ইমামবাড়ার মূল ভবন, পশ্চিমবঙ্গ হুগলি, ভারত

দানবীর কীর্তিমানের স্থাপনা ইমামবাড়া

ছোটবেলায় সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর বইয়ে দাতা মুহসীন কিংবা হাজী মুহম্মদ মুহসীনের নাম পড়েনি কিংবা শোনেনি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। দানশীলতার জন্য বাংলার ঘরে ঘরে কিংবদন্তী হয়ে আছে দাতা মুহসীনের নাম। মহীয়সী এ ব্যক্তিত্বের দরবার ছিল এখনকার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায়। হুগলিতে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রাচীন অনেক নিদর্শন থাকলেও হুগলি কিন্তু এখনো বিখ্যাত হাজী মুহম্মদ মুহসীনের আবাসস্থল ইমামবাড়ার জন্য।

হাজী মুহম্মদ মুহসীনের জন্ম হুগলিতে ১৭৩২ খ্রিষ্টাব্দে। তাঁর বোন মন্নুজানের কোনো ওয়ারিশ না থাকায় উত্তরাধিকারসূত্রে সমস্ত সম্পত্তি পান মুহসীন। বোন মন্নুজানের মৃত্যুর পর সকল সম্পত্তির একচ্ছত্র অধিপতি হন। কিন্তু অন্য সকল রাজা-বাদশাহদের মতো তিনি আমোদ-প্রমোদে গা ভাসিয়ে দেননি। বেশির ভাগ সম্পদ তিনি বিলিয়ে দিয়েছেন গরিব-দুঃখীদের মধ্যে। শুধু অশিক্ষিত হওয়ায় ইংরেজ আমলে শাসকদের কাছে বাঙালি মুসলমানদের কোনো কদর ছিল না। অফিস-আদালত কিংবা কেতাবি চাকরিতে মুসলমানরা মূল্যায়ন পেত খুব কম। এই পিছিয়ে পড়া অনগ্রসর মুসলমান সমাজের প্রতি মনোযোগী হন দাতা মুহসীন। বাংলার মুসলমান সমাজের উন্নতির জন্য তিনি একের পর এক স্থাপন করেন কলেজ-মাদ্রাসার মতো কল্যাণধর্মী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনা মূল্যে মুসলমান শিক্ষার্থীরা পড়ার সুযোগ পান। অঢেল সম্পত্তি থাকায় তিনি উদারহস্তে জনসেবার জন্য দান করতেন। আর তার এই দানশীলতার জন্য নাম হয় দাতা মুহসীন।

ইমামবাড়ার প্রবেশদ্বারের এখন বেহাল দশা ও বাইরের বাগান থেকে ভেতরে কমপ্লেক্সে প্রবেশের বিশাল করিডোর

হাজী মুহম্মদ মুহসীনের বাড়ি ইমামবাড়ায় ঢোকার পথেই রয়েছে বিশাল এক ঘড়ি। এই ঘড়িটি ভারত উপমহাদেশ তথা সমগ্র বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘড়ি হিসেবে পরিচিত। এই ঘড়িটির নিচ দিয়ে মূল ফটকে প্রবেশ করতে হয়। প্রবেশের পরেই উন্মুক্ত হয় বিশাল লন। লনের মাঝখানে ছিল পানির ফোয়ারা। এখন সেই ফোয়ারা না থাকলেও রয়েছে জমানো পানি আর ফোয়ারায় ব্যবহৃত পুরোনো সেই পাইপলাইন।

ইমামবাড়ার ঘড়িটির একটি ইতিহাস আছে। ঘড়িটি যে চূড়ায় অবস্থিত সেটা আনুমানিক ৭০ ফুট উঁচু। দুই দিকে উঠে গেছে দুটো ঘোরানো সিঁড়ি। আর মাঝখানে অবস্থিত সেই বিশালাকৃতির ঘড়ি। আর ঘড়িটির মতোই বিশাল তার ঘণ্টা। মুহসীনের বোন মন্নুজানের স্বামী মির্জা সালাউদ্দিনের ঘনিষ্ঠ মীর কেরামত আলী সেই সময়ের ১১ হাজার ৭২১ টাকা দিয়ে বিলেত থেকে কিনে এনেছিলেন ঘড়িটি। ঘড়িটিতে সপ্তাহে এক দিন দম দিতে হয়। আর দম দিতে প্রয়োজন হয় দুজন লোকের। দম দিতে ব্যবহৃত চাবিটির ওজন প্রায় ২০ কেজি। চূড়ার দুই দিকে দুটি ডায়াল আছে। সেই ডায়াল দুটি প্রতি ৫ মিনিট আর ৩০ মিনিট অন্তর সময় জানান দেয়। মেশিনঘরের ওপরে তিন কুইন্টাল ওজনের ঘণ্টা আছে। সেই ঘণ্টাগুলোতে নির্দিষ্ট সময় পরপর শব্দ করে বেজে ওঠে। বিশাল এই ঘড়িটি সেই ১৭০০ সাল থেকে নিয়মিত বেজে চলেছে। লন্ডনের বিগব্যানের পর এটাই দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘড়ির স্বীকৃতি লাভ করেছে। যদিও এ নিয়ে রয়েছে তথ্যবিভ্রাট!

মূল ফটক পেরোলেই দুই দিকে বিশাল বিশ্রামাগার আর সারি সারি বিশ্রামকক্ষ। এসব কক্ষে হাজী মুহম্মদ মুহসীনের আশ্রয়ে থাকত গরিব-দুঃখী ছিন্নমূল মানুষেরা। ইচ্ছেমতো থাকতে পারত যেকোনো মুসাফির। এদের মধ্যেই একটি ঘরে থাকতেন দাতা মুহসীন।

পুরো কমপ্লেক্সটির স্ট্রাকচার সিস্টেম পোস্ট লিন্টেল। কিন্তু করিডোরগুলোতে মাঝেমধ্যে কংক্রিটের বদলে কাঠের লিন্টেল ব্যবহার করা হয়েছে। আশপাশের বাড়িগুলোতে কংক্রিটের বিম কলাম ব্যবহৃত হলেও দরবার হলে বিশাল বিমের সঙ্গে টিনের চাল যুক্ত করা হয়েছে সামনের দিকে। এককালে এখানে কংক্রিটের স্লাব থাকলেও এখন সেটা ভেঙে যাওয়ার পর মেরামত করা হয়েছে। এই দরবার হলের একপাশে ছিল কোষাগার আরেক পাশে দরবার। এখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ জড়ো হতো হাজী মুহম্মদ মুহসীনের সাক্ষাৎ পেতে। তিনি প্রতিদিন সকালে দরবারে বসতেন। দরবারের ভেতর ছবি তোলা নিষেধ। কেননা এখনো সেখানে রক্ষিত আছে হাজী মুহম্মদ মুহসীনের সিংহাসন। এটার পাশেই রয়েছে বিশাল এক দাড়িপাল্লা। মাঝেমধ্যে দানবীর মুহসীন নিজে সেই দাড়িপাল্লায় বসে নিজের সমান ওজন পরিমাণ স্বর্ণ দিতেন অসহায় দরিদ্রদের। এ ছাড়া টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত তো দিতেনই। কেউ কখনো তাঁর কাছে এসে বিমুখ হয়ে খালি হাতে ফিরে যেত না। কারও বাড়ি ফিরতে দেরি হলে ছিল হাম্মামখানায় থাকার ব্যবস্থা। 

ইমামবাড়ার অভ্যন্তরে

দরবার হলের সামনেই চির নিদ্রায় শায়িত হাজী মুহম্মদ মুহসীন। এখানেই তাঁর কবরের অবস্থান। পাশে আছে আরেকটি কবর। কথিত আছে, কবরটি বোন মন্নুজানের। ১৮১২ খ্রিষ্টাব্দে পরলোকগত হাজী মুহম্মদ মুহসীন মৃত্যুর আগে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকার সম্পত্তি রেখে যান। এরপর টাকা এবং মুহসীন ট্রাস্টের ক্ষমতা অর্পিত হয় ইংরেজদের কাছে। ইংরেজরা মুহসীন ট্রাস্টের অর্থ দিয়ে গড়ে তোলেন অগণিত স্কুল, কলেজ আর মাদ্রাসা। মুহসীনের গড়ে তোলা স্কুল-কলেজের ফান্ডও আসত ট্রাস্টের টাকা থেকে। মুহসীনের কোষাগার ট্রাস্টের আওতায় যাওয়ার পর তাঁর বাসগৃহ ইমামবাড়ার রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতাও চলে যায় ট্রাস্টের অধীনে। এরপর বেশ কয়েকবার এর অনেকাংশ নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে। ট্রাস্টের আওতায় এখানকার বাইরের অংশে মুসলিম ছাত্ররা থাকার সুযোগ পায়।

ইমামবাড়ার উত্তর দিক উন্মুক্ত গঙ্গার দিকে। নদীভাঙনের ফলে একসময় দূরে থাকলেও গঙ্গা এখন অনেক কাছে চলে এসেছে। ভারত সরকারের তরফ থেকে ইমামবাড়া রক্ষার্থে সেখানে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। আরও নির্মিত হয়েছে আধুনিক আমলের নতুন কিছু ঘাট। তবে মুহসীনের আমলে নির্মিত বেশ কয়েকটা সূর্যঘড়ি এখনো আছে ঘাটে। কমপ্লেক্সটিতে মোগল ও রোমান স্থাপত্যকলার সংমিশ্রণ ঘটেছে দারুণভাবে। এখানকার সব সম্পত্তি এখন মুহসীন ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত হয়।

ইসলামিক স্থাপত্যকলার নিদর্শন হিসেবে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি ইমামবাড়া। ব্যাপারটি সত্যিই দুঃখজনক। ভারতে শিক্ষাসফরে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী দর্শনীয় সব স্থানে গেলেও হুগলিতেই এমন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা আছে সেটা অনেকে জানেই না। যার ফলে শিক্ষার্থীদের কাছে প্রায় বিস্মৃত এই ইমামবাড়া। ভারত সরকার কিংবা মুহসীন ট্রাস্টের অবহেলা ও উদাসীনতায় এখন স্থাপনাটির অনেক কিছু ধ্বংস হতে চলেছে।  স্থানভেদে বিভিন্নজন নিজের নাম লিখছে। ফলে ইট-সুরকি ক্ষয়ে ক্ষয়ে স্থাপনাটির এখন বেহাল দশা। মুহররমে এখানে তাজিয়া মিছিল হয়। সেই সময় সংস্কারকৃত রঙের প্রলেপ পড়লেও অন্য সময় অনাদরে অবহেলায় পড়ে থাকে ইমামবাড়া। এটি দেখভালের জন্য রয়েছে খুব কম লোকবল। অন্যান্য নিদর্শন যেমন তাজমহল কিংবা কুতুব মিনার ইসলামিক স্থাপনা হিসেবে কদর পেলেও ইমামবাড়ার কোনো গুরুত্বই রক্ষিত হয়নি অজ্ঞাত কারণে।

গঙ্গা এখন অনেক কাছে চলে এসেছে ইমামবাড়ার

গঙ্গার অনেক দূরেই ছিল ইমামবাড়া। কয়েক শতাব্দী প্রাচীন এই স্থাপনার বেশ কাছেই চলে এসেছে গঙ্গা নদী। খরস্রোতা এই নদী শীতকালে রূপ পায় বিবর্ণতার। বর্ষা এলে বন্যার মতো বান ডাকে। দাতা মুহসীনের স্মৃতিবিজড়িত ইমামবাড়ার হারিয়ে যাওয়া রোধকল্পে সরকারের পাশাপাশি খুব দ্রুত মুহসীন ট্রাস্টকে উদ্যোগে নিতে হবে। তবেই হারিয়ে যাবে না দানবীর হাজী মুহম্মদ মুহসীনের কবর। ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যাবে না মহান এ দাতার স্মৃতি। বাংলার মুসলিম সমাজের উন্নয়নে হাজী মুহম্মদ মুহসীনের অবদান অনস্বীকার্য। এখনো বাংলাদেশসহ ভারতের অনেক স্থানেই চলছে মুহসীন ট্রাস্ট পরিচালিত স্কুল-কলেজ। চট্টগ্রামের মুহসীন কলেজ অনেককাল ছিল মুহসীন ট্রাস্টের অধীনে। প্রায় ২৫ বছর আগে বাংলাদেশ সরকার মুহসীন কলেজকে সরকারি কলেজে আত্তীকরণের ঘোষণা দেয়। আর এমনি করে দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে দাতা হাজী মুহম্মদ মুহসীনের কীর্তি। তাঁর কবর ও সিংহাসন দেখতে চাইলে যেতে হবে পশ্চিম বাংলার হুগলি জেলায়। সেখানের বিশাল ঘড়িটি কিন্তু আপনারই অপেক্ষায়। ঠিক ঠিক ১৫ মিনিট পর পর জানান দিচ্ছে সময় বয়ে যাচ্ছে- কিন্তু বহমান এ সময়কে ছাপিয়ে সব সময় মানুষের মনের মণিকোঠায় থেকে যাবে দানবীর কীর্তিমানের কীর্তি। 

স্থপতি রাজীব চৌধুরী

প্রকাশকাল: বন্ধন ৪১ তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৩

Related Posts

সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য

পরিত্যক্ত শিপিং কনটেইনার ও মাটির মতো সহজ উপাদানকে ব্যবহার করে ভারতের তামিলনাড়ুতে তৈরি হয়েছে এক জলবায়ু-সংবেদনশীল স্থাপত্য। নাম…

মুসলিম স্থাপত্যে স্পেনের বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র ‘আল হামরা’

আল হামরা। স্পেনের একটি বিখ্যাত রাজ প্রাসাদ। আরবি ‘আল হমরা’ শব্দের অর্থ লাল। এই প্রাসাদের বাইরের দেয়ালও লাল…

পাহাড়ের ঢালে খোদাই করা ‘নট আ হোটেল সেতোউচি’

এর নকশাটি ছিল সরাসরি জাপানি লোকজ স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত। যা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সংবেদনশীলতার মাধ্যমে এর যুক্তিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে।…

কফম্যানের মরুনিবাস ডেজার্ট হাউস

মরুভূমি মানেই ধু-ধু বালু, অসহ্য উষ্ণতা, রুক্ষ পরিবেশ ও প্রকৃতি। গাছ নেই, ছায়া নেই, নেই পাখি; আছে কেবল…

01~1
previous arrow
next arrow

CSRM

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

কী কী থাকছে আকাশছোঁয়া শান্তা পিনাকলে
সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য
Home of Haor
Weather
Youth Park
Tower
শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার
Al Hamra
Teroshri Mosq