ভূমিকম্পকালীন লিকুইফ্যাকশন ঝুঁকি

বাংলাদেশ অন্যতম ভূমিকম্প ঝুঁকি অঞ্চলে অবস্থিত। গত কয়েক দশকে তেমন কোনো বড় ভূমিকম্প আমাদের এখানে না হলেও দেশে বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। ভূমিকম্প হলে যেমন দুর্বল দালানকোঠা ভেঙে পড়তে পারে, তেমনই আবার অনেক সময় ভূমিকম্পে দালানকোঠা যে মাটির ওপরে নির্মিত ওই মাটি দেবে গিয়ে দালানকোঠা হেলে পড়তে পারে কিংবা মাটির মধ্যে বসে যেতে পারে। অতীতের ভূমিকম্পে এ ধরনের ঘটনার অনেক উদাহরণ রয়েছে। আর এই ঘটনাই লিকুইফ্যাকশন নামে পরিচিত। আমাদের দেশে লিকুইফ্যাকশন ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা হয়েছে এবং রাজধানীর আশপাশে অনেক এলাকাই রয়েছে লিকুইফ্যাকশন ঝুঁকিতে।

লিকুইফ্যাকশন কী?

আমাদের দেশে নির্মাণ প্রকৌশলে লিকুইফ্যাকশন বিষয়টি নিয়ে তেমন কোনো সচেতনতা আগে ছিল না বললেই চলে, এ ছাড়া আগে আমাদের দেশে এ ধরনের ঘটনার কোনো উদাহরণ নেই বলে এই বিষয়টি তেমন গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হতো না। তবে ইদানীং নেপাল, সিকিম ও মিয়ানমারে সৃষ্ট ভূমিকম্পের পর ভূমিকম্প ও ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট আপদে (লিকুইফ্যাকশন) ঝুঁকি কমানোর বিষয়টি নির্মাণ প্রকৌশলে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ জন্য প্রথমে আমাদের জানা প্রয়োজন লিকুইফ্যাকশন কেন হয় এবং এর ফলে কী ধরনের ক্ষতির হতে পারে।

মাটির নিচে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর যদি ওপরের দিকে থাকে এবং অগভীর হয়, তবে মাটির স্তরে যথেষ্ট পানির উপস্থিতি থাকে। আর ভূমিকম্পের সময় প্রবল বেগে ঝাঁকুনির কারণে এ রকম স্যাঁতসেঁতে মাটির স্তর হঠাৎ করে তার শক্তি হারিয়ে ফেলে তরল পদার্থের মতো আচরণ করে। এ সময়ে মাটি তার ধারণক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং তার ওপরে অবস্থিত বাড়িঘর অবকাঠামো ঠিকমতো ধরে রাখতে না পারায় মাটির মধ্যে দেবে কিংবা হেলে যাওয়ায় তা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ভূমিকম্পের সময় সার্বিকভাবে মাটির এই ধারণক্ষমতা হারানোর ঘটনাকে ‘লিকুইফ্যাকশন’ বলে।

উইকিপিডিয়া

এ ঘটনাটি প্রায়ই সম্পৃক্ত এবং আলগা (কম ঘনত্বের) বালুমাটিতে ঘটে। এর কারণ বালুমাটিকে যদি বাইরে থেকে মাটির মধ্যে বল প্রয়োগ করা হয়, তবে এই মাটির কম্প্রেস হওয়ার সহজাত প্রবণতা থাকে, সাধারণত ঘন বালুমাটির প্রসারিত হওয়ার প্রবণতা বেশি। মাটি যদি পানি দ্বারা পূর্ণ থাকে (যেটা কেবল যখন মাটি ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের নিচে থাকে) তাহলে মাটির মধ্যকার ফাঁকা জায়গাগুলো (লোমকূপ স্পেস) পানি দিয়ে পূর্ণ হয়ে যায়। এই মাটি যদি সঙ্কুচিত হতে থাকে তাহলে বাইরের চাপের কারণে মাটির মধ্যকার পানি বেরিয়ে আসতে চায় তুলনামূলক চাপ অঞ্চলে (সাধারণত ভূপৃষ্ঠের দিকে ঊর্ধ্বগামীভাবে)। যদি বাইরের থেকে প্রয়োগকৃত চাপ দ্রুত প্রয়োগ করা হয় এবং বলের পরিমাণ বেশি ও পুনরাবৃত্তি হতে থাকে, তবে মাটির মধ্যকার ওই পানি তুলনামূলক কম চাপের অঞ্চলে বেরিয়ে আসার আগেই আবার বিপরীতক্রমে নতুন বলের মুখোমুখি হওয়ায় আর বেরিয়ে আসতে পারে না। পানির মধ্যকার সৃষ্ট চাপের কারণে সমগ্র মাটির অঞ্চলটি ওপরের দালানকোঠা ধারণক্ষমতা হ্রাস পায় (শিয়ার চাপ হস্তান্তর করার ক্ষমতা হারায়) এবং মাটি তরল পদার্থের মতো আচরণ করে। এই সামগ্রিক ব্যাপারটিকে ‘লিকুইফ্যাকশন’ বলা হয়।

ঢাকা শহরে লিকুইফ্যাকশনের আশঙ্কা

ঢাকা শহরের নতুন অংশগুলো মূলত গড়ে উঠেছে নিচু অঞ্চল ডোবা-নালা, বিল ভরাট করে। বর্ষাকালে ওই অঞ্চলগুলো পানিতে পূর্ণ থাকত। এই নিচু অংশগুলো ভরাট করা হয়েছে বালু ও মাটি ফেলে এবং নতুন নতুন আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে মূলত এ অঞ্চলেই। লক্ষ করলে দেখা যাবে, এ অঞ্চলের বেশির ভাগ বাড়িঘর নির্মাণে পাইল ফাউন্ডেশন ব্যবহার করা হয়। আগে এই অঞ্চল যেহেতু নিচু ছিল এবং এই অঞ্চলে শক্ত মাটির স্তরও অনেক নিচুতে, তাই পাইল ফাউন্ডেশন ব্যবহার করা হয়, যাতে করে দালানকোঠার ভর পাইলের মাধ্যমে গভীর শক্ত মাটির অঞ্চলে প্রবাহিত হয়।

এই অঞ্চলে বর্ষাকালে পানির স্তরের অবস্থান ওপরের দিকে এবং এই মাটিতে বর্ষাকালে ভূমিকম্প হলে ‘লিকুইফ্যাকশন’ হওয়ার আশঙ্কা যথেষ্ট। এ ছাড়া, অনেক প্রকল্পই দ্রুত সম্পন্ন করতে গিয়ে মাটি ভরাট করার জন্য যে যথাযথ সময় ও পদ্ধতির অনুসরণ করা দরকার, তা  নিয়ম মেনে করা হয় না। যার ফলে, এসব মাটি ভরাট করে তৈরি হওয়া অঞ্চলে ভূমিকম্পের সময় তাই লিকুইফ্যাকশন হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। এসব অঞ্চলে বাড়িঘর তৈরি করার আগে মাটি ভরাট করার জন্য প্রয়োজন সঠিকভাবে কম্প্যাকশন বা দুরমুশ করা, যাতে মাটির স্তর যথেষ্ট পুরু বা ঘন হয়। আর যেসব দালানকোঠা তৈরি করা হয়েছে দুর্বল তুলনামূলক কম ঘন বা আলগা মাটির ওপরে, সেই সব জায়গায় মাটির ধারণক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজন সিমেন্টের দ্রবণ মাটির মধ্যে প্রবেশ করানো। মাটির ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করে সিমেন্ট এবং অন্যান্য দ্রবণ ‘লিকুইফ্যাকশন’ ঝুঁকি কমানোর জন্য প্রকৌশলগত পদ্ধতি রয়েছে।

রাজধানীতে নিচু স্যাঁতসেঁঁতে অঞ্চলে গড়ে ওঠা আবাসন প্রকল্পগুলোতে প্রয়োজন দালানকোঠা নির্মাণের আগে সঠিকভাবে মাটি ভরাট করা, এ ক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, ভালোভাবে মাটি ভরাটের জন্য কয়েক স্তরে কম্প্যাকশন প্রয়োজন, যা সময়সাপেক্ষ। ডাইনামিক কম্প্যাকশন কিংবা মাটির মধ্যে পাথরের কলাম তৈরি করা। তবে আমাদের দেশে প্রথম পদ্ধতি সহজেই প্রয়োগ করা সম্ভব, ইতিমধ্যেই অনেক জায়গায় এই ডাইনামিক কম্প্যাকশন পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। ডাইনামিক কম্প্যাকশন পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট উচ্চতা থেকে একটি ভারী ওজনের বস্তু কিছুটা সময় অন্তর অন্তর ফেলা হয়। বস্তুর ওজনের পরিমাণ নির্ভর করে কী ধরনের কম্প্যাকশন প্রয়োজন তার ওপর ভিত্তি করে ৮ থেকে ৩৬ টন পর্যন্ত হতে পারে এবং উচ্চতা ১ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।

উইকিপিডিয়া

লিকুইফ্যাকশন নির্ণয় পদ্ধতি

কোনো অঞ্চলের মাটিতে ভূমিকম্পের সময় লিকুইফ্যাকশন ঝুঁকি আছে কি না তা বিভিন্ন উপায়ে নির্ণয় করা যায়। সবচেয়ে প্রচলিত যে দুটি পদ্ধতি তা হচ্ছে SPT (স্ট্যান্ডার্ড পেনেট্রেশন টেস্ট) এবং CPT (কোন পেনেট্রেশন টেস্ট)। প্রথম পদ্ধতিটি আমাদের দেশের নির্মাণ প্রকৌশলের সঙ্গে খুবই পরিচিত এবং দ্বিতীয় পদ্ধতিটি যেহেতু সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল ও পরীক্ষণযন্ত্র আমাদের দেশে খুব পর্যাপ্ত পরিমাণে না থাকায় খুব কম পরিসরে ব্যবহৃত হয়। এই দুই ধরনের পদ্ধতিতেই নির্ণয় করা হয়ে থাকে চক্রাকার বা পর্যাবৃত্ত বল ও ওই বলের বিপরীতে মাটির সহনশীলতা, যাকে পর্যায়ক্রমে প্রকৌশল বিদ্যার পরিভাষায় সাইক্লিক স্ট্রেস রেশিও (CSR) এবং সাইক্লিক রেসিস্ট্যান্স রেশিও (CRR) বলে। যদি সাইক্লিক স্ট্রেস রেশিও যদি সাইক্লিক রেসিস্ট্যান্স রেশিওর চেয়ে বেশি হয়, তবে ওই মাটিতে লিকুইফ্যাকশন হওয়ার আশঙ্কা আছে হিসাব করা হয়। এ কারণে কোনো স্থানে বিল্ডিং তৈরি করার আগে মাটিতে লিকুইফ্যাকশন হওয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন, যা খুব সহজেই ওই স্থানের SPT টেস্ট থেকে বের করা যায়। তবে যদি CPT পদ্ধতি ব্যবহার করা যায় তা SPT টেস্টের চেয়ে অধিক গ্রহণযোগ্য। এর কারণ হচ্ছে, CPT টেস্টে মাটির গভীরতা বরাবর দূরত্বের তথ্য পাওয়া যায়, যেটা SPT-এর ক্ষেত্রে ১.৫ মিটার পরপর হয়ে থাকে। এ ছাড়া CPT একটি ডিজিটাল পদ্ধতি যেখানে মাটির মধ্যে একটি রড প্রবেশ করানো হয়, যার Cone  ও Sleeve মাটির সঙ্গে ঘর্ষণের ডেটা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে যুক্ত কম্পিউটারে সংগ্রহ করে ভূমিকম্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮১তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৭।

রামকৃষ্ণ মজুমদার
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top