ডাইনিং টেবিলের শোভা বাড়াতে জুড়ি নেই সিরামিকস সামগ্রীর। তবে এ উপকরণ শুধু টেবিলওয়্যারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সিরামিকসে তৈরি দৃষ্টিনন্দন বাথরুম ফিটিংস অন্দরের সৌন্দর্যবর্ধক উপকরণ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন শৌখিন ও সৌন্দর্যপ্রিয় অনেকেই। সিরামিকস পণ্যের কদর যে দিন দিন বাড়ছে তা কিন্তু নয় বরং আজকাল এটি ফ্যাশনেও পরিণত হয়েছে। ঝকঝকে সুন্দর ইন্টেরিয়রে সাজাতে বাথরুম ডেকোরেশনের অন্যতম অনুষঙ্গ সিরামিকস ফিটিংস। হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হতে সিরামিকস বেসিন, গোসলের আনন্দে সিরামিকসের বাথটাব আর প্রাকৃতিক কর্ম সারতে সিরামিকস কমোডের জুড়ি মেলা ভার।
সিরামিক শিল্পের কাঁচামাল
বাথরুম ফিটিংস তথা সিরামিকস পণ্য তৈরিতে নানা ধরনের কাঁচামাল ব্যবহৃত হয়। যার মধ্যে অন্যতম-
- চীনামাটি
- চুনাপাথর
- পোড়ামাটি
- প্লাস্টার অব প্যারিস
- অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড
- অ্যালুমিনিয়াম হাইড্রো অক্সাইড
- জিঙ্ক
- তরল সোনা ও অন্যান্য।
বেসিন
আমাদের দিনের শুরুটা হয় বেসিনে মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হওয়ার মধ্য দিয়ে। তাই বেসিন হওয়া চাই নান্দনিক। বাথরুমে ঢোকার মুখে সুদৃশ্য বেসিন দেখলে মনটাই ভালো হয়ে যায়। তবে অধুনা বেসিন শুধু বাথরুমেই নয়, ব্যবহৃত হচ্ছে খাবারঘর, রান্নাঘর ও বারান্দায়ও। তা ছাড়া সুদৃশ্য বেসিনগুলো প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ঘরের সৌন্দর্যও বাড়াতেও বিশেষ ভূমিকা রাখে।
ডিজাইন, রং ও ধরন
বিভিন্ন ডিজাইন, রং ও আকারের বেসিন পাওয়া যায় বাজারে। সাধারণ রাউন্ড ও স্কয়ার বেসিনের প্রচলন বেশি। রঙের মধ্যে সাদা, অফহোয়াইট, পার্পেল, গাঢ় ও হালকা নীল বেশি জনপ্রিয়। বেসিন সেটসহ কিংবা আলাদা আলাদা কিনতে পাওয়া যায়। ডিজাইনেও রয়েছে ভিন্নতা। প্রচলিত বেসিনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
- ইন্টিগ্রেটেড পেডিস্টাল
- ওয়াল হ্যাং
- কর্নার
- কাউন্টার
- কেবিনেট
- আন্ডার কাউন্টার
- ওভার কাউন্টার।
বেসিনের ডেকোরেশন
বেসিন স্থাপন ও এর ডেকোরেশন বেশ গুরুত্বপূর্ণ, যার অন্যতম অনুষঙ্গ আয়না। বেসিনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ডেকোরেটিভ বা সিম্পিল আয়না লাগানো যায়। তবে ডাইনিং বেসিনের আয়না একটু ডেকোরেটিভ হলেই ভালো হয়। ছোট পরিসর অথবা কর্নার স্পেসের বাথরুম বা ডাইনিংয়ে কর্নার বেসিন বসানো হয়। বাথরুম ও রান্নাঘরের সৌন্দর্যে কাউন্টার বেসিন বেশ উপযোগী। কারণ, এতে কাউন্টারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সাজিয়ে রাখা বা কাটাকুটি করা সহজ হয়।
আকারভেদে দরদাম
চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশের বেসিন ছাড়াও দেশে তৈরি বেসিন বাজারে পাওয়া যায়। মারকুইস, আরএকে, বেঙ্গলসহ আধুনিক বেসিনগুলো সহজেই নজর কাড়ে। সাধারণত ডিজাইন, মান ও সাইজ অনুযায়ী এর দাম নির্ধারিত হয়। ছোট আকারের বেসিন ১,০০০ থেকে ৩,০০০ টাকা, মাঝারি বেসিন ২,৫০০ থেকে ৫,০০০ টাকা, বড় বেসিনের দাম ৩,০০০ থেকে ৬,০০০ টাকার মধ্যে। কাউন্টারসহ উন্নতমানের ও আমদানি করা বেসিনের দাম পড়বে ৮,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ টাকার মধ্যে। তবে ভালো মানের টেকসই বেসিন কেনাটাই বুদ্ধিমানের কাজ, কেননা তা বারবার বদলানো সম্ভব নয়।
কমোড
প্রাকৃতিক কাজ সম্পন্ন করতে সিরামিকস কমোড বহুল ব্যবহৃত একটি ফিটিংস। আগে লো-কমোডের চল থাকলেও বর্তমানে হাই-কমোডও সমান জনপ্রিয়। প্রতিনিয়তই কমোডে যুক্ত হচ্ছে আধুনিক সব ফিচার। চমৎকার সব ডিজাইনের কমোড এখন বাথরুমসজ্জার অন্যতম অংশে পরিণত হয়েছে। বলা হয়, একটি পরিবারের স্নানঘর ও টয়লেট দেখেই বাড়ির কর্তাব্যক্তির রুচি আঁচ করা যায়; যার অন্যতম অনুষঙ্গ কমোড।
কমোডের ধরন
সাধারণত কমোড দুই ধরনের-
- ক্ল্যাসিক্যাল
- মডার্ন।
মডার্ন কমোডের মধ্যে রয়েছে-
- ইউরোপিয়ান বা ওয়েস্টার্ন ক্লোসেট
- ফ্লোর মাউন্টস
- ওয়াল হ্যাংগ
- রিমলেস
- টর্নেডো।
কমোড বোল
বাজারে প্রচলিত কমোড বোল বিভিন্ন ধরনের-
- রাউন্ড বোল
- স্কয়ার বোল
- ইলংগেটেড বোল
- রেক্টেঙ্গুলার বোল।
কমোড বৈচিত্র্য
বাথরুমের কমোড যে কতটা বৈচিত্র্যময় হতে পারে তা ভাবাই যায় না। সিরামিকস ও পোরসেলিন কমোডই বিশ্বে সর্বাধিক ব্যবহৃত। তবে সোনা দিয়েও কমোড তৈরি হয়েছে, যা সংরক্ষিত আছে নিউইয়র্কের গুগেইনহেম মিউজিয়ামে। নাম ‘আমেরিকা’। দর্শনার্থীরা সোনার কমোডটি ব্যবহার করতে পারেন, তবে গুনতে হবে অনেক টাকা। কমোড উৎপাদক ও গবেষকেরা কমোডে উচ্চ প্রযুক্তি সংযোজনে বেশ মনোযোগী। জাপানের টো টো কোম্পানি স্বয়ংক্রিয় পরিষ্কার যন্ত্রসহ কমোড উদ্ভাবন করেছে, যা থেকে দুর্গন্ধরোধী পদার্থ নিঃসরিত হয়ে সুগন্ধি বের হবে। ওয়াশ বাটন চাপলে পশ্চাৎদেশও ধুয়ে দেবে। তারপর ভেজা অংশ শুকিয়ে দেবে গরম হাওয়া দিয়ে। সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে ফ্লাশ করার পর ইলেকট্রোলাইট কমোডের সব ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও অতিবেগুনি রশ্মিজনিত জীবাণসমূহকে মেরে ফেলে।
এ ছাড়া কিছু প্রতিষ্ঠান জলপ্রপাত, সমুদ্রের ঢেউ, পাখির ডাকসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক শব্দ সংযোজন করেছে, যা ফ্লাশ বাটন চাপলেই বেজে উঠবে। এ ছাড়া জাপানের উন্নত হাসপাতালের কমোডে ব্লুটুথ সংযোগ করা হয়েছে, যা থেকে অ্যাপসের সাহায্যে মল-মূত্রের প্রকৃতি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানা যাবে। স্বয়ংক্রিয় সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করে কমোডকে আরও আধুনিক করে তোলার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। গবেষকেরা চাইছেন এমন একটি কমোড উদ্ভাবনে, যা মল-মূত্র থেকে জৈব সার উৎপাদনে সক্ষম!
কমোডের দরদাম
আধুনিক কমোডগুলো যেমন বৈচিত্র্যময় তেমনি কেনার খরচটাও নেহাত কম নয়। কয়েক লাখ টাকার কমোডও রয়েছে বাজারে। দেশি বাজারে আমদানি করা কমোডের দাম ৩০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকার মধ্যে। তবে ২,০০০ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে দেশি-বিদেশি কমোড কিনতে পাওয়া যায়।
বাথটাব
গ্রামের বাড়ির বিশাল পুকুরকে আধুনিক ফ্ল্যাটের বাথরুমে একচিলতে ঠাঁয় দিতেই সংযোজন করা হয়েছে বাথটাবে, যা মনে আনে প্রশান্তি। হয়তো-বা এটি শুধু মনের নয়, দেহেরও। সারা দিন কাজের পর ঘরে ফিরে বাথটাবে কুসুম গরম পানিতে গোসল করার মজাই আলাদা। এতে যেন নিমেষেই সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। তা ছাড়া প্রচণ্ডগরমে বাথটাবের শীতল জলে গা ডুবিয়ে স্নানের তৃপ্তি অসামান্য। সাধারণত বিত্তশালীদের বাড়িতে বাথটাব শোভা পেলেও এখন আধুনিক ফ্ল্যাট বা বাসাবাড়িতে অনেকেই সংযোজন করছেন বাহারি এ অনুষঙ্গটি।
ডিজাইন ও রকমফের
আজকাল বাথটাব বাথরুমের হাল ফ্যাশনেরই অংশ। বাথরুমজুড়ে বাথটাবের জুড়ি মেলা ভার। আধুনিক ডিজাইনের হরেক রকম বাথটাব পাওয়া যায় বাজারে। এর মধ্যে রাউন্ড, ওভাল, রেক্টেঙ্গুলার শেপের বাথটাবই বেশি জনপ্রিয়। রয়েছে কম জায়গার জন্য ফ্রি-স্ট্যান্ডিং বাথটাব। এ ছাড়া দাঁড়িয়ে গোসল করার জন্যও আছে স্টুডিও বাথটাব। বহুল প্রচলিত বাথটাবের মধ্যে অন্যতম-
- ক্লফুট
- অ্যালকোভ
- ড্রপ-ইন
- ফ্রিস্ট্যান্ডিং
- কর্ণার
- আন্ডারমাউন্ট
- ওয়ার্লপুল।
দরদাম
দেশীয় সিরামিকস কোম্পানিগুলো এখনো ততটা বাথটাব উৎপাদন শুরু করেনি। ইতালি, কোরিয়া, ভিয়েতনাম থাইল্যান্ড, চীন ও ভারত থেকে আমদানি করা বিভিন্ন আকৃতি, নকশা ও মানের বাথটাবের দাম পড়বে ৫ হাজার থেকে লাখ টাকার মধ্যে। অবশ্য বিশেষায়িত কিছু বাথটাবের দাম লাখ টাকারও বেশি।
যত্নআত্তি ও প্রয়োজনীয় টিপস
- স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাথটাব, বেসিন ও কমোড সব সময় পরিষ্কার রাখা উচিত।
- প্রতিবার গোসলের পরই বাথটাব পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুছে ফেললে টাবে ময়লা বা গাদ জমাতে পারে না। ফলে তা থাকে চকচকে।
- এসব ফিটিংস লাগানোতে অভিজ্ঞ ও দক্ষ স্যানিটারি মিস্ত্রির সাহায্য নেওয়া উচিত। এতে ফিটিংসগুলো মাপমতো বসানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
পাওয়া যাবে যেখানে
সাধারণত স্যানিটারি সামগ্রীর বাথরুম ফিটিংস পাওয়া যাবে স্থানীয় বিক্রয়কেন্দ্রে। যদিও বেসিন ও কমোড ঢাকার হাতিরপুল, বাংলামোটর, মিরপুর, উত্তরা, গুলশানের বেশির ভাগ দোকানে পাওয়া গেলেও বাথটাব বড় শোরুমগুলোতেই বেশি বিক্রি হয়। আমদানি করা সিরামিকস ফিটিংসের একটি বড় বাজার রাজধানীর গ্রিন রোডের গ্রিন সুপার মার্কেট।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৭তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৭।