Image

ডোম অব দ্য রক

ইসরায়েলের জেরুজালেমস্থ বিখ্যাত ইসলামিক ঐতিহাসিক স্থাপনা ‘ডোম অব দ্য রক’। অত্যন্ত আকর্ষণীয় এ স্থাপনাটি কোনো মসজিদ না হলেও একে অন্যতম মুসলিম নির্দশন বললেও ভুল হবে না; যেমনটা বলা যায় মক্কার কাবা শরিফকেও। কাবার মতোই এই কাঠামোটিও পাথরে নির্মিত। কথিত আছে, এই পাথরগুলো সেই জায়গা থেকে আনা হয়েছে, যেখান থেকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মেরাজের জন্য উড়ন্ত বাহনে আরোহণ করেছিলেন। ডোম অব দ্য রক সবচেয়ে প্রাচীন ইসলামিক ঐতিহ্যবাহী স্মৃতিস্তম্ভ, যা এখনো অক্ষত রয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিস্তম্ভের মধ্যে এটিও একটি। এতেই রয়েছে সর্বপ্রাচীন ‘মিহরাব’ (কিবলার দিকনির্দেশক)।

ডোম অব দ্য রকের ইতিহাস ঘিরে রয়েছে বিতর্ক। ইহুদিরা বিশ্বাস করে, নবী ইব্রাহিম (আ.) তাঁর সুপুত্র ইসমাইল (আ.)-কে যেখানে উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন, এটি সেই পবিত্র স্থান। অনেকের মতে, এটির অবস্থান ‘সলোমন টেম্পল’ ও ‘হ্যারড টেম্পল’-এ। উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান এর শাসনামলে (৬৮৮-৬৯১ খ্রিষ্টাব্দ) তৈরি হয় ডোম অব দ্য রক। এটিকে মসজিদ না বলে বলা হয় তীর্থযাত্রীদের পবিত্র স্থাপনা। ঐতিহ্যমতে, হজরত মুহাম্মদ (সা.) মেরাজের উদ্দেশ্যে আকাশে আরোহণের স্মৃতি রক্ষার্থে ডোম অব দ্য রক তৈরি করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, পরবর্তী সময়ে ‘ডোম অব এসেনশান’; নির্মিত হয় ডোম অব দ্য রকের নিকটস্থলে।

‘অক্সফোর্ড আর্কিয়োলজিক্যাল গাইড টু দ্য হলি ল্যান্ড’-এর ভাষ্যানুযায়ী, খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের উদ্দেশ্য ছিল কিছুটা জটিল ও সূক্ষ্ম। তিনি মূলত এমন একটি মুসলিম ঘরানার অট্টালিকা দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন, যা কিনা খ্রিষ্টানদের ঐশ্বর্যশালী গির্জাসমূহের সঙ্গে অবলীলায় প্রতিযোগিতায় নেমে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের কাছে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীকী হয়ে দাঁড়াবে। অট্টালিকাটি ইহুদিদের অবস্থান আর খ্রিষ্টানদের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের নিদর্শন প্রকাশ করে।

দশম শতাব্দীতে জেরুজালেম পর্যটক মুকাদ্দাসির চমৎকার সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়েছেন। একাদশ শতাব্দীতেও কজন কিংবদন্তি ‘ডোম অব দ্য রক’ এবং পবিত্র পাথর সম্পর্র্কিত নিজস্ব মতবাদ তুলে ধরেছেন:

মধ্যযুগে খ্রিষ্টান ও মুসলমান উভয়ই বিশ্বাস করত গম্বুজটি বাইবেলে বর্ণিত ‘টেম্পল অব সলোমন’-এর মতো। ক্রসেডের সময় নাইট যোদ্ধারা এখানে তাদের সদর দপ্তর স্থাপন করে পরবর্তী সময়ে গির্জাসমূহকে আদর্শরূপে বদলে ফেলে এর নকশানুসারে।

শীতের প্রভাবে জেরুজালেমে কারুকার্য সজ্জিত ‘ডোম অব দ্য রক’-এর বাহ্যিক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে এটি মামলুকের সময় সংস্কার করা হয় এবং পরে সুলতান সোলায়মানের শাসনামলে ১৫৪৫ সালে টাইলস দিয়ে সম্পূর্ণরূপে পুনর্বিন্যস্ত করা হয়। সেই সঙ্গে মহামান্য শাসক সুলতান সোলায়মান তেরোটি ছোট খিলানবিশিষ্ট রক্ষাপ্রাচীর এবং সদরের বহির্ভাগ নির্মাণ করেন। ডোম অব দ্য রকের জানালাগুলো স্থাপিত সেই সময় থেকে। টাইলসগুলো সর্বশেষ ১৯৫৬ থেকে ১৯৬২ সালে সম্পূর্ণরূপে প্রতিস্থাপিত হয়।

‘ডোম অব দ্য রক’-এর অসাধারণ দর্শনীয় প্রভাব হলো এর গাণিতিক ছন্দ ও অনুপাত। সমস্ত জটিল পরিমাপ একটি কেন্দ্রীয় বৃত্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যেটি পবিত্র পাথরটিকে বেষ্টন করে আছে। উদাহরণস্বরূপ প্রতিটি বহির্প্রাচীর ৬৭ ফুট লম্বা, যা অবিকল এর ব্যাস ড্রামের ভিত্তি থেকে এর উচ্চতার সমান। একই নীতি ইতালি, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের বাইজেন্টাল গির্জাসমূহে ব্যবহৃত হয়েছে কিন্তু কোনোটি ‘ডোম অব দ্য রক’-এর পরিকল্পিত যোগসূত্রের সঙ্গে তুলনীয় নয়।

‘ডোম অব রক’, বৃহৎ স্বর্ণোজ্জ্বল গম্বুজ, যেটি মূলত স্বর্ণনির্মিত ছিল, যা প্রথমে তামা তারপর অ্যালুমিনিয়ামে  প্রতিস্থাপিত হয়েছে। অবশ্য জর্দানের রাজা হুসাইনের অর্থ সাহায্যের মাধ্যমে অ্যালুমিনিয়ামের ওপর হালকা স্বর্ণের পাত মুড়ে দেওয়া হয়েছে। গম্বুজের চূড়াটি পূর্ণচন্দ্রখচিত, যা মুসলমানদের ঈদের বাঁকা চাঁদের কথা মনে করিয়ে দেয়। একে সারিবদ্ধভাবে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে যদি কেউ এর মধ্য দিয়ে দেখে যেন সে একই সরলরেখায় মক্কার দিকে গেছে। নানা রঙের অপূর্ব তুর্কি টাইলস দিয়ে স্থাপনার বাইরের দিকটি সাজানো হয়েছে। যেমনটি পারস্য টাইলস দিয়ে সোলায়মান ১৫৪৫ সালে ক্ষতিগ্রস্ত মূল ভবনে পুনর্বিন্যস্ত করেছিলেন। বাইরের দিকের নিচের অর্ধেক অংশটি শ্বেত মার্বেল পাথরে তৈরি।

উইকিপিডিয়া

ডোম অব দ্য রক-এর অষ্টকোনাকৃতি অংশটি পবিত্র কোরআনের আয়াত দিয়ে খচিত। সোলায়মানের সময় এই আরবি লিপি পুনঃসংস্কৃত হয়। স্বর্ণালি গম্বুজের নিচে টাইলস করা জায়গাটিকে বলা হয় ড্রাম। এর মনোরম তুর্কি টাইলসগুলো আরবি বর্ণমালায় মুহাম্মদ (সা.)-এর মেরাজের বর্ণনা আছে। যেমনটি বলা আছে কোরআনে। স্থাপনাটির ভেতরে একটি খিলান করা দেয়াল রয়েছে, যাকে বলা হয় অষ্টকোনাকৃতি তোরণশ্রেণি বা অভ্যন্তরীণ অষ্টভুজ, যা বাহ্যিক আকৃতিকে ধারণ করে। একটি ঘন লোহিত কার্পেটবেষ্টিত খোলা ময়দান রয়েছে অভ্যন্তরীণ অষ্টভুজ ও কেন্দ্রীয় বৃত্তের মধ্যে। ডোম অব রকের চতুর্দিকে ভ্রমণশীল অংশ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক অষ্টভুজের মধ্যবর্তী স্থানটিকে বলে বাহ্যিক ভ্রমণশীল অংশ যা সবুজ কার্পেটবেষ্টিত। এই দুই ভ্রমণশীল অংশ মক্কায় কাবার চারদিকে হজযাত্রীদের বৃত্তাকার গতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সোনালি গম্বুজের অভ্যন্তরীণ দিকটিকে কাপোলা (Cupola) বলে, যা লাল ও সোনালি পল্লব এবং অন্তর্লিখন খচিত। কাপোলার প্রধান লিপিতে সালাদিনের কথা উল্লেখ আছে, যিনি অট্টালিকার পুনরুদ্ধারের জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন।

মোজাইকের গায়ে আঁকা গাছপালা ও প্রকৃতি যা অপরূপ শিল্পকলার নিদর্শনও বটে [ইসলামে মনুষ্য-চিত্র সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (হারাম)। তাই জীবন্ত কোনোকিছুই মোজাইকে স্থান পাইনি]। মোজাইকে শোভা পাচ্ছিল এমন কিছু অপরিচিত অপরূপ সৌন্দর্যের আধার যা গাছপালা ও বাগানে রূপান্তরিত হয়ে কল্পনার স্বর্গ্যােদ্যানকেই নির্দেশ করছিল। খলিফা উমর (রা.) ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে পারস্য জয় করে এই মোজাইকে পারস্য মুকুটের প্রতীকী রূপ দিয়েছিলেন, যা তিনি পাঠিয়েছিলেন মক্কায়।

পূর্বদিকের অন্তর্লিপিতে আব্বাসীয় খলিফা আল মামুনকে ৬৯১ খ্রিষ্টাব্দে এই অট্টালিকাটি নির্মাণের জন্য সম্মানিত করা হয়েছে। যদিও আল-মামুন ৮১৩-৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন তাই এই অন্তর্লিপি নিখুঁতরূপে পূর্বেকার রাজত্ব অর্জনের জন্য আব্বাসীয় প্রচেষ্টার প্রতিনিধিত্ব করে। অষ্টভুজী তোরণশ্রেণির অভ্যন্তরীণ লিপি খ্রিষ্টানদের ভুল ধারণা পরিত্যাগ করে ইসলামের সত্যতা স্বীকৃতিদানে উৎসাহিত করে। অভ্যন্তরীণ অষ্টভুজ ও কেন্দ্রীয় বৃত্তে স্থাপিত স্তম্ভগুলো ভিন্ন ভিন্ন আকৃতির। ছোট সমতল মিহরাব আদি প্রাসাদেরই অংশ। এটি মুসলিম বিশ্বে সংরক্ষিত সর্বপ্রাচীন মিহরাব। আইয়ুবী সুলতান আল আজিজ ১১৯৮ সালে পবিত্র পাথরের চারদিকে স্থাপিত কাঠের পর্দাটি দান করেন। ক্রুসেডরা পাথরটাকে গোপনে চৌর্যবৃত্তি করে বেড়ানো তীর্থযাত্রীদের কাছ থেকে বাঁচাতে ‘রট আয়রন স্ক্রিন’ বসায়, যা পবিত্র পাথরটির সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে ভূমিকা নেয়।

উইকিপিডিয়া

পবিত্র পাথরটি স্তম্ভের কেন্দ্রীয় বিন্দুতে অবস্থিত। এটি বিশাল আকৃতির প্রাচীন পাথর যা একসময় সলোমন টেম্পলের কেন্দ্রে ছিল। ইহুদিরা বিশ্বাস করে এখানেই ইব্রাহিম (আ.) ইসমাইল (আ.)কে উৎসর্গ করেন। মুসলমানদের বিশ্বাস, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এখান থেকে ঊর্ধ্বগমন করেন এবং পৃথিবী ধ্বংসের পর একজন ফেরেশতা এই পাথরের ওপর থেকে শিঙ্গায় ফুঁক দেবেন শেষ বিচারের দিনে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৩তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৮।

Related Posts

মুসলিম স্থাপত্যে স্পেনের বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র ‘আল হামরা’

আল হামরা। স্পেনের একটি বিখ্যাত রাজ প্রাসাদ। আরবি ‘আল হমরা’ শব্দের অর্থ লাল। এই প্রাসাদের বাইরের দেয়ালও লাল…

 হারিয়ে যাওয়া দিলমুন সভ্যতা

ইতিহাস অনেক কিছু শেখায়। ইতিহাস আমাদের অতীত ও পূর্বপুরুষদের জীবনগাথা তুলে ধরে চোখের সামনে। একেকটি প্রাচীন সভ্যতা পৃথিবীর…

দ্য আর্ক: মধ্য এশিয়ার প্রাচীনতম দুর্গ

উজবেকিস্তানের বুখারা, প্রাচীন মধ্য এশিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি স্মরণীয় অধ্যায়। মরুপ্রবণ ধূসর ভূ-প্রকৃতি হলেও বিখ্যাত সিল্ক রোড…

প্রমবানন কমপ্লেক্স

ইন্দোনেশিয়ার পর্যটনপ্রিয় তীর্থস্থান প্রমবানন মন্দির কমপ্লেক্স, ইউনেসকো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যের একটি ঐতিহাসিক হিন্দু পুরাকীর্তি। প্রমবানন, ইন্দোনেশিয়ার প্রাচীন জাভার…

01~1
previous arrow
next arrow

CSRM

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

Buet
কী কী থাকছে আকাশছোঁয়া শান্তা পিনাকলে
সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য
Home of Haor
Weather
Youth Park
Tower
শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার
Al Hamra