ভূমিকম্প সহনশীল ভবন তৈরিতে স্থাপত্য নকশার গুরুত্ব
ভূমিকম্প বিষয়ক খুঁটিনাটি

ভূমিকম্পের সময় ভবন কেমন আচরণ করবে, তার বড় একটি অংশ নির্ভর করে ভবনের স্থাপত্য নকশার বৈশিষ্ট্যের ওপর। এ ছাড়া সামগ্রিক আকৃতি, আকার ও জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্য এবং মাটির মধ্য দিয়ে সঞ্চালিত ভূমিকম্প তরঙ্গের বৈশিষ্ট্যের ওপরও এটি নির্ভরশীল। অতএব, যেকোনো ভবন তৈরির আগে পরিকল্পনা পর্যায়ে স্থপতি এবং স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারদের একসঙ্গে কাজ করে ভবন নির্মাণের একটি ভালো রূপরেখা বাছাই করতে হয়, যাতে প্রতিকূল বিপর্যয়সমূহ এড়ানো যায়। ভবন নির্মাণে ভালো রূপরেখা তৈরির গুরুত্ব সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপরিচিত ভূমিকম্প প্রকৌশলী হেনরি ডেজেনকোলব বিখ্যাত উক্তিটি সর্বজনবিদিত, ‘যদি আমরা একটি দুর্বল গঠন (কনফিগারেশন) কাঠামো নিয়ে কাজ শুরু করি, একজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলী তাঁর সর্বোচ্চ চেষ্টায় এটির ন্যূনতম সমাধান দিতে পারবেন মাত্র। অপর দিকে, যদি আমরা একটি ভালো গঠন কাঠামো নিয়ে কাজ শুরু করি, তবে একজন খারাপ মানের প্রকৌশলীও ভবনের আচরণের ক্ষেত্রে এটাকে তেমন দুর্বল করতে পারবেন না।’

সাধারণত, একটি নান্দনিক এবং কার্যকর কাঠামো তৈরির ইচ্ছা স্থপতিদের বিস্ময়কর যা কল্পনাপ্রবণ কাঠামো সৃষ্টির প্রবণতা তৈরি করে। কখনো কখনো ভবনের আকৃতি দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়, কখনো বা কাঠামোর গঠন হয় দৃষ্টিনন্দন এবং একসঙ্গে আকৃতি ও কাঠামোর গঠন ভবনকে করে তোলে অপরূপ। তবে, শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভবনের আচরণ-আকার এবং গঠন উভয়ের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব। অতীতের বড় ভূমিকম্পে স্থাপত্য নকশায় ভবনের কাঠামোগত ভিন্নতায় তুলনামূলক ক্ষতি পরিলক্ষিত হয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। অতীতের ভূমিকম্পে তুলনামূলক ক্ষতিগ্রস্ত গঠন কাঠামো যতটা সম্ভব পরিহার করাটাই শ্রেয়।

ভবনের আকার

সাধারণত, যেসব ভবনের আকার তুলনামূলক অনেক বেশি বড় বা বেশি ছোট হয় সেসব ভবন ভূমিকম্পের সময় ভালো আচরণ করে না। একটি উঁচু ভবনের ক্ষেত্রে উচ্চতা এবং ভিত্তির অনুপাত (height to base ratio) বেশি হলে সেগুলোতে ভূমিকম্পের সময় আনুভূমিক বিচ্যুতি বেশি হয়। প্রস্থের দিক দিয়ে ছোট কিন্তু লম্বায় অনেক বেশি এ রকম ভবনের ক্ষেত্রেও ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। এ ছাড়া যেসব ভবনের নকশার ভূমির আয়তন অনেক বেশি (যেমনণ্ড গুদামঘর), সে ক্ষেত্রে আনুভূমিক ভূমিকম্প বল অনেক বেশি হয় এবং কলাম ও দেয়ালের অংশে অনেক বেশি বল বহন করতে হয়।

ভবনের আনুভূমিক বিন্যাস

সাধারণভাবে, যেসব ভবন সরল জ্যামিতিক প্ল্যান অনুযায়ী তৈরি, সেসব ভবন শক্তিশালী ভূমিকম্পের সময়ও ভালো আচরণ করে। যেসব ভবনের প্ল্যান অনিয়মিত বা সরল জ্যামিতিক নয়, যেমন U, L, V, H এবং + এর মতো, সেসব ভবন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভূমিকম্পে বেশি পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের ভবনগুলোতে ভূমিকম্পের ক্ষতি এড়াতে বিভিন্ন আয়তাকার অংশে বিভক্ত করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি L আকৃতির ভবনের প্ল্যানকে Separation Joint ব্যবহার করে দুটি ছোট আয়তাকার প্ল্যানে বিভক্ত করা যায়। আবার প্রায়ই দেখা যায়, যেসব ভবনের প্ল্যান সরল জ্যামিতিক আকারে তৈরি কিন্তু কলাম কিংবা দেয়ালের পরিমাণ প্ল্যানের ওপর সমভাবে বণ্টিত থাকে না বলেই ওই ভবনে ভূমিকম্পের সময় twist বা মোচড় সৃষ্টি হয়। আর মোচড় সৃষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ হলো ভবনের Centre of mass এবং Centre of stiffness একই বিন্দুতে না হয়ে দুটি ভিন্ন বিন্দুতে অবস্থান করে।

ভবনের উল্লম্ব বিন্যাস

একটি ভবনের বিভিন্ন তলায় উৎপন্ন ভূমিকম্প বল উচ্চতা বরাবর সরলপথে ভূমিতে স্থানান্তরে করতে হয় অর্থাৎ উলম্ব বরাবর ভবনের কলাম বা দেয়ালে কোনো ধরনের বিচ্যুতি বা বাধা থাকা যাবে না, যাতে করে ভবনের কার্যকারিতা কমে যায়। যেসব ভবনের বিভিন্ন তলায় প্ল্যানের আয়তন ভিন্ন ভিন্ন হয়, সেসব ভবনের নিচতলার থেকে ওপরের তলায় হঠাৎ প্ল্যানের আয়তনের অংশ পরিবর্তন হয়ে যাওয়াকে setback বলে এবং setback শুরু হওয়ার অংশে হঠাৎ করেই ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি বেশি অনুভূত হয়। আবার কোনো ভবনের একটি বিশেষ তলায় অপেক্ষাকৃত কম কলাম বা দেয়াল থাকে কিংবা কোনো একটি তলা অন্যান্য তলার চেয়ে অস্বাভাবিক লম্বা হয়, তবে সে ধরনের ভবন ধসে পড়তে চায় এবং ওই বিশেষ তলা দিয়েই ধসের শুরু হয়। অতীতের ভূমিকম্পে পার্কিংয়ের জন্য খোলা নিচতলা বিশিষ্ট ভবন গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন নজির অসংখ্য। ঢালু মাটিতে নির্মিত ভবনে এক দিকের কলামের দৈর্ঘ্য লম্বা হওয়ার কারণে ভূমিকম্পের সময় ভবনে মোচড়ের সৃষ্টি হয় এবং অপেক্ষাকৃত ছোট কলামগুলোর অনেক বেশি ক্ষতি হয়। আবার অনেক ভবনে দেখা যায় কলাম ভিত্তি পর্যন্ত না পৌঁছে কোনো একটি তলায় বিমের ওপরে এসে শেষ হয়। অর্থাৎ বিমের ওপর ভেসে থাকে। এসব কলাম ভূমিকম্প বল সমভাবে স্থানান্তর করতে পারে না এবং বিমের মাধ্যমে অন্য কলামগুলোতে স্থানান্তর করে অন্য কলামে অতিরিক্ত বল সৃষ্টি করে ভবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অনেক ক্ষেত্রে কংক্রিটের দেয়াল ভবনের ভিত্তিস্তর পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই শেষ হয়ে যাওয়ায় ভূমিকম্পে ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় (চিত্রের মতো)।

ভবনের সন্নিহিত অবস্থা

দুটি ভবন খুব কাছাকাছি থাকলে শক্তিশালী কম্পনের সময় একে অপরের সঙ্গে আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে। উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই সংঘর্ষের মাত্রা অধিক হয়। এর কারণ হচ্ছে, অপেক্ষাকৃত উঁচু ভবনের দোলনকাল বেশি হয় এবং ভবনগুলোর বিভিন্ন তলার উচ্চতা অসমান হলে একটি ভবনের ছাদ অন্য একটি মেঝে বরাবর আঘাত করে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ভবনে  টুইস্ট বা মোচড় সৃষ্টি

যেসব ভবনের কলাম ও দেয়ালের অবস্থান দুই আনুভূমিক দিকে সমভাবে বণ্টিত থাকে (চিত্রের মতো) সেসব ভবনে যদি আমরা ওপর থেকে দেখি তাহলে দেখা যাবে একটি নির্দিষ্ট দিকে ভূমিকম্পের সময় ভবনটি সামনে-পেছনে এমনভাবে দুলতে থাকবে যেন একই তলার প্রতিটি বিন্দুর একই দিকে সমান বিস্তারে সরণ হয়।

আবার, উদাহরণস্বরূপ যদি আমরা খোলা পার্কে গাছের সঙ্গে একটি দোলনা লক্ষ করি, সেখানে কেউ যদি দোলনার এক প্রান্তে বসে দুলতে থাকে, তবে দোলনাটি দোলনের সময় মোচড় খায়। ঠিক একইভাবে কোনো ভবনের এক প্রান্ত অপেক্ষা অপর প্রান্ত বেশি ভারী হলে, অপেক্ষাকৃত ভারী প্রান্ত বেশি মাত্রায় কম্পিত হবে। ফলে ভবনটিতে আনুভূমিক কম্পনের পাশাপাশি ঘূর্ণনের সৃষ্টি হবে (চিত্রের মতো)।

আবার যদি একটি দোলনা কল্পনা করি যেটি দুটি অসমান উচ্চতা থেকে ঝোলানো, তাহলে দেখা যাবে দোলনের সময় দোলনাতে মোচড় সৃষ্টি হবে। অনুরূপভাবে কোনো ঢালু স্থানে ভবনের ক্ষেত্রে অসমান কলাম কিংবা দেয়াল থাকে তাহলে আনুভূমিক দিকে কলাম বা দেয়াল সমভাবে বণ্টিত হওয়ার পরও ওই ভবনে চিত্রের মতো মোচড় সৃষ্টি হবে। কোনো ভবনে এক বা দুই পাশে যদি দেয়াল থাকে এবং অপর দিকে শুধু কলাম থাকে, সেসব ভবনেও অনুরূপ মোচড় সৃষ্টি হবে। যেসব ভবনের প্ল্যানের আকার অনিয়মিত সেসব ভবনও ভূমিকম্পে দুর্বল আচরণ করে। যেমন কোনো ভবনের একপাশে ঝুলন্ত অংশ থাকলে বা ঝুলন্ত অংশটি শুধু অপেক্ষাকৃত সরু কলামের ওপর থাকলে ওই ভবনের বিভিন্ন তলায় আনুভূমিকভাবে দোলনের পাশাপাশি মোচড়ের সৃষ্টি হয়।

ভবনের Twist বা মোচড়কে প্রকৌশল দৃষ্টিকোণ থেকে Torsion বলা হয়। Torsion এর ফলে ভবনের একই তলায় ভিন্ন ভিন্ন বিন্দুতে ভিন্ন ভিন্ন আনুভূমিক সরণ ঘটে। এটি ভবনের যে পাশে বেশি দোলে বা কম্পিত হয় সে পাশের কলাম এবং দেয়ালে বেশি পরিমাণে ক্ষতি করে। অতীতের বিভিন্ন ভূমিকম্পে অতিরিক্ত মোচড়ের প্রভাবে অনেক ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নজির আছে। মোচড়ের প্রভাব কমাতে হলে নিয়মিত আকারের প্ল্যানবিশিষ্ট ভবন তৈরি করতে হবে নতুবা এমনভাবে ভবনের নকশা করতে হবে যেন অতিরিক্ত ভূমিকম্প বল ভবনের ক্ষতি করতে না পারে।

অবশ্যই ভবন তৈরির সময় ভবনকে একঘেয়ে না করে ভবনকে দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয়ভাবে ডিজাইন করতে হবে যেমন তেমনি স্থাপত্য নকশায় ভবন যাতে ভূমিকম্পের সময় দুর্বল হয়ে না পড়ে সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভূমিকম্প প্রতিক্রিয়ায় ভবনের জন্য ক্ষতিকর স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য এড়িয়ে চলা উচিত। যদি তা না করা যায়, অন্তত দুর্বল বৈশিষ্ট্যের মাত্রা কমিয়ে আনতে হবে। অনিয়মিত বৈশিষ্ট্য অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উচ্চস্তরের স্ট্রাকচারাল ডিজাইন প্রয়োজন হয়। তবে এতেও সরল স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের ভবনের মতো ভালো হবে না, তাই যেকোনো ভবন তৈরির আগে পরিকল্পনা পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৬০তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৫

রামকৃষ্ণ মজুমদার
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top