শীত মানেই বৃষ্টিহীন রুক্ষ প্রকৃতি। শহর-গ্রাম সবখানেই ধুলার প্রকোপ। এ সময়ে প্রকৃতিতে বৃষ্টি না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায় ধুলার মাত্রা; বেড়ে যায় বায়ুদূষণ। তবে বায়ুদূষণের মাত্রাতিরিক্ত ধুলা ছাড়াও প্রকৃতি ও মানবসৃষ্ট আরও নানা কারণ দায়ী। এর মধ্যে ব্যাপক নগরায়ণ, কলকারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া ও বর্জ্য, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর যানবাহন বৃদ্ধি অন্যতম। এই বায়ুদূষণের পরিণাম এতটাই ভয়ংকর, যা মানবজাতি, উদ্ভিদরাজি, পশুপাখি, ফসল, জলজীবন এমনকি বৈশ্বিক পরিবেশ-প্রতিবেশব্যবস্থার জন্য চরম হুমকি। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে যে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে, তাতে অনেক বড় ভূমিকা রাখছে বায়ুদূষণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও প্রতিনিয়তই বেড়ে চলেছে বায়ুদূষণের মাত্রা।
সমস্যাটি যখন বিশ্বজুড়ে
বিশ্বজুড়ে একযোগে প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বায়ুদূষণের ভয়াবহ নানা চিত্র উঠে এসেছে। পৃথিবীর ৯১ শতাংশ মানুষ এমন জায়গায় বসবাস করে, যেখানে বায়ুদূষণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি। বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন দূষিত বায়ু সেবন করে। ইউরোপিয়ান এনভায়রনমেন্ট এজেন্সি (ইইএ) বায়ুদূষণকে ‘অদৃশ্য ঘাতক’ বলে অভিহিত করেছে। বিশ্বে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ভারতের দিল্লি। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দূষিত বায়ুর শহর ঢাকা। পরেই রয়েছে পাকিস্তানের করাচি ও চীনের বেইজিং। ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্বে বায়ুদূষণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভারত ও বাংলাদেশে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির ঝুঁকিতে বাংলাদেশ। তবে বিশ্বের সবচেয়ে দূষণকবলিত শহরগুলোর মধ্যে শুধু ভারতেই রয়েছে ১৪টি শহর। সেখানকার বাতাসে দূষণের মাত্রা এতটাই বেশি যে ঘন ধোঁয়াশায় ঢেকে যায় গোটা শহর। রাজধানী দিল্লিতে ধোঁয়াশা এতটাই ঘন হয় যে রাস্তায় যানবাহনগুলোর দিনের বেলায়ও হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে হয়। প্রায়ই সেখানে ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ জারি এবং স্কুল বন্ধ রাখতে হয়। ধোঁয়াশার এই সমস্যা বিশ্বের আরও কিছু শহরকে পোহাতে হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায় সবচেয়ে বেশি ধোঁয়াশা ও দূষণকবলিত নগরী হিসেবে দেখানো হয়েছে কিছু শহরকে। উল্লেখ্যা, চীনের বিভিন্ন শহরের দূষণের মাত্রা বেশি থাকলেও তালিকায় তা প্রকাশ পায়নি।
বিশ্বব্যাপী বায়ুদূষণের ভয়াবহতা
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের যৌথ প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে, বায়ুতে যেসব ক্ষতিকর উপাদান আছে, তার মধ্যে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক উপাদান হচ্ছে পার্টিকুলেট ম্যাটার্স (পিএম) নামের খুব ছোট বিষাক্ত এক কণা। বাতাসে ভাসমান পিএম পরিমাপ করা হয় প্রতি ঘনমিটারে মাইক্রোগ্রাম (পিপিএম-পার্টস পার মিলিয়ন) এককে। এসব বস্তুকণাকে ১০ মাইক্রোমিটার ও ২.৫ মাইক্রোমিটার ব্যাস শ্রেণিতে ভাগ করে তার পরিমাণের ভিত্তিতে ঝুঁকি নিরূপণ করে থাকেন গবেষকেরা। মানবদেহের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক পার্টিকুলেট ম্যাটার্স হচ্ছে পিএম ২.৫ (যে পার্টিকুলেট ম্যাটারের পরিধি ২ দশমিক ৫ মাইক্রনের কম)। আগে এই উপাদান সবচেয়ে বেশি নির্গত হতো চীনে। তবে গত কয়েক বছরে পাকিস্তান, কাতার, ভারত, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ চীনকেও ছাড়িয়ে গেছে। কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বায়ুদূষণের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে পরিমাপ করা হয়েছে। পিএম ২.৫ নির্গমনকারী বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলো হচ্ছে (মাত্রাটা ঋতুভেদে পরিবর্তিত হয়)-
বাতাসে মিশ্রিত পিএম ২.৫ মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ। এটি শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সহজেই শরীরে প্রবেশ করে শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগ ও হৃদ্্রোগের পরিমাণ বাড়ায়। ইউরোপিয়ান এনভায়রনমেন্ট এজেন্সির তথ্যমতে, বাতাসে পিএম ২.৫-র উপস্থিতির কারণে ২০১৫ সালে বিশ্বের প্রায় ৪২ লাখ এবং ইউরোপীয় অকালে মারা গেছে প্রায় ৫ লাখ। গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বে যেসব কারণে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, তার মধ্যে বায়ুদূষণ রয়েছে পঞ্চম স্থানে। এসব অকালমৃত্যুর অর্ধেকের বেশি ঘটেছে চীন ও ভারতে। ২০১৬-এ দিল্লিতে মৃত্যুবরণ করেছে ১৪ হাজার ৮০০ জন।
যে কারণে বায়ুদূষণ
বায়ুদূষণ সংঘটিত হয় প্রাকৃতিক কিংবা মানুষের কর্মকান্ডের ফলে বায়ুমন্ডলে ক্ষতিকর ও বিষাক্ত পদার্থ ছড়িয়ে পড়লে। ক্ষতিকর রাসায়নিক গ্যাস বা গ্যাসীয় পদার্থ যে প্রক্রিয়ায় বায়ুতে মিশে জীবজগতের স্বাভাবিক বিকাশের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, সেটাই মূলত বায়ুদূষণ। ধুলা, ধোঁয়া, ক্ষতিকর গ্যাস ও রাসায়নিক পদার্থের বিভিন্ন ক্ষতিকারক কণা ও ক্ষুদ্র অণু অধিক অনুপাতে বায়ুতে মিশে বায়ুকে দূষিত করে। তবে বায়ুদূষণের মূল উপাদানসমূহ হচ্ছে-
কার্বন ডাই-অক্সাইড- পরিবেশে এই গ্যাসীয় উপাদানের অতিরিক্ত উপস্থিতি ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় গ্রিনহাউস অ্যাফেক্টের ফলে।
কার্বন মোনো-অক্সাইড- মানুষের শ্বাসক্রিয়ার পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক; এই গ্যাস বায়ুমন্ডলের গ্যাসীয় ভারসাম্যের বিঘ্ন ঘটায়। মূলত পুরোনো যানবাহনের থেকে এই গ্যাসের উৎপত্তি।
সালফার ডাই-অক্সাইড- ট্যানারি এবং অন্যান্য কলকারখানার চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়ার অন্যতম মূল উপাদান এই গ্যাস। বাতাসের ভাসমান জলীয় বাষ্পের সঙ্গে মিশে গিয়ে এই গ্যাস অতি ক্ষতিকারক অ্যাসিড বৃষ্টি ঘটানোর ক্ষমতা রাখে। মানুষের ক্ষতির পাশাপাশি স্থাপনারও ক্ষতিসাধন করে।
ক্লোরো ফ্লুরো কার্বন – পুরোনো এয়ার কন্ডিশনার এবং বাণিজ্যিক সিলিন্ডার এর উৎস। পৃথিবীর ওজোনোস্ফিয়ার বা ওজোন স্তর লঘুকরণের অন্যতম উপাদান এটি। কিন্তু বর্তমানে এই গ্যাস ব্যবহার করা নিষিদ্ধ হয়েছে প্রায় সব দেশেই।
অ্যাসিড বৃষ্টি- মানবজাতি, উদ্ভিদরাজি, পশুপাখি আর জলজ প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর অ্যাসিড বৃষ্টি সংঘটনের মাধ্যমেও বায়ুদূষণ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে আসছে।
এ ছাড়া সোনার কারখানায় ব্যবহৃত নাইট্রিক অ্যাসিডজনিত গ্যাস যেমন: নাইট্রোজেন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড প্রভৃতি, প্রায় সব কারখানাতেই ব্যবহৃত সালফারের যৌগ, ক্লোরিনের যৌগ ইত্যাদি থেকে উদ্ভূত গ্যাসগুলোও বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ।
কোনো এলাকায় বায়ুতে ক্ষতিকর পদার্থের মাত্রা অন্যান্য স্থানের চেয়ে বেশি থাকায় সহজেই দূষণের ক্ষতিকর প্রভাবসমূহ চিহ্নিত করা যায়। যেমন, গ্রাম আর শহরের বৈশিষ্ট্য থেকে সহজেই দূষণের বিভিন্ন উৎস চিহ্নিত করা যায়। বায়ুদূষণের অন্যতম উৎস হচ্ছে ধুলা, যানবাহন, ট্যানারিসহ বিভিন্ন কলকারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও রাসায়নিক উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া অন্যান্য উৎসের মধ্যে রয়েছে-
- শিল্পকারখানায় থেকে সৃষ্ট ধোঁয়া ও ক্ষতিকর রাসায়নিক বর্জ্য
- কঠিন বর্জ্য পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া
- কাঠ, কয়লা ও অন্যান্য জৈব জ্বালানি রান্নার কাজে ব্যবহার
- ইটভাটার কালো ধোঁয়া
- বিদ্যুৎ ও তাপ উৎপাদনকারী যন্ত্র থেকে উৎপন্ন ধোঁয়া
- রাস্তায় চলাচলকারী যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া
- অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের ঊর্ধ্বে বায়ুমন্ডলের ওজোন স্তরে ক্রমবর্ধমান ফাটল
- ট্যানারিশিল্প থেকে সৃষ্ট সালফার ডাই-অক্সাইড
- রাসায়নিক উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ কারখানা
- নির্মাণ ও উন্নয়নকাজের ফলে সৃষ্ট ধুলা
- কৃষিজমি থেকে উৎপন্ন ধুলা
- অ্যাসিড বৃষ্টি
- উপকূলীয় দ্বীপসমূহ ও উপকূলীয় ভূমি এলাকায় সন্নিকটস্থ সমুদ্র তরঙ্গসৃষ্ট লবণ কণা দ্বারা বায়ুদূষণ
- অন্যান্য দূষণকারী পদার্থ।
বায়ুদূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকি
বায়ুদূষণকে অদৃশ্য ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটির গবেষণায় উঠে এসেছে, বায়ুদূষণে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ৭০ লাখ মানুষ অপরিণত বয়সে মারা যায়। এ ছাড়া নানা ধরনের শারীরিক সমস্যায় ভোগে অসংখ্যা মানুষ। নগরের বাসিন্দাদের রোগ-ব্যাধির কমপক্ষে ২২ শতাংশের জন্য সরাসরি দায়ী বায়ুদূষণ, যার মধ্যে অন্যতম ক্যানসার। যাঁরা বায়ুদূষণের শিকার হচ্ছেন, তাদের মগজ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বায়ুতে যেসব দূষণ কণিকা থাকে, সেগুলো শিরা-উপশিরা দিয়ে সরাসরি মগজে গিয়ে পৌঁছায়। এতে অনেকের মানসিক সমস্যা ও স্মৃতিভ্রমের ঝুঁকি তৈরি করে। অনেকেই মানসিক চাপে ভুগতে থাকে। অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে-
শ্বাসকষ্ট
- হাড়ের ঘনত্ব কমে ফ্র্যাকচার হওয়া
- স্ট্রোকের ঝুঁকি
- কিডনির রোগ
- উচ্চ রক্তচাপ
- জন্মগত ত্রুটি
- হার্ট অ্যাটাক
- শুক্রাণুর ক্ষতি
- অ্যালার্জি
- মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব।
বায়ুদূষণের কারণে সর্বাধিক ক্ষতি হয় শিশুরা। বায়ুতে অতিরিক্ত সিসার উপস্থিতি শিশুদের মানসিক বৃদ্ধিকে ব্যাহত করে। প্রতিবছর ঢাকার বায়ুতে প্রায় ৫০ টন সিসা নির্গত হচ্ছে। ঢাকা শিশু হাসপাতালের শিশু বিকাশকেন্দ্রে শিশুদের দেহে সিসাদূষণের ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। পরীক্ষাকৃত শিশুদের রক্তে প্রায় ৮০ মাইক্রোগ্রাম/ডি.এল থেকে ১৮০ মাইক্রোগ্রাম/ডি.এল সিসা পাওয়া গেছে, যা গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে ৭ থেকে ১৬ গুণ বেশি। ইউ.এস সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের নির্দেশনা অনুযায়ী রক্তে ১০ মাইক্রোগ্রাম/ডি.এল পরিমাণ পর্যন্ত সিসার উপস্থিতি নিরাপদ।
বায়ুদূষণ যখন নগর ঢাকায়
রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণ সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়েছে অনেক আগেই। তবে বর্তমানে তা শহরের বাসিন্দাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। নগরবাসী রয়েছে ভয়ানক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। দূষণের এই মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায় শীতকালীন মাত্রাতিরিক্ত ধুলায়। নগরের বিভিন্ন স্থানে খোঁড়াখুঁড়ি, ভাঙাচোরা সড়কে যানবাহন চলাচলের কারণে এই ধুলা হয়ে উঠেছে নিত্যসঙ্গী। ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন নামছে নতুন নতুন যানবাহন। এ ছাড়া সচল গাড়িগুলোর ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিনের কারণে ছড়াচ্ছে বিষাক্ত ধোঁয়া। আর সিএনজিচালিত গাড়ি থেকে বের হচ্ছে ক্ষতিকারক বেনজিন। এ ছাড়া সালফার ও সিসাযুক্ত পেট্রল ব্যবহার, জ্বালানি তেলে ভেজাল ও ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিনের কারণে এসব গাড়ির ধোঁয়ার সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোঅক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, অ্যালডিহাইডসহ বিভিন্ন বস্তুর কণা ও সিসা নিঃসরিত হয়ে বাতাসকে করছে দূষিত। এ ছাড়া অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত শিল্পবর্জ্য, ইট ভাটার ধোঁয়াসহ বিভিন্ন উৎসের দূষণ বাতাসে কার্বনের মাত্রা বৃদ্ধি করছে। ফলে ঢাকার বার্ষিক গড় উষ্ণতাও বাড়ছে। এতে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। বৃষ্টিপাত ও উষ্ণতার স্বাভাবিক নিয়মের ঘটছে ব্যত্যয়। নানা রকম স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে এই নগরের বাসিন্দারা।
বায়ুদূষণ রোধে বৈশ্বিক উদ্যোগ
বায়ুদূষণের ভয়াবহতা কমাতে এবং দূষণরোধে আজ বিশ^বাসী স্বোচ্চার হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো। এসব দেশ দূষণরোধে নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
চীনের বড় শহরগুলো বায়ুদূষণের প্রভাব হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ চেষ্টা করছে, আবাসিক এলাকায় মানুষ যেন যানবাহনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সহজে হাঁটাচলা করতে পারে। সে লক্ষ্যে ৫০ শতাংশ রাস্তা গাড়িমুক্ত করার চিন্তা করছে দেশটি। এখন পর্যন্ত চীন ৩০০টি পরিবেশবান্ধব শহর নির্মাণ করেছে। দেশটি সম্প্রতি প্রায় সব ধরনের কয়লা জ্বালানিনির্ভর কলকারখানা এবং ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি অনেক গ্রামে কাঠ পোড়ানোও বন্ধ। শহরের ধোঁয়াশা কমাতে তারা বায়ুনিষ্কাশন টাওয়ার নির্মাণ করেছে দেশটির অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস-এর ইনস্টিটিউট অব আর্থ এনভায়রনমেন্ট বিভাগে। এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১০ মিলিয়ন কিউবিক মিটার বিশুদ্ধ বায়ু ছাড়া হয়েছে। ফলে ওই এলাকায় বাতাসের মান আগের চেয়ে বেশ ভালো।
কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটায় সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক বাস পরিবহনব্যবস্থা রয়েছে। তা সত্ত্বেও বায়ুদূষণ রোধে ১৯৭৪ সাল থেকে এই শহরে সপ্তাহে এক দিন ১২০ কিলোমিটার রাস্তায় কোনো যান্ত্রিক যানবাহন চালানো হয় না। এ ছাড়া শহর কর্তৃপক্ষ কয়েক শ কিলোমিটার সাইকেল লেন নির্মাণ করছে।
বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহরগুলোর একটি মেক্সিকো সিটি। বায়ুদূষণ রোধে ২০২৫ সাল নাগাদ সব ধরনের ডিজেলচালিত গাড়ি নিষিদ্ধের অঙ্গীকার করেছে শহরটি।
দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচেনে সাইকেলকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। গণপরিবহনের পাশাপাশি যাতে বিপুলসংখ্যাক সাইকেল নির্বিঘ্নে চলতে পারে, সেজন্য রাস্তাগুলোকে চওড়া করা হয়েছে।
ভারতের নয়াদিল্লির ব্যাপক বায়ুদূষণ রোধে বিদ্যুৎচালিত অটোরিকশা নামানো হচ্ছে। ২০৩০ সাল নাগাদ সেখানে নতুন সব বাহন হবে বিদ্যুৎচালিত এবং গ্যাসচালিত যান নিষিদ্ধ করা হবে।
নরওয়ের রাজধানীতে ডিজেলচালিত গাড়ি নিষিদ্ধ।
২০২৪ সাল থেকে ফ্রান্সের প্যারিসে ডিজেলচালিত গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ হবে; ২০৩০ সাল থেকে দেশটি সব ধরনের জ্বালানীনির্ভর গাড়ি নিষিদ্ধ করে বৈদ্যুতিক গাড়ি নামাবে।
লন্ডনের কেন্দ্রে গাড়ি চালাতে দিনে ১০ পাউন্ড বা প্রায় ১৪ ডলার মাশুল গুনতে হয়। রাস্তায় লাগানো যন্ত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির নাম্বারপ্লেট চিহ্নিত করে এই মাশুল ধার্য করে।
বিশ্বের সবচেয়ে সাইকেলবান্ধব শহর ডেনমার্কের কোপেনহেগেন ২০১৯ সাল থেকে ডিজেল গাড়ি প্রবেশ বন্ধ করার কথা ভাবছে। শহরের ৩০০ কিলোমিটারের বেশি রাস্তা শুধুমাত্র সাইকেল আরোহীদের জন্য লেন রাখা হয়েছে।
বায়ুদূষণ কমাতে আমাদের করণীয়
বায়ুদূষণের ফল মারাত্মক হলেও রাতারাতি বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। আবার একেবারে দূষণমুক্তও করা অসম্ভব। এ দেশেও দূষণ রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, যার ধারা চলমান রয়েছে। যেমন, পরিবেশ অধিদপ্তর ঢাকা শহরে বায়ুদূষণকারী টু স্ট্রোক ইঞ্জিনবিশিষ্ট অটোরিকশা কিংবা কালো ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস নির্গমনকারী দুর্বল ইঞ্জিনবিশিষ্ট পুরোনো বাস, ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করে, যা বন্ধ করে দেয়। তা সত্ত্বেও এখনো ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন চলাচলকারী ৯০ শতাংশেরও অধিক যানবাহন ত্রুটিযুক্ত। ডিজেলচালিত যানবাহনগুলো কালো ধোঁয়া নির্গত কওে, যাতে দহন সম্পূর্ণ না হওয়া সূক্ষ্ম কার্বন কণা বিদ্যমান থাকে। তাই একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে পরিকল্পনা অনুযায়ী সামনে এগোতে হবে। বাংলাদেশে বর্তমানে বায়ুর দূষক পদার্থ শনাক্তকরণের লক্ষ্যে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। সেসব কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য আমলে নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বায়ুদূষণ প্রতিরোধে ও পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারিভাবে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নিতে হবে জোরালো পদক্ষেপ। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
- শহরের ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করে গণপরিবহনের সংখ্যাা বাড়াতে হবে।
- সাইকেলের মতো অযান্ত্রিক যানের ব্যবহার বাড়াতে লেনব্যবস্থা চালুসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
- যেসব যানবাহন থেকে কালো ধোঁয়া ও বিষাক্ত সিসা নির্গত হয়, সেগুলোকে চিহ্নিত করে গাড়ির ফিটনেস চেক করে সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
- সড়ক যানবাহনের ওপর চাপ কমাতে নৌপথ খনন ও পুনঃখনন করে সারা দেশে নৌ-যোগাযোগ বাড়ানো। এতে যানজটও কমবে, একই সঙ্গে যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
- অপরিকল্পিতভাবে স্থাপিত শিল্পকারখানার থেকে নির্গত ক্ষতিকর রাসায়নিক ও গ্যাস কমাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো।
- ঢাকা শহরের ভেতরে ও চারপাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিল্পকারখানার পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে বাধ্য করা।
- যন্ত্রতত্র শিল্পকলকারখানা স্থাপনের অনুমতি না দিয়ে তা ইপিজেডের আদলে নির্দিষ্ট স্থানে স্থানান্তর করতে হবে।
- প্রচলিত ইটভাটা নিষিদ্ধ করে আধুনিক মেশিনের পরিবেশবান্ধব ইট তৈরিতে উৎসাহিত করতে হবে।
- নগরের অপরিকল্পিতভাবে খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ করে সঠিক নিয়মে উন্নয়নকাজ পরিচালনা করতে হবে।
- নির্মাণকাজে যাতে ধুলা কম হয়, সে জন্য কাজের সময় বালু ও ইট পানি দিয়ে ভিজিয়ে নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখতে হবে।
- সঠিক নিয়মে নগরের বর্জ্য সংগ্রহ করা এবং উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
- নগরে প্রচুর গাছ লাগাতে হবে। প্রয়োজনে ছোট ছোট পার্ক বা জোন করে বৃক্ষরোপণ করতে হবে।
- প্রতিটি ভবনে যেন বাগান সৃষ্টি করা যায় সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
বায়ুদূষণের ভয়াবহতা হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে অনুধাবন করা যায় না। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এর ফল মারাত্মক। এখনই সময় সচেতন হওয়ার। দেশের প্রত্যেক নাগরিক সচেতন না হলে বায়ুদূষণ রোধ সম্ভব নয়। তবে এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে পরিবেশ অধিদপ্তরকে। মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর নির্মল বায়ুতে বেঁচে থাকার অধিকার কিন্তু সবারই।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৫তম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৯