বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন বলে পরিচিত দুবাইয়ের বুর্জ খলিফার রাজত্ব বুঝি ফুরোল। ৮২৮ মিটার উচ্চতাসম্পন্ন বুর্জ খলিফার নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০০৯ সালের অক্টোবরে। তখন থেকেই বিশ্বের বুকে আজ অবধি সর্বোচ্চ উঁচু ভবনের খ্যাতি পেয়ে আসছিল এটি। কিন্তু ২০১৩ শেষ হওয়ার আগেই বোধ হয় বুর্জ খলিফা তার আসন হারাতে চলেছে চীনে নির্মিত স্কাই সিটির কাছে। ৮৩৮ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট স্কাই সিটির নির্মাণকাজ বছর শেষ হওয়ার আগেই সম্পন্ন হবে, এমনটিই আশা এর নির্মাতা ও প্রকৌশলীদের। বিশ্বের নবনির্মিত সর্ব্বোচ এ ভবনটির অবস্থান চীনের হুনান প্রদেশের চ্যাংসা শহরে।
অবকাঠামোগত বৈশিষ্ট্য
স্কাই সিটি নির্মাণ করছে Broad Sustainable Building নামক চীনের বিখ্যাত নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। মোট ২২০ তলার এই ভবনে জায়গার পরিসর ১৬ লাখ ১০ হাজার বর্গ মিটার। আবাসিক ও বাণিজ্যিক উভয় ধরনের জায়গা বরাদ্দ রয়েছে স্কাই সিটিতে। স্থাপনাটিতে একবারে থাকতে পারবে ৭০ হাজার থেকে এক লাখ ২০ হাজার মানুষ। পুরো ভবনটি নির্মাণের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৬২৫ মিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি টাকায়, যার পরিমাণ প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকা।
সুযোগ-সুবিধার রকমফের
স্কাই সিটির মোট জায়গার ৮৩ শতাংশ ব্যবহার করা হবে আবাসিক উদ্দেশ্যে, ৫ শতাংশ ব্যবহার করা হবে আন্তর্জাতিক মানের একটি হোটেল নির্মাণে এবং বাকি ৩ শতাংশ করে জায়গা বরাদ্দ থাকবে স্কুল-কলেজ, অফিস, হাসপাতাল ও দোকানপাটের জন্য। পুরো ভবনটিতে সহজে চলাচলের জন্য থাকছে ১০৪টি লিফট বা এলিভেটর। কিন্তু যাঁরা লিফটে চড়তে ভয় পান, তাঁদের জন্যও রাখা হয়েছে একদম নিচতলা থেকে ১৭০ তলা পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ছয় মাইল লম্বা একটি চলন্ত পথ (Ramp), যাতে একবার উঠলে নিমেষেই পৌঁছা যাবে কাক্সিক্ষত যেকোনো ফ্লোরে। বিনোদনের জন্য থাকছে টেনিস কোর্ট, বাস্কেটবল কোর্ট, সুইমিংপুল, থিয়েটারসহ মোট ৫৬টি চত্বর (Courtyard)। এ ছাড়া পরিকল্পনা আছে নয় লাখ ৩০ হাজার বর্গফুটের স্বাস্থ্যকর অর্গানিক পণ্যের খামার (Organic Firm) করার। ভবনটির ছাদে থাকছে ১৭টি হেলিপ্যাড। আপৎকালীন অবস্থা সামাল দেওয়ার জন্য থাকবে ১০টি অগ্নিনির্গমন পথের (Fire Escape) ব্যবস্থা, যা ১৫ মিনিটের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ফ্লোরকে সম্পূর্ণ খালি করতে সক্ষম।
নির্মাণকালীন কারিগরি চ্যালেঞ্জ
স্কাই সিটির মতো বৃহৎ একটি স্থাপনার নির্মাণকাজে স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রকৌশলগত কারিগরি চ্যালেঞ্জ থাকবেই। কিন্তু স্কাই সিটির নির্মাতা গোষ্ঠী দুটি ক্ষেত্রকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এর একটি হলো নির্মাণকাল, অপরটি নির্মাণব্যয়। প্রথমে ঠিক হয়েছিল যে প্রতিদিন পাঁচতলা করে নির্মাণ করা হবে এবং মাত্র ৯০ দিনে পুরো ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হবে। কিন্তু দুই লাখ ৭০ হাজার টন স্টিলের কাঠামোটিতে প্রচুর প্রিফেব্রিকেটেড উপাদান (Prefabricated Component)-এর প্রয়োজন থাকায় স্থপতি ও প্রকৌশলীরা সিন্ধান্ত নেন যে ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে এর নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর চার মাস ব্যয় হবে প্রিফেব্রিকেটেড উপাদান তৈরির কাজে এবং বাকি তিন মাস এগুলো সংযুক্ত করা হবে সম্পূর্ণ ভবনটি তৈরি করতে। ১৯ হাজার দক্ষ কর্মীর অক্লান্ত পরিশ্রমে এ মহাযজ্ঞ সম্পন্ন হচ্ছে। কিন্তু যেখানে বুর্জ খলিফা নির্মাণে সময় লেগেছে পাঁচ বছর, সেখানে মাত্র সাত মাসের ব্যবধানে স্কাই সিটি তৈরির চেষ্টাকে অনেকে হেসে উড়িয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু স্কাই সিটির নির্মাতা গোষ্ঠী ও প্রকৌশলীরা একে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন। অনেকেই দেখার অপেক্ষায়, এই বিস্ময় কর্ম কী করে সম্পন্ন হয়!
স্কাই সিটির নির্মাতাগোষ্ঠী ও প্রকৌশলীরা প্রকল্প নির্মাণব্যয়কেও যথাসাধ্য কমিয়ে আনা একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন। তাঁদের উপস্থাপিত প্রকল্প ব্যয় বুর্জ খলিফার নির্মাণব্যয়ের অর্ধেকেরও কম। (১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে মাত্র ৬২৫ মিলিয়ন ডলার)। বুর্জ খলিফার প্রতি বর্গমিটার নির্মাণব্যয় যেখানে ছিল চার হাজার ৫০০ ডলার, সেখানে স্কাই সিটির প্রতি বর্গমিটার নির্মাণব্যয় ধরা হয়েছে মাত্র এক হাজার ৫০০ ডলার। শুধু আকাশচুম্বী অট্টালিকাগুলোর তুলনায় নয়, যেকোনো প্রচলিত স্থাপনার নির্মাণব্যয়ের তুলনায় স্কাই সিটি নির্মাণে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কম খরচ হচ্ছে।
পুরো ভবনটি নির্মাণ করা হবে বান্ডল্ড টিউব (Bundled Tube) নির্মাণ প্রযুক্তিতে, যা প্রথমে ব্যবহার করা হয়েছিল আমেরিকার সিয়ারস টাওয়ার নির্মাণের সময়। স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আইনস্টাইন খ্যাত স্থপতি আর এ খানের আবিষ্কার এই টিউব প্রযুক্তি, যা বুর্জ খলিফার নির্মাণের সময়ও ব্যবহৃত হয়েছিল।
স্কাই সিটি নির্মাণের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ প্রবল বাতাসের গতিবেগ (Wind Load), যা কাঠামোটিকে প্রতিনিয়ত সহ্য করতে হবে। সমালোচকেরা বলছেন, প্রবল এই বাতাসের গতিবেগ সহ্য করার মতো সক্ষমতা স্কাই সিটির বুপ্রিন্টে নেই। কিন্তু স্কাই সিটির প্রকৌশলীরা ভবনটির গাঠনিক সক্ষমতা ও অগ্নি প্রতিরোধক ক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্য ১০০টিরও বেশি নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন এবং সবগুলোর ফলই অত্যন্ত ইতিবাচক। বাতাসের বিপরীতে সক্ষমতা পরীক্ষার উইন্ড টানেল পরীক্ষা (Wind Tunnel Test) তিনটি আলাদা গবেষণা সংস্থা দ্বারা তিনবার করা হয়েছে এবং ১০টি আলাদা সরকারি সংস্থা দ্বারা এই প্রকল্পের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। এখন অপেক্ষা শুধু ইতিহাস গড়ার।
ভূমিকম্প প্রতিরোধক ক্ষমতা
এ ধরনের আকাশচুম্বী অট্টালিকার ক্ষেত্রে ভূমিকম্প বড় একটি সমস্যা। কিন্তু স্কাই সিটিকে এমনভাবে ভূমিকম্প প্রতিরোধক করা হয়েছে যে রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রা পর্যন্ত ভূমিকম্প এটি প্রতিরোধ করতে সক্ষম। শুধু তা-ই নয়, এটিকে এমনভাবে অগ্নিপ্রতিরোধক করা হয়েছে যে এতে একবার আগুন লাগলে তা আগুনের ক্ষয়ক্ষতি তিন ঘণ্টা পর্যন্ত প্রতিরোধ করতে সক্ষম।
পরিবেশবান্ধব স্কাই সিটি
স্কাই সিটির সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য এই যে এটি সম্পূর্ণরূপে পরিবেশবান্ধব স্থাপনা। নির্মাণের ক্ষেত্রে আধুনিক সবুজ প্রযুক্তি (Green Technology) ব্যবহার করার ফলে নির্মাণ বর্জ্য (Construction Waste) অত্যন্ত সীমিত রাখা সম্ভব হচ্ছে। জনপ্রতি ভূমি ব্যবহার (Per Capita Land Use) কমিয়ে এনে অনেক জমি সাশ্রয় করা সম্ভব হচ্ছে। একজন সাধারণ ভবনের অধিবাসী যতটুকু জমি ব্যবহার করে, স্কাই সিটির একজন অধিবাসী এর মাত্র ১০০ ভাগের এক ভাগ জমি ব্যবহার করবে। মোট জমির মাত্র ১০ ভাগের মধ্যে অবকাঠামো নির্মিত হবে আর বাকি ৯০ ভাগই খোলা জায়গা যেখানে পার্কসহ থাকবে নানা পরিবেশবান্ধব উপকরণ।
শুধু এটুকুই নয়, স্কাই সিটি থেকে যাতে যথাসম্ভব কম কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, সেদিকেও বিশেষ খেয়াল রাখা হচ্ছে। প্রচলিত যেকোনো স্থাপনা থেকে পাঁচ গুণ বেশি জৈব শক্তি সাশ্রয়ী (Energy Efficient) করে গড়ে তোলা হচ্ছে স্কাই সিটি। দেয়ালে ৮ ইঞ্চি পুরু ও তিন স্তরবিশিষ্ট ইনস্যুলেটর আবরণী থাকায় রুমে এয়ারকন্ডিশন ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা শতকরা ৩০ ভাগ পর্যন্ত কমে যাবে। এর জানালায় ব্যবহার করা চার স্তরবিশিষ্ট পুরু গ্লাসের কারণে রুমের তাপমাত্রা সব সময় ২০-২৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে থাকবে। যার ফলে শীত ও গরম উভয় মৌসুমেই স্থাপনার অভ্যন্তর আরামদায়ক থাকবে। ভবনের অভ্যন্তরে যে বাতাস প্রবেশ করবে, তা বিশেষ ফিল্টার ব্যবস্থার সাহায্যে বাইরের বাতাসের চেয়ে ২০ গুণ পরিশুদ্ধ করে প্রবেশ করানো হবে। এভাবেই স্কাই সিটিকে পরিবেশবান্ধব অনন্য এক স্থাপনা হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আকাশ ছোঁয়ার আকাক্সক্ষা বেড়েছে। একসময় যখন পিরামিড নির্মাণকেও অবিশ্বাস্য বলে মনে করা হতো, সেই মানুষই এখন একের পর এক আকাশচুম্বী অট্টালিকা নির্মাণ করছে। বুর্জ খলিফার পর স্কাই সিটির নির্মাণ মানুষের স্থাপত্যিক উৎকর্ষতার প্রমাণ। নির্মাণ প্রযুক্তি ও প্রকৌশলগত জ্ঞানের ক্রমবর্ধমান জোয়ারে সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন এমন অট্টালিকাও দেখতে পাব, যার কাছে স্কাই সিটিকেও অনেক ছোট মনে হবে। আমরা সেই দিনেরই অপেক্ষায় রইলাম।
তথ্যসূত্র : ইন্টারনেট
আবু আহমেদ সুফিয়ান
প্রভাষক
পুরকৌশল বিভাগ
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি
প্রকাশকাল: বন্ধন ৪০ তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৩