রিইনফোর্সড্ সিমেন্ট কংক্রিট বা আরসিসি রোড
সিমেন্ট কংক্রিট রোডের দীর্ঘস্থায়িত্বতা এবং ভারবহন ক্ষমতা বৃদ্ধি করার জন্য কংক্রিট ঢালাই করার সময় ঢালাইয়ের অভ্যন্তরে রড ব্যবহার করে যে রোড নির্মাণ করা হয়, তাকে আরসিসি রোড বলা হয়। আরসিসি রোডে ব্যবহৃতব্য রডের পরিমাণ কী হবে তা প্রস্তাবিত রোডের বহন ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে, এই রোড নির্মাণ করার আগেই ওই রোডে কোন ধরনের যানবাহন চলাচল করবে সে অনুযায়ী কংক্রিট এবং রডের ডিজাইন করা হয়ে থাকে।
প্রস্তাবিত রোডের দীর্ঘস্থায়িত্বতা এবং ভারবহন ক্ষমতা অনুযায়ী ডিজাইন করে রডের ডায়ামিটার, স্পেসিং এবং কংক্রিটের পুরুত্ব নির্ণয় করা হয়। অত্র ডিজাইন এবং নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার জন্য ন্যাশনাল এবং ইন্টারন্যাশনাল কিছু কোড আছে, যা যথাযথভাবে মেনে চলা অত্যাবশ্যক। ডিজাইন শেষে একটি ড্রইং প্রণয়ন করা হয়, যেখানে ভৌত কাজ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ব্যবহৃতব্য মালামালের স্পেসিফিকেশন, কংক্রিটের পুরুত্ব এবং রডের ডায়ামিটার ও স্পেসিং উল্লেখ করা থাকে।
এই ডিজাইন অনুযায়ী কংক্রিটের নির্ধারিত স্ট্রেন্থ পাওয়া নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্মাণকাজ শুরুর আগেই নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুসারে ব্যবহৃতব্য মালামালের নমুনা সংগ্রহকরত একটি মিক্স ডিজাইন করা হয়। এরপর এই মিক্স ডিজাইন মোতাবেক কিছু নমুনা কংক্রিট তৈরি করে তা দিয়ে ২ সেট (২ X ৩) সিলিন্ডার বানানো হয়ে থাকে। প্রস্তুতকৃত সিলিন্ডারগুলো পর্যাপ্ত কিউরিং (কমপক্ষে ৭ থেকে ২৮ দিন) করার পর ল্যাবরেটরিতে টেস্ট করা হয়।
ল্যাবরেটরি টেস্টের ফলাফল অনুসারে পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। অর্থাৎ ল্যাবরেটরি টেস্টে কাঙ্ক্ষিত স্ট্রেন্থ নিশ্চিত করা গেলে অত্র ডিজাইন মোতাবেক রাস্তার নির্মাণকাজ বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। অন্যথায় নতুনভাবে মিক্স ডিজাইন করে একই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবারও ল্যাবরেটরি টেস্ট করে আশানুরূপ ফল পাওয়ার পর নির্মাণকাজ শুরু করা হয়। তা ছাড়া, ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশন অনুসারে ব্যবহৃতব্য রডের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরি টেস্টের মাধ্যমে রডের গুণাগুণও পরীক্ষা করা হয়ে থাকে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আরসিসি রোড নির্মাণকাজে ব্যবহৃতব্য মালামাল ও কাজের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে উপরোল্লিখিত কাজগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করা জরুরি। অতএব, এতদ্বারা সংশ্লিষ্ট সব কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং পরিদর্শন করার জন্য দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোকবল নিয়োগ দেওয়া অপরিহার্য। কারণ, যেকোনো কাজের যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণ করে কাজটি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করার জন্য দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেয়।
আরসিসি রোড ঢালাই করার কাজটি ম্যানুয়াল কিংবা মেকানিক্যাল উভয় পদ্ধতিতেই হতে পারে। উন্নত দেশসমূহে এ ধরনের সব কাজই মেকানিক্যাল পদ্ধতিতে হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে অতীতে যন্ত্রপাতির অভাব থাকায় ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেই রাস্তা নির্মাণের কাজটি সম্পন্ন করা হতো। বর্তমানে আমাদের দেশও নির্মাণসংক্রান্ত যন্ত্রপাতিতে অনেকটাই সমৃদ্ধ। তাই দেশের অধিকাংশ রাস্তাই এখন মেকানিক্যাল পদ্ধতিতেই নির্মিত হয়ে থাকে।
আরসিসি রোড নির্মাণকাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব নিয়ম সিমেন্ট কংক্রিট (সিসি) রোড নির্মাণকাজের অনুরূপ, অতিরিক্ত শুধু রড সংযোজন করা হয়ে থাকে। এ ছাড়া সাব-গ্রেড, সাব-বেইজ, বেইজ কোর্স ইত্যাদি নির্মাণ করা, কংক্রিট ঢালাই করা সব কাজই একই নিয়মে সম্পন্ন করা হয়। পাশাপাশি, পর্যাপ্ত কিউরিং করাসহ সব কাজের মান নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রেও কোথাও কোনো ব্যত্যয় করার সুযোগ নেয়।
মনে রাখা দরকার, কংক্রিট ঢালাইয়ের কাজে পানির ব্যবহার খুবই সংবেদনশীল, যা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। সিমেন্ট যথাযথভাবে জমাট বাঁধার জন্য পানি অন্যতম একটি উপাদান। ফলে এর পরিমাণ কম কিংবা বেশি কোনোটাই কাঙ্ক্ষিত নয়। তাই পানির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে কংক্রিট মেশানোর পর স্লাম্প টেস্ট করা অপরিহার্য। এ ছাড়া, পানিসহ বিভিন্ন প্রকার কাঁচামাল ব্যবহারের অনুপাত নির্ধারণ করা এবং তদ্নুযায়ী সব মালামাল সুষ্ঠুভাবে মেশানোও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, যা নিশ্চিত করা অতীব জরুরি।
আরসিসি রোড অধিকতর ভারবহন ক্ষমতাসম্পন্ন ও দীর্ঘস্থায়ী কিন্তু আবহাওয়াজনিত তারতম্যের কারণে অর্থাৎ তাপমাত্রা হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে অত্র রোড়ে ফাটল দেখা দিতে পারে। অত্র ফাটল রোধকল্পে আরসিসি রোড নির্মাণে কংক্রিট ঢালাইয়ের কাজ চলাকালীনই নির্দিষ্ট একটা দূরত্ব পরপর এক্সপ্যানশন জয়েন্ট রাখা প্রয়োজন এবং তা নিশ্চিত করা জরুরি। এক্সপ্যানশন জয়েন্ট রাখার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি আছে, যা মেনে চলা অত্যাবশ্যক।
সর্বোপরি, সিমেন্ট কংক্রিট রোডের মতো আরসিসি রোড নির্মাণের কাজও যতই নিয়ম মেনে করা হোক না কেন, ঢালাই শেষে পর্যাপ্ত কিউরিং নিশ্চিত করতে না পারলে সম্পূর্ণ কাজটিই ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যাবে। তাই রাস্তা ঢালাইয়ের কাজ শেষ করার পর যানবাহন চলাচলের লক্ষ্যে উন্মুক্ত করে দেওয়ার আগে পর্যাপ্ত কিউরিং করা নিশ্চিত করতে হবে। নইলে নির্মিত রাস্তার দীর্ঘস্থায়িত্বতা কমে যাবে এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাড়বে। অতএব, অত্র বিষয়টি কোনোভাবেই অবহেলা করা সমীচীন নয়।
সিমেন্ট কংক্রিট (সিসি) কিংবা রিইনফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিট (আরসিসি) রোড নির্মাণ প্রকল্পের ভৌতকাজ বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে ব্যবহৃতব্য সব মালামাল ও কাজের সার্বিক মান নিয়ন্ত্রণ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ফলে, কংক্রিট ঢালাইয়ের কাজ শুরু করার আগেই কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃতব্য রড, বালু, পাথর, সিমেন্ট প্রতিটি জিনিসের গুণাগুণ যাচাই করা অত্যাবশ্যক, এরপর আসে কাজের মান নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি।
(চলবে)
ডিজিএম (কিউএ) অ্যান্ড এমআর
দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লি.
ক্যাপশন
রড বাঁধা এবং কংক্রিট ঢালাই করার দৃশ্য
ঢালাইয়ের ফিনিশিং দেওয়া এবং ফিনিশড রাস্তার দৃশ্য
প্রস্তুতকৃত সিলিন্ডার এবং সিলিন্ডার টেস্ট করার দৃশ্য
রড এবং রডের বেন্ড টেস্ট করার দৃশ্য
ম্যানুয়াল এবং মেকানিক্যাল উভয় পদ্ধতিতে ঢালাইয়ের ফিনিশিং দেওয়ার দৃশ্য
পানির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণকল্পে স্লাম্প টেস্ট করার দৃশ্য
এক্সপ্যানশন জয়েন্ট এবং ডাওয়েল বার স্থাপনের দৃশ্য
বিভিন্ন পদ্ধতিতে কিউরিং করার দৃশ্য
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৬তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৯