বায়ুদূষণের ভয়াবহতা রোধে

ভারতের দিল্লি নগরীর ভয়াবহ বায়ুদূষণ আতঙ্কিত করেছে বিশ^বাসীকে। দূষণের ভয়াবহতায় জারি করতে হয়েছিল জরুরি অবস্থা। শ্বাসজনিত রোগে হাসপাতালগুলোতে হাজার হাজার রোগীর ভিড়, ঘর থেকে বের হতে পারে না স্থানীয় বাসিন্দারা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ-সব মিলিয়ে ভীতিকর এক পরিস্থিতি! দিল্লির বাতাস বিশ্বের সবচেয়ে দূষণকবলিত হওয়ায় এ নগরকে এখন বর্ণনা করা হয় ‘গ্যাসচেম্বার’ বলে। তবে ভারতে দিল্লিই একমাত্র নগরী নয়, যেখানে বায়ুদূষণ এত মারাত্মক আকার নিয়েছে, অন্যান্য শহরও রয়েছে এই তালিকায়। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই দূষণ ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সীমানা পেরিয়ে প্রবেশ করছে বাংলাদেশসহ অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোতেও। এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরের বায়ুদূষণের মাত্রাও ভয়াবহরকম বেশি। শীতে বা শুষ্ক মৌশুমে এই হার বেড়ে যায় আরও বহুগুণে। বর্তমানে রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণ বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে, যা নগরবাসীর জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

বায়ুদূষণকে অদৃশ্য ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটির হিসাবমতে, প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে ৭০ লাখ মানুষ অপরিণত বয়সে মারা যায় এই নীরব ঘাতকে। বাংলাদেশেও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে দূষণ আক্রান্তদের সংখ্যা। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায়। শীতের শুষ্ক হাওয়ায় ধুলার কারণে এই দূষণের মাত্রা এখন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন, মাত্রাতিরিক্ত ইটভাটা, যানবাহন, নির্মাণকাজ ও কলকারখানার ধোঁয়ার কারণে ঢাকা শহরের প্রায় দেড় কোটি মানুষ এক অবিশ্বাস্য বিষাক্ত গ্যাস বলয়ের মধ্যে বাস করছে। মাস্ক বা মুখোশ ছাড়া যেন প্রতিটি নিশ^াসই এখানে ক্ষতিকর।

বায়ুদূষণ কী?

বায়ুদূষণ বলতে বোঝায় ক্ষতিকর ও বিষাক্ত পদার্থের মাধ্যমে সৃষ্ট বায়ুমণ্ডলের দূষণ। বায়ুদূষণপূর্ণ এলাকাসমূহে বায়ুতে অবমুক্ত ক্ষতিকর পদার্থসমূহের পরিমাণ অন্যান্য স্থানের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। পৃথিবীকে বেষ্টন করে যে বায়ুমণ্ডল রয়েছে, তাতে রয়েছে-

  • নাইটোজেন ৭৮.০৯%
  • অক্সিজেন ২০.৯৫%
  • কার্বন ডাই-অক্সাইড ০.০৩%
  • নিষ্ক্রিয় গ্যাস ০.৯৩%

এ ছাড়া অবশিষ্ট খুব সামান্য পরিমাণে হাইড্রোজেন, কার্বন মনো-অক্সাইড, ওজোন, নিয়ন, হিলিয়াম, মিথেন ও জলীয় বাষ্প রয়েছে। বায়ুর এসব উপাদান ছাড়া মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদ তথা জীবের অস্তিত্ব টিকে রাখা রীতিমত অসম্ভব। বায়ুতে এসবের বাইরে সীসা, কার্বন মনো-অক্সাইড, অ্যামোনিয়া, ক্লোরিনসহ ক্ষতিকর নানা উপাদান মিশে বৈশি^ক পরিবেশ বিরূপ করে তোলে সেটাই মূলত বায়ুদূষণ। 

বায়ুদূষণের জন্য যেসব উপাদান দায়ী

  • সালফার ডাই-অক্সাইড
  • সালফার ট্রাই-অক্সাইড
  • নাইটোজেন অক্সাইড
  • কার্বন মনো-অক্সাইড
  • কার্বন ডাই-অক্সাইড
  • ক্লোরোফ্লোরো কার্বন
  • আসবেস্টস
  • সীসা
  • ক্যাডমিয়াম
  • ওজোন
  • হাইড্রোজেন সালফাইড
  • এসপিএম
  • অ্যারোসল
  • ধূলিকণা
  • ধোঁয়াশা
  • কুয়াশা
  • তেজস্ক্রিয় পদার্থ
  • বিভিন্ন ধাতব পদার্থের কণা।

বায়ুদূষণের যত কারণ ও উৎসসমূহ

বায়ুদূষণ প্রাকৃতিক অথবা মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলেই সংগঠিত হয়। তবে প্রাকৃতিক কারণের থেকে মানবসৃষ্ট কারণে অনেক বেশি বায়ুদূষণ ঘটছে। বায়ুদূষণের জন্য মূলত দায়ী ধোঁয়া, বাষ্প, গ্যাস, ধূলিকণা ও বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক। এ ছাড়া অন্যান্য যেসব বিষয়গুলো দায়ী, সেগুলো হচ্ছে-

প্রাকৃতিক কারণসমূহ

  • অ্যাসিড বৃষ্টি
  • অগ্ন্যুৎপাতের ফলে উৎপন্ন গ্যাস
  • বিভিন্ন জৈব ও অজৈব পদার্থের পচনের ফলে সৃষ্ট গ্যাস
  • ঝড়, দাবানল, ধূলিঝড়, বন্যা, খরা, সাইক্লোন
  • উপকূলীয় দ্বীপ ও জনপদে সমুদ্র তরঙ্গসৃষ্ট লবণ কণা
  • অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের ঊর্ধ্বে বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তরে ক্রমবর্ধমান ফাটল সৃষ্টি হওয়া প্রভৃতি।

মানবসৃষ্ট যত কারণ

  • ইটভাটার কালো ধোঁয়া
  • শিল্পকারখানার ধোঁয়া
  • গাড়ি থেকে নির্গত ধোঁয়া
  • বিদ্যুৎ ও তাপ উৎপাদনকারী যন্ত্র থেকে উৎপন্ন ধোঁয়া
  • কঠিন বর্জ্য পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া
  • নির্মাণাধীন ভবন, সড়ক ও অবকাঠামো থেকে সৃষ্ট ধুলা
  • কৃষি জমি থেকে উৎপন্ন ধুলা
  • ফসল উৎপাদন ও পোকা দমনে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক
  • সড়কের খোঁড়াখুঁড়ি থেকে উৎপন্ন ধুলা
  • ট্যানারি থেকে নির্গত বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ
  • রান্না, শীত নিবারণ ও বর্জ্য পদার্থ পোড়াতে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড
  • গাছ কাটা ও অরণ্য ধ্বংস
  • গ্রিনহাউস গ্যাস প্রভৃতি।

বায়ুদূষণের ক্ষতিকর যত প্রভাব

বিভিন্ন উৎস থেকে সৃষ্ট ধুলা, বিষাক্ত ক্ষতিকারক গ্যাস ও ভারী ধাতব কণা বাতাসে মিশে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে; জীববৈচিত্র্য পড়ছে হুমকির মুখে। উৎপাদিত ক্ষতিকারক পদার্থ, যেমন- গ্রিন হাউস গ্যাস, তেজস্ক্রিয় পদার্থ, শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, আর্সেনিকযুক্ত বর্জ্য, পারদ, ক্যাডমিয়াম, সীসা, বালাইনাশক, আগাছানাশক, ধোঁয়া, ধোঁয়াশা, ধূলিকণা, ময়লা-আর্বজনা ইত্যাদি মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষণ করে। গ্রিন হাউস ইফেক্টের কারণে বায়ুমণ্ডলের তাপ বাড়ছে। এতে মেরু অঞ্চল ও পর্বতশ্রেণির বরফ গলে বাড়ছে সাগরের পানির উচ্চতা। রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, পলিথিন, প্লাস্টিক ও রং তৈরির কারখানা থেকে যে ক্লোরোফ্লোরো কার্বন (সিএফসি) গ্যাস নির্গত হয়, তা বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তরকে ধ্বংস করে। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, এক অণু সিএফসি প্রায় দুই হাজার ওজোন অণুকে ধ্বংস করতে পারে। এতে ওজোন স্তর ছিদ্র হয় দ্রুততার সঙ্গে। ফলে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি এবং কসমিক রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে এসে প্রথমে ফাইটোপ্লাংটনসহ বিভিন্ন অণুজীব ও পরে উদ্ভিদজগৎ ও প্রাণিকৃলের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করবে। এতে বাড়বে ক্যানসার ও বিভিন্ন প্রকার রোগের প্রকোপ।

স্বাস্থ্যঝুঁকি

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘হেলথ অ্যাফেক্টস ইনস্টিটিউট’ এবং ‘ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভাল্যুয়েশন’-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘বৈশ্বিক বায়ুদূষণ পরিস্থিতি-২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বায়ুদূষণে প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু শ্বাসজনিত জটিল সমস্যার শিকার হয় এবং একই কারণে প্রতিবছর ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু ঘটে। ইউনিসেফ বলছে, বিশ্বে ৩০ কোটি শিশু দূষিত বায়ু অধ্যুষিত এলাকায় বাস করে, যার মধ্যে ২২ কোটিই দক্ষিণ এশিয়ায়। আর বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বে প্রতিবছর শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সী ৬ লাখ শিশুর মৃত্যু ঘটে। ঢাকায় পারিপার্শ্বিক বায়ুদূষণের কারণে বছরে মারা যায় সাড়ে ৬ হাজার মানুষ এবং আবাসিক দূষণের কারণে বছরে সাড়ে ৪ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

বায়ুদূষণের কারণে নগরবাসীর রক্তে প্রাপ্ত সীসার গড় মাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমার চেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। বায়ুতে অতিরিক্ত সীসার উপস্থিতি শিশুদের মানসিক বৃদ্ধিকে ব্যাহত করে। প্রতিবছর ঢাকা মহানগরীর বায়ুতে প্রায় ৫০ টন সীসা নির্গত হচ্ছে। শুষ্ক ঋতুতে অর্থাৎ নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসে বায়ুতে সীসার পরিমাণ সর্বোচ্চে পৌঁছে। ঢাকা শিশু হাসপাতালের শিশু বিকাশ কেন্দ্রে (Child Development Centre) সম্প্রতি শিশুদের দেহে সীসা দূষণের ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। পরীক্ষাকৃত শিশুদের রক্তে প্রায় ৮০ মাইক্রোগ্রাম/ডি.এল থেকে ১৮০ মাইক্রোগ্রাম/ডি.এল সীসা পাওয়া  গেছে, যা গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে ৭ থেকে ১৬ গুণ বেশি। ইউএস সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন-এর নির্দেশনা অনুযায়ী রক্তে ১০ মাইক্রোগ্রাম/ডি.এল পরিমাণ পর্যন্ত সীসার উপস্থিতি নিরাপদ। ক্রমবর্ধমান সীসাদূষণ মানবদেহের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করা ছাড়াও বৃক্কের সচলতাকে নষ্ট করে উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করে। শিশুদের রক্তে অতিরিক্ত সীসার উপস্থিতি তাদের মস্তিষ্ক ও বৃক্ককে নষ্ট করতে পারে। পূর্ণ বয়স্ক মানুষের তুলনায় শিশুরা সীসাদূষণে তিনগুণ বেশি আক্রান্ত হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বায়ুদূষণের কারণে স্ট্রোক, হৃদ্্রোগ, ডায়াবেটিস, ফুসফুসের ক্যানসার এবং আরও অনেক ধরনের ক্রনিক ফুসফুসের রোগ বেশি হচ্ছে। বায়ুদূষণের কারণে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে অন্তত ১ দশমিক ২৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্বজুড়ে একযোগে প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, বায়ুদূষণের ফলে শুধু ফুসফুসকেন্দ্রিক রোগ বিস্তার লাভ করে এমনটি নয়, প্রসূতি মায়েদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি অনেক ছোটখাটো রোগবালাইসহ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক অবসাদ ও শিশুদের মধ্যে অ্যাজমার মতো রোগ ছড়াচ্ছে। বায়ুদূষণের লাগাম টেনে না ধরতে পারলে শ্বাসজনিত নানা রোগ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ক্যানসার ও জেনেটিক পরিবর্তনজনিত নানা অজানা রোগে ভুগতে হতে পারে চরমভাবে। এতে এক দিকে যেমন চিকিৎসাব্যয় বেড়ে যাবে, তেমনিভাবে অসুস্থ মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে উৎপাদনশীলতাও ব্যাপকভাবে কমতে পারে।

দূষণের ভয়াবহতার মাত্রা নির্ণয়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বায়ুদূষণের গ্রহণযোগ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রার তারতম্য বোঝাতে ‘এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স’ ব্যবহার করে থাকে। এই ইনডেক্সের সাহায্যে বায়ুর মান ও অবস্থা সহজেই নির্ণয় করা যায়। ‘এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স’ চার্টের সাহায্যে বায়ুদূষণের মাত্রা অনুযায়ী অবস্থা ও এর ভয়াবহতা- 

এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স হারফলাফলপ্রভাব
০-৫০আদর্শমানবস্বাস্থ্যের জন্য স্বাভাবিক।
৫১-১০০ভালোমতোই চলনসইমানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয়।
১০১-২০০মোটামুটি পর্যায়েঅস্বাস্থ্যকর বিধায়   স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
২০১-৩০০খারাপখুব অস্বাস্থ্যকর শহরের বাসিন্দারা নানা ধরনের স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভোগার ঝুঁকিতে থাকেন।
৩০১-৪০০অত্যন্ত খারাপবিপজ্জনক প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগে। সংবেদনশীল ও রোগাক্রান্তদের জন্য ক্ষতিকর।
৪০১-৫০০মারাত্মকঅধিক বিপজ্জনক গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা ও রোগ-ব্যাধি নাগরিকদের নিত্যসঙ্গী।
৫০০-১৫০০অতি মারাত্মকঅতিমাত্রায় বিপজ্জনক নানা রকম রোগ-ব্যাধিতে মানুষের মৃত্যু অবধারিত।

ঢাকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স

এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স সাইট https://aqicn.org/city/bangladesh/dhaka/us-consulate/ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ১৬-২৫ জানুয়ারি ২০২০-এর এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স-

তারিখএয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স
১৬২৬৪
১৭১৯৪
১৮২৩০
১৯২৪৮
২০১৯৫
২১২১৭
২২২৩২
২৩২৪৮
২৪২৫৯
২৫২১৩

১৬-২৫ জানুয়ারি ২০২০-এর রাজধানীর বয়সভিত্তিক এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স চার্ট

ওপরে প্রদর্শিত বায়ুদূষণ চিত্র একটি নগরের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। জনসংখ্যা দিয়ে বায়ুদূষণ বিবেচনা করলে সারা পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত বায়ুদূষণের দেশ বাংলাদেশ। স্টেট অব গ্লোবাল এয়ারের মতে, বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে বায়ুদূষণের মধ্যে বাস করছে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার এক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ঢাকার বাতাসে দূষণের মাত্রা গত ১০ বছরে ৮৬ শতাংশ বেড়েছে। বায়ুতে যেসব ক্ষতিকর উপাদান আছে, তার মধ্যে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক উপাদান হচ্ছে পিএম ২.৫। আর এই অসহনীয় উপাদান নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ ১৯৯০ সাল থেকে বসবাস করছে।

বায়ুদূষণরোধে করণীয়

বায়ুদূষণ মোকাবিলার প্রথম কাজ হচ্ছে দূষণের উৎস বন্ধ করা। যদিও দূষণের উৎস একেবারেই নির্মূল করা সম্ভব নয়, সে জন্য দূষণ কমাতে শহরের বিভিন্ন স্থানে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার পাশাপাশি জলাশয়গুলো রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।  যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করে দূষণ কমানো যেতে পারে-

  • জ্বালানিনির্ভর ইটভাটা বন্ধ করে অটোমেশন পদ্ধতিতে ইট ও ব্লক উৎপাদন বাড়ানো
  • শিল্পকারখানা এবং ইটভাটার চিমনি অনেক উঁচু করে তৈরি ও ধোঁয়া নির্গমন হ্রাসকরণ
  • ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ
  • জ্বালানিনির্ভর গাড়ির বদলে ইলেকট্রিক কার চালু
  • যানবাহনে সীসামুক্ত জ্বালানি ও সিএনজি ব্যবহার নিশ্চিত করা
  • পুরান ঢাকার কেমিক্যাল কারখানাগুলো সরিয়ে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর
  • শুষ্ক মৌসুমে ধুলা নিয়ন্ত্রণে রাস্তায় ওপরে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা গ্রহণ
  • বিআরটি, মেট্রোরেলসহ সব প্রকল্প নির্দিষ্ট বেষ্টনীর মধ্যে রেখে ধুলা নিয়ন্ত্রণ
  • ইট, বালু, মাটিসহ নির্মাণসামগ্রী পরিবহনকারী ট্রাক বা গাড়ি ঢেকে মালামাল পরিবহন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ
  • পরিত্যক্ত বর্জ্য না পোড়ানো
  • শিল্পকারখানার বর্জ্য খাল, বিল ও নদীতে না ফেলে ইটিপি স্থাপনের মাধ্যমে শোধন নিশ্চিতকরণ
  • বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনের মাধ্যমে ডাস্টবিনের ময়লা-আবর্জনা এবং জৈব বর্জ্য দ্বারা বায়োগ্যাস, বিদ্যুৎ ও জৈব সার উৎপাদন
  • বায়োটেকনোলজি প্রযুক্তির সাহায্যে সুপার ফাংশনাল ব্যাকটেরিয়া উৎপাদন করে বর্জ্য বা আবর্জনাকে দ্রুত পচনশীল করার মাধ্যমে সার্বিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ
  • বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা
  • পরিবেশ আইনের বিধিমালার কঠোর প্রয়োগ
  • সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ
  • জনগণকে সচেতন করতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ
  • বায়ুদূষণের সঙ্গে জড়িত দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রভৃতি।

বিশুদ্ধ বায়ু যেমন আশীর্বাদ, তেমন দূষিত বায়ু অভিশাপ। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন নগরের বায়ুদূষণের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এই বৃদ্ধির লাগাম এখনই টেনে ধরতে না পারলে তা চলে যাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বায়ুদূষণরোধে দেশে আইন থাকলেও কেউই আইনের তোয়াক্কা করছে না; নেই আইনের প্রয়োগও। যেমন, উন্নত দেশগুলোতে নির্মাণকাজের সময় বিশেষ প্রক্রিয়ায় ধুলাবালি নির্গত হয়। আমাদের দেশে কোনো ধরনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা না রেখেই সরাসরি নির্মাণ কাজ হয়ে থাকে। ইটিপি ছাড়াই শিল্প-কারখানার বর্জ্য নিঃসরণ করানো হয়। এ ধরনের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলে বায়ুদূষণ সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রয়োজনে ক্ষতিপূরণ হিসেবে অধিক কার্বন নিঃসরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর গ্রিনট্যাক্স ও কার্বনট্যাক্সের মতো জরিমানা ধার্য করে একটি অর্থ তহবিল গঠনের মাধ্যমে দেশের পরিবেশ উন্নয়নে একযোগে কাজ করা যেতে পারে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৮তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০২০।

আশিক মাহমুদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top