জলবায়ুর বিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের বিরাট অংশ সাগরে নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কায় যখন শংকিত সবায়, ঠিক সেই মুহূর্তেই নতুন আশা জাগাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা অসংখ্য চর-দ্বীপ। সমুদ্রের অথৈ জলে প্রাকৃতিকভাবেই সৃষ্টি হচ্ছে বিশাল বিশাল চর, গড়ে উঠছে মাইলের পর মাইল ভূখন্ড। চরগুলো যেভাবে পলিবাহিত হয়ে জেগে উঠছে, তা অব্যাহত থাকলে সৃষ্টি হবে বাংলাদেশের চেয়েও বড় এক ভূখন্ড। এ যেন নতুন এক বাংলাদেশের হাতছানি! তবে আধুনিক ও যুগোপযোগী পরিকল্পনা না নিলে যা হবে অমীয় সম্ভাবনার অকাল মৃত্যুর কারণ। পরিকল্পনাবিদ, গবেষক, নদী ও ভূ-বিশেষজ্ঞের সমন¦য়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নদীভাঙন রোধ, বন সৃষ্টি, ইকো ও অ্যাগ্রো-ট্যুরিজম, পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল, নৌ-বন্দরের মতন কর্মকান্ড গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেই কেবল অদূরভবিষ্যতে সম্ভাবনাময় এক বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব। নতুন নতুন এসব ভ‚খন্ডই হতে পারে সমৃদ্ধ এমন দেশ প্রতিষ্ঠার মূল নিয়ামক।
সাগরের বুকে নতুন চর
প্রতিবছর বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন পয়েন্টে জেগে ওঠে অন্তত ২০ থেকে ২৫ বর্গমাইল নতুন চর। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমীক্ষায়ও এ তথ্যের সত্যতা উঠে আসে। পাউবোর মেঘনা মোহনা সমীক্ষার তথ্যমতে, বিগত কয়েক বছরে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কক্সবাজার, পটুয়াখালী, ফেনী ও ভোলায় সৃজিত হয়েছে প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারের অধিক চর-দ্বীপ। পুরোপুরি জেগে ওঠার অপেক্ষায় আরও কয়েকগুণ ডুবোচর। বঙ্গোপসাগর কোলে দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব সৈকত ও উপকূলের তটরেখা প্রায় ৭১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ। এই তটরেখার খুব কাছেই বিভিন্ন স্থানে জাগছে ছোট ছোট নতুন সব চর-দ্বীপ। নোয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় প্রতিবছর জাগছে অন্তত ৫০-৭০ হাজার হেক্টর জমি। বয়ারচর, নঙ্গলিয়া, নলেরচর, কেরিংচর এবং পূর্বদিকে উড়িরচর পর্যন্ত যে বিশাল এলাকা ইতিমধ্যে জেগে উঠেছে, তা ক্রমাগত দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে হাতিয়াকে ছুঁই ছুঁই করছে। এ চরাঞ্চল মূল হাতিয়ার চেয়েও বড়। এ ছাড়া হাতিয়ার দক্ষিণে নিঝুম দ্বীপ, পশ্চিমে ঢাল চর, চর মোহাম্মদ আলী, চর ইউনুস, চর আউয়াল, মৌলভীর চর, তমরুদ্দির চর, জাগলার চর, উত্তরে নলের চর, কেয়ারিং চর, জাহাইজ্জার চর, নঙ্গলিয়ার চর, দক্ষিণে কালাম চর, রাস্তার চরসহ অন্তত ১৫টি দ্বীপ ১৫-২০ বছর আগে থেকে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জেগে উঠছে। এসব চরের আয়তনও বিশাল। এখনো ডুবোদ্বীপ রয়েছে অন্তত ৪০-৫০টি। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সেগুলোও জেগে উঠবে ।
হাতিয়ার পূর্ব-দক্ষিণে বিশাল ভূমি এখন স্বর্ণদ্বীপ নামে খ্যাত। দ্বীপের আয়তন একটি উপজেলার সমান। স্বর্ণদ্বীপের ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে ভাসানচর। ভাসানচরের আয়তন প্রায় ২৫০ বর্গকিলোমিটার। ভাসানচরের দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান ১০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের গাঙ্গুরিয়ার চরের। খুব শিগগিরই এই চরে শুরু হবে চাষাবাদ। চট্টগ্রামের সন্দীদ্বীপের ১৫০ বর্গকিলোমিটার দ্বীপের চারপাশ ঘিরে গড়ে উঠেছে নতুন ভূমি, যা সন্দীদ্বীপের প্রায় দ্বিগুণ। এ ছাড়া ভোলার মনপুরা, সুন্দরবন ও সাতক্ষীরা রেঞ্জের আশপাশে যুক্ত হওয়া নতুন ভূখন্ডকে বিবেচনায় আনলে সব মিলিয়ে সীমানায় যুক্ত হওয়া নতুন ভূখন্ডের পরিমাণ হবে অন্তত ১০ লাখ হেক্টর। বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন স্থানে ১৫-২০ বছর আগে থেকে জেগে থাকা বিভিন্ন দ্বীপখন্ড ভরা জোয়ারেও আর তলিয়ে যাচ্ছে না, বরং দিন দিনই বেড়ে চলেছে এর আয়তন। ক্রস ড্যাম আর প্রযুক্তিগত উদ্যোগ নেওয়া হলে কয়েক বছরের মধ্যে ওই এলাকার আয়তন দাঁড়াবে প্রায় ১৫ হাজার বর্গমাইল। এসবই জানান দিচ্ছে সম্ভাবনার হাতছানির।
চর জাগার নেপথ্যে
দেশের প্রধান প্রধান নদীর পানি যায় হাতিয়া চ্যানেল দিয়ে বঙ্গোপসাগরে। হিমালয় থেকে উৎপত্তি হওয়া নদীগুলোর পলিমাটি হাতিয়া চ্যানেলে এসে জমা হওয়ায় প্রতিবছর সৃষ্টি হচ্ছে প্রচুর ডুবোচরের। ভোলা জেলার মনপুরা, চরফ্যাশনসহ নিঝুম দ্বীপ, স্বর্ণদ্বীপ, ভাসানচরসহ অনেক দ্বীপ এমনই ডুবোচর থেকে সৃষ্ট। প্রাকৃতিক কারণ ছাড়াও ক্রসড্যামের মাধ্যমেও উদ্ধার করা হয়েছে অনেক জমি। যেমন, দ্বীপরাষ্ট্র নেদারল্যান্ড ডুবোচর ও চর জাগিয়ে মূল ভূখন্ডের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে বিশে^ সবচেয়ে সফল। বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূল ও মোহনায় ভূমি উদ্ধারে অবলম্বন করা হচ্ছে একই কৌশল। কৌশলটি হচ্ছে, প্রথমে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে উপকূলের পানি নিমগ্ন থাকা অংশকে ঘিরে ফেলা। এরপর পানিশূন্য হয়ে পড়লে জায়গাটিতে সৃষ্টি হয় চরের। পাশাপাশি ক্রসড্যামের কারণে মোহনায় জমে পলিমাটি। তাও সৃষ্টি করে নতুন ভূখন্ডের। নেদারল্যান্ডসে পাঁচ ভাগের এক ভাগ ভূখন্ড এ উপায়ে উদ্ধার করা। নেদারল্যান্ডস সরকার ও কৃষি উনয়ন্নবিষয়ক আন্তর্জাতিক তহবিল (ইফাড)-এর আর্থিক সহায়তায় ১৯৭০ সাল থেকেই এমন কাজ সমন্বিতভাবে করছে বাংলাদেশ। সমন্বিত এমন কার্যক্রমের সুফলও মিলছে। প্রতিবছর গড়ে অন্তত ২০ বর্গকিলোমিটার নতুন চরের দেখা মিলছে।
জেগে ওঠা চরে কর্মযজ্ঞ
নতুন জেগে ওঠা চর-দ্বীপে বন বিভাগ চালিয়ে যাচ্ছে বনায়ন কার্যক্রম। কিছু কিছু চরে গড়ে উঠছে জনবসতি। চলছে চাষাবাদ, শুঁটকি তৈরি, হাঁস-মুরগির খামার, গরু-ছাগলের বাথান। তবে কিছু কিছু দ্বীপে চলছে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ড। এর মধ্যে স্বর্ণদ্বীপের ৮৭ হাজার একর জমি সেনাবাহিনীকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য অবকাঠানো নির্মাণ করা হয়েছে ভাসান চরে। এসব চর নদীভাঙনকবলিত জনগোষ্ঠীকে আশার আলো দেখালেও জলদস্যু ও বনদস্যুদের ভয়ে বাকি দ্বীপগুলোতে এখনো বসবাস শুরু হয়নি। মোটা অংকের টাকা দিয়েই কেবল বসতি গড়তে পারছে তারা।
নতুন ভূখন্ডে যত উন্নয়ন কর্মকান্ড
সমুদ্রবক্ষে ব্যাপক সম্ভাবনা সত্ত্বেও এসব ভ‚খন্ড নিয়ে সামগ্রিক মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করতে এখনো তেমন সরকারি উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। যদিও স্বর্ণদ্বীপ, ভাসানচর, মহেশখালী, সন্দ্বীপসহ সাগর উপকূলের বিভিন্ন স্থানে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তবে তা কোনো সামগ্রিক ও সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ নয়। এক দশক আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম সফরকালে মুহুরি প্রজেক্ট এলাকায় জেগে ওঠা বিশালকায় চরভূমির বিস্তারিত জেনে বিষ্ময় প্রকাশ করেন। সাগরের বুকে জেগে ওঠা ভূমিতে তিনি শিল্পপার্ক নির্মাণের নির্দেশ দেন। যার ধারাবাহিকতায় ফেনীর সোনাগাজী ও চট্টগ্রামের মীরসরাইতে ৩০ হাজার একর ভ‚মিতে বিশাল আয়তনের ‘বঙ্গবন্ধু বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ গড়ে তোলা হচ্ছে। বৃহত্তম এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্মাণ সম্পন্ন হলে প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তত ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এ ছাড়া হাতিয়া, সুবর্ণচর, সন্দ্বীপ ও অন্যান্য উপকূলে শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি ব্যাপক বিনিয়োগের লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। জেগে ওঠা নতুন ভূমি মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করতে কাজও শুরু করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়।
সমুদ্রতটে জেগে ওঠা নতুন ভূখন্ড ব্যবহারের উপযোগী করতে সরকারের সঙ্গে কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিস (সিআইজিএস), চর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্রজেক্ট (সিডিএসপি), অ্যাকুয়াচারি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইডিপি), ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংসহ (আইডবিøউএস) এক ডজন সংস্থা। জেগে ওঠা নতুন ভূমির ফিসিবিলিটি স্টাডি করে এটি ব্যবহারের কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে তারা সরকারকে অবহিতও করেছে।
উন্নয়ন কর্মকান্ডের রূপরেখা
একটি দেশে ভূখন্ডের পরিমাণ বাড়া মানেই অফুরন্ত সম্ভাবনার হাতছানি; অর্জনে এটি অমূল্যও বটে! সমুদ্রবক্ষে প্রাপ্তির খাতায় যোগ হয়েছে নতুন ভূখন্ড; এখন শুধু দরকার বুদ্ধিদীপ্ত সামগ্রিক টেকসই পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ। দেশে দ্রæত জনসংখ্যা বাড়ায় আয়তনের তুলনায় ভ‚মি কম হওয়ায় আবাসন, বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত চাহিদা মেটাতে ফসলি জমি কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। অন্যদিকে নদীভাঙনের শিকার হয়ে লাখ লাখ মানুষ হয়ে পড়ছে গৃহহীন। নতুন চর ও দ্বীপ আমাদের জন্য এসেছে আশীর্বাদ হয়ে। পরিকল্পিতভাবে এসব সম্ভাবনাময় সম্পদের সদ্ব্যবহার করতে দেশের ভূমির যথাযথ ব্যবস্থাপনা জরুরি। সুপরিকল্পিত ও পরিবেশসম্মতভাবে ভ‚মি ব্যবস্থাপনা করতে হবে। যদিও জেগে ওঠা নতুন ভূমিকে কেন্দ্র করে সরকার ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চল করার পরিকল্পনা করেছে; চলমান রয়েছে বেশ কিছু প্রকল্প। তবে সবার আগে দরকার সামগ্রিক পরিকল্পনার মাধ্যমে উন্নয়নকার্য পরিচালনা করা। সেখানে বসতিহীন প্রান্তিক মানুষের আবাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, সমুদ্র উপকূলের তলদেশে তেল-গ্যাসসহ মূল্যবান খনিজ সম্পদ, মৎস্য, লবণ, ঝিনুক-মুক্তা-কড়িসহ মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ ইত্যাদি পরিকল্পনা দরকার। টেকসই উন্নয়নে যে যে পদক্ষেপসমূহ নেওয়া যেতে পারে-
- পরিকল্পিত ও সমনি¦ত সামগ্রিক মাস্টারপ্ল্যান
- ইকো-ট্যুরিজম
- অ্যাগ্রো-ট্যুরিজম (কৃষি পর্যটন) ও খামার উন্নয়ন
- রিভার ট্যুরিজম (নৌ-পর্যটন)
- সংরক্ষিত বন ও বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য
- বিশেষায়িত পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল।
পরিকল্পিত ও সমনি¦ত সামগ্রিক মাস্টারপ্ল্যান
বাংলাদেশের উন্নয়নে সবচেয়ে বড় ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদি সামগ্রিক পরিকল্পনা ও এর প্রয়োগ। সমন¦য়ের ঘাটতি সর্বত্রই লক্ষণীয়। নতুন ভ‚খন্ডকে ঘিরে পরিকল্পিত ও সমনি¦ত সামগ্রিক মাস্টারপ্ল্যান করা অত্যন্ত জরুরি। সেই অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনাও নিতে হবে। এসব মাস্টারপ্ল্যান ও কর্মপরিকল্পনায় যেসব বিষয় গুরুত্ব প্রদান জরুরি; সেগুলো হচ্ছে-
- দ্বীপের চারপাশে উপযোগী বৃক্ষের সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা
- নতুন চরে লবণসহিষ্ণু জাতের ম্যানগ্রোভ গাছ রোপণ
- প্রয়োজনে কিছু স্থানে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ
- পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবকাঠামো উন্নয়ন ও স্থাপনা নির্মাণ
- প্রতিটি দ্বীপে পরিবেশবান্ধব সৌর বিদ্যুতায়ন
- বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থা ও ব্যবহার
- কিছু কিছু দ্বীপে নেতয়া যেতে পারে বায়োবিদ্যুৎ প্রকল্প।
ইকো-ট্যুরিজম
বিশে^ পর্যটন অত্যন্ত লাভজনক শিল্প। যেকোনো দেশের অর্থনীতিতে পর্যটন রাখতে পারে ব্যাপক অবদান। পর্যটনের সবচেয়ে বড় নিয়ামত প্রকৃতি তথা সাগর, নদী, পাহাড়, বন এমনকি নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতি। পর্যটকদের বিমোহিত করার মতো এসবের প্রায় সবকিছুই রয়েছে বাংলাদেশে। তবে সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে সম্ভাবনাময় এই খাতটি মুখ থুবড়ে পড়ছে। পর্যটনশিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন অবকাঠামো একেবারেই অপরিকল্পিত। এসব অবকাঠামো তৈরির সময় কখনো বিনষ্ট হচ্ছে পরিবেশ, হারাচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। আবার মানুষের অনাকাক্সিক্ষত আচরণের ফলে বিলুপ্ত হচ্ছে এসব উপকরণ বা জীববৈচিত্র্য। এ অবস্থায় ইকো-ট্যুরিজম তথা পরিবেশগত পর্যটনের বাস্তবায়ন ভীষন জরুরি। এর গুরুত্ব অনুধাবন করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, চীন, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, ভারতসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশ ইকো-ট্যুরিজমের বিকাশে মনোনিবেশ করেছে। ভারতবর্ষের কেরালা, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরাখন্ড, হিমাচল ও অন্যান্য প্রদেশ এই সেক্টরে ব্যাপক আয় করছে। ইকো-ট্যুরিজমের মাধ্যমে প্রকৃতিপ্রেমীরা দায়িত্বশীল ভ্রমণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক পরিবেশে গাছপালা, পশুপাখি, প্রকৃতির ঐশ্বরিক সৌন্দর্য অধ্যয়ন ও উপভোগ করে। এই ট্যুরিজমের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয় জনগণ অরণ্য নিধন ও বন্য প্রাণী হত্যা থেকে বিরত থাকে। এই পর্যটনের সুবিধা হচ্ছে-
- ন্যূনতম পরিবেশগত প্রভাব
- দায়িত্বশীল ভ্রমণের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় মানুষের কল্যাণ সাধন
- পর্যটন এলাকার অর্থনৈতিক বিকাশে পরিবেশ সৃষ্টি
- কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি
- বিভিন্ন বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ
- স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সর্বাধিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে প্রভাবিত না করা
- বিভিন্ন এলাকার মানুষের সমাগম ঘটায় সংস্কৃতিক এই মিলন।
অ্যাগ্রো-ট্যুরিজম (কৃষি পর্যটন) ও খামার উন্নয়ন
কৃষি পর্যটন অবকাশযাপনের এমন এক মাধ্যম, যেখানে ভ্রমণকারীরা কৃষকের বাড়ি বা খামারে অবস্থান ও আতিথেয়তা গ্রহণ করতে পারে। অবকাশযাপনের পাশাপাশি তারা হাতেকলমে বিভিন্ন ফুল-ফল-ফসল চাষ ও গ্রামীণ সংস্কৃতি উপভোগের সম্যক সুযোগ লাভ করে। উদাহরণসরূপ বলা যায়, পশ্চিমা অনেক দেশেই মানুষজন বিনোদনের জন্য নিয়মিত খামারে (ফার্মে), আঙুরখেতে, আপেল বাগানে, মাছ ধরতে যায়। এ সময় প্রতিটি খামারেই চেষ্টা করা হয় অতিথিরা সপরিবারে যেন মনে রাখার মতো কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। অবকাশকালীন কর্মকান্ডের মধ্যে থাকে-
- কৃষিপদ্ধতি সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান আহরণ
- হাতেকলমে ফল ও সবজি চাষ
- পশুপাখি পালন ও খামার সম্পর্কে ধারণা লাভ
- মাছ ধরা
- ঘোড়ায় বা মহিষে চড়া
- মধু আহরণ
- ষাঁড়ের লড়াই, গরুর গাড়ির দৌড়, রান্না করা ও গ্রামীণ খেলাধুলায় অংশগ্রহণ
- স্থানীয় ও আঞ্চলিক বিভিন্ন পণ্য অথবা হস্তশিল্পসামগ্রীর তৈরিশৈলী দেখা, ক্রয়ের সুযোগ প্রভৃতি।
বাংলাদেশে এ ধারণা নতুন হলেও নিউজিল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, পর্তুগাল, ভুটান, নেপাল, জ্যামাইকা, উগান্ডা, আয়ারল্যান্ড, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশে রয়েছে এর বহুল প্রচলন। বাংলাদেশ যেহেতু কৃষিপ্রধান দেশ। তাই সুজলা-সুফলা এই দেশটিই হতে পারে কৃষিভিত্তিক পর্যটনের স্বর্গভূমি। একদিকে যেমন পর্যটকদের জন্য ভ্রমণ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ জড়িত, তেমনি দেশের কৃষিজ পণ্য ও বাজার স¤প্রসারণে পর্যটনভিত্তিক এলাকাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ দেশেও কৃষি পর্যটনে আকর্ষণের কমতি নেই। যেমন: বরিশালের স্বরূপকাঠির ভাসমান পেয়ারা বাজার; গদখালী, যশোরের ফুলের রাজ্য; রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাগান; দিনাজপুরের লিচু বাগান, সিলেটের চা-বাগান প্রভৃতি। এরই মধ্যে এগুলো দেশীয় পর্যটকদের কাছে বিশেষ পর্যটন আকর্ষণ হয়ে উঠলেও যথাযথ প্রচারের অভাবে ও নানা প্রতিবন্ধকতায় বিদেশি পর্যটকদের নজরকাড়া সম্ভব হয়নি। পরিকল্পিত বিজ্ঞানসম্মত ও প্রযুক্তিবান্ধব কৃষিখামার স্থাপন করার মাধ্যমে পর্যটনের এই মাধ্যমেও এগিয়ে যেতে পারি আমরা।
রিভার ট্যুরিজম
নদীমাতৃক বাংলাদেশে রিভার ট্যুরিজমই (নৌ-পর্যটন) হতে পারত পর্যটনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মাধ্যম। অথচ অত্যন্ত সম্ভাবনার এই খাতটিকে আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। মিসরের নীল নদে নৌ-পর্যটন অত্যন্ত জনপ্রিয়, প্রতিদিন শত শত পর্যটক নীল নদে বিলাসবহুল জাহাজে করে নৌ-ভ্রমণ করে, যার মাধ্যমে দেশটি বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। এ ছাড়া ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, অফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, নেপাল, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে নৌ-পর্যটন বেশ জনপ্রিয়। বাংলাদেশের পদ্মা, মেঘনা, যমুনার মতো বিশাল-বক্ষা নদীগুলো নিয়ে গড়ে উঠতে পারে ব্যাপক আকারে পর্যটন কর্মকান্ড। বরিশাল রুটে চলা শত বছরের পুরোনো প্যাডেল স্টিমারগুলো বিদেশি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। নৌ-ভ্রমণ, কায়াকিং, রিভার ক্রুজ, ইয়াট, নৌকাবাইচ, নৌকায় রাত্রিযাপনের সুবিধা ইত্যাদি ব্যবস্থা গ্রহণ করে উপকূলীয় এলাকাগুলো হয়ে উঠতে পারে নৌ-পর্যটনের স্বর্গক্ষেত্র।
সংরক্ষিত বন ও বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য
যেকোনো দেশের মোট আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভ‚মি থাকা প্রয়োজন। অথচ এ দেশে তা ১০ শতাংশও নেই। অতীতে দেশজুড়ে প্রচুর বন্য প্রাণীর বিচরণ ছিল, যার সিংহভাগই বিলুপ্ত হয়ে গেছে বন না থাকায় এবং ব্যাপক শিকারের ফলে। নতুন চরগুলোকে স্থায়ী রূপ দিতে বন সৃজনের বিকল্প নেই। পাশাপাশি বন্য প্রাণী বনের বাস্তুতন্ত্র ঠিক রাখে। এ জন্য পরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব প্রদান করা উচিত বন ও বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য সৃষ্টিতে।
সুন্দরবন, সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের সর্বত্রই বনাঞ্চল ও বন্য প্রাণী মারাত্মক সংকটে। নিঝুম দ্বীপের বন ও ২৫ হাজার হরিণের অস্তিত্ব ব্যাপক হুমকির মুখে। বনের আশপাশের জমিতে ভূমিহীনদের বসবাস আর বন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে স্থানীয় দস্যু ও জনপ্রতিনিধিরা অবাধে গাছ কেটে পাচার ও হরিণ শিকারে যেমন কমছে বনের আয়তন, সেই সঙ্গে বিলীন হচ্ছে হরিণের অস্তিত্ব। নষ্ট হচ্ছে দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ভারসাম্য। অথচ সংরক্ষিত বন ও বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য হলো এমন বনাঞ্চল, যেখানে বন্য প্রাণীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় এবং তাদের প্রজনন ও আবাস নিরাপদ রাখতে শিকারিদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি থাকে। এ ছাড়া এসব বনের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ থাকে। যেমন-
কোনো বন বা জলাভূমিকে অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হলে ওই এলাকায় বসবাসরত জনগোষ্ঠী; যেমন, জেলে, নৌকাচালক ইত্যাদি পেশাগত, প্রথাগত বা জীবন-জীবিকার অধিকার সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে
কোনো ব্যক্তি অভয়ারণ্যে চাষাবাদ করতে পারবে না
কোনো শিল্পকারখানা স্থাপন বা পরিচালনা করতে পারবে না
প্রয়োজনে সীমিত পরিসরে পর্যটকদের চিত্তবিনোদনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থাপনা রাখা যেতে পারে, তবে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য কোনো পর্যটন দোকান, কটেজ বা হোটেল নির্মাণ ব্যতীত রাস্তা, সেতু, ভবন, বেষ্টনী বা প্রতিবন্ধক প্রবেশ তোরণ নির্মাণ ও সীমানা চিহ্নিতকরণ অথবা এই ধরনের অন্যান্য কাজ, যা অভয়ারণ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আবশ্যক, তা করতে অনুমতি প্রদান করতে পারবে
এই ধরনের বনে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সুযোগ থাকবে।
বিশেষায়িত পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চল
শিল্পকারখানার দূষিত বর্জ্য পরিবেশদূষণের অন্যতম মাধ্যম। তা ছাড়া আমাদের দেশে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর তেমন নিয়ন্ত্রণ নেই। অধিকাংশ কারখানাতেই বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি নেই, থাকলেও অনেকে ব্যবহার করে না। তা ছাড়া কিছু কারখানা অত্যন্ত দাহ্য ও ক্ষতিকরণ উপাদান উৎপাদন করে থাকে, যা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক। আর তাই এসব দিক বিবেচনায় নিতে দ্বীপ-চরগুলোতে পরিবেশবান্ধব বিশেষ শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে হবে, যা হবে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে সেসব শিল্পকে নির্ধারণ করে দেবে, যেগুলো মাটি, বাতাস ও পানির কোনো ক্ষতি করবে না কিংবা করলেও কম ক্ষতি হবে। পেট্রোকেমিক্যাল ও পারমাণবিক কারখানা কোনোভাবেই স্থাপন করা যাবে না। কারণ, এগুলো মারাত্মক দাহ্য হওয়ায় দুর্ঘটনা ঘটলে তা বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে। যদিও ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর’-এর আশপাশে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা নিষিদ্ধসহ ১১ দফা অনুশাসন প্রদান করা হয়েছে, এর পাশাপাশি যে বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে-
- সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (ইটিপি)
- সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্লান্ট
- বায়োগ্যাস প্লান্ট
- সৌরবিদ্যুৎ প্লান্ট
- বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও জলধারা তৈরি
- পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো ও সহজ যাতায়াতব্যবস্থা
- চাকরিজীবী, শ্রমিক, কর্মচারীদের মানসম্মত আবাসিক ব্যবস্থা
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, বিনোদনকেন্দ্র, হাসপাতালের ব্যবস্থা প্রভৃতি।
প্রকল্প বাস্তবায়নে যত চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের মানচিত্রে যুক্ত হতে যাচ্ছে বিপুল আয়তনের ভূখন্ড, এটা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জও কিন্তু কম নয়। এ কথা অনস্বীকার্য, বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর বিবর্তনে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলে চর জাগলেও সাগরের গড় উচ্চতা বেড়ে নি¤œাঞ্চল ডুবে যাওয়া ও লোনা পানি উপকূলে প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে। তা ছাড়া উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ¡াস, বন্যা যেন নিত্যসঙ্গ। এসব দুর্যোগ রোধে প্রকৃতি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনা জরুরি। সাগরের বুকের ভূমি উদ্ধার ও ব্যবস্থাপনার জন্য যেসব প্রযুক্তির প্রয়োজন, সেগুলো বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই উদ্ভাবন করেছেন। তবে এ মুহূর্তে পরিবেশগত বিপর্যয়ের ফলে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠী রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন। এ জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া এখনই জরুরি। যেমন-
- পানি ও পলি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার
- জলবায়ুর বিবর্তন ও লোনা পানি সহনীয় বৃক্ষের ব্যাপক বনায়ন
- ভূমির ক্ষয় ও ভাঙন রোধ
- নদীর নাব্যতা বজায় রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং
- নদীর স্রোতোধারা বজায় রাখতে গতিপথ পরিবর্তন না করা এবং দখলমুক্ত রাখা
- পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠা
- বন রক্ষা ও পর্যটনের উন্নয়নে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ ও তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা
- দেশের সব সংস্থার মধ্যে সমন¦য়সাধন নিশ্চিতকরণ।
তথ্যসূত্র:
ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডবিøউএম)
অ্যাকচুয়ারি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইডিপি)
সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিস (সিইজিআইএস)
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৭তম সংখ্যা, মার্চ ২০২১