Image

আজব আদলে নগর ঘনত্বে নতুন আবাসন: MVRDV-এর নিউ বের্গেন

বিশ্বজুড়ে নগরায়নের ফলে আবাসন সংকট মোকাবিলায় শহরগুলো ক্রমশ অধিক ঘনত্বের উন্নয়নের দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ নগর উন্নয়ন প্রায়ই আলো-বাতাস, উন্মুক্ততা এবং মানবিক পরিবেশের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। নেদারল্যান্ডসের আইন্দহোভেনে (Eindhoven) স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান MVRDV-এর সম্পন্ন করা Nieuw Bergen (নিউ বের্গেন) প্রকল্পটি এই চ্যালেঞ্জের একটি উল্লেখযোগ্য উত্তর। সাতটি ভবনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই আবাসন ও মিশ্র-ব্যবহার (mixed-use) প্রকল্প দেখানোর চেষ্টা করেছে কীভাবে উচ্চ ঘনত্বের আবাসনও পর্যাপ্ত সূর্যালোক, সবুজায়ন এবং সামাজিক সংযোগ বজায় রাখতে পারে।

আইন্দহোভেনের ঐতিহাসিক দে বের্গেন এলাকার প্রান্তে নির্মিত প্রকল্পটি পুরোনো স্থাপনা সংরক্ষণ, নতুন নির্মাণ, সামাজিক আবাসন এবং পরিবেশবান্ধব নকশাকে একত্রিত করেছে। ফলে নিউ বের্গেন প্রকল্পটি শুধু একটি আবাসন প্রকল্পের পাশাপাশি এটি সমসাময়িক ইউরোপীয় নগর উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগার হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

প্রকল্পে সাতটি ভবন রয়েছে—পাঁচটি নতুন নির্মাণ এবং দুটি ঐতিহাসিক ভবনের পুনর্নির্মাণ ও রূপান্তর। ছবি: ডিজেইন ম্যাগাজিন
ঐতিহাসিক পাড়া ও নতুন নগর উন্নয়নের সংলাপ

নিউ বের্গেন প্রকল্পটি গড়ে উঠেছে আইন্দহোভেনের অন্যতম পুরোনো ও চরিত্রসমৃদ্ধ এলাকা  দে বের্গেন-এ। পূর্বে এখানে পৌর ভবন ও পার্কিং এলাকা ছিল। MVRDV এই স্থানকে আবাসন, খুচরা বাণিজ্য এবং জনপরিসরসমৃদ্ধ একটি নতুন নগর ব্লকে রূপান্তর করেছে।

প্রকল্পে মোট সাতটি ভবন রয়েছে, যার মধ্যে পাঁচটি নতুন নির্মাণ এবং দুটি ঐতিহাসিক ভবনের পুনর্নির্মাণ ও রূপান্তর। এই কৌশল নতুন ও পুরোনোর মধ্যে একটি ভারসাম্য সৃষ্টি করেছে, যা এলাকার বিদ্যমান নগর চরিত্রকে অক্ষুণ্ণ রাখার পাশাপাশি নতুন আবাসনের সুযোগ তৈরি করেছে।

‘পাহাড়ি’ স্কাইলাইন: ছাদের নকশার পেছনের যুক্তি

নিউ বের্গেন -এর সবচেয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো এর খাঁজকাটা ও ঢালু ছাদের সারি। প্রকল্পটির নামেই ‘বের্খেন’ বা পাহাড়ের উল্লেখ রয়েছে, এবং ভবনগুলোর সম্মিলিত সিলুয়েট একটি কৃত্রিম নগর-পাহাড়ের অনুভূতি সৃষ্টি করে।

তবে এই নকশা কেবল নান্দনিকতার জন্য নয়। MVRDV ভবনগুলোর আকার নির্ধারণ করেছে একটি সূর্যালোকভিত্তিক কৌশল অনুসরণ করে। প্রতিবেশী ভবনের ভিত্তি থেকে কল্পিত ৪৫ ডিগ্রি কোণে রেখা টেনে ছাদের আকৃতি নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে আশপাশের ভবন ও জনপরিসরে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পৌঁছায়। এর ফলে ঘনবসতিপূর্ণ উন্নয়ন হওয়া সত্ত্বেও প্রকল্পটি উন্মুক্ত ও আলোকিত পরিবেশ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।

প্রকল্পটির সাতটি ভবনের নাম রাখা হয়েছে রংধনুর সাতটি রঙের নামে। ছবি: ডিজেইন ম্যাগাজিন
আবাসনের বৈচিত্র্য ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি

নিউ বের্গেন-এ মোট ২৩৭টি আবাসন ইউনিট রয়েছে। এখানে একক বাসিন্দার জন্য ছোট অ্যাপার্টমেন্ট থেকে শুরু করে পারিবারিক আবাসন, সামাজিক আবাসন (social housing) এবং বিলাসবহুল পেন্টহাউস সব ধরনের বাসস্থানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ‘Orange’ নামের ভবনটি, যেখানে ৪৮টি সামাজিক আবাসন ইউনিট রাখা হয়েছে। একই প্রকল্পের মধ্যে বিভিন্ন আয়ের মানুষের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা নগর বৈচিত্র্য এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে উৎসাহিত করে।

পুরোনো ভবনের পুনর্ব্যবহার ও স্থায়িত্ব

প্রকল্পটির টেকসই নকশার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিদ্যমান স্থাপনার পুনর্ব্যবহার। দুটি ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণ ও রূপান্তরের মাধ্যমে প্রকল্পটি নির্মাণজনিত কার্বন নিঃসরণ কমানোর চেষ্টা করেছে।

এই ভবন দুটি একসময় এলাকার পুলিশ স্টেশন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। নতুন নকশায় তাদের সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং মাঝখানে অতীতে থাকা একটি ভবনের সম্মুখভাগ পুনর্নির্মাণ করে একটি কলোনেডসদৃশ পথ তৈরি করা হয়েছে, যা এলাকার স্মৃতি ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে ধরে রাখে।

সবুজ ছাদ, সৌরশক্তি ও সামাজিক পরিসর

নিউ বের্গেন-এর ঢালু ছাদগুলো শুধু আলো প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করেনি, এগুলো সবুজ ছাদ এবং সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্যও ব্যবহার করা হয়েছে। ছাদে সবুজায়ন স্থানীয় জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং নগর উষ্ণতা কমাতে ভূমিকা রাখে।

তিনটি ভবনের ছাদে উন্মুক্ত টেরেস এবং সমবায়ভিত্তিক বাগানের ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে একটি ভবনে কাচঘেরা গ্রিনহাউসও যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে বাসিন্দারা সম্মিলিতভাবে বাগানচর্চা করতে পারবেন। এই ধরনের ভাগাভাগিকৃত পরিসর প্রতিবেশীদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ এবং কমিউনিটি গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

সবচেয়ে উঁচু ভবন বেগুনি-এর উচ্চতা ১৭ তলা, আর সামাজিক আবাসন ভবন কমলা ছয় তলা। ছবি: ডিজেইন ম্যাগাজিন
রঙ, স্কেল ও নগর পরিচয়ের নির্মাণ

প্রকল্পটির সাতটি ভবনের নাম রাখা হয়েছে রংধনুর সাতটি রঙের নামে বেগুনি, নীল, আকাশি, সবুজ, হলুদ, কমলা এবং হলুদ। ভবনগুলোর উচ্চতা ও উপকরণের রঙ ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হয়েছে, যা ঐতিহাসিক নিম্ন-উচ্চতার ভবন থেকে শুরু করে আধুনিক উচ্চতর টাওয়ারের দিকে একটি স্বাভাবিক রূপান্তর তৈরি করে।

সবচেয়ে উঁচু ভবন বেগুনি-এর উচ্চতা ১৭ তলা, আর সামাজিক আবাসন ভবন কমলা ছয় তলা। এই ধাপভিত্তিক উচ্চতা প্রকল্পটিকে আশপাশের নগর বুননের সঙ্গে আরও সংবেদনশীলভাবে যুক্ত করেছে।

নিউ বের্গেন দেখিয়েছে যে নগর ঘনত্ব বৃদ্ধি মানেই আলো, সবুজায়ন বা মানবিক পরিবেশের সঙ্গে আপস করা নয়। ঐতিহাসিক স্থাপনার পুনর্ব্যবহার, সূর্যালোকভিত্তিক নকশা, আবাসনের বৈচিত্র্য এবং সবুজ অবকাঠামোর সমন্বয়ের মাধ্যমে MVRDV একটি বিকল্প নগর উন্নয়ন মডেল উপস্থাপন করেছে।

আজ যখন বিশ্বের বহু শহর আবাসন সংকট এবং টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন নিউ বের্গেন প্রমাণ করে যে ঘনবসতিপূর্ণ নগর জীবনও হতে পারে উন্মুক্ত, পরিবেশবান্ধব এবং সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। 

তথ্যসূত্র

ডিজেইন ম্যাগাজিন। প্রকাশকাল: ১৪ জুন ২০২৬।

Related Posts

টাইলসের রকমফের ও আধুনিক ভবন নির্মাণ

বর্তমান সময়ে একটি ভবনের নান্দনিকতা, স্থায়িত্ব এবং ব্যবহারিক সুবিধা নিশ্চিত করতে টাইলের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একসময় টাইল শুধুমাত্র…

ভারতের ৪টি সুন্দর স্মৃতি থেকে নির্মিত বাড়ি

ভারতের সবচেয়ে সুন্দর বাড়িগুলো প্রায়শই স্মৃতি থেকে শুরু হয়। রান্নাঘর পুরোনো আম গাছের গন্ধে ভরপুর থাকে, করিডোরে হাসির…

গাছকে কেন্দ্র করে নির্মিত আবাসনের নতুন ভাষা: ‘হোমস অ্যারাউন্ড ট্রিজ’

দ্রুত নগরায়ণ, জমির সংকট এবং বাজারকেন্দ্রিক আবাসন উন্নয়নের চাপে সমসাময়িক ভারতীয় শহরগুলোতে আবাসন ক্রমেই একটি পণ্য হিসেবে বিবেচিত…

ফেনীর নামকেও সমৃদ্ধ করে চাঁদগাজী মসজিদ

বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেক স্মৃতি আমাদের নস্টালজিক করে তোলে। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো ঐতিহাসিক মসজিদগুলো। এমনই এক ঐতিহাসিক…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *