ধরনভেদে বিভিন্ন ধরনের সড়ক নির্মাণ কিংবা সংস্কারকাজের জন্য গৃহীত প্রকল্পের সকল কাজ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করার নিমিত্তে প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী, ব্যবহার্য যন্ত্রপাতি এবং নির্মাণ পদ্ধতি সম্পর্কিত বিষয়গুলো সংক্ষিপ্ত পরিসরে এবারের আলোচ্য।
প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী
- মাটি
- বালু
- ইট
- পাথর
- সিমেন্ট
- রড
- বিটুমিন
- কাঠ
- বাঁশ
- স্টিল প্রভৃতি।
প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ
- থিওডোলাইট
- এক্সকাভেটর
- বুলডোজার
- ট্রাক্টর
- গ্রেডার
- ফ্রেজার
- কমপ্যাক্টর (প্লেট কমপ্যাক্টর, রোলার-শিপফুট রোলার, স্টিল রোলার টায়ার রোলার ইত্যাদি)
- লোডার
- ডাম্পার
- ট্রাক
- ওয়াটার ট্যাঙ্ক (স্প্রেইং প্রভিশনসহ)
- রোড ক্লিনার
- এয়ার কম্প্রেশার
- অ্যাজফাল্ট ফিনিশার
- কংক্রিট মিক্সার
- টুলস্ (কোদাল, বেলচা, শাবল, গেতি, হাতুড়ি, কুর্নি, প্লেনার, ঝুড়ি, কড়াই, ব্রাশ ইত্যাদি), প্ল্যান্ট ইত্যাদি।
নির্মাণ পদ্ধতি
কাঁচা সড়ক
গ্রামগঞ্জে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সর্বসাধারণের চলাচলের সুবিধার্থে নির্মিত সড়ককে রাস্তা বলা হয়। অত্র রাস্তা মানুষ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচলের উপযোগী করে নির্মিত, যা সাধারণত জনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং খোলা মাঠের মধ্য দিয়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামকে সংযুক্ত করে। এলাকার অবস্থাভেদে কোথাও মাটি কেটে কিংবা কোথাও মাটি ভরাট করে এসব রাস্তা নির্মাণ করা হয়।
রাস্তা তৈরির কাজে মাটি ভরাট করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃতব্য মাটির গুণাগুণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মাটির গুণগত মান এমন হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়, যা সঠিকভাবে কমপ্যাকশন করতে না পারার কারণে বৃষ্টির পানিতে মাটি ওয়াস-আউট হয়ে যেতে পারে কিংবা মাটি-পানির মিশ্রণে রাস্তার ওপর কাদা সৃষ্টি করে সার্বিক চলাচলে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। তাই, রাস্তা তৈরির ক্ষেত্রে গুণগত মানসম্পন্ন মাটি পেতে নির্দিষ্ট একটি জায়গা নির্বাচন করা হয়, যাকে ‘বরোপিট’ বলে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, যেকোনো সড়ক কিংবা রাস্তা তৈরির জন্য এর বেইজ প্রিপারেশন ঠিকভাবে হওয়া অত্যাবশ্যক। নইলে রাস্তার দীর্ঘস্থায়িত্বতা কমে যেতে পারে। তাই, সড়ক নির্মাণকল্পে মাটি ভরাট করার আগে বেইজটিকে মজবুত করার লক্ষ্যে নির্ধারিত স্থান থেকে আলগা ময়লা-আবর্জনা কিংবা কাদা-পানি সরিয়ে ফেলা জরুরি। কারণ, আলগা ময়লা-আবর্জনা কিংবা বিদ্যমান কাদা-পানির ওপর মাটি ভরাট করা হলে তা সঠিকভাবে কমপ্যাকশন করা যায় না।
যা হোক, নির্মিতব্য রাস্তার কাজ শুরু করার লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে অ্যালাইনমেন্ট ঠিক করার পর রাস্তার সীমানা আর লেভেল ঠিক করে বেঞ্চমার্কিং করতে হবে। এরপর নির্ধারিত স্থানের ওপর থেকে আলগা ময়লা-আবর্জনা কিংবা কাদা-পানি সরিয়ে গ্রেডার মেশিনের সাহায্যে মাটি সমান করে নেওয়া এবং স্টিল রোলার চালিয়ে কমপ্যাকশন করে নেওয়া জরুরি। অতঃপর ‘বরোপিট’ থেকে মাটি এনে স্তরে স্তরে ভরাট করে প্রতিটি স্তর আলাদাভাবে কমপ্যাকশন করতে হয়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রতিটি স্তরের ওপর ফেলানো আলগা মাটির উচ্চতা যাতে কমপ্যাকশন করার পর ৬ ইঞ্চির বেশি হতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। এ ছাড়া, কমপ্যাকশনের কাজটি সুসম্পন্ন করা জন্য নির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি আছে, যা যথাযথভাবে মেনে চলা অপরিহার্য। তাই, পর্যায়ক্রমিকভাবে প্রতিটি স্তরে মাটি ফেলা এবং কমপ্যাকশন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজের ধারাবাহিকতাগুলো হচ্ছে-
- বেইজ কোর্সের প্রিপারেশন শেষ করা।
- নির্বাচিত স্থান থেকে মাটি এনে নির্ধারিত এলাকার ওপর নির্দিষ্ট উচ্চতায় মাটি ছড়িয়ে দেওয়া।
- মাটি ফেলানো শেষে সমস্ত এলাকায় ট্রাক্টর চালিয়ে সম্পূর্ণ মাটি আলগা করে দেওয়া।
- স্প্রেয়িং ওয়াটার ট্যাঙ্কের সাহায্যে পানি দিয়ে মাটি ভিজিয়ে দেওয়া।
- ফ্রেজার মেশিনের সাহায্যে মাটি গুঁড়া করে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ভালোমতো মিশিয়ে নেওয়া।
- মাটির সঙ্গে বাঁশ, কাঠ, লতা, পাতা, ঘাসসহ অন্যান্য ময়লা-আবর্জনা থাকলে তা বেছে সরিয়ে ফেলা।
- পানি-মাটি মিশিয়ে নেওয়ার পর ভাইব্রেশনসহ শিপফুট রোলার চালিয়ে কমপ্যাকশন করা।
- গ্রেডিং মেশিনের সাহায্যে কমপ্যাকটেড স্তরের উপরিভাগ কেটে সমান করে নেওয়া।
- গ্রেডিং মেশিন চালানোর পর স্টিল রোলার চালিয়ে পুনরায় কমপ্যাকশন করা।
- কমপ্যাকশন ঠিকভাবে হয়েছে কি না নিশ্চিত করণার্থে ল্যাব টেস্টকরা।
ল্যাব টেস্টের ফলাফল আশানুরূপ না হলে উপরোল্লিখিত ৩ নম্বর ধাপ থেকে প্রতিটি কাজ পুনরায় পর্যায়ক্রমিকভাবে সম্পন্ন করতে হবে। এভাবে প্রতিটি লেয়ারের কাজ একই পদ্ধতিতে শেষ করা প্রয়োজন। প্রসঙ্গত আরও উল্লেখ্য, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে মাটি ফেলার আগে বেইজের ওপর পানি স্প্রে করে হালকাভাবে ভিজিয়ে নিতে হয়।
পুনশ্চ: কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি লেয়ারে নির্দিষ্ট উচ্চতার বেশি মাটি না ফেলা, মাটির মধ্যে ঘাস-পাতাসহ অন্যান্য ময়লা-আবর্জনা থাকলে তা সরিয়ে ফেলা, মাটির বড় বড় চাকাগুলো ভেঙে ছোট করে দেওয়া, পানির পরিমাণ কম/বেশি না হওয়া (পানির পরিমাণ এমন হতে হবে, যা মাটি কমপ্যাকশনের জন্য তা পরিমিত হয়), পানি-মাটি ঠিকমতো মিশিয়ে নেওয়া, পর্যাপ্তভাবে কমপ্যাকশন নিশ্চিত করা ইত্যাদি বিষয়গুলোর প্রতি তীক্ষè দৃষ্টি রাখা জরুরি।
সর্বশেষ, প্রস্তাবিত রাস্তাটি নির্ধারিত উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য ওপরে আলোচিত নিয়মানুযায়ী ৬ ইঞ্চি পরপর প্রতিটি লেয়ার পর্যায়ক্রমিকভাবে কমপ্যাকশন করার মাধ্যমে সম্পূর্ণ রাস্তার নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে। রাস্তা সাধারণত স্থানীয় এলাকা থেকে উঁচু হয়, ফলে সম্পূর্ণ রাস্তার মাটি ভরাট এবং কমপ্যাকশনের কাজ শেষ করার পর দুই পাশের ঢালে ঘাস লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে বৃষ্টির পানিতে রাস্তা ভেঙে নষ্ট হয়ে যেতে না পারে।
নির্মিত রাস্তাটি মাটি কেটে কিংবা মাটি ভরাট করে যেভাবে তৈরি করা হোক না কেন, সর্বশেষ লেয়ারটি এমনভাবে লেভেল (সমান) করতে হবে, যাতে এর উপরিভাগে কোনোভাবেই পানি জমতে না পারে। সর্বোপরি, উপরোল্লিখিত কাজগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অভিজ্ঞ লোকবল নিয়োগ দিয়ে সার্বক্ষণিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
(চলবে)
ডিজিএম (কিউএ) অ্যান্ড এম.আর.
দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লি.
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০২তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৮