জীববৈচিত্র্যে ভরপুর প্রাণচঞ্চল গ্রহ পৃথিবী। মহাবিশ্বে এমন ঐশ্বর্যময় সবুজ গ্রহ আর দ্বিতীয়টি নেই। বিবর্তন আর নানা ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এখনো নিজের অস্তিত্ব জানান দিলেও জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও যুদ্ধবিগ্রহে গ্রহটি আজ অস্তিত্ব রক্ষায় চরম হুমকির সম্মুখীন। ক্রমেই বিলীন হচ্ছে এর প্রাণিকুল। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর বিভিন্ন দেশে চলমান যুদ্ধের কারণে মানুষ হচ্ছে বাস্তুহারা; আশ্রয়হীন। উদ্বাস্তু এবং দুর্যোগকবলিত এসব মানুষের জন্য টেকসই আবাস নির্মাণ রীতিমত চ্যালেঞ্জিং। আর এই কাজটিই করেছেন বিশ্বখ্যাত ইরানি-আমেরিকান স্থপতি নাদের খলিলি। বালু বা মাটির বস্তা আর কাঁটাতার সহযোগে তিনি উদ্ভাবন করেছেন মানুষের জন্য নিরাপদ আবাস ‘সুপারঅ্যাডোব’। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্মিত হচ্ছে তাঁর উদ্ভাবিত এ আবাসন। আশ্রয়হীন দরিদ্র মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যে এমন টেকসই আবাসন ক্রমেই হয়ে উঠছে বিশ্বব্যাপী দুর্যোগ মোকাবিলার সুরক্ষা দুর্গ।
অনাদিকাল থেকেই বাড়ি তৈরির প্রধান উপকরন মাটি। তবে ইট বা কংক্রিটের তুলনায় মাটির শক্তিমাত্রা কম হওয়ায় এবং বহুতল ভবন নির্মাণ করা যায় না বলে মাটির বাড়ি কেবল গ্রামের দরিদ্র মানুষেরাই নির্মাণ করে থাকেন। সম্প্রতি যদিও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থাপনা নির্মাণে ব্যবহৃত হচ্ছে মাটি, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। আধুনিক স্থপতিদের কেউ কেউ মাটিকে কীভাবে আবাসন নির্মাণে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে প্রতিনিয়ত করছেন গবেষণা। যোগ করছেন নিত্য নতুন প্রযুক্তি ও কৌশল। কিন্তু বালু দিয়ে প্লাটার ও কংক্রিট তৈরি ছাড়া তেমন কোনো কাজ হয়নি। এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম স্থপতি নাদের খলিলি। দীর্ঘ গবেষণা করেছেন কীভাবে প্রাকৃতিক এসব উপকরণ ব্যবহার করে নির্মাণপ্রযুক্তিকে সহজ, ব্যয়সাশ্রয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী করা যায়। তাঁর এই প্রত্যাশার সমাধান মেলে যুদ্ধক্ষেত্রে। যে যুদ্ধ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে, সেই যুদ্ধে ব্যবহৃত সেনা বাংকারে তিনি খুঁজে পান মানুষের জন্য টেকসই আবাস। শত্রুপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করে নিজেদের নিরাপদে রাখতে সেনারা বালু বা মাটির বস্তা দিয়ে তৈরি করে বাংকার আর কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে দেয় ক্যাম্প। শত্রুর গোলা উপেক্ষা করে মাটি বা বালুর বস্তা যখন টিকে থাকে, তবে তা নিশ্চয় দুর্যোগপূর্ণ বৈরী আবহাওয়ায়ও টিকবে। এ ধারণা থেকেই যুদ্ধে ব্যবহৃত নির্মাণ উপকরণকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ব্যবহার করেছেন তিনি। উদ্ভাবন করেছেন সুপারঅ্যাডোব নির্মাণকৌশল।
নির্মাণ উপকরণ
সুপারঅ্যাডোব নির্মাণে যেসব উপকরণ লাগে তা খুবই সহজলভ্য ও সহজপ্রাপ্য। যার প্রধান উপকরণই বালু বা মাটি। সংগ্রহকৃত বালু বা মাটিকে সঠিক উপায়ে ব্যবহারের জন্য প্রথমে বস্তায় ভরা হয়। এ জন্য সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্র বা অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে পাটের বস্তা ব্যবহার করা যেতে পারে। কারণ, স্থাপনা যদি অপসারণ করতে হয় তাহলে পাটের বস্তা সহজেই মাটির সঙ্গে মিশে যায়। ফলে পরিবেশের ক্ষতি হয় না। তবে স্থায়ী কাঠামোর জন্য সিনথেটিক, পলিপ্রোপাইলিন ওভেন, পলিফাইবার ব্যাগ (সিমেন্ট, সার, চাউলের বস্তা) ব্যবহার করা ভাল। তবে ব্যাগের দৈর্ঘ্য যত বেশি হবে, স্থাপনার জন্য সেটা ততই ভালো। সে ক্ষেত্রে সেলাইবিহীন বস্তা প্রয়োজনমতো কেটে ব্যবহার করা যেতে পারে। এই বস্তার লেয়ার যেন স্থানচ্যুত না হয় তার জন্য প্রয়োজন কাঁটাতার। দরজা, জানালা ও ভেন্টিলেশনের জন্য কাঠ বা বাঁশের ফ্রেম ও প্লাস্টিক পাইপ। মেঝে তৈরিতে রোদে শুকানো ইট, ব্লক ও টালি। ভেতরে আলো প্রবেশের জন্য গম্বুজের ওপরে কাচ, স্বচ্ছ প্লাস্টিক ঢেউটিন অথবা চালা ব্যবহার করা হয়। এরপর স্থাপনার সৌন্দর্য বাড়াতে কাদামাটি, সিমেন্ট, চুন বা পিচের প্রলেপ বা পলেস্তারা দেওয়া হয়। বর্তমানে আধুনিক সুপারঅ্যাডোবে ব্যবহৃত হচ্ছে কাচ। এ ছাড়া আয়তনে বড় ও দ্বিতল স্থাপনার ক্ষেত্রে বাঁশ, কাঠ বা কংক্রিট কলাম ব্যবহারই উত্তম।
নির্মাণ-প্রক্রিয়া
সুপারঅ্যাডোব নির্মাণের জন্য কিছুটা উঁচু সমতল স্থান নির্বাচন করাই ভালো, যেন পানি জমে না থাকে। স্থাপনার ডিজাইন অনুযায়ী জমিতে প্রথমে নকশা করে নিতে হবে। এরপর সংগ্রহকৃত মাটি বা বালু সরাসরি বস্তায় ভরতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে তা যেন যথাসম্ভব ঠেসে ভালোভাবে পূর্ণ করা হয়। ছোট বস্তায় মাটি ভরা সহজ হলেও দীর্ঘ দৈর্ঘ্যরে বস্তা ভরাট করা কিছুটা জটিল। দেয়ালের আয়তন অনুযায়ী বস্তাগুলো আগেই কেটে নিতে হবে। এরপর দরজার জায়গা ছেড়ে বাকিটা ঘিরে ফেলতে হবে। একটি লেয়ার বা স্তর বসানো হলেই তা ভালোভাবে দুরমুজ করে নিতে হবে যেন কোনো এয়ারগ্যাপ বা ফাঁপা না থাকে। এরপর বস্তার ওপর কাঁটাতার বিছিয়ে দিতে হবে, যাতে বস্তাগুলো একটি আরেকটির সঙ্গে ভালোভাবে আটকে থাকে। এভাবে একটির ওপর আরেকটি বস্তা বসিয়ে দেয়াল তুলতে হবে। তবে কাঠামোটিকে গম্বুজ আকার দিতে নির্দিষ্ট উচ্চতার পর থেকে প্রতিটি লেয়ার ১ ইঞ্চি (উচ্চতাভেদে কমবেশি হতে পারে) পরিমাণ ভেতরের দিকে সরিয়ে স্থাপন করতে হবে। জানালা ও ভেন্টিলেশনের জন্য নির্ধারিত জায়গায় ফ্রেম ও পিভিসি পাইপ স্থাপন করতে হবে। চারপাশটা ভালোভাবে আটকে দিতে হবে, যেন তা বেরিয়ে না আসে। মাটি-বালুর বস্তা নমনীয় বলে সহজেই ঘুরিয়ে গোলাকার করা যায়। গম্বুজের ওপর দিকটায় কিছু অংশ খালি রাখা যায় সূর্যের আলো প্রবেশের জন্য। সেখানে স্বচ্ছ প্লাস্টিক ঢেউটিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া যেতে পারে। মেঝে তৈরিতে পরিবেশবান্ধব রোদে শুকানো ইট, ব্লক, টালি বা কাঠ পেতে দিতে হবে। তবে মাটি ভালোভাবে দুরমুজ দিয়ে সমান করেও মেঝে তৈরি করা সম্ভব।
এভাবে যখন পুরো কাঠামো দাঁড়িয়ে যাবে, তখন ফিনিশিং কাজগুলো করতে হবে। যার মধ্যে রয়েছে স্যানিটারি অ্যান্ড প্লাম্বিং ওয়ার্কস, পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, পয়ঃপ্রণালি এবং কিচেন কেবিনেট তৈরি, বাথরুমের কমোড বা প্যান স্থাপন। পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে অবকাঠামোর অভ্যন্তরে বিভিন্ন ধরনের পাইপ লাইন বসানো হয়। পানির লাইনের জন্য জিআই, পিভিসি ও ইউভিসি পাইপ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বস্তার খাঁজে পাইপ বসাতে হয়। চুলায় গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়। এগুলো প্রধান ডোমের সঙ্গে লাগোয়া ছোট ডোমগুলোতে করতে হবে। তবে অস্থায়ী ও ব্যয়সাশ্রয়ী সুপারঅ্যাডোবের জন্য একটি ডোমই যথেষ্ট। সাধারণত দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের সুপারঅ্যাডোবের ক্ষেত্রে এসব ব্যবস্থা রাখা হয় না। এরপর দরজা-জানালার পাল্লা লাগানোর পর বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের জন্য বাকি থাকে প্লাস্টার বা পলেস্তারা। পলেস্তারার জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও ব্যয়সাশ্রয়ী অনুষঙ্গ কাদামাটি। এ ছাড়া সিমেন্ট বা পিচ দিয়েও কাজটি করা যায়। পলেস্তারা সম্পন্ন হলে চুন বা রং দিয়ে পেইন্ট করে নিতে হয়। দেশ ও সংস্কৃতিভেদে সুপারঅ্যাডোবের নকশা ভিন্ন হতে পরে। যেমন- মধ্যপ্রাচ্যে শুকনো কাদা ইট ও কাপড় ব্যবহার করা যায় স্থাপনার দেয়ালে, আফ্রিকার দেশগুলোতে কাদামাটি লেপে তাতে লতা-গাছের রং ঘষে নেয়, কোথাও কাদামাটিতে সাদা চুন করে তাতে আঁকিবুকি করা হয়। এ ছাড়া পাথর, টালি, সিরামিকের টুকরোও আবরণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
স্থাপনার বৈশিষ্ট্য ও নিরাপত্তা
মাটি বা বালুতে নির্মিত স্থাপনা আদতে দুর্যোগপূর্ণ বৈরী আবহাওয়ায় টিকতে কতটা সক্ষম এটি একটি সহজ প্রশ্ন। জবাবে বলা যেতে পারে বালুর বাঁধ ক্ষণস্থায়ী হতে পারে কিন্তু তা যখন বস্তাবন্দী করা হয়, তখন তা হয়ে ওঠে অত্যন্ত শক্তিশালী। ব্যাপারটা আরেকটু ব্যাখ্যা করলে বুঝতে সুবিধা হবে। নদীর ভাঙনরোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর গোলা থেকে বাঁচতে বাংকার তৈরি, পাহাড়ধস, ভবনের পাইলের শক্তিমাত্রা পরীক্ষাসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হয় বালু ও মাটিভর্তি বস্তা। সে ক্ষেত্রে প্রথাগত মাটির কাঠামোর তুলনায় এটি হয় অনেক বেশি টেকসই। তা ছাড়া এই স্থাপনার ডিজাইন চিন্তায় ছিল এটি যেন অন্য গ্রহের বিরূপ আবহাওয়া ও পরিবেশেও টিকতে পারে। বন্যা, ঝড়, দাবানল, ভূমিকম্পসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে এ স্থাপনাগুলো আদতে টিকতে পারে কি না তা নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে আর তাতে ভালোভাবেই এসেছে সফলতা। এমনকি সুপারঅ্যাডোব প্রযুক্তি ক্যালিফোর্নিয়ার উচ্চ সিসমিক বিল্ডিং কোড টেস্টেও উত্তীর্ণ হয়েছে। তাই নিজের জন্য নিরাপদ আবাসন নির্মাণে নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যায় এই নির্মাণকৌশল।
তা ছাড়া এর নির্মাণপদ্ধতি অত্যন্ত সহজ। উপকরণসমূহ অত্যন্ত সহজলভ্য ও নমনীয় হওয়ায় সহজেই সুবিধামতো জায়গায় স্থাপন, বাঁকানো ও গোল করা যায়। এ ছাড়া স্থাপনার সঠিক গ্রাভিটি বজায় রাখতে বস্তার লেয়ারে কাঁটাতারের ব্যবহার চমৎকার ফ্রিকশন সৃষ্টি করে স্থাপনার ভারসাম্য বাড়িয়ে দেয়। এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণের জন্য প্রয়োজন হয় না দক্ষ প্রকৌশলী বা নির্মাণশ্রমিকের। বেশ দ্রুতই সুপারঅ্যাডোব নির্মাণ করা সম্ভব। তবে দলবেঁধে করলে যা হয় আরও দ্রুত।
সতর্কতা
যেকোনো নির্মাণেই কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। ব্যতিক্রম নয় সুপারঅ্যাডোব নির্মাণের ক্ষেত্রেও। যেহেতু দেয়াল নির্মাণে মাটি বা বালুর ভারী বস্তা ব্যবহার করা হয়, তাই সতর্ক থাকতে হবে তা যেন তুলতে পিঠে বা কোমরে বেশি চাপ না পড়ে। এ ছাড়া বস্তা ওপর থেকে পড়ে যেন কেউ আহত না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। দেয়ালের গ্রাভিটি ঠিক রাখতে না পারলে তা ভেঙে পড়তে পারে। এ জন্য প্রতিরক্ষামূলক ব্রেসিং বা কাঠ-বাঁশ দিয়ে ঠেস প্রদান করা যেতে পারে। গম্বুজ বা ছাদের নিরাপত্তায় স্থায়ী বিম দিলে স্থাপনার শক্তিমাত্রা বাড়বে।
সুপারঅ্যাডোবের নেপথ্যে কাহিনি
স্থপতি নাদের খলিলি (১৯৩৬-২০০৮) প্রথম এই নির্মাণকৌশল উদ্ভাবন করেন। স্থপতি ছাড়াও লেখক, মানবধিকার কর্মী, শিক্ষক ও সমাজ সংস্কারকের তকমাও রয়েছে তাঁর। তিনি ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব আর্থ আর্কিটেকচার বা ক্যাল-আর্থ স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান স্থপতি। কর্মজীবনের শুরুতে প্রচলিত ধারায় স্থাপত্য চর্চা শুরু করলেও পরবর্তীতে তিনি জনহিতকর স্থাপত্য চর্চা শুরু করেন। প্রতিষ্ঠা করেন ক্যাল-আর্থ নামক অলাভজনক স্থাপত্য ফার্ম। উদ্দেশ্য ছিল সহজলভ্য নির্মাণসামগ্রী ও কৌশল ব্যবহার করে আশ্রয়হীনদের টেকসই বাসস্থান উপহার দেওয়া। যেখানে থাকবে না কোনো জটিল নির্মাণ উপকরণ, নির্মাণকৌশল ও ব্যয়ের হিসাবনিকাশ। শুরু হয় তাঁর গবেষণা। তিনি ইরান, আমেরিকা, সিয়েরা লিওন, তুরস্কসহ আফ্রিকা ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশের স্থাপত্যকলা থেকে ধারনা নেন। তবে তিনি সবচে বেশি অনুপ্রাণিত হন ইরানের গম্বুজ আকারের ঘর দেখে। সে সময়ে চাঁদ ও মহাশূন্যে বাসস্থান নির্মাণ-বিষয়ক গবেষণা তাঁর কাজের অবিচ্ছেদ্য এক অংশ হয়ে ওঠে। তিনি ইরানের স্থাপত্যকৌশল ও যুদ্ধে ব্যবহৃত সেনা বাংকারের সমন¦য়ে উদ্ভাবন করেন তাঁর বিখ্যাত সেই সুপারঅ্যাডোব প্রযুক্তি। খলিলি তাঁর এই স্থাপত্য ধারণা চাঁদ ও মঙ্গলে আবাসস্থল নির্মাণের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র (Velcro-Adobe) হিসেবে উপস্থাপন করেন নাসায়। এই অসাধারণ সৃষ্টি তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়, সবার কাছে যা ব্যাপক প্রশংসিত হয়। তিনি ভিজিটিং বিজ্ঞানী হিসেবে লস আলামস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে গবেষণার সুযোগ পান। বিভিন্ন সিম্পোজিয়ামে তুলে ধরেন তাঁর আবিস্কৃত এই প্রকল্পকে। নাসাসহ অসংখ্য প্রকাশনায় স্থান পায় তাঁর প্রস্তাবনা। তিনি তাঁর প্রকল্পের জন্য জাতিসংঘ, জার্নাল অব অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং, আমেরিকান সোসাইটি অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্সসহ বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন। স্থাপত্যে আগা খান অ্যাওয়ার্ডও অর্জন করেছেন তিনি। এই কৌশল ও স্থাপত্যে দর্শন নিয়ে রেসিং অ্যালন, আর্থ আর্কিটেকচার, সিরামিক হাউসেস, ইমারজেন্সি স্যান্ডব্যাগ শেল্টার, অ্যা জার্নি থ্রো ট্র্যাডিশন অ্যান্ড টেকনোলজি এবং ইকো-ভিলেজ-এ ছয়টি বই লেখেন তিনি।
সুপারঅ্যাডোব নির্মাণের পেছনে নাদের খলিলি বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা স্থাপনার ধারণা নিলেও মূলত তা এসেছে তাঁর হৃদয় থেকে। আর তাঁর প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে মরমি ফার্সি কবি রুমির অসাধারণ সব প্রেরণামূলক কবিতা। তিনি চেয়েছিলেন সবচেয়ে সহজলভ্য প্রাকৃতিক নির্মাণ উপকরণ মাটি, বালু, পানি, অগ্নি (সূর্যালোক) দিয়ে কীভাবে স্থাপনা নির্মাণ করা যায়। আর তিনি যখন তার সন্ধান পান, তখন তা উদ্ভাবন করেই থেমে থাকেননি, দীর্ঘকাল গবেষণা করেছেন যেন নির্মাণ-প্রক্রিয়াকে সহজ ও সাধারণ করা যায়। যদিও এই নির্মাণকৌশলটি ক্যাল আর্থের পেটেন্ট করা, তবুও তা বিশ্বের দরিদ্র মানুষের জন্য অবৈতনিকভাবে করা হয়। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অনেক কমিউনিটি প্রকল্প নির্মাণ করেন তিনি। পরে জাতিসংঘের সহযোগিতায় দুর্যোগপ্রবণ ও উদ্বাস্তু মানুষের আশ্রয়ণে নির্মিত হয় অসংখ্য প্রকল্প। খলিলি তাঁর এই স্থাপত্যকৌশল ও দর্শন ছড়িয়েছেন বিশ্বময়। তিনি তাঁর পরিবারের সদস্য ও শিষ্যদের শিখিয়ে যান এবং তাঁর মৃত্যুর পরেও যেন তাঁরা দরিদ্র মানুষের কল্যাণে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা পরিচালনা করে। সে ধারাবাহিকতায় তাঁর উত্তরসূরিরা ক্যাল-আর্থের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও প্রকল্প নির্মাণ করে আসছে। এমনকি তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে সরাসরি নির্মাণ-বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।
তবে এই স্থাপত্যকৌশল যে শুধু আশ্রয়কেন্দ্র বা ইকো-ভিলেজ নির্মাণেই প্রযোজ্য তা নয় বরং বাণিজ্যিক ভিত্তিতেও হতে পারে। তারই একটি চমৎকার উদাহরণ দক্ষিণ ওমানে সুওয়াইমিয়ায় গানুট ইকো রিসোর্ট-এর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। সমুদ্রপারের প্রত্যন্ত মাছধরা গ্রামে পর্যটকদের উৎসাহিত করতে গড়ে তোলা হয়েছে পরিবেশবান্ধব এই ইকো রিসোর্ট। জেলেদের অব্যবহৃত পুরোনো মাছ ধরার জালসহ স্থানীয় নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে নির্মিত এই অবকাশ যাপন রিসোর্টটিতে সাশ্রয় হচ্ছে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ। স্থানীয় সামুদ্রিক পাথর দিয়ে সাজানো হয়েছে অভ্যন্তরীণ মেঝে ও রিসোর্ট প্রাঙ্গণ। এ ছাড়া বাহ্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে স্থানীয় চারু ও কারুশিল্পের নানা বস্তু ও বস্ত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে। এ ধরনের প্রকল্প স্থানীয় জেলেরা নিজেদের জন্যও যেন নির্মাণ করতে পারে সে জন্য জেলে ও অন্যান্য স¤প্রদায়ের বসবাসকারীকে ক্যাল-আর্থের নেতৃত্বে পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই প্রকল্পটি ওয়ার্ল্ড আর্কিটেকচার ফেস্টিভ্যাল ২০১২-এ ‘ফিউচার প্রজেক্ট…লেইজার’ বিভাগে প্রথম পুরস্কার জিতে নেয়।
ক্রমাগত বন উজাড়, কার্বন নিঃসরণ, গ্রিন হাউস ইফেক্টসহ নানা কারণে উষ্ণ হচ্ছে পৃথিবী, পরিবর্তিত হচ্ছে জলবায়ু। তাই ভূমিকম্প, সুনামি, উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড়, বন্যাসহ নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে গৃহহারা হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। যুদ্ধের শিকার হয়েও শরণার্থী মিছিলে যুক্ত হচ্ছে অজস্র গৃহহারা মানুষ। বিশ্বের এমন পরিবর্তন হয়তো সাধারণ মানুষের পক্ষে রোধ করা সম্ভব নয়। সে কারণে অনিবার্য বিপর্যয়ের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। আমাদের আবাসন নির্মাণ করতে হবে দুর্যোগ প্রতিরোধী করে। তা ছাড়া স্থাপনা নির্মাণে পরিবেশের যেন ক্ষতি কম হয়, সেটাও ভাবতে হবে। তাই কাঠামো নির্মাণে যথাসম্ভব প্রাকৃতিক উপকরণ বাছাই করতে হবে। সে ক্ষেত্রে আর্থব্যাগে তৈরি সুপারঅ্যাডোব প্রযুক্তি টেকসই আবাসনের সমাধান হতে পারে। সুপারঅ্যাডোব বলতে শুধু গম্বুজাকৃতির স্বল্প আয়তনের আবাসন নির্মিত হয় তা ভাবলে ভুল হবে। সুপারঅ্যাডোব নির্মাণকৌশল প্রতিনিয়ত বিকশিত হচ্ছে; লেগেছে আধুনিকতার ছাপ। বিভিন্ন আকার ও আয়তনের স্থাপনা নির্মিত হচ্ছে নব এই প্রযুক্তিতে। গম্বুজ ফর্ম বদলে চারকোনাবিশিষ্ট স্থাপনাও তৈরি হচ্ছে। তবে সেখানে ছাদে ব্যবহৃত হচ্ছে খড়, টিন, প্লাস্টিক বা কংক্রিটের চাল। আধুনিক কম্পিউটার সফটওয়্যার দিয়ে করা হচ্ছে এ ধরনের স্থাপনার স্ট্রাকচারাল ডিজাইন।
সুপারঅ্যাডোব প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
বাংলাদেশ নদীবিধৌত একটি ব-দ্বীপ। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে বিশ্বে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় সবার ওপরে অবস্থান দেশটির। সিডর, আইলা, নার্গিসসহ নানা সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব উপকূলবর্তী বির্স্তীন জনপদের দুর্যোগের শিকার হাজার হাজার মানুষ গৃহ ও আশ্রয়হীন। প্রথাগত মাটির বাড়ি কোনোভাবেই টিকছে না দুর্যোগে। বিভিন্ন এনজিও তাদের টিনের ঘর বানিয়ে দিলেও লবণাক্তের প্রভাবে তাও টিকতে পারছে না। তাই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিশাল এ জনগোষ্ঠীর আবাসন-সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নির্মাণ করতে হবে স্থানীয় উপকরণ দিয়ে জলবায়ু-সহিষ্ণু বাড়ি। আর তা হতে পারে সুপারঅ্যাডোব প্রযুক্তির এই বস্তাবাড়ি নির্মাণের মাধ্যমে। প্রয়োজনে এই স্থাপনা নির্মাণে এ দেশীয় আবহাওয়া ও জলবায়ুর প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে বিস্তর গবেষণা করা যেতে পারে। প্রকল্পটির সঙ্গে স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে যেন তারা নিজেদের বাড়ি নিজেরাই তৈরি করতে পারে। তবে এ প্রযুক্তিতে শুধু দুর্যোগ সহনীয় বাড়িই নয়, আবাসন, ইকো রিসোর্ট, রেস্টুরেন্টসহ নান্দনিক নানা স্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব। এ জন্য এর বিকাশ, উন্নয়ন ও ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিতে গণপূর্ত বিভাগ, এইচবিআরআইসহ সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান, স্থপতি, প্রকৌশলী ও নির্মাতাদের এগিয়ে আসতে হবে। তবেই নিশ্চিত হবে এর যথার্থ ব্যবহার।
– মারুফ আহমেদ
প্রকাশকাল: বন্ধন ৭০ তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৬