গরমের আরামে সিলিং ফ্যান

অসহ্য গরম! তীব্র রোদের তেজ! ঘর থেকে বাইরে বের হলেই তপ্ত রোদে যেন পুড়ে যায় শরীর। দরদর করে ঘামতে থাকা শরীরটা হাঁসফাঁস করতে থাকে শীতল বাতাসের পরশ পেতে। গ্রীষ্মের বাতাসেও যেন মিশে থাকে আগুনের হলকা। ঋতু ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রাও বাড়ছে প্রতিনিয়ত। বাইরের কাজ সেরে ঘরে বা অফিসে ফিরে এসিটা চালু করতে পারলেই যেন স্বস্তি মেলে। কিন্তু ঘরে ঘরে এসি লাগানোর সামর্থ্য তো আর সবার নেই। ভরসা তখন বৈদ্যুতিক পাখা বা ফ্যানের ওপরেই। গরম এলেই বেড়ে যায় ফ্যানের চাহিদা। বিভিন্ন ধরনের ফ্যান বাজারে পাওয়া গেলেও কার্যকারিতা ও চাহিদা বেশি সিলিং ফ্যানের। কিন্তু সিলিং ফ্যান সম্পর্কে ভালোভাবে না জানলে তা হতে পারে বিড়ম্বনার কারণ। সিলিং ফ্যানের আদ্যোপান্ত নিয়ে থাকছে দরকারি তথ্য। 

গরমে শীতল পরশ পেতে ফ্যান কিনতে গেলেই সাধারণত আমরা দোকানিকে বলি, এমন ফ্যান দিন যা ঘুরবে জোরে; আর বাতাস হবে ঠান্ডা! এটা ঠিক উন্নত মানের ফ্যান ঘোরে বেশি, তবে কম ঘোরা ফ্যান থেকেও বেশি বাতাস পাওয়া সম্ভব। এই বিষয়টি নির্ভর করে ফ্যানের ওয়াট, উন্নতমানের কয়েল ও সঠিক ডিজাইনের পাখার ওপর। বেশি ওয়াটের ফ্যান বেশি বাতাস দেবে কিন্তু বাতাস ঠান্ডা হবে কি না তা নির্ভর করে পরিবেশের ওপর। আসলে সিলিং ফ্যান ঘরের তাপমাত্রা কমায় না। পাখা ঘুরলে বাতাসে স্থান পরিবর্তিত হতে থাকে। এতে স্থির বাতাস নড়তে শুরু করে, আর গায়ে বাতাস লাগে। সিলিং ফ্যানের সঙ্গে সংযুক্ত রেগুলেটর দিয়ে এর ঘূর্ণনগতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এই বাতাস শরীরের থেকে তাপ সঞ্চালন বাড়িয়ে দেয় ঠান্ডার অনুভূতি। আর্দ্র পরিবেশে ফ্যানের বাতাস অনেক ঠান্ডা রাখতে পারে। কিন্তু শুকনো পরিবেশে ফ্যানের বাতাস তেমন কাজে দেয় না। 

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে ফ্যানের ওয়াট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বেশির ভাগ ফ্যানের গায়েই ওয়াট উল্লেখ করা থাকে। সাধারণ ফ্যান সিঙ্গেল ফেজ ক্যাপাসিটর স্টার্ট অ্যান্ড রান ইন্ডাকশন মোটরে চলে। এই প্রযুক্তির ফ্যান সাধারণত ৬০ থেকে ৮০ ওয়াট বিদ্যুৎ খরচ করে। ওয়াট যত কম হবে বিদ্যুৎ খরচও তত কমবে। তবে সম্প্রতি দেশের বাজারে এসেছে নতুন প্রযুক্তির কম ওয়াটসম্পন্ন উন্নত ফ্যান। এগুলোর ওয়াট ২৮ থেকে ৪০-এর মধ্যে। সাধারণ ফ্যানের থেকে এই ডিভাইসগুলো অনেক বেশি বিদ্যুৎসাশ্রয়ী অথচ বাতাস দেয় বেশি। কোনো শব্দও হয় না। লো-ভোল্টেজেও ফুল স্পিডে চলে। 

সিলিং ফ্যান কিনতে অনেকে দ্বিধায় ভোগেন কত পাখা বা ব্লেডের ফ্যান কিনবেন। বাজারে প্রাপ্ত ৩, ৪, ৫ পাখাবিশিষ্ট ফ্যানের কোনটিই-বা অধিক বাতাস দেবে, এ নিয়ে আমাদের মধ্যে স্বচ্ছ ধারণার অভাব রয়েছে। আগে ৩ পাখাযুক্ত ফ্যানের চলন থাকলেও এখন সে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫-এ। তবে তারও আগে দুই ব্লেডের ফ্যান বেশি জনপ্রিয় ছিল, যা আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকায় এখনো দেখা মেলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে ৪ ব্লেডের ফ্যানের প্রচলন শুরু হয়। সম্প্রতি ৩ পাখার পাশাপাশি ৪ ও ৫ পাখার ফ্যানও বেছে নিচ্ছেন অনেকেই। এই ফ্যানগুলো আস্তে ঘুরলেও বাতাস হয় বেশি। শব্দও হয় কম। 

ফ্যানের ব্লেড সাধারণত স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের হয়। স্টিলের থেকে অ্যালুমিনিয়ামের দাম বেশি। কিছু ফ্যানের পাখা হয় বাঁকানো। যে ফ্যানের পাখা সোজা না থেকে পরিধির দিয়ে একটু পেছনে বাঁকা থাকে তা থেকে বাতাস ছড়ায় বেশি। বেশি বাতাসের জন্য বড় ব্লেডের ফ্যান কেনা উচিত। তবে তা অবশ্যই ঘরের আয়তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকতে হবে। তা ছাড়া ব্লেডের সাইজ অনুযায়ী সিলিং ফ্যানেরও বিভিন্ন সাইজ হয়। ঘরের আয়তনভেদে কোন সাইজের ফ্যান ব্যবহার করবেন তার নির্দেশিকা-

ফ্যান সাইজ (মি.মি)

উল্লেখ্য, ঘরের আয়তন ১৪ বর্গফুটের বেশি হলে ১৪০০ মি.মি সাইজের ২ বা ততোধিক ফ্যান ব্যবহার করতে পারেন।

ব্র্যান্ড ও ডিজাইন

দেশি-বিদেশি উভয় ধরনের সিলিং ফ্যান পাওয়া যায় বাজারে। তবে বিদেশি ফ্যানের তুলনায় দেশি ফ্যানের চাহিদা বেশি। দেশীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান উন্নতমানের সিলিং ফ্যান তৈরি ও বাজারজাত করছে। দেশি ব্র্যান্ডের মধ্যে রয়েছে ন্যাশনাল (টঙ্গী), বিআরবি, সিঙ্গার, ওয়ালটন, গাজী, প্যারাডাইস, সুপারস্টার, ক্লিক, ভিশন, তুফান প্রভৃতি। বিদেশি ব্র্যান্ডের মধ্যে পাকিস্তানের পাক, জিএফসি ও পাক্কল পাক ফ্যান এবং ভারতীয় হ্যাবেলস, ওরিয়েন্ট ও খাইতান উল্লেখযোগ্য। ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে নিত্যনতুন নকশাও যুক্ত হচ্ছে ফ্যানে। বর্তমানে সাদা, কালো, হালকা বাদামি কিংবা অফহোয়াইট রঙের পাশাপাশি লাল, নীল, সবুজ ও সোনালি কারুকাজ করা ফ্যান পাওয়া যাচ্ছে। পাখার মধ্যেও মিলছে বিভিন্ন রকম নকশা। 

ফ্যান কেনার আগে

এই গরমে মাথার ওপরে ঘোরা ফ্যানটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে ভোগান্তির অন্ত নেই। তাই নতুন সিলিং ফ্যান কেনার আগে জানতে হবে কিছু দরকারি তথ্য। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি ফ্যান ব্যবহারের ক্ষেত্রে সস্তা দরের ফ্যান না কিনে ভালো ব্র্যান্ড ও গুণগতমানের পণ্যটিই কেনা উচিত। সেক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়গুলো হচ্ছে- 

  • ফ্যান কেনার সময় এর ওয়ারেন্টি কিংবা গ্যারান্টির মেয়াদ বুঝে নিন।
  • বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে কম ওয়াটের ফ্যান কিনুন।
  • উন্নত মানের বিয়ারিং ও মোটরযুক্ত ফ্যান কিনুন, তাতে শব্দ কম হবে।
  • নিশ্চিত হয়ে নিন ক্যাপাসিটর সম্পর্কেও।
  • ফ্যানের কয়েল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উন্নতমানের কপার কয়েল দীর্ঘ মেয়াদে নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যায়।
  • ব্লেডের ক্ষেত্রে বেছে নিন অ্যালুমিনিয়ামের পাখা। অ্যালুমিনিয়ামের পাখায় সহজে মরিচা ধরে না এবং সহজেই বারবার পরিষ্কার করা যায়।
  • ব্লেডের অ্যাংগেল ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নেবেন। এই অ্যাংগেল সাধারণত ১২ থেকে ১৫ ডিগ্রি হওয়া উচিত।
  • বাড়িতে এসি থাকলে ৪ ব্লেডযুক্ত সিলিং ফ্যান ব্যবহার করতে পারেন।
  • ঘরের মেঝে ও সিলিংয়ের মধ্যবর্তী দূরত্ব কম হলে লো-প্রোফাইল সিলিং ফ্যান ব্যবহার করতে পারেন।
  • বড় আকারের বসার ঘর কিংবা পড়ার ঘরের জন্য লম্বা আকারের সিলিং ফ্যান ব্যবহার করলে ভালো। এতে পুরো ঘরেই বাতাস পাওয়া যায়।

সিলিং ফ্যান সংযোজনে

ফ্যান লাগানোর সময় কিছু জিনিস খেয়াল রাখতে হবে-

  • ফ্লোর থেকে ফ্যানের উচ্চতা ২ থেকে ৩ মিটার রাখবেন।
  • সিলিং থেকে ২৪-২৫ ইঞ্চির মতো গ্যাপ রাখবেন।
  • ইলেকট্রনিক রেগুলেটর ব্যবহার করবেন। নিয়মিত লুব্রিকেন্ট দিয়ে রাখবেন।

টিপস

  • ঘরে বাইরে থেকে প্রচুর ধুলা-ময়লা প্রবেশ করে। অন্যান্য স্থান পরিষ্কার করা গেলেও উচ্চতার কারণে সিলিং ফ্যানের ময়লা সব সময় পরিষ্কার করা যায় না। বেশি ময়লা জমে দেখতেও খারাপ লাগে। এতে ঘরের সৌন্দর্যও ম্লান হয়। এ জন্য প্রতিনিয়ত ফ্যান পরিষ্কার করা উচিত। বালিশের পুরাতন পাতলা কভার দিয়ে সহজেই কাজটি করা যায়। ফ্যানের পাখার বা ব্লেডের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত ঢেকে বালিশের কভারটি দুই হাত দিয়ে পাখার ওপরে চেপে ধরে বাইরের দিকে টান দিলে দেখা যাবে কভারের ভেতর সব ময়লা চলে এসেছে। 
  • বেশি ময়লা হলে ডিটারজেন্টযুক্ত পানিতে কাপড় ভিজিয়ে মুছে নিতে পারেন।
  • ফ্যান ও এয়ারকন্ডিশনার একই সঙ্গে না চালানোই ভালো।
  • ঘরের তাপমাত্রা বেশি থাকলে একটি সাধারণ কুলারের সঙ্গে সিলিং ফ্যান ব্যবহার করলে ঘরের পরিবেশ ঠান্ডা থাকবে। তবে কারও শ্বাসকষ্টের সমস্যা থাকলে সাধারণ পানি দেওয়া কুলার ব্যবহার না করাই শ্রেয়।

দরদাম

নিত্যপ্রয়োজনীয় এই ইলেকট্রনিকস পণ্যটি বিভিন্ন দামে কিনতে পাওয়া যায় বাজারে। ব্র্যান্ড, ডিজাইন, রং ও পাখার পরিমাণভেদে ফ্যানের দাম হয় ভিন্ন। তা ছাড়া বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় গ্রীষ্মে এ সময়ে ফ্যানের চাহিদাও বেড়ে যায়; দরদামেও গজায় নতুন নতুন পাখা। তবে সাধারণত দেশি কোম্পানির ভালো মানের ফ্যান ন্যূনতম ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। ২ হাজারের নিচেও ফ্যান কিনতে পাওয়া যায় তবে তা মানসম্মত নয়। ৪র্২র্  ও ৩র্৬র্  ফ্যানের দাম পড়বে ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে। ৪ পাখার বা ৫ পাখার ফ্যানের দাম বেশি। এই ফ্যানগুলো ২ হাজার ৭০০ থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। কিছু ফ্যানে রেগুলেটর ছাড়াও বিক্রি হয়। আলাদাভাবে রেগুলেটর কিনতে ১০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে পেয়ে যাবেন। ৮০০-১,৫০০ টাকার মধ্যে পাবেন রিমোট কন্ট্রোল সুইচসহ রেগুলেটর। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিলিং ফ্যানের মূল্যটা জেনে নিন; তবে স্থানভেদে এই মূল্য কমবেশি হতে পারে-

ওয়ারেন্টি-গ্যারান্টি

বাজারের প্রায় সব ব্র্যান্ডই ফ্যান বিক্রির ক্ষেত্রে বিক্রয়োত্তর সেবা দিয়ে থাকে। পণ্যের মানভেদে ফ্যানের ১ থেকে সর্বোচ্চ ১২ বছরেরও গ্যারান্টি/ওয়ারেন্টি পাওয়া যায়। তবে অধিকাংশ ফ্যানেরই কয়েল রিপ্লেসমেন্ট ওয়ারেন্টি দেওয়া হয় নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য। কয়েল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা বদলে দিতে দোকানভেদে ৭-৩০ দিন সময় নিয়ে থাকে। তবে পণ্য কেনার সময় এ বিষয়গুলো ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে এবং ওয়ারেন্টির বা গ্যারান্টি কার্ড এবং ক্রয় মেমোটি অবশ্যই যতœসহকারে সংরক্ষণ করতে হবে। অন্যথায় পরবর্তীতে বিক্রেতারা কোনো দায় নেয় না।

কোথায় পাবেন

দেশের প্রায় সব শহরের ইলেকট্রনিকস পণ্যের শোরুম ও দোকানগুলোতে পাওয়া যায় সিলিং ফ্যান। ঢাকার বায়তুল মোকাররম মার্কেট, স্টেডিয়াম মার্কেট, নিউমার্কেট, চকবাজার, মোহাম্মদপুর টাউন হল, বসুন্ধরা শপিং মল মিরপুর স্টেডিয়াম মার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকার ইলেকট্রনিকস সামগ্রীর দোকান থেকে সব রকমের ফ্যান কেনা যাবে। তবে তুলনামূলক কম দামে পণ্যটি পেতে দেশের বৃহত্তম পাইকারি মার্কেট নবাবপুরে যেতে পারেন। সব ধরনের ফ্যান মিলবে সেখানে। এ ছাড়া ন্যাশনাল, ভিশন, ওয়ালটন, সিঙ্গারসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্য পাবেন প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব শোরুমে। পরিমাণে বেশি লাগলে টঙ্গী ন্যাশনালের তেজগাঁও কারখানা থেকে সরাসরি কিনতে পারেন। বিভিন্ন অনলাইন শপ (ফধৎধু.পড়স, নধমফড়ড়স.পড়স, চরশধনড়ড়.পড়স) থেকেও অর্ডার দিয়ে সংগ্রহ করতে পারেন আপনার পছন্দের পণ্যটি। 


প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৯তম সংখ্যা, মে ২০১৯

কাজী গোলাম মোর্শেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top