ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ সিস্টেম (শেষ পর্ব)

যেকোনো নির্মাণকাজে যখন নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে, তখন ওই কাজ সম্পন্ন করার পর নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। ফলে, আমাদের দেশের ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ সিস্টেম নির্মাণের ক্ষেত্রে যেসব অনিয়ম দেখা দেয়, তাতে বিভিন্ন রকম সমস্যা দেখা দেওয়াটাই স্বাভাবিক। সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রিত এসব কাজের ডিজাইন-ড্রইং কি থাকে জানি না, তবে সরেজমিনে যে কাজ সম্পাদিত হতে দেখেছি, তাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়মনীতির কোনো বাধ্যবাধকতা দেখি না।

প্রসঙ্গত, ইঞ্জিনিয়ারিং থিওরি মোতাবেক এসব কাজ কার্যকরভাবে সম্পাদন করণার্থে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রস্তাবিত এলাকার জনবসতির ঘনত্ব বিবেচনায় নিয়ে ড্রেনের ধারণক্ষমতা নির্ণয় করা এবং অ্যালাইনমেন্ট বরাবর মাটির গুণাগুণ ও ধরন অনুযায়ী যথাযথ একটি ডিজাইন ও ড্রইং প্রণয়ন করা অত্যাবশ্যক। সেই সঙ্গে নির্মাণকাজে ব্যবহৃতব্য মালামালের স্পেসিফিকেশন এবং সব কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনকল্পে সার্বিক দিকনির্দেশনা থাকাও জরুরি।

সর্বোপরি, সব কাজ নিয়মানুযায়ী সম্পাদন করার লক্ষ্যে অভিজ্ঞ লোকবল, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং সঠিক ও সুষ্ঠু কর্মপদ্ধতি প্রয়োজন। আগেই আলোচনা করা হয়েছে, ড্রেন দুইভাবে নির্মিত হয়, যেমন-

১.    সারফেইস ড্রেন

২.   কভারড্ ড্রেন

সারফেইস ড্রেন নির্মাণকল্পে সাধারণত ব্রিক-মেশনরি কিংবা রিইনফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিট (আরসিসি) ব্যবহার করা হয়, যা প্রস্তাবিত ড্রেনের সাইজ, ধরন এবং মাটির অবস্থা বিবেচনায় ডিজাইন ও বাস্তবায়ন করা হয়ে থাকে।

কর্মপদ্ধতি

যেকোনো ড্রেন নির্মাণকাজের সময় ড্রেনের অ্যালাইনমেন্ট বরাবর লেভেল মেশিনের সাহায্যে নির্দিষ্ট একটি দূরত্ব পরপর লেভেল পেগ (খুঁটি) বসিয়ে তাতে লেভেল চিহ্নিত করা জরুরি। অতঃপর ড্রইংয়ে নির্দেশিত স্লোপ অনুসারে লেভেল পেগের রেফারেন্স মোতাবেক ড্রেনের মাটি কাটা প্রয়োজন। অত্র মাটি কাটার পর প্রাপ্ত সারফেস থেকে নরম কাদা-মাটি সরানো এবং জমা পানিনিষ্কাশন করে ড্রেনের প্রস্তাবিত তলা সঠিকভাবে সমান করে নেওয়া অপরিহার্য।

লেভেল মার্ক অনুযায়ী, নির্দিষ্ট লেভেল পর্যন্ত মাটি কাটার পরও যদি ড্রেনের তলায় নরম মাটি থাকে, তাহলে অত্র মাটি অপসারণ করে সেখানে বালু ভরাট করার মাধ্যমে একটি সমান ও শক্ত বেইজ তৈরি করে নিতে হয়। এই শক্ত বেইজ তৈরির বিষয়টি আরও নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সমান মাটি/বালুর ওপর সিঙ্গেল ব্রিক ফ্ল্যাট সলিং করে তার ওপর সিমেন্ট কংক্রিট (সিসি) বা রিইফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিট (আরসিসি) ঢালাই দিয়ে ড্রেনের বেইজ তৈরি করা হয়।

বেইজ ঢালাই সঠিকভাবে জমাট বাঁধা এবং শক্তি সঞ্চার নিশ্চিত করণার্থে নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত কিউরিং করা জরুরি। বেইজের কিউরিং পিরিয়ড অতিক্রান্ত হওয়ার পর ডিজাইন ও ড্রইং মোতাবেক ইটের গাঁথুনি কিংবা আরসিসি ঢালাই করে দুই পাশের দেয়াল নির্মাণ করে পুনরায় কিউরিং করা হয়ে থাকে। এরপর নিট সিমেন্ট ফিনিশিংসহ প্লাস্টারের কাজ সম্পন্ন করা হয়। এসব ড্রেনের ওপর আরসিসি স্লাব ঢালাই করে ঢেকে দেওয়া হয়, ক্ষেত্রবিশেষে খোলাও থাকে।

কোনো ড্রেন যখন আরসিসি স্লাব দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়, তখন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অর্থাৎ পরিষ্কার করার জন্য নির্দিষ্ট একটি দূরত্ব পরপর ম্যানহোল কভার বসানো কিংবা স্লাবের একটি অংশ তুলে ড্রেইনের মধ্যে মানুষ নামার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। এসব ড্রেন কভারড কিংবা ওপেন যাই হোক ড্রেইনের নিষ্কাশন ফ্লো ঠিক রাখার জন্য নিয়মিত পরিষ্কার করা জরুরি। নতুবা ড্রেনের স্বভাবিক ফ্লো বিঘ্নিত হয়ে আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে। উল্লেখ্য, ড্রেনের ব্যবহারিক বিশ্লেষণে দুই ধরনের ড্রেনেজ সিস্্টেম নির্মিত হয়ে থাকে, যেমন-

১.    স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ

২.   স্যুয়ারেজ ড্রেনেজ

ব্রিক মেশনরি কিংবা আরসিসি ঢালাইয়ের মাধ্যমে নির্মিত ড্রেনগুলো সাধারণত স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আর স্যুয়ারেজ সিস্্টেমের জন্য আরসিসি প্রি-কাস্ট পাইপ ব্যবহারে ড্রেন নির্মাণ করা হয়। ড্রেনেজ সিস্্টেমের কার্যকারিতা এবং এলাকার চাহিদা অনুযায়ী অত্র পাইপের ব্যাস বিভিন্ন প্রকার হয়ে থাকে।

পাইপ ড্রেনেজ নির্মাণের ক্ষেত্রেও প্রস্তাবিত ড্রেনের অ্যালাইমেন্ট বরাবর একই নিয়মে মাটি কেটে নির্দিষ্ট স্লোপ অনুসারে পাইপ বসিয়ে যেতে হয় এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণকল্পে নির্দিষ্ট একটি দূরত্ব পরপর ইনস্পেক্শন পিট রাখতে হয়। এসব পাইপ বসানোর ক্ষেত্রেও শক্ত ও লেভেলড বেইজ তৈরি করা জরুরি। মনে রাখা দরকার, পাইপ লাইনের বেইজ যদি সব জায়গায় সমানভাবে শক্ত ও মজবুত না হয় তাহলে ড্রেনের পাইপ ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে বসে যেতে পারে।

নরম মাটির কারণে পাইপ বসে গেলে পাইপ লাইনের তলার স্লোপ ঠিক থাকে না। এতে ড্রেনের নিষ্কাশনব্যবস্থা বিঘ্নিত হয় এবং বসে যাওয়া স্থানে পলি জমে ড্রেনের পরিবহন কিংবা ধারণক্ষমতা কমে যায়। সুতরাং প্রয়োজনীয় লেভেল অনুযায়ী মাটি কাটার পর যদি বেইজের মাটি পর্যাপ্ত শক্ত অবস্থায় না পাওয়া যায়, তাহলে নরম মাটি উঠিয়ে ফেলে নির্দিষ্ট লেভেল পর্যন্ত লেয়ারে লেয়ারে বালু ভরাট ও কম্প্যাক্শন করে শক্ত বেইজ তৈরি করে নিতে হয়।

এরপর পাইপ বসানোর সময় দুটি পাইপের সংযোগস্থলে কলার ব্যান্ড বসিয়ে জয়েন্টগুলো সিমেন্ট মর্টার দ্বারা ভালোমতো সিল করে দিতে হয়। নইলে এসব জয়েন্ট দিয়ে মাটি পড়ে ড্রেনের মধ্যে জমা হয় এবং একইভাবে ড্রেনের পরিবহন কিংবা ধারণক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। ফলে মাটি কাটা থেকে শুরু করে প্রতিটি কাজ সম্পন্ন করার সময় যথাযথ নিয়ম মেনে চলা এবং কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য সার্বক্ষণিক তদারকি করার কোনো বিকল্প নেই।

পাইপ ড্রেইন নির্মাণকল্পে পাইপ বসানোর পর, মাঝে মাঝে রাখা জায়গা অনুসারে ইনস্পেক্শন পিটসমূহ তৈরি করা হয়। এসব পিট সাধারণত ইটের গাঁথুনি দিয়ে করা হয়। গাঁথুনি শেষে পিটের দেয়ালে নিট সিমেন্ট ফিনিশিংসহ সিমেন্ট প্লাস্টার করা হয়। পিটের টপ লেভেল রোড লেভেল অনুসারে নির্ধারণ করা এবং পিটের ওপর ঢাকনা হিসেবে অপসারণযোগ্য আরসিসি স্লাব নির্মাণ করা হয়ে থাকে। কোনো কোনো সময় আরসিসি স্লাবের সঙ্গে সি আই ম্যানহোল কভারও দেওয়া হয়। 

পাইপ বসানো এবং ইনস্পেক্শন পিট নির্মাণ শেষে ব্যাকফিল অর্থাৎ পিটের চতুর্পাশসহ পাইপের পার্শ্বদ্বয় এবং ওপরের অংশ নিয়মমাফিক ভরাট করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের রাস্তাঘাটে সচরাচর যেটা দেখা যায় তা হলো, উদ্বৃত্ত কাদা-মাটি, ময়লা-আবর্জনা, ইট-পাথর যা পায় তাই দিয়ে এসব ব্যাকফিলের অংশ ভরাট করা হয়ে থাকে। এই অনিয়মে ভরাটকৃত এলাকার ওপর তৈরি হয় রাস্তা, ফলে রাস্তা বসে যাওয়াসহ নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

ইঞ্জিনিয়ারিং থিওরি এবং সরকারি কাজের নিয়মানুযায়ী পাইপ বসানো এবং ইনস্পেক্শন পিট নির্মাণ শেষে ব্যাকফিলের কাজটি সম্পূর্ণভাবে বালু ভরাট করে সম্পন্ন করার কথা। তাও আবার নির্দিষ্ট মানের বালু দ্বারা ৯ ইঞ্চি কিংবা ১২ ইঞ্চি লেয়ারে লেয়ারে ভরাট করে যথাযথভাবে কম্প্যাক্শন করা অত্যাবশ্যক। যাতে এই ভরাটকৃত অংশের ওপর নির্মিতব্য রাস্তা কিংবা অন্য কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে ভবিষ্যতে তা বসে বা দেবে যেতে না পারে।     

যাই হোক, আমি বিভিন্নভাবে যা কিছু বলার চেষ্টা করেছি, তা সবই তত্ত্বকথা, নিয়মনীতির কথা এবং বই-পুস্তকের কথা। আর এসব কথাগুলো সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সবার সঠিকভাবে জানা থাকা এবং তা মেনে চলা অপরিহার্য। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আমরা এসব কাজের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, তাদের অনেকেই বিষয়গুলো নিয়ে মাথা ঘামাতে চাই না। কিংবা পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে মাথা ঘামাতে পারি না, যার কোনোটাই গ্রহণযোগ্য নয় এবং নীতি নৈতিকতাবহির্ভূত।

তাই, আবারও সেই একই কথার পুনরাবৃত্তি ঘটে। ‘মানুষ সৃষ্টির সেরা জীবÑ বিচার-বুদ্ধি, বিবেক-বিবেচনা সব মিলিয়ে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিতে হয় তার কর্মের মাধ্যমে। সমাজ, ধর্ম, আইন, আদালত কোনো কিছুই মানুষকে নীতিভ্রষ্ট দেখতে চায় না। অতএব, আমাদের সবার মধ্যে নীতিবোধ জাগ্রত হোক, আমরা সবাই মানুষ ও জাতির কল্যাণে আত্মনিবেদিত হই, এই কামনায় আমি আমার লেখার পরিসমাপ্তি টানছি।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৪তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৯।

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান পিইঞ্জ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top