মাটি পৃথিবীকে করেছে সবুজ-শ্যামল। এই মাটির অস্তিত্বের কারণেই মহাবিশ্বের অন্য গ্রহের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা আমাদের এই বসুন্ধরা। মাটি মানেই প্রাণ। মাটি সৃষ্টিলগ্ন থেকেই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীব থেকে শুরু করে প্রাণিকুল ও বৃক্ষরাজির জীবন সৃষ্টির অন্যতম নিয়ামক। খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন থেকে শুরু করে আবাসন নির্মাণের কাজে মাটির ব্যবহার অনস্বীকার্য। আর তাই গ্রামগঞ্জে মাটির বেচাকেনাও চলে দেদারছে। গ্রামে মাটির প্রাপ্তি সহজ হলেও শহর-নগরে তা পেতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়।
মাটির হেরফের
ভূ-ত্বক, জলস্তর, বায়ুস্তর ও জৈবস্তরের মিথোস্ক্রিয়ার মাধ্যমে পাথর থেকে সৃষ্টি হয় মাটির। মাটিতে রয়েছে খনিজ এবং জৈব পদার্থের মিশ্রণ। এই মিশ্রণের অনুপাত যথাক্রমেÑ
- খনিজ পদার্থ- ৪৫ শতাংশ
- জৈব পদার্থ- ৫ শতাংশ
- বায়ু- ২৫ শতাংশ
- পানি¬ ২৫ শতাংশ
বালি, পলি ও কাদা-এই তিনটি স্বতন্ত্র মাটি কণার তুলনামূলক অনুপাতের ওপর ভিত্তি করে মাটির বুনটসমূহের নামকরণ করা হয়েছে। বিভিন্ন মাটি বিভিন্ন অনুপাতে বালি, পলি ও কাদা কণা ধারণ করে থাকে। কোনো মাটিতে বালি কণার পরিমাণ বেশি, আবার কোনোটাতে কাদা কণার পরিমাণ বেশি। মাটি সাধারণত ৪ প্রকার বৈশিষ্ট্যের হয়ে থাকে। এগুলো-
১. এঁটেল মাটি
২. বেলেমাটি
৩. লাল মাটি
৪. দো-আঁশ মাটি
এই শ্রেণিগুলোর একটির থেকে অন্যটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক ধর্মে যথেষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যে মাটিতে অধিক পরিমাণ কাদা কণা থাকে তাকে কাদামাটি, যে মাটি অধিক পরিমাণ পলি কণা ধারণ করে তাকে পলিমাটি, আর যে মাটিতে বালি কণার পরিমাণ বেশি থাকে তাকে বেলেমাটি বলে। যদি কোনো মাটি এই তিনটি শ্রেণির একটিরও প্রভাব বিস্তারকারী ভৌতিক বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন না করে (যেমন- ৪০ শতাংশ বালি কণা, ২০ শতাংশ কাদা কণা ও ৪০ শতাংশ পলিকণাযুক্ত মাটি) তবে তাকে দো-আঁশ মাটি বলে। দো-আঁশ মাটিতে বালি, পলি ও কাদা কণার শতকরা পরিমাণ সমান থাকে না। তবে এ বালি, পলি ও কাদা কণাসমূহের কাছাকাছি প্রায় সামঞ্জস্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বা ধর্ম প্রদর্শন করে।
যে মাটিতে পানি ঢাললে সঙ্গে সঙ্গে শোষণ করে নেয়, সহজ কথায় সেটাই বেলেমাটি। সাধারণত এই জাতীয় মাটিকে বলা হয় ভিটি বালু। নদীর চরে যে বালু থাকে, সেটাই বেলেমাটি। বেলেমাটিতে হিউমাস থাকে না। বেলেমাটি শুকালে কোনো চাকা বাঁধে না। ময়লা-আবর্জনা, গাছপালা ও জীবজন্তু পচে যে সার তৈরি হয়, তাকেই হিউমাস বলে। বালু ৫০ শতাংশ আর হিউমাস ৫০ শতাংশ মিশ্রিত করলেই দো-আঁশ মাটি তৈরি হয়। স্বাভাবিকভাবে আমাদের দেশে জমিজমায় যে মাটি দেখা যায় তা-ই দো-আঁশ মাটি। এই মাটিতে পানি ঢাললে ধীরে ধীরে শুষে নেয়। শুকালে চাকা বাঁধে, তবে সামান্য আঘাতেই ভেঙে চুরচুর হয়। আর এঁটেল মাটি শুকালে খুব শক্ত চাকা বাঁধে, জোরে আঘাত করলেও ভাঙে না। মাটিতে পানি ঢাললে সহজে শোষণ করে না। এ মাটি সাধারণত ইট বানানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। এঁটেল মাটিতে বালু অপেক্ষা পলি ও কাদার ভাগ বেশি থাকে। এ কাদামাটি খুব নরম, দানা খুব ছোট ও মিহি। মাটি বেশি পানি ধরে রাখতে পারে। মাটিতে ভালোভাবে বাতাস চলাচল করতে পারে না। এ মাটি সব ফসলের জন্য তেমন উপযোগী নয়, তবে ধান চাষ করা যায়।
মাটির পুষ্টি উপাদান
উর্বর মাটিতে প্রধান পুষ্টি উপাদানগুলো সঠিক পরিমাণে বিদ্যমান থাকে। প্রধান পুষ্টি উপাদান নাইট্রোজেন। এ ছাড়া অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদানের মধ্যে ফসফরাস, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ, জিংক, বোরোন উল্লেখযোগ্য। এই অত্যাবশ্যকীয় উপাদানগুলো ছাড়া উদ্ভিদ তার সম্পূর্ণ জীবনচক্র সম্পন্ন করতে পারে না। ভালো মাটিতে যেমন ভালো ফসল হয়, ঠিক তেমনি ভালো মাটির পুকুরেও মাছের বৃদ্ধি ভালো হয়।
শহরে মাটির ব্যবহার
গ্রামের তুলনায় শহরে মাটির স্বল্পতা রয়েছে। কারণ, বেশির ভাগ জায়গায় কংক্রিটের আচ্ছাদন। তা সত্ত্বেও অবকাঠামো নির্মাণ, পার্ক, উদ্যান তৈরিতে নিচু স্থান ভরাটের কাজে মাটি ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া ভবনের ছাদে, বারান্দায় ও ফাঁকা জায়গায় গাছ লাগাতে অথবা বাগান করতে প্রয়োজন হয় মাটির। বিশেষ করে ঢাকায় বর্তমানে ছাদবাগান খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় বেড়েছে মাটির চাহিদা। কিন্তু মাটি এখানে সহজপ্রাপ্য নয়। আবার গ্রামাঞ্চলেও মাটির প্রয়োজন নেহাত কম নয়। ডোবা বা নিচু স্থান ভরাট করে বাড়ি বা বাগান তৈরিতেও মাটির চাহিদা ব্যাপক।
দরদাম ও বিক্রয় তথ্যাবলি
গ্রাম, শহর ও বাণিজ্যিক এলাকায় মাটির দাম ভিন্ন রকম হয়। গ্রামে সাধারণত ৩০ শতাংশ জমি থেকে এক কোদাল মাটি ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এ ছাড়া জমির মালিকের সঙ্গে চুক্তিতেও মাটির কেনাবেচা চলে। তবে শহরে এর দামের কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়। শহরের বাড়ি, স্থাপনা, পার্ক, উদ্যান, ইমারত তৈরি বা বাড়ির আশপাশে নিচু স্থান ভরাটের জন্য যে মাটি ব্যবহৃত হয়, প্রতি বর্গফুট এই মাটির দাম পড়বে ৫-৭ টাকা।
ছাদবাগান বা ফুলের টবে যে মাটি ব্যবহৃত হয় তা পাওয়া কিছুটা কঠিন এবং ব্যয়সাধ্যই বৈকি। তবে সম্প্রতি মাটি বাসায় পৌঁছে দেবে এমন অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া নার্সারি থেকেও মাটি সংগ্রহ করা যায়। সাধারণ ৩০ কেজি ওজনের মাটির বস্তার দাম ৭০-১০০ টাকা পড়বে। সাধারণত বস্তা বলতে সিমেন্টের বস্তা বোঝায়। আর গোবরসহ বস্তাপ্রতি মাটির দাম পড়বে ১০০-১৫০ টাকা।
আবার ট্রাকপ্রতি মাটির দাম হবে একটু অন্য রকম। এক ট্রাকে বস্তা ধরবে প্রায় ৮০-১০০টি। সে ক্ষেত্রে ট্রাকপ্রতি মাটির দাম হবে ৪-৫ হাজার টাকা। দূরত্বের ওপর দাম নির্ভর করে। যেমন কেউ যদি সাভার থেকে মাটি আনে তার মূল্য পড়বে এক রকম। আবার যদি গাবতলী থেকে আনে তার মূল্য পড়বে আরেক রকম। এ ছাড়া দিনে ও রাতে সরবরাহের ওপর দাম নির্ভর করে। রাতে ট্রাক প্রবেশ করানো সহজ আর দিনে কঠিন তাই সরবরাহের সময়ের ওপরও দাম নির্ভর করে।
প্রাপ্তিস্থান
ঢাকায় বর্তমানে গ্রিন সেভার্স, নগরবাগান ও সবুজ ঢাকা নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাগান তৈরির মাটি সরবরাহ করছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে শৌখিন ও পরিবেশপ্রেমীরা সহজেই পেতে পারেন নিজের মতো প্রিয় বাগানের মাটি। ঢাকার গাবতলী, সাভার, সায়েদাবাদ, আগারগাঁও, দোয়েল চত্বর ও ঢাকা কলেজের পাশে নার্সারি থেকে পাবেন প্রয়োজনীয় মাটি। এ ছাড়া যেকোনো নার্সারির সঙ্গে যোগাযোগ করলে পাওয়া যাবে ছাদ কৃষির সারসহ ও সারবিহীন মাটি।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৯তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৭।