গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ, গলায় গলায় গানের সুর-এসবই গ্রামবাংলার ঐতিহ্য। আর বাংলার সৌন্দর্য মানেই গ্রাম। কিন্তু অসম ও বিচ্ছিন্ন উন্নয়নে গ্রামের আদি ও অকৃত্রিম রূপ যাচ্ছে হারিয়ে। অপরিকল্পিত নগরায়ণে যেভাবে শহরগুলো হচ্ছে শ্রীহীন, ঠিক একই প্রভাব পড়ছে গ্রামগুলোতেও। আবহমানকাল থেকেই গ্রামের মানুষজন নাগরিক সুযোগ-সুবিধার অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত। অথচ বিশাল এ কৃষিভিত্তিক জনগোষ্ঠী দেশীয় অর্থনীতিতে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। উন্নত গ্রাম ব্যবস্থা ছাড়া একটি দেশ কখনোই স্বয়ংসম্পূর্ণ ও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পেঁৗছাতে পারে না। এই গুরুত্ব উপলব্ধি করেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রতিশ্রম্নতি ‘গ্রাম হবে শহর’ স্লোগানে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে শহরের মতো আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে নাগরিক অধিকার নিশ্চিতকরণ। ইশতেহার ঘোষণার পর গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি নিয়ে স্থপতি, প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশকর্মীসহ সচেতন নাগরিক মহলে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা; কিছুটা উৎকণ্ঠাও লক্ষণীয়! গ্রামের মানুষ আধুনিক শহুরে নাগরিক সুবিধা পাক, এটা অবশ্যই কাম্য। কিন্তু গ্রামের উন্নয়ন যদি হয় শহরের মতো করে, তাহলে সেখানে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। গ্রামের উন্নয়ন অবশ্যই কাম্য। তবে তা হতে হবে গ্রামের মতো করেই। এখনই সময় গ্রাম নিয়ে ভাবার; আধুনিক গ্রাম গড়ে তোলার মাধ্যমে স্বনির্ভর দেশ গড়ার।
ইশতেহারে গ্রামোন্নয়নে যেসব প্রতিশ্রম্নতি
দেশের প্রতিটি বাড়িতে বিদ্যুৎ পেঁৗছানো।
পাকা সড়কের মাধ্যমে সব গ্রামকে জেলা, উপজেলা শহরের সঙ্গে যুক্ত করা।
সুপেয় পানি ও উন্নতমানের পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
সুস্থ বিনোদন ও খেলাধুলার জন্য অবকাঠামো গড়ে তোলা।
কর্মসংস্থান গড়ে তোলার জন্য জেলা, উপজেলায় কলকারখানা গড়ে তোলা।
ইন্টারনেট, তথ্যপ্রযুক্তি সারা দেশের গ্রামপর্যায়ে পৌঁছানো।
উল্লেখিত এসব প্রতিশ্রম্নতি অত্যন্ত ইতিবাচক হলেও শঙ্কাও কিন্তু কম নয়। যেহেতু দেশে সামগ্রিক পরিকল্পনার প্রকট অভাব লক্ষণীয়, সেহেতু গ্রাম উন্নয়নের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম নয়। শহরের তুলনায় গ্রাম অনেকটাই স্পর্শকাতর। আর অদূরদর্শী উন্নয়নের প্রথম বলি হয় পরিবেশ। কৃষিজমি, নদী-খাল ভরাট, বৃক্ষনিধন করে বিনষ্ট করা হয় গ্রামীণ ভূ-প্রাকৃতিক বিন্যাস ও নৈসর্গিকতা। তাই গ্রামের স্বকীয়তা বজায় রেখে শহরের সব সুযোগ-সুবিধা গ্রামেই যাতে পাওয়া যায়, সে ধরনের ব্যবস্থা করাই অধিক যুক্তিযুক্ত। নদীনালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, গাছপালা, লতাগুল্ম, বনবাদাড়, দিগন্তবিস্তৃত মাঠ রেখেই পরিবেশবান্ধব আধুনিক গ্রাম গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে গ্রামকে শহর করার নামে বৃক্ষনিধন, নদী-খালবিল ভরাট তথা পরিবেশ ধ্বংসের মহোৎসব লেগে যাবে। এতে সবুজ-শ্যামল, জলাভূমিপ্রধান দেশটি হয়ে পড়বে রুক্ষ, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যহীন, মরুভূমির প্রতিম অন্য এক বাংলাদেশ।
স্বাধীনতার চার যুগ পেরিয়ে গেলেও দেশের গ্রামগুলোর যতটা উন্নয়ন হওয়া সমীচীন ছিল তা হয়নি। যদিও গ্রামে গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয়, কয়েকটি গ্রাম মিলে উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ, কমিউনিটি হাসপাতাল, ইউনিয়ন সেবাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে, তবে সেগুলোর সেবার মান মোটেও সন্তোষজনক নয়। এখন গ্রামে গ্রামে পৌঁছে গেছে স্যাটেলাইট চ্যানেল সংযোগ, ইন্টারনেট, হাতে হাতে স্মার্টফোন, মোবাইল ব্যাংকিং, ইউনিয়নভিত্তিক তথ্যসেবা কেন্দ্রের মতো আধুনিক সব অনুষঙ্গ। বিনা মূল্যে শিক্ষা, বিনা মূল্যে কৃষি, সার, পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ প্রদান, কাবিখা, টিআর, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা ইত্যাদির মাধ্যমে গ্রামের সাধারণ মানুষ নানাভাবে উপকারভোগী হচ্ছে কিন্তু মূল সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে তা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। গ্রামের প্রধান যে সমস্যাগুলো আজও রয়েছে; সেগুলো হচ্ছে-
অপরিকল্পিত বাড়িঘর ও অবকাঠামো নির্মাণের ফলে কৃষিজমি হ্রাস
ব্যাপক বিদ্যুৎ ঘাটতি
কর্মসংস্থানের অভাব
ভৌত অবকাঠামোর অভাব
যাতায়াত ও যানবাহন সমস্যা
গৃহায়ন সমস্যা
সেচ ও নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনা
নদীভাঙন প্রতিরোধ ও গ্রাম রক্ষাকারী বাঁধ
আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বাজার
কাঁচা সবজি সংরক্ষণাগার
প্রাণিসম্পদ সেবা ও চিকিৎসাকেন্দ্র প্রভৃতি।
গ্রাম উন্নয়নে যা যা করণীয়
বাংলাদেশের গ্রামগুলোকে আধুনিক ও আদর্শ গ্রামে রূপান্তরে নিতে হবে সামগ্রিক একটি পরিকল্পনা। এ ক্ষেত্রে গ্রামকে শহর থেকে আলাদাভাবে ভাবতে হবে। গ্রামাঞ্চলের চাহিদাগুলো সাধারণত শহর থেকে আলাদা। ইউরোপ, আমেরিকার মতো উন্নত দেশের গ্রামগুলো কখনো শহরের আদলে তৈরি হয়নি বরং স্থানীয় ঐতিহ্যকে বজায় রেখেই অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়েছে। সেখানকার গ্রামগুলোতে বিদ্যুৎ, পাকা রাস্তাঘাট সবই আছে, কিন্তু গ্রাম্য শোভায় তা পরিপূর্ণ। গ্রামের উন্নয়ন করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সুবিধা যেমন স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, নিরাপদ পানযোগ্য পানি, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ, কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্কুল, কলেজ, দোকান, মসজিদ, লাইব্রেরি ইত্যাদি কমিউনিটি সুবিধা যেন প্রতিটি গ্রামে গড়ে ওঠে সে ব্যবস্থা করতে হবে। এগুলোর অবস্থানও হতে হবে গ্রাম থেকে নিকটবর্তী দূরত্বে। মানুষজন যেন নিত্যপ্র্রয়োজনীয় সামগ্রীগুলো হাতের নাগালে পায়, থাকতে হবে সে ব্যবস্থাও। এ জন্য দেশের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়, প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সব এনজিও ও প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে রাজধানী উন্নয়ন কতৃর্পক্ষের মতো একটি পৃথক সংস্থা অথবা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গ্রামের অবকাঠামো উন্নয়নে কার্যকরী একটি ইউনিট চালু করতে পারে। সবার সমনি¦ত উদ্যোগে গ্রামের উন্নয়নে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি তা হলো-
গ্রামীণ গৃহায়ন পরিকল্পনা
গ্রামের গৃহায়ন বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শহরে বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে অনেক নিয়মকানুন আছে কিন্তু গ্রামে এর বালাই নেই। এমনকি গ্রাম নিয়ে তেমন কোনো পরিকল্পনাও করা হয়নি। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবার জন্য গৃহায়ন নিশ্চিত করতে ফসলি জমিতেই গড়ে উঠছে বসত-বাড়ি। একদিকে যেমন থাকার জন্য বাড়ির প্রয়োজন অন্যদিকে জীবিকার জন্য কৃষিজমি রক্ষা করাও প্রয়োজন। তাই কৃষিজমিকে বাঁচিয়ে কীভাবে আবাসন ব্যবস্থা করা যায়, সে বিষয়টিতেও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। পল্লি আবাসন মডেল তৈরি করে সরকারি উদ্যোগে আবাসনের ব্যবস্থা করা গেলে অথবা একটি নির্দিষ্ট জোনে বহুতলবিশিষ্ট ভবন নির্মাণের মাধ্যমেও স্বল্পপরিমাণ ভূমিতে অধিক মানুষের আবাসন নিশ্চিত করা গেলে কৃষিজমি অনেকাংশে রক্ষা করা সম্ভব।
দিন বদলের পালায় হারিয়ে যাচ্ছে চিরচেনা গ্রাম্য বাড়িগুলো। গ্রামের যারা বিত্তবান হয়ে উঠছে, তারা শহরের বাড়িগুলোকে অনুকরণ করে বাড়ি তৈরি করছেন। কিন্তু এসব বাড়ি গ্রামীণ পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না। দেখতেও দৃষ্টিকটু লাগছে। এমনকি গ্রামীণ মানুষের সরলতা ও অজ্ঞতার সুযোগে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী পৌঁছে যাচ্ছে সেখানে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। গ্রামের বাড়িগুলো শহরের অনুকরণে হবে, সেটা কিছুতেই প্রত্যাশিত নয়। তাই এমন বাড়ি তৈরি করতে হবে, যা গ্রামের চিরচেনা পরিবেশের সঙ্গে খাপ খায়। গ্রামে অনেক কাঁচা বাড়িঘর রয়েছে। কম খরচে স্থানীয় মাটি, বাঁশ, বেত, ছনের মতো সস্তা পণ্য ব্যবহার করে এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ও অধিক স্থায়িত্বের ভিত্তিতে এসব বাড়িগুলো নির্মাণ করা গেলে গ্রামের মানুষ সানন্দেই তা গ্রহণ করবে। অধিক লোকের আবাসন নিশ্চিত করতে দ্বিতল মাটি বা কাঠের বাড়ি তৈরি করা যেতে পারে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল, পিরোজপুর, বরগুনাসহ বিভিন্ন জায়গাতে দীর্ঘ সময় যাবৎ মানুষ এ ধরনের বাড়িতে বসবাস করে আসছে। এমন বাড়ি আছে যেগুলো ৫০-১০০ বছরের পুরোনো। এগুলোকে যদি আরও আধুনিক করে ডিজাইন করা যায়, তাহলে গ্রামের মানুষ এসব বাড়ি তৈরিতে উৎসাহী হবে। এ জন্য এগিয়ে আসতে হবে স্থপতি ও প্রকৌশলীদের; নিতে হবে সরকারি কার্যকর উদ্যোগ।
কৃষিভিত্তিক উন্নয়ন
কৃষি গ্রামীণ অর্থনীতির সবচেয়ে বড় খাত। এই জমির ওপরই নির্ভর করছে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি; সর্বোপরি দেশের সার্বিক উন্নয়ন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষিজমির অকৃষি ব্যবহার, ভূমির উর্বরতা হ্রাস, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, ব্যাপক নগরায়ণ, আবাসন নির্মাণ, নদীভাঙন এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে মাথাপিছু জমির পরিমাণ দ্রুতই কমছে। আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক পরিবেশের বিরূপ পরিবর্তনের ফলে কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষের জীবন ও জীবিকা ক্রমে হচ্ছে হুমকির সম্মুখীন। কৃষি খাতে জিডিপির মোট অবদান ২১ দশমিক ৪৭। যার মধ্যে ফসলি খাতে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। কৃষিতে নিয়োজিত জনশক্তি ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ (তথ্য সূত্র: শ্রমশক্তি জরিপ, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), ২০১৮)। শহরের মতো গ্রামকেও প্রাধান্য দিতে হবে। কারণ, গ্রামেই অধিকসংখ্যক মানুষের বসবাস। তাই অতি সত্বর গ্রামের কৃষিজমি রক্ষায় একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা জরুরি। সে ক্ষেত্রে-
- ‘কৃষিজমি সুরক্ষা’ কল্পে বিশেষ আইন তৈরি করা।
- ‘ভূমি জোনিং আইন’ তৈরি করে এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
- নদী-খাল খননের মাধ্যমে নাব্যতা বৃদ্ধি করে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো এবং ফসলি জমিতে সেচ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
- গ্রাম পর্যায়ে কৃষিযন্ত্র প্রাপ্তি কেন্দ্র ও ওয়ার্কশপ স্থাপন করার মাধ্যমে দ্রুত যন্ত্রপাতি মেরামত নিশ্চিত করা।
- শুকনো মৌসুমে পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নদীর পানির প্রবাহ ঠিক রাখা। দেশের বিভিন্ন স্থানে জেগে ওঠা নতুন চরগুলোকে কাজে লাগানো, নদীভাঙন ঠেকাতে বাঁধ নির্মাণ প্রভৃতি। উল্লেখ্য, এর কয়েকটি বিষয় রয়েছে ইশতেহারে।
- গ্রামে গ্রোথ সেন্টার বা আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ভিলেজ মার্কেট স্থাপন করা জরুরি, যেখানে কৃষকের সঙ্গে সরাসরি ক্রেতার সংযোগ ঘটবে। এতে দালাল, ফড়িয়া ও মধ্যস্থতাকারী এড়িয়ে কৃষক পাবে ফসলের ন্যায্য দাম। এ ছাড়া সেখানে থাকবে ফসল ও কাঁচাপণ্য সংরক্ষণের জন্য আধুনিক হিমাগার। উল্লেখ্য, এরই মধ্যে দেশের কয়েকটি স্থানে এ ধরনের মার্কেট স্থাপিত হয়েছে।
বিদ্যুৎ-ব্যবস্থার উন্নয়ন
লোডশেডিং গ্রাম উন্নয়নের অন্যতম অন্তরায়। সরকারের লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে দেশের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া। এরই মধ্যে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেলেও মানুষ লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ। বিশেষ করে ফসলে সেচ প্রদান ও কাটার মৌসুমে এই সমস্যা পৌঁছে চূড়ান্তে। গ্রামের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে শুধু পল্লী বিদ্যুতের ওপর নির্ভর না করে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট ও সৌর প্যানেল বসাতে উৎসাহ ও সহায়তা প্রদান অতীব জরুরি।
কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা
একমাত্র কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসা ছাড়া গ্রামে তেমন কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। এ জন্য মানুষ বাধ্য হয় গ্রাম ছেড়ে শহরে আসতে। এই ব্যাপকহারে শহরমুখিনতা শুধু নগর সভ্যতার জন্যই ঝুঁঁকি নয়, এটা সামাজিকভাবেও একটি দেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। আর তাই গ্রামীণ যুবক, কৃষি উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, ঋণ, বাজারজাতকরণ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এ ছাড়া আধুনিক খামার ব্যবস্থা ও কুটির শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ভাগ্য আমূল পরিবর্তন করা সম্ভব।
ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন
শহর ও গ্রাম বৈশিষ্ট্যগতভাবে আলাদা হলেও মৌলিক বিষয়গুলো অভিন্ন। অথচ স্কুল, কলেজ, ব্রিজ-কালভার্ট, সড়ক, বাজার, কমিউনিটি সেন্টার, হাসপাতাল ইত্যাদি শহরে যেভাবে গড়ে উঠেছে তার খুব কমই হয়েছে গ্রামে। গ্রামের মানুষের অবসর বিনোদনের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে সিনেমা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগের জন্য তাদের যেতে হয় পার্শ্ববর্তী শহরে। শিক্ষাপ্র্রতিষ্ঠানের অভাবে গ্রামের কিশোর-তরুণদের উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে হচ্ছে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে। হাসপাতাল ও ক্লিনিকের অভাবে জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে। আর তাই গ্রাম উন্নয়ন করতে হলে এসব ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
যাতায়াত ও যানবাহন সমস্যা
গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটেছে ঠিকই কিন্তু তা পরিকল্পিত নয়। রাস্তাগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক সংকীর্ণ, যা বড় যানবাহন চলাচলের জন্য উপযুক্ত নয়। মানহীন সড়ক নির্মাণে তৈরির কিছুদিনের মধ্যেই তা যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পাশাপাশি অবহেলিত গ্রামীণ পরিবহনব্যবস্থাও। বাস বা মিনিবাসের পরিবর্তে সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে নছিমন, করিমন, আলম সাধু, ভটভটিসহ বিভিন্ন ধরনের অবৈধ যান। ফলে প্রায়ই ঘটছে নানা ধরনের দুর্ঘটনা, জীবন হারাচ্ছে গ্রামীণ জনপদের মানুষ। এ জন্য গ্রামীণ পরিবহনব্যবস্থার ওপর গুরুত্বরোপ করা জরুরি।
কবরস্থান ব্যবস্থাপনা
অধিকাংশ গ্রামেই নেই নির্দিষ্ট গোরস্থান। সাধারণত পারিবারিক ভিত্তিতে কবরস্থান ব্যবস্থাপনা করা হয়। এভাবে প্রতিটি পরিবারের জন্য আলাদা আলাদা ব্যবস্থার ফলে জমির অপচয় হচ্ছে। বড় কোনো গ্রামে স্থানীয় মানুষ মিলিতভাবে একটি কবরস্থান গড়ে তোলে। বিষয়টি সরকারিভাবে বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি গ্রাম বা কয়েকটি গ্রাম মিলে খাসজমিতে কবরস্থান গড়ে তোলা গেলে ভূমির অপচয় অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।
বন্যা ও নদীভাঙন প্রতিরোধ
বর্ষাকালে বন্যা ও নদীভাঙন এ দেশের স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীভাঙন রোধে বাঁধ দেওয়া হলেও সঠিক ডিজাইন ও নির্মাণ ত্রুটির কারণে তা বেশি দিন স্থায়ী হচ্ছে না। বাঁধ ভেঙে অনায়াসে বন্যার পানি গ্রামে ঢুকছে। এ জন্য নদীভাঙন রোধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে বাঁধে উপযোগী গাছ লাগানো, সঠিক প্রকৌশল ডিজাইন ও দুর্নীতি বন্ধ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই উন্নয়নশীন দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। লক্ষ্য উন্নত দেশের কাতারে দাঁড়ানো। অথচ একটি দেশের উন্নয়ন টেকসই ও কার্যকর হয় যখন সেই দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন হয়। যদি গ্রাম ও শহরের উন্নয়নের মধ্যে বৈষম্য থাকে, তবে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন হয় না। আর তা নিশ্চিত করতে সরকারের তরফ থেকে নিতে হবে একটি মহাপরিকল্পনা। আর সে অনুযায়ী বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কাজ করলে গ্রামের উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশও থাকবে অটুট। আর এভাবেই বাংলার গ্রাম অটুট থাকবে তার অকৃত্রিম সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য নিয়ে।
সজল চৌধুরী,
সহকারী অধ্যাপক ও পরিবেশবিষয়ক স্থাপত্য গবেষক
স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)
‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ স্লোগানকে পাথেয় করে নবনির্বাচিত সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার, ২০১৮-এর ৩.১০ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘আমার গ্রাম-আমার শহর’ নিঃসন্দেহে গ্রামপ্রধান বাংলাদেশের জন্য আশা জাগানিয়া বিষয়। কৃষিজ উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধিসহ নানা উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। তবে একটি বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা অতি জরুরি। তা হলো গ্রামে শহরের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা নাকি গ্রামকে শহর করার পরিকল্পনা? যদি প্রথমটি হয় তাহলে একে সাধুবাদ জানানো যায় অবশ্যই আর যদি দ্বিতীয়টি হয় তাহলে কিছু কথা থেকে যায় বৈকি! এ ক্ষেত্রে আরও গভীরভাবে চিন্তার অবকাশ থাকে। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে আমরা অনেক কিছুই ঠিকমতো না জেনে, না বুঝে হুটহাট করে ফেলি। এতে ফল হয় হিতে বিপরীত।
গ্রামের উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। এমনকি শহরকেন্দ্রিক সব সুযোগ সুবিধা অল্পপরিসরে হলেও গ্রামে থাকা প্রয়োজন। কিন্তু সেটি হতে হবে নির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে; গ্রামের জীবনধারণের রূপরেখার কথা চিন্তা করে। কারণ, আমাদের প্রতিটি গ্রামে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন কিছু বৈশিষ্ট্য, যা একটি থেকে আরেকটিকে আলাদা করে। গ্রামকে সমৃদ্ধ করতে গেলে প্রথমেই চিন্তা করতে হবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার কী কী পরিবর্তন আনলে তারা সুন্দর, সুস্থ পরিবেশে স্বনির্ভর হয়ে গ্রামে বসবাস করতে পারবে। সেক্ষেত্রে গ্রামবাসীর সমস্যা সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করে, তাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলে উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। গ্রামকে শহরের মতো নয় বরং গ্রামের মতো করেই ভাবতে হবে। কারণ, যেখানে সেখানে অপরিকল্পিত স্থাপনা-রাস্তাঘাট ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করলে তা গ্রামের সবুজ রূপরেখাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে।
যেভাবে আমরা শহরগুলোকে বসবাসের অনুপযোগী করে ফেলছি, ঠিক তেমনিভাবেই গ্রামগুলোও একদিন নষ্ট হবে যদি এখনই সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ না করা হয়। দেশে এখনো গ্রামকেন্দ্রিক পরিবেশবান্ধব স্থাপনা ও অবকাঠামো নির্মাণের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই, যা বাস্তবায়ন অতি জরুরি। বাংলাদেশের গ্রামগুলোর জন্য প্রয়োজন ‘টেকসই গ্রাম উন্নয়ন পরিকল্পনা’ নীতিমালা। পরিবেশবান্ধব ‘স্থাপনা নির্মাণ বিধিমালা’ও থাকতে হবে। সেক্ষেত্রে ‘ইকো ভিলেজ কিংবা স্মার্ট ভিলেজ কনসেপ্ট’ নীতিমালায় সংযুক্ত করতে হবে এবং তা বাস্তবায়ন করতে হবে গ্রাম্য পরিকল্পনার প্রতিটি পর্যায়ে।
গ্রামগুলোতে অবকাঠামোগত উন্নয়নে ‘মড্যুলার সিস্টেম কনস্ট্রাকশন’-এর ব্যবস্থাপনা করা যেতে পারে। এতে যেকোনো স্থাপনা খুব কম সময়ে তৈরি করা সম্ভব, যাতে অযাচিত ধুলাবালি পরিবেশদূষণ করবে না। তবে এ ধরনের কারিগরি ক্ষেত্রে আমাদের দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি করতে হবে। গ্রামে ‘ক্লিন এনার্জি’ যেমন: বাতাস, সৌরশক্তি, বায়োগ্যাস, মাইকো-হাইড্রোর ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্থানীয়ভাবে সঠিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং তা বাস্তবায়ন করতে হবে। গ্রামের রাস্তাঘাটসমূহ জৈব উপাদান দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে। গ্রামে প্রতিটি স্থাপনায় বৃষ্টির পানি ধরে রাখার সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। গ্রামের হাটবাজারগুলোকে নতুনভাবে আরও চমকপ্রদ করে সাজানো প্রয়োজন। প্রতিটি গ্রামে সঠিক উপায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে, এতে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে। একটি গ্রামে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর নাগরিক প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে কিছু সুযোগ-সুবিধা এবং অবকাঠামো থাকা অতিপ্রয়োজন। যেমন: স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল এমনকি মুদি দোকান কিংবা লাইব্রেরি।
গ্রামের আবাসন, অবকাঠামো বিষয়টি গবেষণা ও দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মপরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এলাকাভিত্তিক গ্রামগুলো নিয়ে কাজ করতে পারে গবেষণার মাধ্যমে। প্রয়োজন শুধু কাগজ-কলমের গবেষণার মধ্যে না থেকে প্রায়োগিক গবেষণা। এসব ক্ষেত্রে বিশেষ করে গ্রাম উন্নয়নে গৃহায়ন ও গণর্পূত বিভাগ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে পারে। আমরা যদি গ্রামগুলোকে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করতে পারি, তাহলে হয়তো এই গ্রামগুলোর মাধ্যমেই আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ আরও সামনের দিকে সামাজিক থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দুয়ার খুলে দেবে। গ্রামের সব উন্নয়নের ক্ষেত্রে গ্রামের মানুষকে সঙ্গে নিতে হবে।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৭তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৯