চিন্তা করুন তো, মাত্র ১১ বছরের এক শিশু গত ছয় মাসে সে বাসার বাইরে একবারও খেলতে পারেনি। একই বয়সের আরেকটি মেয়েশিশুকে এলাকার নিরাপত্তার অভাবে একা বাইরে যেতে দেওয়া হয় না। এই দুই শিশুর অভিজ্ঞতা আমাদের শহরগুলোর একটি সাধারণ বাস্তবতা। শহরে নতুন নতুন ভবন ও রাস্তা তৈরি হচ্ছে, কিন্তু শিশুদের খেলাধুলা, চলাফেরা ও বেড়ে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা কি তৈরি হচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে ১২ থেকে ১৯ জুন অনুষ্ঠিত হয় আটদিনব্যাপী ব্যতিক্রমধর্মী নকশা প্রদর্শনী ‘আমরা যে ঢাকায় বেড়ে উঠতে চাই’। শিশু ও কিশোরবান্ধব শহর গঠনের ভাবনা, নগর পরিকল্পনায় শিশুদের অংশগ্রহণ, এবং তাদের স্বপ্নের শহরের রূপকল্পকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই প্রদর্শনী চট্টগ্রামবাসীর ব্যাপক আগ্রহ ও অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।
শিশুদের চোখে শহরের নতুন পাঠ
আমরা সাধারণত শহর পরিকল্পনাকে প্রকৌশলী, স্থপতি কিংবা পরিকল্পনাবিদদের কাজ হিসেবে চিন্তা করি। কিন্তু যে শহরে শিশুরা বড় হয়, সেই শহর সম্পর্কে তাদের মতামত কতটা গুরুত্ব পায়? প্রদর্শনীটি মূলত এই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে ঢাকার রায়েরবাজার এলাকার ২৩৪ জন, এবং রূপনগর এলাকার ১৩১ জন শিশুর কল্পিত ও পরিকল্পিত ভবিষ্যৎ শহরের নকশা। ৮ থেকে ১৮ বছর বয়সী এসব শিশু-কিশোর যুক্তরাজ্যের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, এবং ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্টের গবেষকদের সঙ্গে কাজ করে তাদের এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করেছে। তাদের ভাবনায় উঠে এসেছে নিরাপদ রাস্তা, খেলার মাঠ, পার্ক, সহজ চলাচল এবং সবার জন্য উন্মুক্ত জনপরিসরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো।
এই প্রদর্শনী ‘বিল্ডিং চাইল্ড-অ্যান্ড ইয়ুথ-ফ্রেন্ডলি নেবারহুডস ইন ঢাকা, বাংলাদেশ’ প্রকল্পের অংশ। প্রকল্পের অভিজ্ঞতা ও ফলাফল ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই চট্টগ্রামে এ আয়োজনটি করা হয়।

উদ্বোধনী সংলাপে উঠে এলো বাস্তবতার কঠিন চিত্র
১২ জুন প্রদর্শনীর উদ্বোধনী দিনে অনুষ্ঠিত অংশীজন সংলাপে শিশু, অভিভাবক, শিক্ষক, গবেষক, স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন। আলোচনায় উঠে আসে শহুরে জীবনে শিশুদের নানা সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাবনার কথা।
প্রকল্পের বাংলাদেশি দলনেতা ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. রাশেদ ভুঞা , ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব আর্কিটেকচার অ্যান্ড প্ল্যানিংয়ের ডিন অধ্যাপক ড. রাশিদুল হাসান, ডিপার্টমেন্ট অব আর্কিটেকচারের প্রধান অধ্যাপক ড. সজল চৌধুরী এবং সাংবাদিক শারমিন রিমা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। অনলাইনে যুক্ত হন কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকল্পের প্রধান গবেষক ড. মাতলুবা খান।
আলোচনায় ড. মাতলুবা খান ভবিষ্যৎ চট্টগ্রামের মাস্টার প্ল্যানে শিশুদের অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন, শিশুদের জন্য শহর পরিকল্পনা মানে এমন একটি শহর গড়ে তোলা, যা সকল নাগরিকের জন্য বাসযোগ্য।
শিশুদের কণ্ঠে শহরের গল্প
আলোচনা অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল চট্টগ্রামের লালখান বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের এবং তাদের বাবা-মা ও শিক্ষকদের সরাসরি অংশগ্রহণ। তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতার কথা অকপটে তুলে ধরে।
শিশু প্রতিনিধি তাওসিফ(১১) জানায়, গত ছয় মাসে সে বাসার বাইরে একবারও খেলতে পারেনি। আরেক শিশু প্রতিনিধি জাফিরা(১১) শহরের অনিরাপদ পরিবেশের কথা বলতে গিয়ে জানায়, তাদের এলাকায় শিশুদের হাঁটাচলায় নানা অসুবিধা রয়েছে। রাস্তায় যানবাহনের চাপ বেশি, আর মেয়েদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতার কারণে পরিবার থেকেও নানা বিধিনিষেধ থাকে।
জাফিরার বক্তব্যে আরও উঠে আসে নগর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা—মেয়েশিশুদের স্বাধীন চলাচলের সীমাবদ্ধতা। সে জানায়, অনেক সময় নিরাপত্তার আশঙ্কায় তাকে বাইরে যেতে দেওয়া হয় না। একই উদ্বেগের কথা জানিয়ে একজন অভিভাবক প্রতিনিধি বলেন, মেয়েকে বাইরে ছাড়তে সব সময়ই দুশ্চিন্তা কাজ করে।
শিশুদের এই বক্তব্যগুলো নগর পরিকল্পনার আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করে। কারণ তারা শুধু অবকাঠামোর অভাবের কথা বলেনি। বরং নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং সামাজিক মানসিকতার মতো বিষয়ও সামনে এনেছে।
প্রাণবন্ত আলাপ শেষে শিশুদের প্রতিনিধি তাওসিফ ফিতা কেটে প্রদর্শনীর উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

খেলার মাঠের বৈষম্য
সংলাপে শহরে খেলার সুযোগের বৈষম্যের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। পরিকল্পনাবিদ ড. রাশিদুল হাসান বলেন, শহরে খেলাধুলার সুযোগ সবচেয়ে বেশি পায় উচ্চ আয়ের মানুষ, এবং সবচেয়ে কম আয়ের মানুষ। উচ্চ আয়ের মানুষ ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক খেলার সুবিধা ব্যবহার করতে পারে। আর নিম্ন আয়ের মানুষ অনেক সময় রাস্তায় খেলাধুলা করে। কিন্তু মধ্যবিত্ত শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার জায়গা প্রায় নেই বললেই চলে।
তার এই পর্যবেক্ষণ নগর উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ অসাম্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শহরে খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান কমে যাওয়ার ফলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে।
শিশুদের কথা কি আমরা শুনি?
স্থপতি ড. সজল চৌধুরী শিশুদের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে বড়দের মানসিকতার সমালোচনা করেন। তার মতে, বড়রা প্রায়ই শিশুদের হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু শিশুদের কথা শোনার চেষ্টা করে না। শিশুদের জন্য পরিকল্পনা করতে হলে প্রথমে তাদের অভিজ্ঞতা ও চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
এই ধারণাটিই পুরো প্রদর্শনীর মূল দর্শন। শহর সম্পর্কে শিশুদের ভাবনা কেবল আবেগের বিষয় নয়। এটি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে—প্রদর্শনীটি সেই বার্তাই দিয়েছে।

প্রদর্শনীতে চট্টগ্রামবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ
আটদিনের প্রদর্শনীজুড়ে ছিল দর্শনার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, শিল্পী, সাংবাদিকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রদর্শনী দেখতে আসেন।
কাপাসগোলা সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, অনন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্বপ্ননগর বিদ্যানিকেতন এবং ইয়ুথ ওয়ার্ল্ডওয়াইড ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতাধিক শিক্ষার্থী প্রদর্শনী ঘুরে দেখে। তারা বিভিন্ন সৃজনশীল কার্যক্রমে অংশ নিয়ে নিজেদের স্বপ্নের শহরের ছবি ও ভাবনা প্রকাশ করে।
দর্শনার্থীদের প্রতিক্রিয়াও ছিল ইতিবাচক। অনেকেই মনে করেন, প্রদর্শনীটি শিশু ও কিশোরদের অংশগ্রহণমূলক নগর পরিকল্পনার গুরুত্ব সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করেছে।
একজন কিশোরী দর্শনার্থী নদী(১৬) বলেন, “এই প্রদর্শনীটি শিশু ও কিশোরদের সৃজনশীল চিন্তাচেতনা প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।”
অন্যদিকে আলম(৪৪) নামের এক দর্শনার্থী মন্তব্য করেন, ‘‘শিশুদের শিক্ষা নিয়ে আমরা যতটা ভাবি, তাদের খেলাধুলার প্রয়োজন নিয়ে ততটা ভাবি না’’। প্রদর্শনীটি সেই বিষয়টিকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

শেষ দিনের আলোচনায় ভবিষ্যতের ভাবনা
প্রদর্শনীর শেষ দিনে অনুষ্ঠিত মুক্ত আলোচনায় স্কুলশিক্ষক, স্থপতি, উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন পেশাজীবীরা অংশ নেন। আলোচনায় মূলত শিশুদের কণ্ঠস্বরকে কীভাবে নগর পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ করা যায়, তা নিয়ে মতবিনিময় হয়।
স্থপতি অনিকেত চৌধুরী বলেন, নগর পরিকল্পনায় শিশুদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে স্কুলের মাঠও ছোট হয়ে যাচ্ছে, অথচ শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি খেলার মাঠও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
স্কুলশিক্ষক আজাদ ইকবাল এ ধরনের প্রদর্শনী আরও বেশি স্কুলভিত্তিক করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অন্যদিকে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শুভ্র দাশ শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদের শিশুদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
ড. মাতলুবা খান আলোচনায় শিশুবান্ধব নগর গঠনে ‘ছোট পরিসরের উদ্যোগের’ গুরুত্ব তুলে ধরেন। তার মতে, পরিবর্তন সব সময় বড় প্রকল্প দিয়ে শুরু হয় এমন না। তাই প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে উদ্যোগ নিলে ধীরে ধীরে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শিশুবান্ধব শহর গড়ে তোলা সম্ভব।
শিশুদের জন্য শহর মানেই সবার জন্য শহর
রাজধানী ঢাকায় প্রতি ১০০ জনে মাত্র দুইজন শিশু খেলার মাঠ ও পার্ক ব্যবহারের সুযোগ পায়—এই তথ্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি নগর উন্নয়নের একটি বড় চ্যালেঞ্জের প্রতিচ্ছবি। শিশুদের জন্য নিরাপদ রাস্তা, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান এবং অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে সেই সুবিধা নারী, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং অন্যান্য নাগরিকের কাছেও পৌঁছে যায়।

চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত ‘আমরা যে ঢাকায় বেড়ে উঠতে চাই’ প্রদর্শনী তাই ছিল শহরকে নতুন চোখে দেখার আহ্বান। শিশুদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়ার, তাদের স্বপ্নকে পরিকল্পনার অংশ করার এবং ভবিষ্যতের নগরকে আরও মানবিক করে তোলার এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
কারণ, যে শহর শিশুদের জন্য ভালো, সেই শহরই শেষ পর্যন্ত সবার জন্য ভালো।



















