ভবন ‘নির্মাণ’ এবং মান নিয়ন্ত্রণ (পর্ব ১০)

….পূর্ব প্রকাশের পর

আজকের অলোচ্য বিষয় স্থাপনায় ‘পেইন্টিং ও পলিশিং’।

একটি স্থাপনা নির্মাণ প্রকল্পে সিভিল কাজের মধ্যে সর্বশেষ ধাপ (ফিনিশিং আইটেম) ‘পেইন্টিং ও পলিশিং’-এর কাজ। নির্মাণ-পরবর্তী ব্যবহারকালীন এর সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ এবং আবহাওয়াজনিত কারণে ক্ষয়রোধ নিশ্চিত করে দীর্ঘস্থায়িত্বতা বৃদ্ধি করা, নির্মিত ইমারতটিতে স্বাস্থ্যসম্মত ও স্বাচ্ছন্দ্যচিত্তে বসবাসের নিমিত্তে কাক্সিক্ষত পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং সার্বিক সৌন্দর্যবর্ধন করাই পেইন্টিং ও পলিশিং কাজের প্রধান উদ্দেশ্য।

প্রতিটি ইমারত নির্মাণ প্রকল্পের বিভিন্ন অংশ ভিন্ন ভিন্ন কাঁচামাল ব্যবহারের মাধ্যমে নির্মিত হয়ে থাকে। তাই উপরোল্লিখিত উদ্দেশ্যাবলি কার্যকরভাবে সফল করার জন্য বিভিন্ন অংশের জন্য আলাদা আলাদা পেইন্ট ব্যবহার করা হয়। মালামাল ও কাজের পদ্ধতি অনুসারে অত্র কাজকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যা হচ্ছে-

১.    পেইন্টিং ও

২.   পলিশিং।

সিভিল, স্যানিটারি, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল সব কাজ সম্পন্ন করার পর এই ফিনিশিং আইটেমের কাজ সম্পাদন করা হয়।

পেইন্টিং

স্থান ও পাত্রভেদে পেইন্টিংয়ের নানা প্রকারভেদ আছে, যেমন;

১.    কংক্রিট বা ব্রিক সারফেস

২.   উডেন সারফেস ও

৩.   স্টিল সারফেস।

উপরোল্লিখিত প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন পেইন্টিং মালামাল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তবে উডেন ও স্টিল সারফেসে সাধারণত একই ধরনের পেইন্টিং মালামাল ব্যবহৃত হয়, যা ‘এনামেল পেইন্ট’ নামে পরিচিত। কিন্তু কংক্রিট বা ব্রিক সারফেসের ভেতর ও বাইরের অংশের জন্য পেইন্টিং মালামালের ধরন ও মান আলাদা আলাদা হয়ে থাকে। যার বিস্তারিত একটি তালিকা উল্লেখ করা হলো-

বাইরের অংশে ব্যবহৃতব্য পেইন্ট

১.    হোয়াইট ওয়াশ (চুনকাম)

২.   কালার ওয়াশ

৩.   স্নো-সেম

৪.   ওয়েদার কোট ইত্যাদি।

কালের আবর্তে প্রথম তিনটি পেইন্টের ব্যবহার বিলুপ্ত প্রায়। অতীতকালে মানুষের রুচি ও আর্থিক সংগতির ওপর নির্ভর করে ১ থেকে ৩ নম্বর পর্যন্ত পেইন্টগুলো পর্যায়ক্রমিকভাবে ব্যবহার করা হতো। দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার প্রভূত উন্নতি সাধিত হওয়ায় এখন ধনী-গরিব নির্বিশেষে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ওয়েদার কোট ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে ব্যক্তিমালিকানায় ইমারত নির্মাণ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় সব ক্ষেত্রেই ওয়েদার কোটের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে।

ভেতরের অংশে ব্যবহৃতব্য পেইন্ট

১.    হোয়াইট ওয়াশ (চুনকাম)

২.   কালার ওয়াশ

৩.   ডিসটেম্পার

৪.   প্ল¬াস্টিক পেইন্ট ইত্যাদি।  

ইমারতের বাইরের অংশের মতো ভেতরের অংশে ব্যবহারের জন্যও একইভাবে ১ ও ২ নম্বর পেইন্টের ব্যবহার একবারেই উঠে গেছে। এখন রুচি ও আর্থিক সংগতি অনুযায়ী ডিসটেম্পার ও প্ল¬াস্টিক পেইন্টই সর্বত্রই ব্যবহৃত হচ্ছে। প্লাস্টিক পেইন্টের আবার নানা প্রকারভেদ আছে, আছে ব্যবহারিক স্থান ও দামের পার্থক্যও। ফলে একইভাবে রুচি ও আর্থিক সংগতি অনুযায়ী প্লাস্টিক পেইন্ট ব্যবহার করা হয়ে থাকে। 

স্থানভেদে পেইন্টিংয়ের সারফেস প্রিপারেশন, অ্যাপ্লি¬কেশন এবং অন্যান্য মালামাল আলাদা হয়। তবে প্রতিটা ক্ষেত্রেই পেইন্টিং কাজেরই মূল উদ্দেশ্য এক। তাই এসব কাজের জন্য ব্যবহৃতব্য মালামাল ও কাজের গুণগত মান রক্ষা করা অতীব জরুরি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সব ধরনের পেইন্টই বিদ্যমান বাজারে রেডি মিক্সড আকারে পাওয়া যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাহিদা অনুযায়ী নিজেরাও বিভিন্ন রং মিশ্রণ করে নেওয়া যেতে পারে।

পেইন্টিং কাজের ফিনিশিং ভালো হওয়া এবং এর দীর্ঘস্থায়িত্বতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে মালামাল সংগ্রহ করা এবং কাজের পদ্ধতিসমূহ সঠিকভাবে মেনে চলা অত্যাবশ্যক। প্রতিটি কাজের গুণগতমান রক্ষার্থে যেকোনো সারফেসে পেইন্টিং ম্যাটেরিয়ালস লাগানোর আগে প্রয়োজনীয় সারফেস ট্রিটমেন্ট (অর্থাৎ প্রয়োজনীয় ফিনিশিং দেওয়া এবং ঘষা-মাজা করা) করার পর তা উত্তমরূপে পরিষ্কার করে নিতে হয়, যাতে ধুলা-ময়লা কিংবা অন্যান্য কোনো আবরণ না থাকে।

সঠিকভাবে সারফেস ট্রিটমেন্ট শেষে নির্বাচিত পেইন্টিং ম্যাটেরিয়ালস সংগ্রহকরত প্রস্তুতকারী কোম্পানির ম্যানুয়াল অনুযায়ী পর্যায়ক্রমিকভাবে প্রাইম কোট, সেকেন্ড কোট ও ফাইনাল কোট প্রয়োগ করে পেইন্টিং কাজের ফিনিশিং দিতে হয়। পেইন্টের প্রতিটি কোট লাগানোর পর পরবর্তী কোট লাগানোর আগে ভালোভাবে শুকানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া জরুরি। খেয়াল রাখা দরকার, কোনো অবস্থাতেই ভেজা সারফেসে পেইন্টিং ম্যাটেরিয়ালস লাগানো যাবে না।

প্রাথমিকভাবে পেইন্টিং কাজের প্রিপারেশন নেওয়ার আগে সব সারফেস ভালোভাবে শুকানোর ব্যাপারটি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। বাংলায় একটা প্রবাদ আছেÑ ‘সব ভালো যার, শেষ ভালো তার’। সুতরাং পেইন্টিংয়ের কাজে সারফেস প্রিপারেশনের ব্যাপারে কোনোরূপ অবহেলা করা ঠিক নয়। সামান্যতম অবহেলার কারণে নষ্ট হয়ে যেতে পারে অত্র কাজের সার্বিক দৃষ্টি নান্দনিকতা ও স্থায়িত্বতা। 

সবশেষে বলতে চাই, পেইন্টিংয়ের কাজের জন্য সঠিক রং (কালার) নির্বাচন করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। রঙের ব্যবহারই একটা মানুষের রুচির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। ফলে পারিপার্শি¦ক সবকিছুর সঙ্গে সামঞ্জস্যতা রেখে পেইন্টের কালার নির্বাচন করা প্রয়োজন। সর্বোপরি, গুণগতমানসম্পন্ন কাজ করতে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মিস্ত্রি দ্বারা নিয়মমাফিকভাবে কাজ করানো এবং অভিজ্ঞ লোকবল নিয়োগ দিয়ে সার্বক্ষণিক তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।

পলিশিং

পলিশিংয়ের কাজে মূলত কোনো পার্থক্য নেই। ব্যবহারকারীর চাহিদা অনুযায়ী শুধু গুণগতমান আর রং (কালার)-এর কিছু তারতম্য হয়ে থাকে। একটি ইমারত নির্মাণ প্রকল্পে ব্যবহৃত সব কাঠের কাজ যেমন-ফার্নিচার, জানালা-দরজার চৌকাঠ ও পাল্লা ইত্যাদি ক্ষেত্রে পলিশিংয়ের কাজ করা হয়। এই কাজটি তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল ও দৃষ্টিনন্দনও বটে। মানসম্পন্ন পলিশে কাঠের আঁশগুলো প্রাকৃতিক নিয়মে দৃশ্যমান হয় এবং নান্দনিকতা বৃদ্ধি করে।

ফলে এই কাজটি সঠিকভাবে সম্পাদন করার জন্য মানসম্পন্ন মালামাল সংগ্রহ করা এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মিস্ত্রি নিয়োগ দেওয়া অত্যাবশ্যক। অনভিজ্ঞ মিস্ত্রি দ্বারা কাজ করানো হলে অতিরিক্ত রঙের প্রলেপ দিয়ে কাঠের আঁশগুলো ঢেকে ফেলে ও ঔজ্জ্বল্য ম্লান করে দেয়, ফলে এর নান্দনিকতা হারিয়ে যায়। তাই এই কাজটি করার আগেই সঠিক মালামাল সংগ্রহ করা, অভিজ্ঞ মিস্ত্রি নিয়াগ দেওয়া এবং কাজের পদ্ধতিগত ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য।

চলবে…

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩৩তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০২১। 

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান পিইঞ্জ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top