• Home
  • অ্যাওয়ার্ড
  • ৩৫০ বছরের বুন্দেলা দুর্গ যখন বিশ্বের অন্যতম সুন্দর হোটেল
Oberio Palace

৩৫০ বছরের বুন্দেলা দুর্গ যখন বিশ্বের অন্যতম সুন্দর হোটেল

বিশ্বের সেরা হোটেলগুলোকে এখন আর শুধু কাপড়ের সুতোর মান, ইনফিনিটি পুল বা মেন্যু দিয়ে বিচার করা হয় না। আধুনিক সময়ের অতিথিরা ভ্রমণের সাথে সাথে ভেন্যুর গল্প, ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্থাপত্য, টেকসই উন্নয়ন এবং একটি স্থানের প্রকৃত অনুভূতিও চান।

সময়ের ধারাবাহিকতায় এই পরিবর্তনটি মর্যাদাপূর্ণ প্রিক্স ভার্সাই পুরস্কারে প্রতিফলিত হয়েছে। সম্প্রতি ২০২৬ সালের জন্য প্রিক্স ভার্সাই বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর হোটেলগুলোর তালিকা প্রকাশ করেছে।

বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হোটেলগুলোর মধ্যে স্থান পেয়েছে ভারতের বহু পুরনো একটি দুর্গ যা বর্তমানে আবাসিক হোটেলে রূপান্তরিত করা হয়েছে। ওয়েবরয় রাজগড় প্যালেস যা মধ্যপ্রদেশে অবস্থিত।

খাজুরাহোর কাছে মণিয়গড় পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই প্রাসাদ থেকে নিচে সবুজ বাগান, প্রাচীন অরণ্য এবং বৃষ্টির জলে পুষ্ট একটি হ্রদ দেখা যায়। ‘পান্না জাতীয় উদ্যান’ থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে হওয়ায়, পুনরুদ্ধারকৃত রাজকীয় এই বাসস্থানটির কদর যেনো বহুগুণে বেড়ে গেছে।

তবে একটি পাঁচতারা অবকাশযাপন কেন্দ্র হওয়ার অনেক আগেই বহুল পরিচিত আর ঐতিহাসিক স্থান।  ঐতিহাসিকভাবে রাজগড় ছিল যুদ্ধ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কেন্দ্রবিন্দু। নিজের রাজ্যকে রক্ষা করার জন্য একজন শাসকের দৃঢ় সংকল্প থেকে জন্ম নেওয়া একটি দুর্গ রাজগড় প্যালেস।

Bundela
ওবেরয় প্যালেস। ছবি: সংগৃহীত

সংঘাতের যুগে নির্মিত ৩৫০ বছরের পুরনো দুর্গ

রাজগড় প্রাসাদের গল্প শুরু হয় তিন শতাব্দীরও বেশি আগে, সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে। সে সময়, মধ্য ভারত ব্যাপক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী ছিল। মুঘল সাম্রাজ্য উপমহাদেশ জুড়ে প্রসারিত হচ্ছিলো।  অপরদিকে আঞ্চলিক রাজপুত রাজ্যগুলো তাদের স্বায়ত্তশাসন, সংস্কৃতি এবং ক্ষমতা রক্ষার জন্য সংগ্রাম করছিলো।

বুন্দেলখণ্ডে, একজন শাসক এমন একটি দুর্গ তৈরি করতে চেয়েছিলেন যা একই সাথে সামরিক প্রতিরক্ষা এবং সার্বভৌমত্বের ঘোষণা হিসেবে কাজ করবে।

বুন্দেলা রাজবংশের মহারাজা হিন্দুপত সিং একটি বিশেষ কারণেই দুর্গম মণিয়গড় পাহাড় বেছে নিয়েছিলেন। এই উঁচু ভূখণ্ড থেকে চারপাশের ভূদৃশ্যের চমৎকার দৃশ্য দেখা যেত। প্রাকৃতিকভাবে এই পাহাড়টি ছিলো প্রতিরক্ষামূলক।

বেলেপাথরে নির্মিত সমতলভূমির উপরে দুর্গটির কৌশলগত অবস্থান তার শাসককে  বিশাল ভূখণ্ডের নজরদারিতেও সুযোগ করে দিয়েছিলো। আজও এই দুর্গের কর্তৃত্বপূর্ণ অবস্থান এর সামরিক প্রতিরক্ষার সাক্ষ্য হয়ে আছে।

যেভাবে এটি রাজকীয় বাসভবনে পরিণত হলো

রাজগড়ের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয় যখন কিংবদন্তিতুল্য বুন্দেলা শাসক মহারাজা ছত্রসালের শাসনামলে। তার অধীনে পান্না এলাকাটি ক্ষমতার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয় তখন।

রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে সাথে, দুর্গটি ধীরে ধীরে একটি প্রাসাদে রূপান্তরিত হয়। যদিও এটি তার মূল প্রতিরক্ষামূলক চরিত্রের অনেকটাই ধরে রেখেছিলো। পাশাপাশি এটি একটি রাজকীয় বাসভবনের কাঙ্খিত জাঁকজমকও অর্জন করেছিলো।

তখনই সামরিক স্থানগুলোর জায়গায় প্রাঙ্গণও তৈরি করা হয়। আলংকারিক উপাদান যুক্ত করা হয় রাজার সম্মানে। কৌশলগত কাজের মতোই আনুষ্ঠানিক কাজগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

Oberoy Palace
হোটেলের লবি। ছবি: সংগৃহীত

ফলে এমন একটি কাঠামো তৈরি হয় যা শত শত বছরের স্তরীভূত ইতিহাসকে প্রতিফলিত করে। এটি পুরোপুরি দুর্গও ছিল না, আবার পুরোপুরি প্রাসাদও ছিল না, বরং ছিল এক অনন্য সত্তা।

এই দ্বৈত পরিচয়ই রাজগড়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটি। রাজার জন্য নির্মিত স্থানগুলোতে দিয়ে হাঁটার সময় অতিথিরা আজও ভবনটির প্রতিরক্ষামূলক অতীত অনুভব করতে পারেন।

অবক্ষয়ের দীর্ঘ বছরগুলো

ভারতের অন্যান্য ঐতিহাসিক রাজকীয় সম্পত্তির মতো, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর রাজগড় প্রাসাদও এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সম্মুখীন হয়েছিলো।

প্রাসাদটি ধীরে ধীরে অবহেলার শিকার হতে থাকে। কয়েক দশক ধরে, সম্পত্তির বিভিন্ন অংশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে এবং প্রকৃতি ধীরে ধীরে এস্টেটের কিছু অংশ গ্রাস করে নেয়।

একসময় স্থাপত্যটি তার ঐতিহাসিক গুরুত্বের জন্য স্বীকৃত ছিলো। এক পর্যায়ে রাজ্য প্রত্নতাত্ত্বিক কর্তৃপক্ষ এটিকে সংরক্ষণ শুরু করলেও সংরক্ষণটি একটি চ্যালেঞ্জ হয়েই থেকে যায়।

পুনরুদ্ধার

রাজগড় দুর্গটি এমনভাবেই পরিত্যাক্ত হয়েছিলো যা পুনরুদ্ধার করতে প্রায় তিন দশক সময় লেগেছিলো। ১৯৯৬ সালে, মধ্যপ্রদেশ সরকার এই ঐতিহাসিক সম্পত্তিটি পৃথ্বীরাজ সিং ওবেরয় এবং ওবেরয় গ্রুপের হাতে অর্পণ করে।

এরপরই দুর্গটি দ্রুত কোন হোটেলে রূপান্তরিত হয়নি। ভবিষ্যতে এ স্থাপত্যকে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলতে ছিলো এক উচ্চাভিলাষী ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার প্রকল্প। সেকারণেই এটির পুনরুদ্ধার কার্যক্রম প্রায় তিন দশক ধরে চলেছিল।

প্রাসাদটিকে কেবল একটি বিলাসবহুল রিসোর্টে রূপান্তরিত করাই ওবেরয় গ্রুপের লক্ষ্য ছিলো না।  প্রসাদের প্রতিটি সম্ভাব্য ঐতিহাসিক উপাদান সংরক্ষণ করে এর মূল চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করাই ছিলো তাদের মূল লক্ষ্য।

প্রকল্পটি বর্ণনা করতে গিয়ে দ্য ওবেরয় গ্রুপের এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান অর্জুন ওবেরয় এটি “ইতিহাসকে পুনরুজ্জীবিত করার এক যাত্রা” বলে অভিহিত করেছেন।

পুনরুদ্ধারকারী দলটি মূল স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য, শতবর্ষী গাছ, লুকানো পথ, প্রাচীন মন্দির এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই এস্টেটে বিদ্যমান বৃষ্টির জলে পুষ্ট হ্রদটিকে যত্ন সহকারে রক্ষা করেছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো সময়ের প্রবাহকে মুছে ফেলা নয়, বরং দর্শনার্থীদের তা অনুভব করার সুযোগ করে দেওয়া।

শতাব্দীর কালের স্থাপত্য

প্রাসাদটির অন্যতম প্রধান শক্তি হলো এর স্থাপত্য, যা ইতিহাসের বিভিন্ন যুগের প্রতিফলন ঘটায়। পুরো সম্পত্তি জুড়েই বুন্দেলখণ্ডের ঐতিহ্যবাহী উপাদানগুলো দৃশ্যমান। বেলেপাথরের উঠান, হাতে আঁকা ফ্রেস্কো, খোদাই করা স্তম্ভ এবং খিলানযুক্ত ছাদ আঞ্চলিক কারুশিল্পের নিদর্শন।

ক্লেরিস্টোরি জানালা দিয়ে প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করে। এতে আলোকিত হয় চুন-প্লাস্টার করা ভেতরের অংশ। এতে এমন এক আবহ তৈরি করে যা একাধারে রাজকীয় ও মোহনীয়।

প্রাসাদটিতে পরবর্তী সময়েরও প্রভাবেরও ছাপ রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় নকশার পাশাপাশি এতে রয়েছে মার্জিত ফরাসি জানালা এবং ঔপনিবেশিক শৈলীর বিন্যাস। এতে নান্দনিকতার পাশাপাশি সময়ের ধারাবাহিকতায় স্থাপত্যশৈলীতে সুস্পষ্ট হয়ে ফুটেছে।

দুর্গের বাইরেটা পাহাড়ের ঢাল থেকে গম্বুজাকৃতির মিনার, খিলান এবং বেলেপাথরের সম্মুখভাগ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আঝে। যা দেখে বুঝা যায় চারপাশের প্রাকৃতিকর সাথে রাজগড় দুর্গের গভীর মিতালী।

প্রায় ৭৬ একর জুড়ে বিস্তৃত এই এস্টেটটি প্রাচীন শাল ও পলাশ বনে ঘেরা। প্রাসাদের সীমানার বাইরে রয়েছে পান্না জাতীয় উদ্যান, যা ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাঘ সংরক্ষণাগার। খাজুরাহোর ইউনেস্কো-তালিকাভুক্ত মন্দিরগুলো এখান থেকে গাড়িতে অল্প দূরত্বেই অবস্থিত।

Sitting Place
সুইমিং পুলের পাশে হোটেলের ভিউ পয়েন্ট। ছবি: সংগৃহীত

রাজকীয় ঐতিহ্য, বন্যপ্রাণী এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এই সংমিশ্রণ বিলাসবহুল ভ্রমণের মানদণ্ডেও এক ব্যতিক্রমী রাজগড় দুর্গ।

অতিথিরা সকালবেলা মধ্যযুগীয় মন্দির চত্বর ঘুরে দেখতে পারেন। বিকেলে জঙ্গলে বাঘের সন্ধান করতে পারেন। সন্ধ্যায় একটি প্রাক্তন রাজকীয় বাসভবনে নৈশভোজও সারতে পারেন। খুব কম পর্যটন গন্তব্যই এমন মিশ্র অভিজ্ঞতা দিতে পারে।

এক নতুন অধ্যায়

২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদবের উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রাসাদটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘দ্য ওবেরয় রাজগড় প্যালেস’ নামে নতুন করে চালু হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “দ্য ওবেরয় রাজগড় প্যালেস বিশ্বমানের আতিথেয়তা প্রদানের পাশাপাশি মধ্যপ্রদেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে। এটি রাজ্যের পর্যটন অঙ্গনে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।”

স্বীকৃতি

প্রাসাদটি লাক্সারি ট্র্যাভেল ইন্টেলিজেন্সের বিশ্বের সেরা নতুন বিলাসবহুল হোটেলগুলোর মধ্যে স্থান অর্জন করেছে এবং এখন প্রিক্স ভার্সায়ের সেরা হোটের তালিকায় জায়গা দখল করে নিয়েছে।

ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস অনেক ঘটনাবহুল। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার পালবদলে যুগে যুগে বদলেছে শাসক আর শাসন। গড়ে উঠেছে বিভিন্ন রকম স্থাপত্য। এই স্থাপত্যগুলো একটি থেকে অপরটি ভিন্ন। বহু শাসনের ফলে এই উপমহাদেশে স্থাপত্য বৈচিত্রতাও নানা রকম। সঠিক সংরক্ষণ বিশ্ব দরবারে স্থাপত্যের কারণে উপমহাদেশের জৌলসু ও খ্যাতি বাড়াতে পারে। রাজগড় প্যালেন এরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

Related Posts

আধুনিক নির্মাণ উপকরণ হিসেবে মাটি

মানবসভ্যতার ইতিহাসে নির্মাণশিল্পের অন্যতম মৌলিক উপাদান হলো মাটি। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ ঘরবাড়ি, দুর্গ, উপাসনালয় এবং নগর…

ByBySarwar Alam Jun 9, 2026

RIAS ২০২৬ সালের বার্ষিক পুরস্কারের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা

প্রসঙ্গ RIAS ২০২৬ এ বিজয়ী হলো কারা। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য পুরস্কারগুলোর দিকে তাকালে আজ একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে,…

নিখিল: নৃত্যের ছন্দে গড়া স্মৃতির অনুরণন

নিখিল রেসিডেন্স (একজন নৃত্যশিল্পীর বাড়ি)অবস্থান: ৩৩৫, নর্থ বাগবাড়ি, সিলেট।প্রধান স্থপতি: স্থপতি রাজন দাসআলোকচিত্র: Prantography  নিখিল রেসিডেন্স এমন এক…

প্রথমবার AIA মেডেল পেলেন জাপানের স্থপতি শিগেরো ব্যান

আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেকটস (AIA)। তারা প্রতি বছরই একজন আমেরিকান স্থপতিকে সম্মাননা হিসেবে AIA গোল্ড মেডেল দিয়ে থাকে।…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *