অতীতে মানুষের নিত্যকাজে ব্যবহৃত পানির প্রধান উৎস ছিল নদী, জলাশয়, খাল, বিল ও ঝরনা। সভ্য হওয়ার পর থেকেই মানুষ তৈরি করছে ভবন; গড়ে তুলছে নগরসভ্যতা। আর এসব সভ্যতা গড়ে উঠছে পানির অফুরন্ত উৎসকে কেন্দ্র করে। নগরে এমনকি ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের বাড়িতে আগে ড্রেনের মাধ্যমে পানির সংযোগ দেওয়া হতো পাহাড়ি ঝরনা বা ঝিরি থেকে। কিন্তু যেখানে পাহাড় কিংবা নদী নেই, পানির ধারাও লোকালয় থেকে অনেক দূরে, সেখানে পানি পাওয়াটা সহজ ছিল না। তবে সময়ের বিবর্তনে মানুষ মাটির নিচ থেকে (কুয়া, টিউবওয়েলের ধারাবাহিকতায়) বা দূরবর্তী উৎস থেকেও পানি সংগ্রহের কৌশল আবিষ্কার করেছে। একটি যন্ত্রের আবিষ্কার বদলে দিয়েছে পানিপ্রাপ্তির অতীত ইতিহাসকেও। আর প্রয়োজনীয় এ যন্ত্র বা ডিভাইসটির নাম পাম্প। পাম্পের সাহায্যে মাটির গভীর থেকে খুব সহজে পানি তোলা যায়। পাম্প আবিষ্কারের ফলে বাসাবাড়িতে পানির চাহিদা মেটানো ছাড়াও কৃষিজমিতে সেচ ও শিল্পকারখানায় পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে উৎপাদনব্যবস্থায় ঘটেছে বৈপ্লবিক এক পরিবর্তন।
পাম্প এমন একধরনের যান্ত্রিক ডিভাইস, যা ফ্লুয়িডকে (তরল অথবা বায়বীয়) এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত করে। এটি মেকানিক্যাল এনার্জিকে ফ্লুয়িড এনার্জিতে রূপান্তর করে। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে স্বাভাবিকভাবে পানি কিংবা যেকোনো পদার্থই সব সময় ওপর থেকে নিচে ধাবিত হয়। তবে পাম্প এ ক্ষেত্রে বাতাসের চাপকে কাজে লাগিয়ে তরল বা বায়বীয় পদার্থকে নিচের উৎস থেকে ওপরের উৎসে প্রেরণ করে। যেমন, ভবনের নিচে পানির রিজার্ভার থেকে ছাদের ট্যাঙ্কিতে পানি ওঠানো হয়। প্রতিটি বস্তুই স্বাভাবিকভাবে সেখানেই থাকতে চায়, যেখানে তার বিভবশক্তি সবচেয়ে কম। নিচতলায় পানির ট্যাঙ্কিতে থাকা পানির চেয়ে পাঁচতলায় পানির বিভবশক্তি স্বভাবতই বেশি। আর এ কারণে ওপরে তুলতে হলে পানিকে প্রেশারাইজড করে ওপরের দিকে পাঠাতে হয়। পাম্প চালু করা হলে তাতে থাকা ইম্পেলার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে পানিকে ছিটকে ওপরে ঠেলে দেয়। সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প এই কাজটি করে সেন্ট্রিফিউগাল ফোর্সকে কাজে লাগিয়ে।
পাম্পকে মূলত তিনটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যথা-
১. ডাইরেক্ট লিফট
২. ডিসপ্লেসমেন্ট
৩. গ্রাভিটি পাম্প।
পাম্প যেসব শক্তির সাহায্যে চলে তা হচ্ছেÑ
- বিদ্যুৎশক্তি
- ইঞ্জিন বা জীবাশ্ব জ্বালানি (ডিজেল, পেট্রল) শক্তি
- বায়ুশক্তি
- সৌরশক্তি।
হরেকরকম পাম্প
পাম্পকে সাধারণত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। যার মধ্যে রয়েছে-
পজিটিভ ডিসপ্লেসমেন্ট পাম্প (Positive Displacement)
- রেসিপ্রোকেটিং পাম্প
- রোটারি লোব পাম্প
- প্রোগ্রেসিভ ক্যাভিটি পাম্প
- রোটারি গিয়ার পাম্প
- পিস্টন পাম্প
- স্ক্রু পাম্প
- গিয়ার পাম্প
- হাইড্রোলিক পাম্প
- রোটারি ভেইন পাম্প
- পেরিস্টাটিক পাম্প
- রোপ পাম্প
- ফ্লেক্সিবল ইম্পেলার পাম্প।
রোটাডাইনামিক পাম্প (Rotadynamic Pump)
সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প
প্রপেলার পাম্প
মিক্সড ফ্লো পাম্প।
এ ছাড়া আরও রয়েছে কয়েক ধরনের পাম্প-
- ইমপাল্স
- ভেলোসিটি
- স্টিম
- ভাল্ভলেস।
তবে সাধারণত পানি উত্তোলনের ক্ষেত্রে দুই ধরনের পাম্প অধিক প্রচলিত। এগুলো হচ্ছে-
- ক্ল্যাসিক পানির পাম্প
- সাবমার্সেবল পানির পাম্প।
ক্ল্যাসিক পানির পাম্প
সাধারণত কম উচ্চতায় পানি উত্তোলনে ব্যবহৃত হয় ক্ল্যাসিক পানির পাম্প। এই পাম্প বেশি ব্যবহৃত হয় বাসাবাড়িতে পানি তোলার কাজে। শহরাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে রয়েছে ক্লাসিক পানির পাম্প।
সাবমার্সেবল পাম্প
মাটির গভীর থেকে আরও গভীরে পানি তোলার কাজে ব্যবহৃত হয় সাবমার্সেবল পানির পাম্প। ক্ল্যাসিক পাম্প ১০ দশমিক ৩৩ মিটারের বেশি ওপরে পানি ওঠাতে পারে না। কিন্তু সাবমার্সেবল পাম্পকে পানির উৎসের ভেতর ডুবিয়ে দেওয়া হয়। পানির প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ ফুট নিচেও পাম্পটি স্থাপন করে পানি তোলা হয়। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাওয়ায়, গভীর ও অগভীর উভয় ধরনের নলকূপ থেকে ফসলের জমিতে সেচ দিতে এখন ব্যাপকহারে সাবমার্সেবল পাম্প ব্যবহৃত হয়।
বাসাবাড়ি, কলকারখানা, খেলার মাঠ, ফসলের খেতে পানি ওঠাতে কয়েক গ্রেডের পাম্প ব্যবহার করা হয়। এগুলো নির্ধারণ করা হয় পাম্পের অশ্বশক্তির (হর্স পাওয়ার-hp) ওপর ভিত্তি করে। পাম্পের অশ্বশক্তি যত বেশি হবে, তার কার্যক্ষমতাও তত বেশি হবে। যেমন-
এক ঘোড়া পাম্প
একতলা থেকে পাঁচতলা বাড়ির জন্য এক ঘোড়া (ওয়ান হর্স পাওয়ার) বা ৭৪৬ ওয়াট শক্তিসম্পন্ন পানির পাম্প ব্যবহৃত হয়। এই পাম্প পাঁচতলায় ঘণ্টায় ১০০০ লিটার পর্যন্ত পানি তুলতে পারে।
দুই ঘোড়া পাম্প
সাত থেকে আটতলা বাড়ির জন্য প্রয়োজন দুই ঘোড়া (টু হর্স পাওয়ার) পানির পাম্প। এই পাম্প ঘণ্টায় ১,২০০ থেকে ১,৫০০ লিটার লিটার পানি তুলতে সক্ষম।
তিন ঘোড়া পাম্প
১০ থেকে ১২ তলা বাড়ির জন্য প্রয়োজন তিন ঘোড়া (থ্রি হর্স পাওয়ার) পানির পাম্প। এই পাম্প ১০ থেকে ১২ তলার ওপরে ঘণ্টায় ১৮০০ থেকে ২০০০ লিটার পানি তুলতে পারে।
চার থেকে পাঁচ ঘোড়া পাম্প
অপেক্ষাকৃত ছোট জমির সেচকাজে ব্যবহৃত হয় এ ধরনের পাম্প। সাধারণত কূপের গভীরতা ৩০ মিটারের (১০০ ফুট) কম হলে এই পাম্প ব্যবহার করা হয়।
ছয় থেকে দশ ঘোড়া পাম্প
শিল্পকারখানা বা বৃহৎ ফসলি জমির জন্য ছয় ঘোড়া বা ততোধিক শক্তির পানির পাম্প ব্যবহার করা হয়। এই পাম্প প্রতি ঘণ্টায় ১০ থেকে ২০ হাজার লিটার পানি উত্তোলন করতে পারে। সাধারণত কূপের গভীরতা ৩০ মিটারের বেশি হলে এই পাম্প ব্যবহার করা হয়।
পাম্প সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্য
| পাম্পের ধরন | শক্তি | ডেলিভারি | সাকশন (ফুট) | হেড | ব্যবহার | পানি উত্তোলনের পরিমাণ | পানির প্রাপ্যতা | প্যাকেজ মূল্য (টাকা) |
| ০.৫ ইঞ্চি সেন্ট্রিফিউগাল | ২৪ ভোল্ট | ০.৫ ইঞ্চি | ১৮ | ১৮ | ছোট সবজিক্ষেত ও বাগানসহ যেকোনো ছোটখাটো কাজে ব্যবহার করা যায় | প্রতি ঘণ্টায় ৭০০-১০০০ লিটার ও সারা দিনে ৬০০০-৮০০০ লিটার | নদী বা গভীর নলকূপ (১৮ ফুটের মধ্যে) পানি তোলা সম্ভব | ১০০০০-১৮০০০ (প্যাকেজের সঙ্গে প্যানেল মোটর ও পাম্প কন্ট্রোলারসহ) |
| ০.৫ ইঞ্চি সেন্ট্রিফিউগাল | ২৪ ভোল্ট | ১ ইঞ্চি | ২৮ | ৫০ | ৪-৫ বিঘার ছোট খেত ২-৩ বিঘার ধানিজমি গরুর ফার্ম ১-২ বিঘার মাছের খামার ২/৩ তলা বাসাবাড়ি প্রভৃতি | প্রতি ঘণ্টায় ১৮০০ থেকে ৩০০০ লিটার ও সারা দিনে ২০০০০-৩৫০০০ লিটার | নদী বা গভীর নলকূপ থেকে (২৯ ফুটের মধ্যে) পানি তোলা যাবে | ৪০০০০-৬০০০০ টাকা (প্যাকেজের সঙ্গে প্যানেল মোটর পাম্প ব্যাটারি ও কন্ট্রোলারসহ) |
| ০.৫/২ ইঞ্চি সেন্ট্রিফিউগাল | ২৭ | ১.৫/২ | ২৩ | ১০ | ৮-১২ বিঘার ধানিজমি সবজিখেত মাছের খামার প্রভৃতি | ৮০০০০-১২০০০০ টাকা (প্যাকেজের সঙ্গে প্যানেল মোটর ও পাম্প কন্ট্রোলার) |
প্রয়োজনীয় টিপস
- বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর পাম্পের সুইচ অফ করতে হবে।
- লাইনে পানি না থাকলেও বা পানি না উঠলে পাম্প বন্ধ রাখাই শ্রেয়। তা না হলে পাম্পটি গরম হয়ে জ্বলে যেতে পারে।
- পাম্প স্থাপনের আগে কী কাজে, পানি তোলার পরিমাণ ও পানির স্তরের গভীরতাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়সমূহ বিবেচনা করে পাম্প কিনতে হবে।
দরদাম ও প্রাপ্তিস্থান
বাজারে বিভিন্ন ধরন ও মানের দেশি-বিদেশি পাম্প পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মারকুইস, আরএফএল, গাজী, পেডরোলো, এজি, পারটেক্স প্রভৃতি। অশ্বশক্তি ও মান, স্থায়িত্ব অনুযায়ী এগুলোর দাম পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। ধরনভেদে পাম্পের বাজারদর:
| ক্ল্যাসিক | দাম (টাকা) | সাবমার্সেবল পাম্প | দাম (টাকা) |
| ১ ঘোড়া | ৫০০০-১৫০০০ | ১ ঘোড়া | ১২০০০-৩০০০০ |
| ২ ঘোড়া | ১০০০০-২০০০০ | ২ ঘোড়া | ২০০০০-৬০০০০ |
| ৩ ঘোড়া | ১৫০০০-৪০০০০ | ৩ ঘোড়া | ২৫০০০-১০০০০০ |
ইলেকট্রনিক ও নির্মাণপণ্যসামগ্রী বিক্রির দোকান ছাড়াও বিভিন্ন কোম্পানির শোরুমেও পাম্প পাওয়া যায়। অধিকাংশ পাম্পেরই রয়েছে দুই থেকে তিন বছরের ওয়ারেন্টি। কোনো পাম্প জ্বলে গেলে কিংবা বড় কোনো সমস্যা হলে কোম্পানিগুলো বিক্রয়োত্তর সেবা দিয়ে থাকে। তবে পাম্প কেনার আগে গুণাগুণ, মান ও ওয়ারেন্টি যাচাই করে কেনাই ভালো। প্রয়োজনে একটু বেশি দাম দিয়ে উন্নতমানের পানির পাম্প কিনলে বিড়ম্বনা এড়ানো যায় সহজেই।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৩তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৮।