লাইটওয়েট বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালগ্যাসবেটন

কংক্রিট অনন্য এক নির্মাণ উপকরণ। সভ্যতার অগ্রগতিতে কংক্রিটের অবদান কতটা তা বলার অপেক্ষা রাখে না।যেকোনো নির্মাণকাজে কংক্রিটের ব্যবহার চলে আসছে আবহমানকাল থেকে। পৃথিবীর উন্নত-অনুন্নত সব দেশেই স্থায়ী কাঠামো নির্মাণকল্পেকংক্রিটের ব্যবহার বহুল প্রচলিত। যেকোনো বস্তুর মান উন্নয়নে যেন মানুষের প্রচেষ্টার অন্ত নেই। কংক্রিটের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। কংক্রিট প্রযুক্তিবিদেরা অবিরাম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এর গুণাগুণকে বৃদ্ধি এবং উন্নত করতে নতুন নতুন কংক্রিট প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছেন।মানব স্বাস্থ্য ও প্রকৃতিবান্ধব নির্মাণ উপকরণ উদ্ভাবনে প্রযুক্তিবিদদের আরও নতুন কিছু আবিষ্কারের জন্য অনুপ্রাণিত করছে প্রতিনিয়ত। অব্যাহত প্রচেষ্টার ফলেসাধারণ কংক্রিটের রূপ বদলে আবিষ্কৃত হয়েছে পলিমার কংক্রিট, ফাইবার রিইনফোর্সড কংক্রিট, আলট্র্রা হাই স্ট্রেংথ কংক্রিটসহ নানা ধরনের কংক্রিট।এতেও যেন তাঁদের কাঙ্খিত ফল মেলেনি। অবিরাম গবেষণা ও অক্লান্ত প্রচেষ্টায় গবেষকগণভারী, নিরেট এ নির্মাণ উপকরণটিকেঅত্যন্ত হালকা, নমনীয়, আরামদায়ক, পরিবেশবান্ধব করে রূপায়িত করেছেন অনন্য এক কংক্রিট ব্লকে, যা পরিচিতগ্যাসবেটন (Gasbeton) নামে।এই নির্মাণ উপকরণটিশুধু শক্তপোক্ত কাঠামোই গড়ে তোলে না বরং উপহার দেয় নান্দনিক সব স্থাপনা! 

গ্যাসবেটন কংক্রিট ব্লক মূলত একধরনের অটোক্লেভড এরিটেডেট,বা অটোক্লেভড এরিটেডেট লাইটওয়েট সেসুলার কংক্রিট। এটা অত্যন্ত হালকা ওজনের একধরনের ফোমভিত্তিক প্রিকাস্ট কংক্রিট ব্লক। একে এএসি (AAC), পোরাস কংক্রিট, হেবেল ব্লকসহ নানা নামে ডাকা হয়। এই লাইটওয়েট অ্যাগ্রিগেটেড কংক্রিট ব্লকের অভ্যন্তরীণ গঠন অনেক ছিদ্র বা রন্ধ্র দিয়ে পরিপূর্ণ, যার দৈর্ঘ্য ৫ থেকে ৩০০ মাইক্রো মিটার পর্যন্ত হয়। অসংখ্য ছিদ্র দিয়ে গঠিত এর অভ্যন্তরীণবিন্যাস হয় অবিচ্ছেদ্য, তুলনামূলকভাবে ফাটলবিহীন এবং একই সঙ্গে স্বচ্ছ কাচের মতো ধর্মবিশিষ্ট। আর্দ্র আবহাওয়ায় উন্মুক্ত থাকাকালীন কণাসমূহের বাইরের দিকের ছিদ্র পানি দিয়ে সহজেই পরিপূর্ণ হয়ে যায়, কিন্তু অপেক্ষাকৃত অভ্যন্তরীণ রন্ধ্রগুলো পরিপূর্ণ হতে অনেক বছর অতিবাহিত হতে হয়। লাইটওয়েট অ্যাগ্রিগেটের হালকা ওজনের মূল কারণ এটিই। যেকোনো ধরনের নির্মাণকাজে সাধারণ অ্যাগ্রিগেটের পরিবর্তে লাইটওয়েট অ্যাগ্রিগেটের ব্যবহারে বাস্তবিকভাবেই ভারের পরিবর্তন ঘটে, যা বিম-কলামের প্রয়োজনীয় আকার কমায়। তাই এর ব্যবহার আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী। ব্লক ছাড়াও গ্যাসবেটন কংক্রিট ওয়াল প্যানেল, ফ্লোর, ফ্লোর প্যানেল, ফ্যাসাদ প্যানেল, লিনটেলসের কাজে ব্যবহারের জন্য প্রিকাস্ট আকারে উৎপাদন করা হয়।

নির্মাণকাজে বহুল ব্যবহৃত কংক্রিট অত্যন্ত ওজনবিশিষ্ট এবং নিরেট হলেও গবেষকদের বিশ্বাস ছিল, এর গুণাগুণ বজায় রেখে রূপ পরিবর্তন করা সম্ভব। সামগ্রিক ওজনে ভিন্নতা আনতেবিভিন্ন ঘনত্বের উপাদান ব্যবহার শুরু করেন তাঁরা। ব্যবহৃত উপাদানের যে ধর্মের ওপর নির্ভর করে কংক্রিটের ওজনে ভিন্নতা আনা হয় তা হলো, পদার্থের বাল্ক ¯েপসিফিক গ্রাভিটি। এই ধর্মের ওপর নির্ভর করে কংক্রিটে সচরাচর তিন ধরনের উপাদান ব্যবহার করা হয়- লাইটওয়েট (Lightweight), নরমালওয়েট (Normal weight) এবং হেভিওয়েট অ্যাগ্রিগেট। লাইটওয়েট অ্যাগ্রিগেট সাধারণত সেই প্রাকৃতিক অথবা কৃত্রিম উপাদান, যাদের ঘনত্ব হলো ১১০০ কেজি/মি.৩ বা তার চেয়ে কম। ব্যবহৃত উপাদানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- পরিবর্ধিত কাদামাটি (Expanded Clay) অথবা পরিবর্ধিত স্লেøট-জাতীয় নরম শিলা (Expanded Shale) (প্রাকৃতিক), ধাতুমল (Foamed slag) অথবা বিচূর্ণ ফুয়েল অ্যাশ (Sintered Pulverized Fuel Ash)। এ ছাড়া অনেক অপ্রক্রিয়াজাত প্রাকৃতিক উপাদানও (যেমন Pumice)। এখন ব্যবহৃত হচ্ছে গাঠনিক লাইটওয়েট অ্যাগ্রিগেট (Structural Lightweight) হিসেবে। এ ক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন যে লাইটওয়েট অ্যাগ্রিগেটের গাঠনিক শক্তি সরাসরি উপাদানের ঘনত্বের ওপর নির্ভরশীল। তাই উপাদানের আপেক্ষিক ঘনত্ব ২-এর থেকে কম হওয়া জরুরি এবং ন্যূনতম ১.২ হলেই তা গাঠনিক লাইটওয়েট অ্যাগ্রিগেট হিসেবে গণ্য করা যাবে।

লাইটওয়েট অ্যাগ্রিগেটের ব্যবহার হাজার হাজার বছর আগেই শুরু হয়েছিল। রোমান সভ্যতার বিখ্যাত তিনস্থাপনা কোসার পোর্ট (Port of Cosa), প্যান্থেয়ন ডোম (Pantheon Dome) এবং কলসিয়াম (Coliseum)কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে,যা লাইটওয়েট অ্যাগ্রিগেটের দীর্ঘস্থায়িত্বের প্রমাণ দেয়। একই সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ খরচের দায়ও এড়ানো গেছে এর গুণগত মানের কারণে।তবে ফোমভিত্তিকলাইটওয়েট কংক্রিট বিল্ডিং মেটেরিয়ালস আবিষ্কৃত হয় ১৯২০সালের মধ্যভাগে। এই আবিষ্কারের উদ্দেশ্য ছিল বাড়তি কোনো নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার না করেই শুধুকংক্রিটের রূপ পরিবর্তন করেই কীভাবে আদর্শ ইনস্যুলেশন ব্যবস্থা করা যায়, যা ইনস্যুলেশনের পাশাপাশি অগ্নিরোধকও হবে। এই প্রচেষ্টা থেকেই বিখ্যাত রয়াল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে সুইডিস স্থপতি এবং আবিষ্কারক ড. জোহান এক্সেল এরিকসন প্রফেসর হেনরিক ক্রিউগার সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘ গবেষণার পর উদ্ভাবন করতে সক্ষম হন। ১৯২৪ সালে তাঁরা একে পেটেন্টও করেন।

এছাড়া ১৯২০-১৯৩০ সালের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের লাইটওয়েট কংক্রিটের উন্নয়ন হতে থাকে, পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভিত্তিতেও উৎপাদন শুরু হয়। এসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম ডারিসল, সিপোরেক্স, আরজেক্স ও ওয়াইটং। এগুলো সবই ইউরোপের প্রতিষ্ঠান। ১৯২৯ সালে প্রথম এই লাইটওয়েট ব্লকের উৎপাদন শুরু হয় সুইডেনের ইয়াক্সহলট (Yxhult) শহরে। এই ফোমভিত্তিক ইয়াক্সহলট এগ্রিগেটেড গ্যাসবেটং (Yxhults Anghardade Gasbetong) কংক্রিট ব্লকই হয়ে ওঠে পৃথিবীর প্রথম নিবন্ধনকৃত বিল্ডিং মেটেরিয়ালস ব্র্যান্ড ওয়াইটং (Ytong)। ওই দেশেই ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় অন্য আরেকটি ব্র্যান্ড সিপোরেক্স (Siporex), বর্তমানে যে প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে বিশ্বজুড়ে ৩৫টি নিজস্ব উৎপাদন প্ল্যান্ট।আরজেক্সনামে আরেকটি কোম্পানি প্রথম ডেনমার্কে ১৯৩৯ সালে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড লেকা নামে উৎপাদন শুরু করে। বার্ষিক ২০.০০০ কিউবিক মিটার হারে শুরু করে ১৯৭২ সালে তা পৌঁছায় বছরে ৬ মিলিয়ন কিউবিক মিটার।  তবে সবচেয়ে জনপ্রিয়তা পায় ওয়াইটং।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সেলুলার কংক্রিট ব্র্যান্ড হেবেল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৩ সালে জার্মানিতে।প্রকৃতপক্ষে ওয়াইটং অটোক্লেভড এরিটেডেট কংক্রিট উৎপাদন করত অ্যালাম শেল (Alum Shale) দিয়ে। বস্তুটির প্রজ্জ্বলনক্ষম কার্বন কনটেন্ট, এ প্রক্রিয়ায় বেশ সুবিধা প্রদান করত। কিন্তু স্লেটের উৎস ছিল খুব কম এবং তা ভবনে রেডিও অ্যাকটিভ র‌্যাডন গ্যাস উৎপন্ন করতে সহায়ক ছিল। ১৯৭২ সালে সুইডিস রেডিয়েশন সেফটি অথরিটি এই বিষয়টিকে চিহ্নিত করে। পরে প্রতিষ্ঠানটি অ্যালাম ব্যবহার স্লেট বন্ধ করে নতুন ফর্মুলায় উৎপাদন শুরু করে। এই প্রক্রিয়ায় শুধু কোয়ার্টাজ স্যান্ড, ক্যালসাইনড জিপসাম, প্রাকৃতিক লাইম, সিমেন্ট, পানি এবং অ্যালুমিনিয়াম পাউডার ব্যবহার করে একটি নতুন ধরনের এগ্রিগেটেড কংক্রিট উৎপন্ন করে। ফলে এই কংক্রিট থেকে কোনো ধরনের র‌্যাডন গ্যাস নির্গত হতো না। এই সাদা রঙের অটোক্লেভড কংক্রিট হয়ে উঠেছে সৌন্দর্য অনন্য স্টেট অব দ্য আর্থ এবং যা উৎপাদন হচ্ছে বিশ্বজুড়ে।

১৯৭৮ সালে সিপোরেক্স সুইডিস দলসৌদি আরবে একটি ‘এলসিসি সিপোরেক্স’ নামে কারখানা স্থাপন করে। সেখান থেকে তারা মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং জাপানে পণ্য সরবরাহ করত। ৪০ বছর যাবৎ প্রতিষ্ঠানটি ওইএলাকায় আধিপত্য বজায় রাখে। তবে প্রযুক্তি উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গড়ে ওঠে এরিটেডেট কংক্রিট নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়াতে। তবে আমেরিকা ও আফ্রিকাতেও কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ইউরোপে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সূচনা হলেও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং নগরায়ণদ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ায় এই কংক্রিটের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পায় এশিয়াতে। চীন এ সময়ের সবচেয়ে বড় স্থাপত্যশৈলীর বাজার। স্থানীয় এবং পার্শ্ববর্তী চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে দেশটিতে কয়েক শ কারখানা গড়ে উঠেছে। ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যেও প্রচুর চাহিদা সৃষ্টি হওয়ায় সেখানেও গড়ে উঠছেঅটোক্লেভেড কারখানা। পণ্যটি অন্যান্য নির্মাণ উপকরণের মতোই বিভিন্ন ব্র্যান্ড নেমে বিক্রি হচ্ছে।

উৎপাদন প্রক্রিয়া

কংক্রিট একধরনের কম্পোজিট উপাদান, যা সাধারণত বালু, পাথর, পানি, সিমেন্ট এগ্রিগেট দিয়ে তৈরি হয়। অন্যান্য কংক্রিট অপ্লিকেশনের মতোগ্যাসবেটন ব্লকে বালুর চেয়ে কোনো ধরনের মোটা দানার অ্যাগ্রিগেট ব্যবহার করাহয় না।উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শুধু কোয়ার্টাজ স্যান্ড, ক্যালসাইনড জিপসাম, প্রাকৃতিক লাইম, সিমেন্ট, পানি এবং অ্যালুমিনিয়াম পাউডার ব্যবহার করে একটি নতুন ধরনের এগ্রিগেটেড কংক্রিট উৎপন্ন করা হয়।রিঅ্যাকটিভ এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয় লাইম ও সিলিকা, যার অনুপাত প্রায় ৩০ শতাংশ লাইম ও ৭০ শতাংশ সিলিকা। এছাড়া ব্যবহার করা হয় বাতাসপূর্ণ অটোক্লেভ, সেললুার এগ্রিগেটস ও আগ্নেয়শিলা পিউমাইস অথবা স্ল্যাগ। এই পিউমাইস তৈরি হয় যখন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুপাত হয় এবং গলিত লাভা অত্যন্ত ঠান্ডা হয়ে গ্যাসপূর্ণ হয়ে অত্যন্ত হালকা অথচ শক্ত শিলা উৎপন্ন করে।জিপসাম, লাইম, সিমেন্ট এবং পানি দৃঢ়কারক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ০.০৫-০.০৮% অ্যালুমিনিয়াম গুঁড়া ব্যবহার করা হয় (নির্ভর করে পূর্বনির্ধারিত ঘনত্বেও ওপর)। ইন্ডিয়া, চীনে কিছুটা ফ্লাই অ্যাশও (কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের) ব্যবহার করা হয়। ৫০-৬৫% সিলিকা উপাদান ব্যবহৃত হয় এই কংক্রিটে। এই উপকরণসমূহ মেশানো এবং কাস্টিংয়ের সময়ে কিছু রাসায়নিকও মেশানো হয় এর থার্মাল ইনস্যুলেশন ও ওজনে হালকা করতে।প্রকৃতপক্ষে সিলিকন, অ্যালুমিনিয়াম ও অক্সাইড, হিটিং অ্যান্ড কুলিং ফাংশন অসংখ্য ভয়েড সৃষ্টি করে। এসবই হালকাধর্মী উপহার দেয়।

অ্যালুমিনিয়াম পাউডার বিক্রিয়া করে ক্যালসিয়াম হাইড্রো-অক্সাইড এবং পানির (হাইড্রোজেন ফর্মে থাকা) সঙ্গে। হাইড্রোজেন গ্যাস ফোম এবং দ্বিগুণ মাত্রায় গ্যাস বাবল/বুদবুদ ৩ মিমি (১/৮ ইঞ্চি) ডায়ামিটারের উৎপন্ন করে। উৎপাদনের প্রক্রিয়ার শেষে হাইড্রোজেন জলবায়ু হয়ে সেখানে বাতাসে পরিপূর্ণ হয়। পরে এটা নিরেট হয়ে এলেও নমনীয়তা বজায় থাকে। এটিকে তখন ব্লক অথবা প্যানেলের আদলে কেটে ১২ ঘণ্টার জন্য একটি অটোক্লেভ চেম্বারে পাঠানো হয়। এই চেম্বারে বাষ্পীয় চাপে শক্ত করার প্রক্রিয়ায় মধ্যে তাপমাত্রা যখন ১৯০ক্ক সেলসিয়াসে (৩৭৪ক্ক ফারেনহাইট) এবং চাপ পৌঁছায় ৮ থেকে ১২ বারে। কোয়ার্টজ স্যান্ড ক্যালসিয়াম হাইড্রো-অক্সাইডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ক্যালসিয়াম সিলিকা হাউড্রেটে পরিণত হয়, যা গ্যাসবেটন ব্লককে দেয় উচ্চ শক্তিমাত্রা ওহালকা ওজন। শুষ্ক উপাদান মেশানোর ফলে অ্যালুমিনিয়াম পাউডার, ফোমিং এজেন্ট মেশানোর ফলে অসংখ্য পোর সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই বাবলগুলো একটার সঙ্গে অরেকটা মিশে পোরগুলোকে বড় করে না। তবে অ্যালুমিনিয়াম পাউডার কংক্রিটের ঘনত্ব বাড়াতে সাহায্য করে। মিক্সার শুকিয়ে গেলে মোল্ড সরিয়ে ফেলা হয়। পিস করে কেটে অটোক্লেভে পাঠানো হয়। অটোক্লেভে ব্লকগুলোকে বাষ্পীয় চাপে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় হয়ে ওঠে অত্যন্ত দৃঢ়। এখানে অন্তত ১৬ ঘণ্টা রাখা হয়। যদিও উৎপাদন প্রতিষ্ঠানভেদে এই প্রক্রিয়া কিছুটা ব্যতিক্রম হতে পারে। এই ব্লকে অনেকটাই বেকিং পাউরুটির সঙ্গে তুলনা করা যায়। অটোক্লেভিং প্রক্রিয়ার পর উপাদানটি নির্মাণকাজে ব্যবহারের জন্য পুরোদস্তুর প্রস্তুত হয়ে ওঠে। বর্তমানে কোম্পানিগুলো এই ব্লকের টেক্সারে পরিবর্তন আনার প্রচেষ্টারত। এ ছাড়া কিছু প্রতিষ্ঠান এই ব্লকের শক্তিমাত্রা বাড়াতে যোগ করছে ন্যানো প্রযুক্তি, যা বদলে দেবে অটোক্লেভড ব্লকের চিরচেনা ধারণা।

গ্যাসবেটন অটোক্লেভডকংক্রিট ব্লকেরবৈশিষ্ট্য

আমরা জানি, কংক্রিট একধরনের ছিদ্রযুক্ত নির্মাণসামগ্রী। এর মধ্যে রয়েছে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র। এই ছিদ্রের উপস্থিতির জন্য কংক্রিটের সামর্থ্য এবং স্থায়িত্ব হ্র্রাস পায়। এই ছিদ্রময়তার (Porosity) পরিমাণ কমাতে পারলে কংক্রিটের চাপ শক্তি এবং স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পায়। গ্যাসবেটনে ছিদ্রের পরিমাণ বেশি থাকলেও তা একটার সঙ্গে আরেকটা সম্পর্কিত নয়। ঘনত্বের ওপর ভিত্তি করে ৮০ শতাংশ বেশি বাতাসথাকেএই ব্লকে। ফলে সাধারণ কংক্রিটের ওজন যেখানে ২.০০০ থেকে ২.৫০০ কেজি/কিউবিক মিটার, সেখানে লাইটওয়েট কংক্রিটের ওজন হয় ৫০০ থেকে ৯০০ কেজি/কিউবিক মিটার। এটা ৮ এমপিএ (১,১৬০ পিএসআই), যা অনেকাংশে ৫০ শতাশের মতো কমপ্রেশিভ স্ট্রেন্থের কংক্রিটের সমতুল্য। এটা হালকা কমপ্রেশন স্ট্রেন্থের কাঠামোর জন্য আদর্শ। এই ব্লকের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে-

  • সাধারণ কংক্রিটের চেয়ে ওজন চার ভাগের একভাগ
  • অত্যন্ত সহজে ও দ্রুতগতিতে স্থাপন করা যায়
  • ব্লকগুলো মাপে সঠিক হওয়ায় একটা অন্যটার সঙ্গে মানিয়ে যায়
  • কার্বন স্টিল সামগ্রী দিয়ে কাটা, গোল করা, মসৃণ আকার প্রদান করা যায়
  • জয়েন্ট কম হওয়ার কারণে মর্টার কম লাগে
  • অতিরিক্ত ও তীব্র শব্দের অনুপ্রবেশে বাধা প্রদান করে
  • তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখে
  • পরিবেশের কম ক্ষতি করে

গ্যাসবেটন কংক্রিট ব্লকের সুবিধাসমূহ

অটোক্লেভড এরিটেডেট লাইটওয়েট সেসুলার কংক্রিট ব্লকে অনেক ভয়েড থাকায় তা হয় অত্যন্ত হালকা ওজনের। এই ব্লকগুলোর রয়েছে নানাসুবিধা। এগুলো হচ্ছে-

  • উৎপাদনকালে যে এয়ার ফিল্ড সেল তৈরি হয়, তা অত্যন্ত ভালো মানের থার্মাল সুবিধা দেয়। যেহেতু এই ব্লকে ইনস্যুলেশনের জন্য বাড়তি কোনো থার্মাল উপকরণ দরকার হয় না। তাপমাত্রা কমিয়ে ভবনের থার্মাল এফিসিয়েন্সি বাড়ায়। ফলে গরমে ও ঠান্ডায় ঘর থাকে আরামদায়ক।ফলে অর্থ ও শক্তির অপচয় রোধ করে।
  • এই ব্লকগুলোর থার্মাল ইনস্যুলেটরের পাশাপাশি রয়েছে চমৎকার শব্দরোধী ক্ষমতা। এর অসংখ্য সেল ঘরের মধ্যে শব্দ প্রবেশে বাধা দেয়।
  • ব্লকগুলোওজনে হালকা হওয়ায় পরিবহন খরচ কমে; শ্রমিক ব্যয়ও কমায়।
  • ব্লকগুলোওজনে হালকা হওয়ায় সহজেউত্তোলন করা যায় এবং আকারেবড় হওয়ায় দ্রুতগতিতে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা যায়।
  • সঠিক আকারে কেটে ব্যবহার করা যায় বিধায় অপচয় কম হয়।
  • এই ব্লকের রয়েছে অগ্নিপ্রতিরোধক ক্ষমতা। তা ছাড়া আগুন ধরার মতো কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিকও নির্গত করে না। 
  • এই কংক্রিট ব্লক বেশ পরিবেশবান্ধব। এটা প্রথাগত কংক্রিটের চেয়ে ৩০ শতাংশ বর্জ্য ও ৫০ শতাংশ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত কমায়। তা ছাড়া আদর্শ ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে। ফলে এটা গ্রিন বিল্ডিংকে সমর্থন করে।
  • এই ব্লক বিষ ও ক্ষতিকর রাসায়নিক মুক্ত। তাছাড়া এটা ইঁদুর-জাতীয় প্রাণীকে আকর্ষণ করে না।
  • ফাংগাস, মোল্ড, মাইক্রো অর্গানিজম, পোকমাকড় আক্রমণ করতে পারে না।
  • কখনো স্থাপনা ভাঙার দরকার হলে ব্লকগুলো সহজে অপসারণ করা সম্ভব এবং তা পুনরায় ব্যবহার করা যায়।

ব্যবহারের ক্ষেত্র

গ্যাসবেটন ব্লক অত্যন্ত উচ্চমানের থার্মাল ইনস্যুলেটিং কংক্রিট-বেসড বিল্ডিং মেটেরিয়াল। এটা স্থাপনার ভেতরে ও বাইরে সমানভাবে ব্যবহার করা যায়। এমনকি উঁচু ভবনের পার্টিশনওয়ালেও ব্যবহার সম্ভব। এই কংক্রিট ব্লক উদ্ভাবনের পর সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পায় মধ্যপ্রাচ্যে, যেখানে আবহাওয়া প্রচণ্ড উষ্ণ এবং ইউরোপে, যেখানে শীতে তাপমাত্রা নেমে যায় প্রায় হিমাঙ্কের নিচে। স্থাপনার অভ্যন্তরে স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে এই গ্যাসবেটন ব্লকগুলো অত্যন্ত সহায়ক হয়। এজন্য যেখানে স্বাভাবিক তাপমাত্রার তারতম্য বেশি, সেখানকার বাসিন্দারা এই ব্লক ব্যবহারে অধিক আগ্রহী। তবে নানা উপযোগিতার এ ব্লক শুধু ওই দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। ইন্টেরিয়র, ক্যাভিটি ও পার্টিশন ওয়াল, ফায়ারওয়াল, লোড-বিয়ারিং, নন-লোড বিয়ারিং ওয়াল, ফ্যাসাদসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত হচ্ছে এই ব্লক। এ ছাড়া যেসব স্থানে এ ব্লকের ব্যবহার রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে-

  • স্থাপনার ফ্যাসাদ
  • ভবনের সারফেস
  • বাউন্ডারি ওয়াল
  • পার্টিশন ওয়াল
  • বর্ণিল ডিজাইনের মঞ্চ
  • চিত্তবিনোদন পার্ক
  • বিনোদনকেন্দ্র
  • ফান হাউস
  • গেমস জোন প্রভৃতি

প্রাথমিকভাবে এ ধরনের নির্মাণশৈলী কম উচ্চতাবিশিষ্ট আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত হলেও ধীরে ধীরে এর ব্যবহার বহুতল ভবন নির্মাণের দিকেও প্রসার লাভ করেছে।

ব্লক স্থাপন পদ্ধতি

ব্লক বা প্যানেলগুলোকে সাধারণত ইটের দেয়ালের মতো করে স্থাপন করা হয়। বলা চলে ইটের বিকল্প পার্টিশন ওয়াল। ইটের মতোই এই ব্লকও সাধারণ সিমেন্ট-মর্টার দিয়েই গাঁথা হয়। তবে সাধারণ মর্টার ছাড়াও ডিসফোবিন, ডিউরোফিক্স এবং স্টোন গ্লু ক্যালসিফিক্সের মতো আঠা, মর্টার হিসেবেও ব্যবহার করা হয়, যা মর্টারের পুরুত্ব ৩ মিমি থেকে ৭ মিমি পর্যন্ত। এটা জমাটও বাঁধে দ্রুত।প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এবং সলিড উভয় ধরনের কয়েকটি আদর্শ সাইজে ব্লক তৈরি করে থাকে। সীমানা দেয়ালের জন্য গ্রুভ কাটা ইন্টারলক সিসেন্টম কিছু ব্লকও রয়েছে বাজারে।

গ্যাসবেটন ব্লক :প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

বাংলাদেশ গ্যাসবেটন ব্লক উৎপাদন ও ব্যবহারে একেবারেই পিছিয়ে রয়েছে। এখনো এ দেশে এ ধরনের কোনোউৎপাদন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। কিছু চীন ও ভারতীয় প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ দেশের পণ্যের প্রচার ও বিক্রয় প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এ দেশে। স্থাপত্যিক চাহিদা মেটাতে বিদেশ থেকে কিছু ব্লক আমদানি করা হলেওতা একেবারেই নগণ্য এবং বেশ ব্যয়বহুল। বাংলাদেশ যেহেতু বিল্ডিং মেটেরিয়ালস সামগ্রী উৎপাদনে বেশ এগিয়ে যাচ্ছে, অর্জন করছে স্বয়ংসম্পূর্ণতা; সে ক্ষেত্রে অত্যন্ত পরিবেশবান্ধব ও নান্দনিক এ ব্লক উৎপাদন শুরু করতে না পারলে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে নিঃসন্দেহে। স্থাপনার নন্দনতত্ত্বের বিবেচনা ছাড়াও যেহেতু বাংলাদেশের মাটির প্রকৃতি নরম। এখানে বহুতল স্থাপনার জন্য প্রয়োজন গ্যাসবেটনেরমতো লাইটওয়েট বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এ ধরনের উপকরণ ব্যবহার বৃদ্ধি ও উৎপাদন এখন সময়ের দাবি।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৭তম সংখ্যা, মে ২০১৮।

মঈন আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top