ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ সিস্টেম (পর্ব ২)

ঢাকা শহর তথা সারা দেশের ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ সিস্টেমের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে পূর্বালোচিত সমস্যাগুলো মাথায় রেখে সব কাজ সম্পাদন করলে আমরা আমাদের চারপাশে উদ্ভূত সমস্যা থেকে অনেকাংশেই পরিত্রাণ পেতে পারি। তাই, বিদ্যমান ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ সিস্টেম সংস্কার কিংবা পুনর্নির্মাণ করা এবং জনভোগান্তি থেকে সাধারণ মানুষকে অব্যহতি দেওয়ার লক্ষ্যে সার্বিক অবস্থা জরিপ করে তদনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া অত্যাবশ্যক।

দেশের প্রচলিত নিয়মানুযায়ী ডিপার্টমেন্ট অব ওয়াসা এবং বিভিন্ন শহরের সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন/পৌরসভা এসব কাজের দায়িত্ব বহন করে থাকে। কর্তৃপক্ষের যথাযথ উদ্যোগে সব কার্যক্রম বাস্তবায়নার্থে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। এতদলক্ষ্যে, নির্মাণসংক্রান্ত প্রতিটি কাজ নিয়মানুসারে সুসম্পন্ন করার নিমিত্তে আলাদা আলাদাভাবে বাস্তবায়ন ও মনিটরিং সেল তৈরি করা দরকার, যাতে সুষ্ঠু তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট সবার জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়।

প্রসঙ্গত, আমাদের দেশে বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটে প্রতিবছরই বিভিন্ন এলাকার জন্য কিছু থোক বরাদ্দ থাকে, সেই সঙ্গে থাকে নির্দিষ্ট কিছু প্রকল্পের বাজেটও। কিন্তু, এসবের সুষ্ঠু পরিকল্পনা, সার্বিক তদারকি এবং জবাবদিহির অভাবে আর্থিক বরাদ্দের সিংহভাগই অনর্থ কিংবা অদৃশ্য খাতে ব্যয় হয়। বাস্তবে যতটুকু কাজ সম্পাদিত হয়, তাও তদারক করার জন্য মাঠে কোনো দায়িত্বশীল লোকের দেখা মেলে না। ফলে যে কাজ সম্পন্ন করা হয়, সেটা হয়ে থাকে ত্রুটিপূর্ণ।

আমার দেখা মতে, এ জাতীয় কাজ বাস্তবায়নে সরেজমিনে যারা কাজ কওে, তাদের সঙ্গে টেকনিক্যাল কোনো সুপারভাইজার দেখা যায় না। গায়ে খেটে কাজ করা মিস্ত্রিসর্বস্ব লোকেরাই তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে এসব কাজ সম্পাদন করে থাকে এবং তারা কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে না। নিয়মের ব্যত্যয়গুলো আমি নিজে দেখেছি, উপযাচক হয়ে কথাও বলতে গিয়েছি, কোনো কোনো সময় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের গোচরে আনার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তেমন কোনো সুফল মেলেনি।

প্রসঙ্গত, যেকোনো কাজের সুফল পেতে হলে প্রতিটি ক্ষেত্রে মান সম্পন্নভাবে কাজ সম্পাদন করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের অভিজ্ঞতা এবং কর্মদক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে, কাজে ব্যবহৃতব্য মালামালের গুণগত মান এবং ভৌত কাজ বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট নিয়মনীতি সম্পর্কিত বিষয়গুলোও কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার জানা একান্ত প্রয়োজন। শুধু জানলেই হবে না, মালামাল নির্বাচন এবং ভৌত কাজ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নকল্পে এসব নিয়মনীতি যথাযথভাবে মেনে চলাও অত্যাবশকীয় একটি বিষয়, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই থাকে উপেক্ষিত।

আমার দৃষ্টিতে, প্রতিটি কাজের সুষ্ঠু তদারকি এবং কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারাই আমাদের বড় সমস্যা। এ বিষয়ে বলতে গেলে প্রথমত, আমাদের দেশের মানুষের নীতি-নৈতিকতা নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। দ্বিতীয়ত, স্বজনপ্রীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ পদ ও কাজে অনভিজ্ঞ এবং অদক্ষ লোকবল নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টিও চলে আসে। তাই সার্বিক অবস্থার উন্নতিকল্পে আমাদের সামাজিক তথা ব্যক্তি সচেতনতার বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা দরকার।

যাই হোক, এখন আবার মূল কথায় ফিরে আসি, ঢাকা শহরের ড্রেনেজ এবং স্যুয়ারেজ সিস্টেমকে কার্যকর করতে হলে বিদ্যমান সব নিয়মনীতি এবং বিধিনিষেধ মেনে চলার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে বাধ্য করতে হবে। প্রয়োজনে বিধিবিধান লঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে দৃষ্টান্তমূলক কিছু শাস্তি বা অর্থদণ্ড দেওয়ার ব্যাপারে অধিকতর কঠোর হতে হবে। সরকার চাইলে পারে না এমন কোনো কাজ নেই। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ‘নদী উদ্ধার অভিযান’।

অতএব, ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ সিস্টেমের উন্নয়ন নিশ্চিত করণার্থে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৬, গেজেট-২০০৮ এ শহর/নগর উন্নয়নের লক্ষ্যে যেসব বিধিবিধান সন্নিবেশিত হয়েছে, তার আইনি প্রয়োগ দরকার। প্রতিটি আবাসিক এলাকা থেকে বৃষ্টির পানি ও স্যুয়ারেজ স্বাচ্ছন্দ্যে নেমে যাওয়া নিশ্চিত করণার্থে সব ইমারত নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নকালে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা কর্তৃক নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে যে কাজগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি: 

  • ‘মফএআর’-এর নিয়মানুযায়ী সফ্ট গ্রাউন্ড রাখা নিশ্চিত করা অর্থাৎ ইমারতের চারিপাশে উন্মুক্ত মাটি রাখা
  • এলাকায় বিদ্যমান নদী-খাল উদ্ধার ও পুনরায় খনন করা
  • পরিকল্পিত ড্রেনেজ সিস্টেমের মাধ্যমে জমে থাকা বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করা
  • ইমারতে বসবাসকারীদের বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত পানি ও বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য স্থাপিত ড্রেনসমূহ স্যুয়ারেজ লাইনের সঙ্গে কার্যকরভাবে সংযোগ দেওয়া
  • ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজের লাইনগুলো সঠিকভাবে চালু রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা ইত্যাদি।

ড্রেনেজ সিস্টেম সাধারণত দুইভাবে নির্মিত হয়ে থাকে;

১.     সারফেস ড্রেন

২.    আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেন।

উভয় ক্ষেত্রেই পারিপার্শ্বিক অবস্থা, এলাকার গুরুত্ব, জনবসতির ঘনত্ব ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ড্রেনের ধারণ কিংবা পরিবহনক্ষমতা নির্ণয় করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। পাশাপাশি নির্মাণপদ্ধতি, মালামাল ও কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার বিষয়টিও অবশ্যই Ÿাস্তবায়ন করতে হবে। প্রতিটি ড্রেন নির্মাণের সময় এর ঢাল ঠিক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেন নির্মাণের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব বেশি করে দেখা দেয়।

এতদলক্ষ্যে, আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেন নির্মাণের জন্য প্রস্তাবিত এলাকার নির্দিষ্ট একটি বেঞ্চমার্ক থেকে লেভেল নির্ধারণকরত লেভেলিং ইনস্ট্রুমেন্টের সাহায্যে নির্মিতব্য ড্রেনের লম্বালম্বি সেকশন বরাবর তলদেশের লেভেল সঠিকভাবে নির্ণয় করার জন্য লেভেল মার্ক (খুঁটি) ঠিক করে নেওয়া প্রয়োজন। আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেন সাধারণত প্রি-কাস্ট আরসিসি পাইপ বসিয়ে নির্মাণ করা হয়। প্রতিটি পাইপ ডায়ামিটারভেদে ৫ থেকে ৬ ফুট লম্বা হয়।

এসব পাইপ বসানোর জন্য পর্যায়ক্রমিকভাবে মাটি কাটা, পাইপ বসানো এবং মাটি ভরাট (ব্যাকফিল) করার কাজগুলো পাশাপাশি চলতে থাকে। এসব কাজ বাস্তবায়নে সরেজমিনে আমি যা অবলোকন করেছি তা অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মবহির্ভূতভাবে কাজ করা এবং তা দেখার জন্য মাঠে লোকবলের অভাব কিংবা বিষয়গুলো নিয়ে অজ্ঞাত কারণে কেউ মাথা ঘামাতে চান না। ফলে, জনস্বার্থে নির্মিত এসব ড্রেন সময়ের ব্যবধানে জনভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে কোনো কাজ সম্পাদিত হয় না। ফলে, স্বল্প মেয়াদ পরেই তা আবার পুনর্নির্মাণ করার প্রয়োজন দেখা দেয়। আর এই পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রেই একাধিক সমস্যা দেখা দেয়। আমাদের দেশে আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেনেজ কিংবা স্যুয়ারেজ লাইনগুলো সচরাচর চলমান রাস্তার নিচ দিয়ে নির্মিত হয়, যা পুনর্নির্মাণের সময় বিদ্যমান রাস্তাগুলোতে চলাচল বিঘ্নিত হয় কিংবা চলাচলের অযোগ্য হয়ে যায়।

তাই যেকোনো আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার সময় প্রয়োজনীয় সার্ভিস কানেকশনগুলো (গ্যাস, ইলেকট্র্রিসিটি, পানি,  পয়ঃপ্রণালি ইত্যাদি) দীর্ঘমেয়াদি (৫০ থেকে ১০০ বছর) হিসাবে নির্মাণ করা অত্যাবশ্যক। সেই সঙ্গে প্রয়োজন, সব নির্মাণকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা। ভূগর্ভস্থ এসব কাজ সম্পাদন করার ক্ষেত্রে নির্মিতব্য স্ট্র্রাকচার/সাবস্ট্রাকচার সবকিছুই মানসম্পন্ন হওয়া জরুরি। এ ছাড়া কাজের শেষে মাটি ভরাট (ব্যাকফিল)-এর কাজটিও সঠিকভাবে করা জরুরি।

যেকোনো ব্যাকফিল সাধারণত চিকন বালু দ্বারা নির্দিষ্ট একটি লেয়ারে লেয়ারে (৯ ইঞ্চি থেকে ১২ ইঞ্চি) কম্প্যাকশন করে সম্পন্ন করার কথা। কিন্তু বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই ব্যাকফিলের কাজটি পাইপলাইন বসানোর জন্য খননকৃত মাটি কিংবা অন্যান্য পদার্থ (কাদা-মাটি, চাকা মাটি, ইট-পাথর ইত্যাদি) দ্বারা একবারেই ভরাট করে ফেলা হয়। যার ফলে নির্মিত লাইনসমূহ অকালে নষ্ট হয়ে যাওয়া, রাস্তা বসে যাওয়া ইত্যাদি নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিয়ে থাকে।

চলবে…

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৩তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৯।

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান পিইঞ্জ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top