• Home
  • স্থাপত্য
  • গাছের চারপাশে বোনা লুয়ান্ডার নতুন গ্রন্থাগার
Image

গাছের চারপাশে বোনা লুয়ান্ডার নতুন গ্রন্থাগার

আঙ্গোলার রাজধানী লুয়ান্ডায় স্প্যানিশ স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান টিপসা আরকিটেক্তুরা সম্প্রতি একটি গ্রন্থাগারের ডিজাইন সম্পন্ন করেছে। যেখানে গাছপালাকে সরিয়ে না দিয়ে বরং সেগুলোকে ঘিরেই পুরো ভবনের কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। 

ঢেউ খেলানো কংক্রিটের ছাদে গোলাকার ছিদ্র রাখা হয়েছে। যেগুলো সাইটের পুরোনো গাছগুলোকে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে রেখেছে। লুয়ান্ডার প্রযুক্তি পার্কের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ১,৯১৫ বর্গমিটার আয়তনের এই গ্রন্থাগারটির ডিজাইন এমনভাবে করা হয়েছে যে সাইটে থাকা পূর্ণবয়স্ক গাছগুলোই এর ফুটপ্রিন্ট, স্থানিক বিন্যাস এবং ছাদ কেমন হবে তা নির্ধারণ করেছে।

সাইটে বিদ্যমান গাছগুলোই পুরো ডিজাইনের অংশ হয়ে উঠেছে। ছবি: ডিজেইন
গাছকে কেন্দ্র করে ডিজাইনের ভাবনা

সাইটটি পুরোপুরি পরিষ্কার করে ফেলার সাধারণ প্রবণতার বিপরীতে গিয়ে স্থপতিরা গ্রন্থাগারটিকে সাজিয়েছে একাধিক গাছপালাযুক্ত উঠান বা কোর্টইয়ার্ডকে কেন্দ্র করে। যার ফলে বিদ্যমান গাছগুলোই পুরো ডিজাইনের অংশ হয়ে উঠেছে। 

প্রধান স্থপতি মারিনা গনসালেস সুয়ারেস বলেন, বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ইতিহাসজুড়ে গাছের ছায়া সবসময় মানুষের একত্র হওয়া, শেখা, মতবিনিময় এবং বিশ্রামের একটি জায়গা হিসেবে কাজ করেছে।

সুয়ারেস আরও জানান, এই পূর্ণবয়স্ক গাছগুলোই পুরো প্রকল্পের মূল ডিজাইন-নির্ধারক হয়ে উঠেছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে যেখানে আগে ভবনের ডিজাইন ঠিক করে পরে ল্যান্ডস্কেপকে তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হত, এখানে তার উল্টো ঘটেছে। স্থাপত্যটি গড়ে উঠেছে গাছগুলোকে ঘিরেই।

বাঁকানো কংক্রিট ছাদ সরু-প্রশস্ত হয়ে খুলে গেছে গোলাকার ফাঁকায়, যেখানে দাঁড়িয়ে সংরক্ষিত গাছ। ছবি: ডিজেইন
ছাদের কাঠামো ও পরিবেশগত কৌশল

গ্রন্থাগারটি ঢাকা পড়েছে একটি বাঁকানো কংক্রিটের ছাদের নিচে। যা সাইটজুড়ে কখনো প্রশস্ত হয়েছে, কখনো সরু হয়ে গিয়ে গোলাকার ফাঁকা জায়গায় গিয়ে খুলে গেছে। আর সেই ফাঁকা জায়গাগুলোই সংরক্ষিত গাছগুলোকে ঘিরে রেখেছে। 

এর ছাদ গ্রন্থাগারের প্যাসিভ পরিবেশগত কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু। নিচের ব্যবহৃত জায়গা থেকে আলাদা রাখা এই ছাদ আসলে দুই স্তরের একটি বায়ুচলাচলযোগ্য কাঠামো। যেখানে ক্রমাগত বাতাস চলাচল করে এবং তাপ ভেতরে পৌঁছানোর আগেই তা ছড়িয়ে যায়। ক্রস-ভেন্টিলেশন এবং গাছের ছায়ার সঙ্গে মিলিয়ে এই ছাদ সৌরতাপ প্রবেশ কমিয়ে ভেতরের পরিবেশকে ঠান্ডা রাখতে সহায়তা করে।

ভবনের বহিরাবরণে থাকা ব্রিজ সোলেই নামের বিশেষ পর্দা সূর্যের অবস্থান বুঝে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়। ছবি: ডিজেইন
ব্রিজ সোলেই ও বহির্ভাগের নকশা

বাঁকানো কাচের বাইরের দেয়ালে ছায়া দিতে লাগানো হয়েছে উঁচু, ব্রিজ সোলেই নামের বিশেষ পর্দা। যেগুলো সূর্যের অবস্থান বুঝে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়। অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি এসব পর্দা ভবনের বাইরের অংশে একটু অসমান, খসখসে চেহারা এনে দিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি বলছে, আঙ্গোলার আধুনিক স্থাপত্যে ব্রিজ সোলেই পর্দা খুবই পরিচিত একটি বিষয়। এখানে সেই পুরনো ধারণাটিকেই নতুনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই পর্দাগুলো রোদ ছেঁকে গ্রন্থাগারের ভেতরের সাদা, বাঁকানো দেয়ালে বদলাতে থাকা গ্রিড-আকৃতির ছায়া ফেলে।

ভেতরে সাদা দেয়াল, চকচকে মেঝে আর মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত লম্বা কাচ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে উজ্জ্বল, খোলামেলা একটি পরিবেশ। ছিদ্রযুক্ত পর্দার ভেতর দিয়ে আসা বদলাতে থাকা ছায়া পুরো জায়গাটিকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

মাঝখানে একটি চওড়া কাঠের সিঁড়ি উপরের তলায় উঠে যায়, যেখানে মূল পাঠকক্ষটি একটি বারান্দায় গিয়ে মেশে। ছবি: ডিজেইন
অভ্যন্তরীণ পরিসর ও পরিভ্রমণের অভিজ্ঞতা

গ্রন্থাগারটিতে আছে দুটি সাধারণ ব্যবহারের তলা, আর একটি প্রযুক্তিগত তলা যেখান থেকে ভবনের বিভিন্ন সার্ভিস পরিচালনা করা হয়। দর্শনার্থীরা প্রবেশ করেন নিচতলা দিয়ে। মিলনায়তনেও এখান থেকেই যেতে পারবেন তারা। মাঝখানে একটি চওড়া কাঠের সিঁড়ি উপরের তলায় উঠে যায়, যেখানে মূল পাঠকক্ষটি একটি বারান্দায় গিয়ে মেশে। সেখান থেকে চারপাশের পার্কের দৃশ্য দেখা যায়।

প্রকল্প পরিচালক কোরাল বলেন, পুরো ডিজাইনটি এমনভাবে করা হয়েছে যাতে দর্শনার্থীরা সহজ ও স্বস্তিদায়ক অনুভূতি পান। তাঁর মতে, এখানে একটি সোজা পথ ধরে হাঁটার বদলে দর্শনার্থীরা একের পর এক জায়গা ঘুরে বেড়ান। আর তাতে ধাপে ধাপে নতুন নতুন দৃশ্য, ভবনের অংশবিশেষ এবং নানা কার্যক্রম চোখে পড়ে।

প্রকৃতিকে সরিয়ে নয়, কেন্দ্রে রেখেই আধুনিক স্থাপত্য সম্ভব। ছবি: ডিজেইন

লুয়ান্ডার এই গ্রন্থাগারটি দেখিয়ে দেয়, প্রকৃতিকে সরিয়ে না দিয়ে বরং তাকে কেন্দ্রে রেখেও আধুনিক ও কার্যকর স্থাপত্য গড়ে তোলা সম্ভব। বিদ্যমান গাছগুলোকে ধ্বংস না করে বরং সেগুলোকে নকশার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করার এই দৃষ্টিভঙ্গি একদিকে যেমন ভবনের নান্দনিক পরিচয় তৈরি করেছে, তেমনি অন্যদিকে প্যাসিভ শীতলীকরণ কৌশলের মাধ্যমে জ্বালানি সাশ্রয়েও সহায়ক হয়েছে। 

তথ্যসূত্র:

ডিজেইন

Related Posts

বায়তুর রউফ জামে মসজিদ স্থপতি মেরিনার অনন্য স্থাপত্যকর্ম

শুধু দৃশ্যত নান্দনিকতাই নয়, স্থাপত্যের শিখরে রয়েছে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জলবায়ুর সম্পৃক্ততা। আর এসবের পরিপূর্ণ সংমিশ্রণেই সম্ভব স্বতন্ত্র…

আধুনিক বাড়ির নকশায় গৃহস্থালি কাজ ও করিডরের বিবর্তন

একটি বাড়ির নকশায় করিডর বা চলাচলের পথকে সাধারণত খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বসার ঘর, শোবার ঘর,…

আধুনিক বাড়ির স্বপ্ন: মানুষকে স্বাধীন করার প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার সংকট

আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ, আরামদায়ক ও স্বাধীন করে তোলা। বিংশ শতাব্দীতে স্থপতি…

পরিবেশগত নৈতিকতার আলোকে স্থাপত্যের ১০টি প্রধান চ্যালেঞ্জ

স্থাপত্য কেবল ভবন নির্মাণ কিংবা নান্দনিক নকশা তৈরির শিল্প নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রা, প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

বায়তুর রউফ জামে মসজিদ স্থপতি মেরিনার অনন্য স্থাপত্যকর্ম
করিডোর
house
01
হাসপাতালে রোগী-কক্ষে ঘরোয়া আবহ দিচ্ছে কোয়ালুর নতুন ফার্নিচার
10
09
ফর্ম ফলোজ ফিকশন: ফাংশনের বাইরে ছয়টি ডিজাইনের অনুসন্ধান
প্রকৃতির দামও হিসাব করছে ভুটান: জিডিপির পাশে জিইপি