মেঘ ছাড়িয়ে আকাশের কাছে  বেইপেনজিয়াং সেতু

বছর তিনেক আগের কথা। চীন একটা স্বপ্ন দেখেছিল। স্বপ্নটা ছিল বিশ্বের উচ্চতম সেতু নির্মাণের। এরপর? এরপর আবার কী? বাকিটা ইতিহাস! তিন বছর পেরিয়ে সেই স্বপ্ন আজ বাস্তব। ২০১৬ সালের বিদায়লগ্নে, ২০১৭ সালের শুরুতে নির্মাণ শেষ হলো বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু সেতুর। পূরণ হলো চীনাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। স্বপ্নের সে সেতু দিয়ে এখন দিব্যি চলছে যানবাহন, হাঁটছে মানুষও।

আয়তনে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম দেশ চীনের পার্বত্য প্রদেশ দুটি; ইউনান ও গুইঝু। পাশাপাশি দুটি প্রদেশ; যার মাঝ দিয়ে বহমান নদী। এই নদীর জন্য প্রায় তিনগুণ রাস্তা ঘুরে আসতে হতো যানবাহনকে। আর যদি সংক্ষিপ্ত সময়ে আসতে চান তাহলে উপায় একটাই; সেটা আকাশপথে, ব্যয়বহুল যাত্রা। যা-ই করুন না কেন যোগাযোগের সময় এবং খরচ দুটোতেই যা প্রভাব ফেলে। নদী তো রয়েছেই, সেতু বানিয়ে ফেললেই হয়! কিন্তু বলাটা যতটা সহজ করাটা মোটেও কিন্তু তা নয়। সহজ হয়ই-বা কীভাবে? হিসাবের পর দেখা গেল সেতু বানালে সেটার উচ্চতা হতে হবে অর্ধ কিলোমিটারেরও বেশি! যা কি না হবে নতুন বিশ্বরেকর্ড। এ অবস্থায় হয়তো অন্য কেউ ভয় পেলেও পেতে পারে, কিন্তু যে জাতির রয়েছে ‘গ্রেট ওয়াল’ বা বিশে^র সপ্তাশ্চর্য মহাপ্রাচীর বানানোর কৃতিত্ব, তারা কি আর কোনো কিছুতেই ভয় পায়! মোটেই না। শুরু হলো সেতু তৈরির কাজ।

এরপর দেখতে দেখতে কেটে গেল তিন-তিনটি বছর। এখন এই সেতু আর স্বপ্ন নয়। আজ এটা নিরেট বাস্তব। মাটি থেকে ৫৬৫ মিটার উচ্চতায়। ফুট হিসাব করলে ১ হাজার ৮৫৪ ফুট। মানে প্রায় ২০০তলা সুউচ্চ ভবনের সমান উঁচু! নিউইয়র্ক সিটির ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের চেয়েও উঁচু স্থাপনা এটি। উড়ন্ত বিমানে বসে জানালা দিয়ে নিচে তাকানো আর বেইপেনজিয়াং ব্রিজে দাঁড়িয়ে নিচে তাকানোর মাঝে খুব একটা পার্থক্য নেই বললেই চলে। চার লেনের এই সেতু কিন্তু একটি ঝুলন্ত সেতু। এর দৈর্ঘ্য ১ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার। এই ব্রিজ বানাতে চীনের খরচ হয়েছে স্থানীয় মুদ্রায় ১০০ কোটি ইউয়ান, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।

সেতুটির খবর ইতিমধ্যে নিশ্চয় পেয়েছেন। কিন্তু, যাঁরা এই বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন, তাঁদের মাঝে অনেকের মনে নিশ্চয় একটা খটকাও তৈরি হয়েছে। আর তা হলো ফ্রান্সের মিলাউ সেতু নিয়ে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ‘হাইয়েস্ট ব্রিজ’ ও ‘টলেস্ট ব্রিজ’ নামে বিভিন্ন তালিকা পাওয়া যায়। আমরা বাংলা অর্থে অনেক সময় এই দুটোকে একই ধরছি। আর সেখানেই ঘটছে যত বিপত্তি। যদি টলেস্ট ব্রিজের কথা বলা হয় তবে সেটা চীনের বেইপেনজিয়াং ব্রিজ নয়, সেটি হবে ২০০৪ সালে ফ্রান্সে নির্মিত মিলাউ ব্রিজ। যদিও এটির উচ্চতা ৩৩৫ মিটার বা ১ হাজার ১০০ ফুট। কিন্তু তবুও এটি পৃথিবীর টলেস্ট ব্রিজ। এর কারণ হলো ‘টলেস্ট’ বিবেচনার সময় হিসাব করা হয় ব্রিজটির স্থাপনার একদম নিচের ভিত্তি বিন্দু থেকে ব্রিজের সর্বোচ্চ বিন্দুর উচ্চতা। সেটার ক্ষেত্রে ২০০৪ সালে নির্মিত হওয়া মিলাউ ব্রিজ এগিয়ে বেইপেনজিয়াং ব্রিজের চেয়ে। কিন্তু, বেইপেনজিয়াং ব্রিজকে উঁচু বলা হচ্ছে মাটি থেকে এর উচ্চতা বা দূরত্বের ভিত্তিতে। মাটি থেকে ৫৬৫ মিটার বা ১ হাজার ৮৫৪ ফুট উঁচু এই সেতু। কিন্তু, একইভাবে মাটি থেকে উচ্চতার হিসাবে মিলাউ ব্রিজ অনেক পিছিয়ে রয়েছে; মাটি থেকে এর উচ্চতা মাত্র ২৭০ মিটার বা ৮৯০ ফুট। সেতুর গঠন, উচ্চতা, মাটি থেকে এর দূরত্বের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু সেতু বিবেচনা করা হয়। তাই নিঃসন্দেহে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ব্রিজ চীনের বেইপেনজিয়াং ব্রিজ।

১৯২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্যান ফ্রানসিসকোতে দুনিয়া খ্যাত ‘গোল্ডেন গেইট’ ব্রিজ সম্পর্কে বিখ্যাত আমেরিকান স্থপতি জোসেফ স্টরাস বলেছিলেন, ‘গোল্ডেন গেট ব্রিজের মাধ্যমে আমেরিকা প্রমাণ করল যে এটিই হলো বিশ্বের একমাত্র দেশ, যার কি না পর্যাপ্ত সম্পদ, পর্যাপ্ত উদ্যম ও পর্যাপ্ত সাহস রয়েছে; যেকোনো দুঃসাহসিক ও স্বপ্নের স্থাপত্য প্রকল্পকে বাস্তব রূপ দেওয়ার।’ এরপর প্রায় ১০০ বছর পেরিয়ে গেছে। আজ বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ১০টি সেতুর ৮টিই চীনে! জোসেফ স্টরাসের সেই কথাটিই আজ আবার মনে করতে ইচ্ছা করছে; শুধু দেশের জায়গায় আমেরিকার বদলে চীন বসিয়ে নিলেই হলো। কী বলেন?

DW

এক নজরে বেইপেনজিয়াং সেতু

নির্মাতা দেশ: চীন

ভূমি থেকে উচ্চতা: ৫৬৫ মিটার/১,৮৫৪ ফুট

সেতুর দৈর্ঘ্য: ১.৩৪ কিলোমিটার

মোট খরচ: ১,১৫০ কোটি টাকা (১০০ কোটি ইউয়ান)

নির্মাণকাল: ৩ বছর

লেন: ৪টি

পৃথিবীর উচ্চতম ৭ সেতু

(ভূমি থেকে উচ্চতার ভিত্তিতে)

DW
ক্রমিকসেতুর নামউচ্চতা (ফুট)অবস্থান
বেইপেনজিয়াং১৮৫৪চীন
সিডু রিভার১৬২৭চীন
পুলি১৫৯১চীন
ইয়াচি১৪২৪চীন
কুনশুই১৩৩২চীন
হেইগো জর্জ পাইপ্লাইন১২৮৯ পাপুয়া নিউগিনি
বালুয়ার্তে১২৮০মেক্সিকো

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮২তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৭।

ফয়সাল হাসান সন্ধী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top