বর্তমানে বৈদ্যুতিক তারের সংযোগ নেই এমন বাড়ি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। শহুরে কলকারখানা ও উন্নত জীবনযাপনে করা বহুতল ভবন ছাড়িয়েও গ্রামগঞ্জে এখন সহজলভ্য বৈদ্যুতিক কেব্্ল বা তার। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে বৈদ্যুতিক তার যুক্ত নয়। লাইট, ফ্যান, রেফ্রিজারেটর, ইস্তিরি, চার্জার, রাইস কুকার, মাইক্রো ওয়েভ ওভেন, এয়ারকুলার, রুম হিটার, কম্পিউটার, বহুতল ভবনের লিফট সবকিছুতেই রয়েছে এই কেব্্লের ব্যবহার। কেব্্ল বা তার অনেক সহজ করেছে আমাদের নিত্যনৈমিত্তিক কাজকর্ম। এমনকি বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পরে জেনারেটর ও আইপিএস পরিবহনের মাধ্যম হিসেবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বৈদ্যুতিক এই কেব্্ল। কেবল বিদ্যুৎই নয়, ডেটা কমিউনিকেশনের বৃহত্তম মাধ্যমও এই বৈদ্যুতিক কেব্্ল। বর্তমান তথা আধুনিক জীবনযাত্রা এই বৈদ্যুতিক তার ছাড়া একদমই অচল। বৈদ্যুতিক কেব্্ল আবিষ্কারের মাধ্যমে সূচিত হয়েছে সোনালি যুগের নতুন অধ্যায়। আসুন, তবে জানা যাক গুরুত্বপূর্ণ এই উপাদানটির বাসাবাড়ির ব্যবহার সম্পর্কে।
বৈদ্যুতিক তারে রয়েছে ভিন্নতা। কলকারখানা, করপোরেট হাউস বা অফিসে যে ধরনের তার ব্যবহার হয়, তা আবার বাসাবাড়ির জন্য প্রযোজ্য নয়। যে জায়গায় যে ধরনের কেব্্ল বা তার ব্যবহার করতে হবে তার সঠিক জ্ঞান না থাকলে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনাও। কোন ধরনের কেব্্ল কোন ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে, কোন কেব্ল কতটুকু বিদ্যুৎ বহন করতে পারবে এই সম্পর্কিত ধারণা থাকাটা অতীব জরুরি। অপর দিকে বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক তারের অসচেতনতামূলক ব্যবহারে যেকোনো ধরনের বিপদের আশঙ্কা কিন্তু থেকেই যায়। তাই সবার উচিত বৈদ্যুতিক কেব্ল বা তার ব্যবহারে সচেতন হওয়া। বাসাবাড়িতে সাধারণত ভোল্ট ও আরএম এই দুই হিসেবে কেব্ল ব্যবহৃত হয়। বাসাবাড়িতে সাধারণত ২২০-২৪০ ভোল্ট পর্যন্ত পরিবহনকারী কেব্ল ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে আরএম ১.০ থেকে আরএম ৭.০ মাত্রার তার ব্যবহৃত হয়। ভোল্ট হচ্ছে তারে পরিবহন করা বিদ্যুতের পরিমাপ। অপর দিকে আরএম হচ্ছে তারের ভেতরে থাকা গাঠনিক অবস্থা।
কোম্পানিভেদে দরদাম
বিআরবি, পারটেক্স, বিজলী, পলি, বিবিএস, সুপার সাইন, আরআর কেব্ল, ইস্টার্ন কেব্ল ও প্যারাডাইস এই কোম্পানিগুলোর কেব্ল বা তারই বাংলাদেশের অধিকাংশ স্থানের বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত হয়। বাসাবাড়ির কেব্ল কেনাবেচা হয় মিটার ও কয়েলে। বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত কেব্ল নিজেদের প্রয়োজনমতো গজ হিসেবেও বিক্রি হয়। ঘরের টুকিটাকি কাজে কম করে হলেও কেব্ল কিনে থাকে মফস্বল ও শহরের বাসিন্দারা।
মিটার ও কয়েল হিসেবেই কেব্ল বেচাকেনা হয়। ১০০ মিটার তারের সমপরিমাণ হচ্ছে ১ কয়েল। ধরনভেদে আরএম হিসেবে তারের মূল্যমান-
ওয়্যারিং বা ঘরে বৈদ্যুতিক তার লাগানো
বাসাবাড়িতে কেব্ল বা তার ব্যবহারের আগে বাসাবাড়ির পরিবেশকে কেব্ল ব্যবহারের উপযোগী করা হয়। কেব্ল ব্যবহারের জন্য হাউস ওয়্যারিং বা ঘরে বৈদ্যুতিক তার লাগাতে হয়। এখন প্রায় সব ঘরেই বিদ্যুতের ছোঁয়া লেগেছে। গ্রামের অনেক ঘরেই এখন সুইচ টিপলে বাতি জ্বলে, ফ্যান ও ফ্রিজ চলে। তবে সুইচ টিপে বিদ্যুৎ বাতি জ্বালানো সহজ কাজ হলেও ঘরে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করার কাজটি এত সহজ নয়। এর জন্য দরকার একজন দক্ষ ইলেকট্রিক মিস্ত্রির।
সাধারণত কোন ঘরের কোথায় ফ্যান চলবে, কোথায় বাল্ব জ্বলবে তা আগে ঠিক করে নিতে হয়। এরপর সে অনুযায়ী মিস্ত্রির সহায়তায় বিদ্যুতের তার টেনে নেওয়া হয়। বিদ্যুৎ থাকা অবস্থায় বিদ্যুতের তার ধরা বিপজ্জনক। তাই কাজটি করতে হয় খুব সাবধানে। এ ক্ষেত্রে একজন মিস্ত্রি বিদ্যুতের তারকে জায়গামতো লাগায়। এই কাজকে আমরা বলি ঘরে বৈদ্যুতিক তার লাগানো বা হাউস ওয়্যারিং। আর হাউস ওয়্যারিং বা নিয়মমতো তারের সুন্দর বিতরণব্যবস্থা হতে পারে বহুমাত্রিক। বাসাবাড়িতে তার ব্যবহারে যে যে পদ্ধতি অনুসৃত হয়-
অভ্যন্তরীণ বা ভেতরের ওয়্যারিং
ঘরের ভেতরে যে ওয়্যারিং করা হয় তাকে অভ্যন্তরীণ ওয়্যারিং বলে। এই ওয়্যারিং প্রধানত দুই ধরনের। ক. কনসিলড ওয়্যারিং, খ. ওপেন ওয়্যারিং। কনসিলড ওয়্যারিং হলো দেয়ালের ভেতরে যে ওয়্যারিং করা হয়। এই ওয়্যারিং পাইপের ভেতর দিয়ে করা হয়। বাড়ি তৈরির সময় এই ব্যবস্থা করে নিতে হয়। আর ওপেন বা সারফেস ওয়্যারিং হলো ঘরের দেয়ালের ওপরে চ্যানেল বা পাইপের সাহায্যে যে ওয়্যারিং করা হয়।
বাহ্যিক বা বাইরের ওয়্যারিং
ঘরের বাইরে যে ওয়্যারিং করা হয় তাকে বাহ্যিক বা বাইরের ওয়্যারিং বলে। বিদ্যুতের মূল খুঁটি থেকে বাড়ির মিটার পর্যন্ত বিদ্যুৎ নেওয়ার জন্য এই ওয়্যারিং করা হয়। বাসাবাড়িতে তার ব্যবহারের আগে হাউস ওয়্যারিং অবশ্যই করাতে হবে। হাউস ওয়্যারিং ছাড়া বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ অসম্ভব।
যা যা লাগবে হাউস ওয়্যারিংয়ে
হাউস ওয়্যারিং করতে দুই ধরনের জিনিসপত্র লাগবে। ১. স্থায়ী জিনিসপত্র, ২. নিয়মিত লাগে এমন জিনিসপত্র ও ৩. অন্যান্য জিনিসপত্র।
১. স্থায়ী জিনিসপত্র
এ কাজে এ রকম জিনিসগুলো হলো: প্লায়ার্স বা প্লাস, ড্রাইভার, এভো মিটার, ছুরি, কাঁচি, স্টার স্ক্রু ড্রাইভার, হ্যাক-স, হ্যান্ড ড্রিল মেশিন, ইলেকট্রিক ড্রিল মেশিন, ইনস্যুলেশন রিমোভার, হাতুড়ি, সাইড কাটিং পাস, ফ্লাট স্ক্রু ড্রাইভার, টেস্টার ও মেজারিং টেপ। এসব স্থায়ী জিনিসপত্র নিকটস্থ জেলা ও উপজেলা শহরের ইলেকট্রিক বা হার্ডওয়্যারের দোকানে পাওয়া যায়।
২. নিয়মিত লাগে এমন জিনিসপত্র
হাউস ওয়্যারিংয়ের কাজে আমাদের লাগবে পিভিসি বা প্লাস্টিক টেপ, হ্যাকস ব্লেড বা লোহা কাটা ব্লেড, ওয়াল ড্রিল বিট (৬ মিলি মিটার), রঙিন চক, পেনসিল ও সুতা। এদের মধ্যে প্রথম তিনটি জিনিস আমরা পাবো হার্ডওয়্যারের দোকানে। আর চক, পেনসিল ও সুতা যেকোনো স্টেশনারি দোকান থেকে কেনা যাবে।
৩. অন্যান্য জিনিসপত্র
হাউস ওয়্যারিং করার জন্য আরও কিছু জিনিসপত্র আমাদের লাগবে। যে বাড়িতে কাজ হবে তার মালিককে এসব জিনিস সংগ্রহ করতে হবে, যা যা লাগবে:
- চীনা মাটির ফিউজ বা কাট আউট প্লাস্টিক
- প্লাস্টিক ফিউজ বা কাট আউট
- মেইন সুইচ
- এনার্জি মিটার
- পিয়ানো সুইচ
- টুপিন সকেট
- টাম্বলার সুইচ
- সিলিং রোজ
- সিলিং রোজ বসানোর বোর্ড স্ক্রু
- রাওয়াল বা রয়েল প্লাগ
- ব্যাটেন হোল্ডার
- প্যানডেন্ট হোল্ডার
- সুইচ বোর্ড
- প্লাস্টিক চ্যানেল
- ফ্যান
- বাল্ব
- টিউব লাইট
- টিউব ব্যালেস্ট
- টিউব স্টার্টার
- টিউব হোল্ডার
- এক খেইবিশিষ্ট তার
- বহু খেইবিশিষ্ট তার।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৭তম সংখ্যা, মে ২০১৮।