Image

সোলার ট্রি

সূর্যকে বশে আনার গল্প

ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার কথা। তখনো এই শতকের মতো বিদ্যুতের ভয়াবহ চাহিদা দেখা দেয়নি। বিভিন্ন প্রচলিত উপায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে প্রয়োজনীয় চাহিদা বেশ ভালোভাবেই মেটাচ্ছিল উন্নত দেশগুলো। কিন্তু প্রকৌশলীরা তাতে মোটেও সন্তুষ্ট ছিলেন না। কেননা তাঁরা ভবিষ্যতের পৃথিবীকেই যেন দেখতে পাচ্ছিলেন দিব্য চোখে। সামনের শতকে বিদ্যুতের যে প্রবল চাহিদা তৈরি হবে তার মোকাবিলা করতে দরকার নতুন কিছুর। সৃষ্টির শুরু থেকেই অনুসন্ধিৎসু মানুষেরা সব সময় খোঁজ করেছে নতুন কিছুর। আর তা খুঁজতে খুঁজতেই বিজ্ঞানীদের মাথায় আসে সূর্যের অপার শক্তিকে কাজে লাগানোর বুদ্ধিটা। যেই ভাবা সেই কাজ। ১০০ বছরের গবেষণার পরে বিজ্ঞানীদের হাতে এল সোলার প্যানেল বা সৌরকোষ। আজ সেই সোলার প্যানেলের ওপর ভর করেই পুরোপুরি পরিবেশবান্ধবভাবে উৎপাদিত হচ্ছে হাজার হাজার গিগাওয়াট বিদ্যুৎ সমগ্র বিশ্বজুড়ে। এবং তাও একেবারেই ন্যূনতম খরচে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো এটি পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব উপায়ে। আজ কিন্তু প্রকৌশলীরা আর শুধু সোলার প্যানেলেই আটকে নেই। বরং তাঁরা প্রতিনিয়ত কাজ করছেন সৌরবিদ্যুৎকে আরও স্বাছন্দ্যে, প্রযুক্তিবান্ধব ও বহুমুখী ব্যবহারের উপযোগী করে তৈরি করতে। আর তাতেই বিশ্ববাসী সম্প্রতি প্রত্যক্ষ করল এক অদ্ভুত বৃক্ষের। নাম যার সোলার ট্রি বা সৌরবৃক্ষ!

কী এই সোলার ট্রি বা সৌরবৃক্ষ?

সৌরবৃক্ষ বা Solar TREE-এর নামের সুন্দর একটি ব্যাখ্যা রয়েছে।

T=Tree generating

R=Renuwable

E=Energy and

E=Electricity

এই নাম থেকেই খুব সহজে বোঝা যাচ্ছে সোলার ট্রি আসলে কী এবং কীভাবেই-বা কাজ করে। আসলে ছাদের ওপর বা খোলা জায়গায় একের পর এক সোলার প্যানেল সাজিয়ে জায়গা দখল না করে বরং ব্যস্ত সড়ক বা কার পার্কিং অথবা ফুটপাতে জায়গার ন্যূনতম ব্যবহার করে সেই স্থানের বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো এবং একই সঙ্গে সত্যিকারের গাছের মতো ছায়া দানের ধারণা থেকেই সোলার ট্রি ধারণার উদ্ভব। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে সোলার প্যানেলের ব্যবহার শুরু হওয়ার ৫০ বছর পরে ২০০৮ সালে রেইন ট্রিফেল্ডের নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করে ‘সোলার ট্রি ফাউন্ডেশন’। এরপরে ২০১২ রস লাভগ্রোভ সর্বপ্রথম সোলার ট্রি নকশা করেন। এই নকশা করার ক্ষেত্রে ‘ফিবোনাচি সিরিজ’ (ফিবোনাচি নম্বর হলো ওই স সংখ্যা, যেগুলো তার সিরিজের আগের পরপর যেকোনো দুটি সংখ্যা যোগ করলে পাওয়া যায়। ধারাটি হলো- ০, ১, ১, ২, ৩, ৫, ৮, ১৩, ২১, ৩৪, ৫৫…) ব্যবহার করা হয়। যার ফলে স্বল্প স্থানে দিনের যেকোনো সময়ে সর্বোচ্চ পরিমাণ সূর্য কিরণের ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। তারই মডেল অনুসরণ করে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপে সোলার ট্রি ব্যবহার শুরু হয়েছে কয়েক বছর ধরে। সম্প্রতি গত বছর আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুরের বাঙালি বিজ্ঞানী শিবনাথ মাইতি এই সৌরবিদ্যুৎ বৃক্ষ তৈরি করেছেন। একটি গাছ থেকে পাঁচ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি হয়। তা থেকে গ্রামে অন্তত পাঁচটি বাড়িতে আলো জ্বলতে পারে। এই কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে ভারতের বর্তমান কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী হর্ষবর্ধন নিজের বাসভবনে সোলার ট্রি স্থাপন করেছেন। তাঁর বাসভবনের বিদ্যুতের চাহিদার বড় একটা অংশ মেটাচ্ছে এই সোলার ট্রি। গবেষক ও বিদ্যুৎ খাতের প্রকৌশলীদের মতে, এতে জমি লাগে কম। সোলার ট্রির ডালে এমনভাবে সোলার প্যানেলগুলো সাজানো থাকে, যাতে সারা দিন ধরে সূর্যের আলোও পুরোপুরি ব্যবহৃত হয়। এমনিতে এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি করতে পাঁচ একর জমি লাগে। যার অর্থ ১০ হাজার মেগাওয়াটের জন্য ৫০ হাজার একর জমি প্রয়োজন। কিন্তু অপর দিকে সোলার ট্রি বসাতে মাত্র চার বর্গফুটের মতো জমি প্রয়োজন। তাই ব্যস্ত রাস্তার ধারে, জনবহুল এলাকায় বা যেখানে ছাদে বা অন্য কোথাও সোলার প্যানেল বসানোর জায়গার অভাব, সেখানেও এই সোলার পাওয়ার ট্রি বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। আর খরচটাও বেশ কম। পাঁচ কিলোওয়াটের সৌরবৃক্ষ তৈরিতে খরচ প্রায় পাঁচ লাখ টাকা।  আর বেশি সংখ্যায় তৈরি হলে এই খরচটা পাঁচ লাখ থেকেও অনেক কমে আসবে।

সায়েন্স ডিরেক্ট

সৌরবৃক্ষ বা সোলার ট্রি বানাতে যা যা প্রয়োজন

সাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবৃক্ষ বা সোলার ট্রি বানাতে খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন পড়ে না। স্বাভাবিকভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যা যা দরকার হয় মূলত সেগুলোই লাগে সোলার ট্রি বানাতেও। প্রথমেই প্রয়োজন হবে গাছের কাণ্ডের মতো একটি কাঠামো। এই কাঠামো বিভিন্নভাবেই বানানো যেতে পারে কিন্তু যেহেতু আমরা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছি তাই মূল কাঠামো তৈরিতে বাঁশের ব্যবহার করা যেতে পারে। গাছের কাণ্ড, ডালপালা তৈরি হয়ে গেলে প্রয়োজনীয়সংখ্যক সোলার প্যানেল লাগবে, যা কি না কৃত্রিম বৃক্ষের ডালে ডালে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। আর এই প্যানেলগুলো গাছের কাণ্ডের ভেতরের তারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। গাছের মূলের জায়গায় সাধারণত থাকে ব্যাটারি ও এসি-ডিসি কনভার্টার। আর কাণ্ডের গায়ে সেই বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য লাগানো থাকে চাহিদামাফিক সকেট, চার্জিং পোর্ট প্রভৃতি।

যেসব জায়গায় কার্যকর সোলার ট্রি

সোলার প্লান্টের ক্ষেত্রে অসংখ্য সোলার সেল দ্বারা উৎপাদিত বিদ্যুৎ সাধারণত ন্যাশনাল গ্রিড বা সমন্বিত কোনো ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করে, যা কিছুটা জটিল ও ব্যয়বহুল। কিন্তু সোলার ট্রির ক্ষেত্রে এই জটিলতা বা মাত্রাতিরিক্ত সমন্বয় খরচ নেই। সোলার নিজেই একক ইউনিট হিসেবে কাজ করতে পারে। তাই এটি ব্যস্ত সড়কের ফুটপাতে স্ট্রিট লাইট বা ইলেকট্রিক ডিভাইসের চার্জিং পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এমনকি ইলেকট্রিক কারের চার্জার হিসেবে হাইওয়েতে এটি স্থাপন করা যেতে পারে। আর ছোট পরিবারের বসবাসরত বাসার জন্য তো ব্যবহার করা যেতেই পারে। এমনকি ৫ থেকে ১০ কিলোওয়াট চাহিদাসম্পন্ন ছোট আকারের কলকারখানার জন্য একটি সোলার ট্রিই যথেষ্ট।

পিন্টারেস্ট

হতে পারেন ‘মিনিয়েচার’ সৌরবৃক্ষের মালিক

বৃহদাকার সোলার ট্রি যদি লাগানো ঝক্কি মনে করেন তবে সমস্যা নেই মোটেও। আপাতত হাত বাড়ালেই মালিক হতে পারেন একটা মিনিয়েচার সোলার ট্রি বা সৌরবৃক্ষের। বেশ কিছুদিন হলো বড় আকারের সোলাল ট্রির আদলেই একদম ছোট আকারের সোলার ট্রি বাজারজাতকরণ শুরু হয়েছে। এই সহজে বহনযোগ্য সোলার ট্রি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে পরিবেশবান্ধব বাঁশ। বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে মূল কাঠামো। এরপরে তার ওপরে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ছোট ছোট সোলার প্যানেল। আর গাছের কাণ্ড দিয়ে বের হয়েছে মাইক্রো ইউএসবি কেব্ল সংযোগ, যা দিয়ে সহজেই সংযুক্ত করা যাবে মুঠোফোনে। হাতের মুঠোফোন চার্জ হবে সহজেই। ১৪০০ Milliamp Hour (mAh)-এর এই মিনিয়েচার সৌরবৃক্ষের উচ্চতা প্রায় ২০ ইঞ্চি। আর নিচের ব্যাটারি স্টোরেজটি প্লাস্টিকের। আর বৃক্ষের ডালপালায় ছড়িয়ে আছে ৯টি পিচ্চি আকারের স্বল্পক্ষমতাসম্পন্ন (সৌরকোষ) সোলার প্যানেল। এই সৌরবৃক্ষ অনলাইনে বিভিন্ন বিদেশি ই-কমার্স সাইটে পাওয়া যাচ্ছে। আর মডেল ভেদে দাম ৩-৫ ডলারের (২৪০-৪০০ টাকার) মধ্যেই।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৭তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৭।

Related Posts

ফেসবুক পোস্ট থেকে ফিরে এলো ফুটুরো হাউস

বিশ শতকের ষাটের দশকের শেষভাগে ফিনল্যান্ডের স্থপতি মাত্তি সুরোনেন যে উড়ন্ত সসারসদৃশ বাড়িটি ডিজাইন করেছিলেন, তা স্থাপত্যের ইতিহাসে…

নির্মাণসামগ্রী আবিষ্কার করবে রোবট

স্থাপত্য ও নির্মাণশিল্পে প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন কোনো ঘটনা নয়। কম্পিউটার-এইডেড ডিজাইন (AI) থেকে শুরু করে থ্রিডি প্রিন্টিং, প্যারামেট্রিক…

স্থপতির চোখে বাউলশিল্পী শাহ আব্দুল করিমের সমাধিসৌধ

প্রিয় গানের দল ‘দোহার’-এর প্রয়াত শিল্পী কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য বাউল শাহ আব্দুল করিমের একজন একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। তিনি বলেছিলেন,…

সিউলের হাইওয়ে ভেঙে নদী ফিরিয়ে আনতেই কমল যানজট

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি ছোট নদীর নাম চেওংগিয়েচন। এক সময় নগরায়নের কারণে এই…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

নিউইয়র্ক সিটির চার নতুন জেলের পেছনের স্থাপত্য চিন্তা
prada galleria
গোল্ডেন সেকশন থেকে কোস্টারিকার পাহাড়ে ত্রিভুজাকৃতির বাড়ি
রান্নাঘরে খেলাচ্ছলে টুইস্ট নিয়ে এসেছে ডিজাইনবুম শপের নতুন কিউরেটেড সংগ্রহ
বাগানের ভেতর রঙিন খিলানে বিস্তৃত হলো এক ইরানি বাড়ি: গেলারেহ হাউস
বেঙ্গাজির নতুন পরিকল্পনার রূপরেখা আঁকছে ZHA
ফেসবুক পোস্ট থেকে ফিরে এলো ফুটুরো হাউস
ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচার ও কার্বন নি:সরণ
আসন্ন RIBA ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজের শর্টলিস্টে রংপুরের গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি