আকাশের রং বদলায় বারবার। বদলায় মানুষের মন, মনন ও ভাবনা। বদলায় সময়। সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলায় মানুষের জীবন ও জীবনধারা। দেশে দেশে বদলায় সংস্কৃতি, শিল্প; আর উন্নয়নের ধারা। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বদলেছে মানুষের আবাসন ব্যবস্থাও। সেই ধারাবাহিকতায় উল্লেখযোগ্য বিবর্তন দেখা গেছে অস্ট্রেলিয়ার স্থাপত্যশৈলীতেও। সময় ও শাসকের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্তিত হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার স্থাপত্যকলার একেকটি অধ্যায়।
কেউ যদি অস্ট্রেলিয়ার পুরোনো বাড়ি কেনার জন্য কোনো বিক্রয়কেন্দ্রে যোগাযোগ করে, তবে পিরিয়ড (Period Home) হিসেবে কিছু বাড়ির কথাই সবার আগে বিবেচিত হবে। এই বাড়িগুলোর নকশা এবং স্থাপত্যশৈলী অস্ট্রেলিয়ার ২০০ বছরের অস্ট্রেলিয়ার স্থাপত্যকলার বিবর্তনকে উপস্থাপন করে। সর্বোপরি একজন ক্রেতা কেমন বাড়ি চায়, সেটা তাকেই পছন্দ করে নিতে হবে। সময়ভেদে এ দেশটির স্থাপত্যকলার ব্যাপক রূপান্তর হয়েছে।
ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলী (১৭৮৮-১৮৪০)
৫০ বছরে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। ব্রিটিশ বন্দোবস্তের ৫০ বছর পরে অস্ট্রেলিয়ার স্থাপত্যকলা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে। ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলীর উদ্ভব হয়েছিল ব্রিটিশ উপনিবেশের সময়। এই স্থাপত্যকলা ব্রিটিশদের রুচি, চিন্তা ও চেতনার ধারক। আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের শেষভাগে জর্জিয়ান স্টাইলের শেষ সময়ে এ ডিজাইন উদ্ভাবন করেন স্থপতিরা। জর্জিয়ান স্টাইলের এই বিল্ডিংগুলোর বিশেষত্ব হচ্ছে আকর্ষণীয় বারান্দা এবং কোমর পর্যন্ত উঁচু রেলিংযুক্ত ছাদ। ১৮২০ এবং ১৮৩০ সালের ভবনগুলো পরবর্তী সময় পর্যন্ত তার জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছিল নিজস্ব শিল্পশৈলীতে। দিন দিন তা হয়ে উঠেছিল অভিজাত আবাসনের আদর্শ।
ঔপনিবেশিক সময়ে অস্ট্রেলিয়ার ফার্ম হাউসগুলোর (Farm House) প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল চারপাশের প্রসারিত বারান্দা। মূলত সব দিক থেকে শোবার ঘরে প্রবেশ সহজীকরণের জন্য এমন টানা বারান্দা ব্যবহার করা হতো। তা ছাড়া নান্দনিকতার একটি ব্যাপার তো আছেই। জানালাগুলো ছিল খাড়া এবং খুবই চকচকে। ওই সময়ের বেশির ভাগ জানালা ছিল লাল ও সোনালি রঙের। পরে ঘরের প্রধান দরজায় খিলানসম্বলিত (অর্ধবৃত্তাকার) কারুকার্যখচিত গেট যুক্ত করা হয়েছিল এবং তা-ই প্রচলিত হয়। কারুকার্যখচিত এই গেট ব্রিটিশদের রাজত্বের প্রতীক নির্দেশ করত এবং নকশাগুলোও রাজকীয় ছিল।
রাজকীয় এই প্রবেশদ্বারের দুই পাশেই আলোকসজ্জার ব্যবস্থা থাকত। মূলত জর্জিয়ান স্টাইলগুলোই মানুষের গভীর দৃষ্টি আকর্ষণ করত। এই স্টাইল থেকেই রিজেন্সি (রাজকীয়) স্টাইলের ধারণা পান স্থপতি ও নকশাকাররা।
ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যশৈলী (১৮৪০-১৮৯০)
ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়ার নামেই এই স্থাপত্যশৈলীর নামকরণ করা হয় ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যশৈলী। এ স্থাপত্যশৈলী সে সময় থেকে আজও ব্রিটিদের সব উপনিবেশেই সমান সমাদৃত। মূলত তিন সময়ের স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যশৈলী আবিষ্কার করেছিলেন স্থপতিরা। একটি হলো ব্রিটিশ উপনিবেশের প্রথম সময়ের শ্রমিকদের কটেজের ডিজাইন থেকে নেওয়া মূল ঘরের নকশা এবং অন্যান্য ডিজাইন বিভিন্ন সময়ের স্থাপত্যশৈলী থেকে নেওয়া। এর সবচেয়ে ব্যতিক্রম বিষয়টি হলো বারান্দা। ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যশৈলীতে বারান্দার কোনো গুরুত্ব নেই। থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছোট বারান্দা ব্যবহার করা হয়েছে।
মধ্য ভিক্টোরিয়ান ভবনের স্থাপত্যশৈলীই শত শত বছর পেরিয়েও আধুনিক অস্ট্রেলিয়ার স্থাপত্যকলায় বাড়তি সংযোজন হিসেবে আজও জনপ্রিয়। ১৮৬০ থেকে ১৮৭০-এর মাঝামাঝি সময় এ ধরনের নির্মাণশৈলীর সূচনা হয়। এর বিশেষ আকর্ষণ হলো নান্দনিক নকশা ও কারুকার্য। এতে স্থান পেয়েছে সম্মুখভাগের টানা বারান্দা এবং মেঝেতে পলিশ করা বোর্ডের কিংবা কাঠের পাটাতন। রানি ভিক্টোরিয়ার পরের সময়েও এই স্থাপত্যশৈলীতে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন ফিচার। জানালায় লাগানো হয়েছে রঙিন কাচ। খিলাযুক্ত দরজা থাকত প্রতি ঘরে ঘরে। দেয়ালে যুক্ত করা হয়েছিল রেন্ডারিং করা ইটের গাঁথুনি।
ফেডারেশন বা এডওয়ার্ডিয়ান (১৮৯০-১৯১৫) স্থাপত্যশৈলী
প্রচুর কাঠ ও লাল ইটের ব্যবহারের জন্য ডোরেশন বা এডওয়ার্ডিয়ান স্থাপত্যশৈলী খুব বেশি পরিচিত। এর বিশেষ পরিচিতির আরও একটি বিশেষ কারণ হলো, এটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার স্থাপত্যশৈলীর একটি ট্রানজিশন পিরিয়ড তথা ক্রান্তিকাল। এ সময়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রচলিত স্থাপত্যশৈলীর আমূল পরিবর্তন ঘটে। এই স্থাপত্যশৈলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটির খাড়া চালা। প্রথমে এই খাড়া চালায় ঢেউটিন ব্যবহার করা হলেও সময়ের ব্যবধানে এতে যুক্ত হয়েছে পোড়ামাটির ব্লক। এই স্থাপত্যশৈলী প্রধানত দুটি সময়ের স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে উদ্ভাবন করা হয়েছিল। একটি হলো অষ্টাদশ শতকের ফরাসি স্থাপত্যশৈলী এবং সপ্তদশ শতকের ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলী। এই স্থাপত্যশৈলীর বিশেষ আকর্ষণ হলো প্রশস্ত খিলানযুক্ত দরজা, বিস্তৃত মেঝে, আলাদা আলাদা ইউনিট এবং গম্বুজওয়ালা ছাদ।
যুদ্ধ অন্তর্বর্তী স্থাপত্যশৈলী (১৯১৮-১৯৩৯)
এই সময়ের স্থাপিত বাড়িগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এক তলাবিশিষ্ট। অর্থনৈতিক দৃঢ়তা ও আধুনিকতার ছাপ পাওয়া যায় এই স্থাপত্যশৈলীতে। পুরোনো ধাঁচের স্থাপনার রীতি ভেঙে এ সময় অস্ট্রেলিয়ার বাড়ির নকশা বা ডিজাইনে আনা হয় নতুনত্ব। এই স্থাপত্যশৈলীর মধ্য দিয়েই গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে আধুনিক যুগের সঙ্গে মিশে যায় অস্ট্রেলিয়ার স্থাপত্যকলার বিবর্তনের ধারা। এই ধারায় অলংকরণ সীমিত থাকলেও মিশ্র অলংকারশৈলী ব্যবহার বেশি লক্ষ করা যায়। স্প্যানিশ মিশন, জর্জিয়ান এবং আর্ট ডেকোর সংমিশ্রণে এ সময় তৈরি হয় এক ভিন্ন শিল্পশৈলীর ধারা। সঙ্কুচিত করা হয়েছে চলাচলের জায়গা ও রান্নাঘর। খোলা বারান্দাগুলো বারান্দায় রূপান্তর করা হয়েছিল যুদ্ধ অন্তর্বর্তী স্থাপত্যশৈলীতে।
মানুষ যত বেশি ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির এলাকায় ভ্রমণ করবে, তত বেশি নতুন নতুন ধারণার বিকাশ ঘটবে। এই সময়ের নির্মাণশৈলীতে এই বহুসংস্কৃতির বৈচিত্র্যের ছাপ পাওয়া যায়। ১৯২০ সালের দেশটির গৃহ সংস্কার আইন এই স্থাপত্যশৈলীকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। ১৯২১ সালে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বাড়ি পুনরায় নির্মাণের জন্য স্বল্প আয়ের মানুষদের অনুদান ও কম খরচে বাড়ি নির্মাণের নকশা প্রদান করে। এই নকশাগুলো যুদ্ধ অন্তর্বর্তীকালীন প্রচলিত নকশারই একটি সহজ সংস্করণ মাত্র।
ক্যালিফোর্নিয়ান স্থাপত্যশৈলী
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নাটকীয়ভাবে অস্ট্রেলিয়ায় আধুনিকীকরণ হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই দেশটি আমেরিকান স্থাপত্যশৈলীকে অনুসরণ করতে থাকে। এ সময়ের ভবনগুলোর নকশা ছিল খুবই সাধারণ। যার প্রধান বৈশিষ্ট্যই ছিল লাল ইট, ওয়েদার বোর্ড এবং বারান্দা। এই স্থাপত্যশৈলী ১৯২০ সালে শুরু হওয়া ব্রিটিশকেন্দ্রিক নকশা থেকে ধীরে ধীরে আমেরিকাকেন্দ্রিক নকশায় বিবর্তিত হয়।
এই স্থাপত্যশৈলীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো রাস্তার পেছনে বড় ব্লকের মধ্যে এই নকশার বাড়িগুলো নির্মাণ করা হতো। এতে সিরামিক কিংবা পোড়ামাটির ব্লকের দোচালা নকশা করা থাকত। এই নকশায় ঘরের মাঝখানে হলরুম ডিজাইন করা হয়। এই স্থাপত্যশৈলীর শুরুতে আর্ট ডেকো ধরনের ডিজাইন করা হলেও পরে তা আর রাখা হয়নি। বাড়িগুলোতে সাদা এবং ধূসর রঙের ব্যবহার বেশি দেখা যায়।
যুদ্ধ-পরবর্তী স্থাপত্যশৈলী (১৯৪০-১৯৬০)
অস্ট্রেলিয়ায় যুদ্ধ-পরবর্তী স্থাপত্যশৈলী ছিল খুবই চ্যালেঞ্জিং। সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উন্নত হয়েছে দেশের শিল্প ও অর্থনীতি। বেড়েছিল প্রযুক্তির উৎকর্ষতা। ভবণ নির্মাণের উপকরণও উন্নত হয়েছিল তুলনামূলক। তাই এই সময়ের স্থাপত্যশৈলী চ্যালেঞ্জিং ছিল। এ সময় ভবন নির্মাণে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত ও সহজলভ্য উপকরণের ব্যবহারকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। ভবনের নকশাও করা হয় সে অনুযায়ী। এ সময়ে নির্মিত অস্ট্রেলিয়ার স্থাপত্যকলার বেশির ভাগ ভবন একতলাবিশিষ্ট। সম্মুখভাগে অঙ্কন করা হতো দ্বিমুখী কিংবা ত্রিমুখী আকৃতির আর এটিই ছিল এই সময়ের স্থাপত্যশৈলীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগের স্থাপত্যশৈলী (১৯৬০-১৯৭০)
মূলত এই সময় থেকেই শুরু হয় অস্ট্রেলিয়ার আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর ব্যবহার। সহজলভ্য উপকরণ, উন্নত প্রযুক্তি ও বহুমাত্রিক ব্যবহারের কারণে এ সময় অস্ট্রেলিয়ার স্থাপত্যকলায় যুক্ত হয় নতুন নতুন মাত্রা। শুরু হয় বহুতল ভবনের পরিকল্পনা। শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এ সময় থেকেই স্থাপত্যশৈলীর বিবর্তনে আরও এক ধাপ এগিয়ে যায় দেশটি।
সময়ের প্রয়োজনে, সময়ের ব্যবধানে কালে কালে এভাবেই বিবর্তিত হয়ে আসছে শিল্প ও সংস্কৃতি। শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা স্থাপত্যশৈলী কিংবা স্থাপনার নকশা। অন্যান্য দেশের তুলনায় এ দেশে স্থাপত্যশৈলীর বিবর্তন হলেও উত্তর আধুনিক সময়ে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়েই এগিয়ে আছে অস্ট্রেলিয়ার অত্যাধুনিক এবং নান্দনিক স্থাপনাগুলো। ব্রিটিশ উপনিবেশের কারণে অস্ট্রেলিয়ার স্থাপত্যকলার ইতিহাসে বারবার পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে বিভিন্ন সময়ের স্বাক্ষর। এই বৈচিত্র্যে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস হয়েছে সমৃদ্ধ। অর্জনের তালিকায় এই বিবর্তন যোগ করেছে বাড়তি মাত্রা।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩১তম সংখ্যা, জুলাই ২০২১।