প্রকৃতির রঙে বর্ণিল রেস্তোরাঁ ‘হাটখোলা’

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সারসেন সড়ক ধরে হেঁটে গেলে ডানে কিংবা বামে মোড় নেওয়ার আগেই এক টুকরো লাল আলো হঠাৎ করেই থমকে দেবে প্রতি মুহূর্তকে। ইট-পাথরের শহুরে ছবির মাঝে হঠাৎই বাহারি লতাপাতা আর পাতাবাহারের আড়ালে বড় কাচ জানালার স্বচ্ছতাকে ভেদ করে দৃষ্টি যাবে স্থাপনারটির ভেতরে। একটি ক্যাফে লাউঞ্জ কাম রেস্তোরাঁ যেন আপনারই অপেক্ষায়। ব্যতিক্রমী এ রোস্তোরাঁর নাম ‘হাটখোলা’।

হাটখোলা ফাউন্ডেশন তাদের নিয়মিত আয় বাড়াতে একটি ব্যতিক্রমী রেস্তোরাঁ নির্মাণে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়, যা হবে গতানুগতিক অন্য আর সব রেস্তোরাঁ থেকে একেবারেই আলাদা। ব্যস্ত নগরজীবনে এখন রেস্তোরাঁ শুধু খাওয়ার জায়গা নয়। একই সঙ্গে ভাব বিনিময়, তারুণ্যের আড্ডা, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির সমাপ্ত হীন বিতর্কস্থলও বটে। সময়ের চাহিদায় গ্যালারি ও রেস্তোরাঁর মিলিত পরিবেশ তৈরি একটু চ্যালেঞ্জ বৈকি! হাটখোলা রেস্তোরাঁ সেই চেষ্টার আন্তরিক বহিঃপ্রকাশ। একটু পুরোনো স্মৃৃতিকাতরতা, লালচে রহস্যময় আলোর বর্ণিলতা, একটু নতুনত্বের ছাপÑ সব মিলিয়ে সাধারণের মধ্যেও খানিকটা স্বতন্ত্র অবস্থান এর। মাটির প্রলেপ দেওয়া গ্রামীণ দেয়াল আর হারিকেনসদৃশ টিমটিমে বাতির কম্পোজিশন আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে স্মৃতিবিজড়িত গাঁয়ের সেই পাখা নাড়ানো মায়াবী রাতের কাছে। 

হাটখোলা নাম থেকেই বোঝা যায় আমাদের শিকড় থেকে ভাবনা নিয়েই গ্যালারি রেস্তোরাঁর এমন সজ্জাবিন্যাস। হাটখোলা গ্রামবাংলার সব ধরনের কর্মের কেন্দ্রবিন্দু। শুধু গ্রামই নয়, জৌলুশহীন শহর, উপশহরগুলোও আজও হাটখোলায় উপচে পড়ে বেচাকেনা, খাওয়াদাওয়া, গল্প-আড্ডা আর ছন্দময় জীবনের কোলাহলে। মানুষের পাশাপাশি রিকশা এই হাটখোলার আরেকটি পরিচিত অধ্যায়। হাটখোলা রেস্তোরাঁর ‘হাটখোলা’ তাই সত্যিই শক্তিশালী এক ভাবনা। একটি রিকশার বর্ণিল সজ্জাকে তুলে আনা হয়েছে এই রেস্তোরাঁর থিম হিসেবে। বসার জায়গা, ক্যাশ কাউন্টার, ঝুলন্ত বাতিÑ সবকিছুর মধ্যে পাওয়া যায় বিমূর্ততার ছাপ।

প্রকল্পের আসল সার্থকতা টেকসই নির্মাণকৌশলে। একটি পরিত্যক্ত আস্তানা পেয়েছে নতুন জীবন। পরিত্যক্ত সব উপকরণ, যা হয়তো চলে যেত ডাস্টবিনে, স্থপতির কল্যাণে নতুন রূপে দৃশ্যমান হয়েছে। ওপরে ওঠার সিঁড়ির ধাপগুলো তৈরি করা হয়েছে পুরোনো নৌযানের পরিত্যক্ত কাঠ দিয়ে। গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ারগুলোকে একটার ওপর আরেকটাকে সাজিয়ে বানানো হয়েছে বসার জায়গা। পুরোনো দেয়ালে কাদামাটির আস্তর, মেটে রঙের আবহ ছাপিয়ে গেছে পুরো অন্তঃপুরে। 

ধূসর, বাদামি, লালচে ধরনের সবগুলো রংই প্রকৃতির কাছ থেকে ধার করা। এ যেন প্রকৃতির স্বকীয়তাকে আরেকটু মহিমান্বিত করার প্রচেষ্টা। আমাদের ঋতু চক্রকে ধারণ করে আছে বিমূর্ত সত্তায়। পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ফুলের রং বদলাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে অনুভূতি। খুবই প্রভাবক স্মৃতিকাতর অনুভূতি এ যেন মননের গভীরের।

এক নজরে প্রকল্পটি

স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান:  আর্য স্থাপত্য
স্থপতি: আদর ইউসুফ
অবস্থান: সারসেন রোড, চট্টগ্রাম
স্বত্বাধিকারী: হাটখোলা ফাউন্ডেশন
নির্মাণকাল: ২০১৪।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৬তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৬।

স্থপতি খালিদ মাহমুদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top