২ ফুট। এখানে ১৫০ থেকে ২০০ জন মানুষ একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন।

সাহেব বিবি মসজিদের গম্বুজ। ছবি: উইকিমিডিয়া

মসজিদটি একটি খোলা মাঠের ওপর চতুর্ভুজ আকৃতির কাঠামো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে একটি বড় খোলা চত্বর রয়েছে। পূর্ব দিকে তিনটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। অন্যান্য মোগল স্থাপনার মতোই বরাবরের মতো কেন্দ্রীয় প্রবেশ দুয়ারটি অন্য দুটির তুলনায় কিছুটা বড়। প্রবেশদ্বারগুলো খিলানাকৃতির। প্রাচীনকালে হয়তো কারুকাজ ছিল। বর্তমানে এগুলো সাদাটে মার্বেল টাইলস দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। মসজিদে সামনে চারটি এবং পেছনে চারটি, মোট আটটি মিনার রয়েছে। চারদিকের কর্নারের মিনারগুলো বড় এবং মাঝখানে যে চারটি মিনার রয়েছে, সেগুলো ছোট। সামনে দুটি জানলার সারি রয়েছে। এক সারিতে চারটি জানালা। পাশে একটি মিনার রয়েছে, যেখান থেকে আজানের ধ্বনি শোনার জন্য একটি বড় মাইকের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই মিনারের ওপরে লম্বা দন্ডায়মান একটি চাঁদ-তারা চিহ্ন রয়েছে। মসজিদকে দেখতে দূর থেকে এক গম্বুজবিশিষ্ট মনে হলেও এটি আসলে তিন গম্ভুজবিশিষ্ট। কেন্দ্রীয় গম্বুজটি বেশ বড় এবং দুই দিকে দুটি ছোট ছোট গম্বুজ রয়েছে। গম্বুজগুলোর ওপরে কলস এবং পদ্ম ফুলের কাজ করা হয়েছে। জনসাধারণের কাছ থেকে শোনা যায়, মোগল আমলের এই ঐতিহ্যটি একটা সময় বিধ্বস্ত এবং জীর্ণ হয়ে পড়ে। এরপর এ মসজিদ সংস্কারের ব্যবস্থা গ্রহণ করে স্থানীয় সরকার।

বিজয়া চৌধুরী

প্রকাশকাল: বন্ধন ১৬৬ তম সংখ্যা, জুন ২০২৪

Related Posts

ফেনীর নামকেও সমৃদ্ধ করে চাঁদগাজী মসজিদ

বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেক স্মৃতি আমাদের নস্টালজিক করে তোলে। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো ঐতিহাসিক মসজিদগুলো। এমনই এক ঐতিহাসিক…

তাজহাট জমিদার বাড়ি বাংলার ইতিহাসের সাক্ষী

তাজহাট জমিদার বাড়ি বাংলার ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের এক স্মারক। পুরান রংপুর যা বর্তমানে তাজহাট উপজেলা হিসেবে পরিচিত সেখানেই গড়ে…

কংক্রিটের নগরীতে চারশ বছরের মোঘল স্থাপত্য ধানমন্ডি শাহী ঈদগাহ

ব্যস্ত ট্রাফিক, আধুনিক ক্যাফে, আর বহুতল ভবনের ভিড়ে ঠাসা আজকের ধানমন্ডি। ঢাকার অন্যতম অভিজাত ও কোলাহলপূর্ণ এই এলাকার…

ইট-পাথরে গাঁথা ইতিহাসের পাতা: বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ঈদগাহের গল্প

‘ঈদ’ মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। আত্মত্যাগের মহিমা নিয়ে হাজির হয় ঈদুল আজহা। ঈদের দিন সকালে ঘুম…