টেকসই স্থাপত্যে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ

টেকসই স্থাপত্য কি, কেন জানেন কি? রাষ্ট্রের অবকাঠামোগত উন্নয়নই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন। বাংলাদেশের স্থাপত্যে কতটা টেকসই আমরা তা-ই জানবো বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে। এ বিষয়ে জানাবেন স্থপতি বিকাশ সউদ আনসারী।

তার জন্ম ১৯৬৩ সালে খুলনায়। ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালে মাধ্যমিক এবং ১৯৮১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ১৯৮৯ সালে স্থাপত্যে স্নাতক এবং পরবতীর্তে স্নাতোকোত্তর সম্পন্ন করেন (চলতি) । ব্যক্তিগত এবং পেশাজীবনে অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্থাপত্য ডিজাইন প্রতিযোগিতায়। এরই ধারবাহিকতায় ১৯৮৯ ও ১৯৯৩ সালে জিতে নেন মিমার আন্তর্জাতিক আর্কিটেকচার জার্নাল অ্যাওয়ার্ড। এছাড়াও ডিআইটিএফ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় মাস্টার প্ল্যান, হামদর্দ ইউনিভার্সিটির মাস্টার প্ল্যান, সেন্টার ফর আইএবি এর ডিজাইনসহ বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতায় জিতেছেন সম্মানজনক অ্যাওয়ার্ড। তিনি দু’টি সইকলএ আন্তজার্তিক প্রকল্প এর আগা খান অ্যাওয়ার্ডের জন্য নমিনেটর মনোনীত হন। তিনি আইএবির জাতীয় স্থাপত্য অ্যাওয়ার্ড এর জুরি বোর্ডের সদস্য হবার সম্মান লাভ করেন। অস্ট্রেলিয়া, নেপাল, ইন্দোনেশিয়াসহ কয়েকটি দেশের আন্তর্জাতিক সেমিনারে পেপার উপস্থাপন করেছেন। এসব পেপার বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিতও হয়েছে। তিনি শান্তা মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টেরিয়র আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং A+AA স্থাপত্য ফার্মের প্রিন্সিপ্যাল আর্কিটেক্ট হিসেবে দায়িত্বরত। সমকালীন স্থাপত্যধারার সংকট, সম্ভাবনা ও দেশে শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ের শিক্ষা পরিবেশ নিয়ে বন্ধনকে জানিয়েছে খোলামেলা কথা। আলাপচারিতায় তাঁর সাথে ছিলেন মারুফ আহমেদ

বাংলাদেশের স্থাপত্যশিক্ষার সংকট ও সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাই?

সাম্প্রতিক সময়ে সমগ্র বিশ্বেই এমন কিছু পরিস্থিতি হচ্ছে, যেখানে টেকসই স্থাপত্যের নানা দিক হয়ে উঠছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে গুরুত্বটা আরও বেশি। যেহেতু বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে অর্থনৈতিকভাবেও ক্রমাগত এগোচ্ছে, সেহেতু স্থাপত্যশিক্ষার সংকট একপর্যায়ে জরুরি বিচার্য্য বিষয় হয়ে উঠবে। টেকসই স্থাপত্যচর্চা সঠিকভাবে না হলে বৈদেশিক স্থাপত্য সংস্কৃতি আমাদের ওপর চেপে বসবে। কেননা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্কিটেকচারের যে নোশ্যান, তা স্বকীয়তা কিংবা এসথেটিকসেন্সের সঙ্গে সমন্বয় করা হয় না। আন্তর্জাতিকীকরণ করতে গিয়ে বাদ পড়ে যায় নিজস্বতা। উন্নত দেশগুলোর বড় বড় অনেক কাজ, যেগুলো আইকেচি হয়, সেগুলোতে আমরা ব্যাপক উৎসাহিত হতে শুরু করি, তখনই শুরু হয় সংকটের। এভাবেই আমরা হারাচ্ছি নিজস্বতা। এ দেশের বেশির ভাগ স্থপতিই খুব সরলীকরণভাবে আন্তর্জাতিকীকরণের দিকে এগোনো শুরু করেছিলেন। এই প্রবণতাটা চলছিল দীর্ঘদিন। এটা টেকসই স্থাপত্যশিক্ষার একধরনের সংকট বলে আমার মনে হয়। বিশ্বায়নকে আমরা পজেটিভ ও নেগেটিভ উভয়ভাবেই দেখতে পারি। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবসা বিশ্বায়নকে গ্লোবাল ভিলেজে রূপায়ণের কথা বলছে। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খোলার ব্যাপারটি উন্নত দেশগুলোর জন্য সহায়ক হয়েছে, তা হয়নি উন্নয়নশীলদেশের বেলায়। আমারও অবশ্য অন্য কয়েক দিক থেকে কিছুটা ছাড় পেয়েছি। যেমন- তথ্যপ্রযুক্তি, বিশ্বযোগাযোগ, ন্যানো টেকনোলজি প্রভৃতি। ছাত্র-শিক্ষকেরা এই সুবিধায় অনেক বেশি অন্তর্ভুক্ত হতে পেরেছে। যেমন- আমাদেরকে অনেক টাকা খরচ করে বিভিন্ন সফটওয়্যার বা প্রোগ্রামের লাইসেন্স কিনতে হয় না, আমরা পাইরেটেড কপি পাই। এসব বিষয়ে কিছুটা ছাড় পাওয়ার কারণে আমরা গ্লোবাল কানেকটিভিটির মধ্যে ঢুকতে পেরেছি। এভাবে সংকট কিছুটা উত্তরণ হতে পারে, আবার একইভাবে ইন্টারনেটের ব্যাপক সুবিধা ও ব্যবহার আমাদের সম্ভাবনাকে ম্লান ও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কারণ, শিক্ষার্থীরা ক্রমাগত ইন্টারনেট-নির্ভর হয়ে পড়ছে। কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলেই তারা ইন্টারনেটে এর সমাধান খুঁজছে। এটা একধরনের অশনিসংকেত। কারণ, সেখানে কিছু নির্দিষ্টধর্মী সমাধান দেওয়া থাকে, যার মাধ্যমে প্রকৃত শিক্ষা অর্জন সম্ভব নয়। প্রকৃত শিক্ষার্জনে প্রয়োজন গবেষণা, প্রচুর বই পড়া, শিক্ষিত মানুষের সংস্পর্শে আসা, সংস্কৃতিকে নিজের মধ্যে ধারণ করা ইত্যাদি। কিন্তু ইন্টারনেটে উত্তর খোঁজার সংস্কৃতি একধরনের সংকট বলেই আমি মনে করি।

সম্ভাবনার কথা যদি বলি তাহলে, টেকসই স্থাপত্য বিজ্ঞান ও শিল্পের সমন¦য়ে খুব উদার এবং চ্যালেঞ্জিং একটি পাঠ্যবিষয়, যার ফলে আমরা প্রথম থেকেই টেকসই স্থাপত্যের সম্ভাবনা সম্পর্কে অত্যন্ত অনুপ্রাণিত হওয়ার চেষ্টা করেছি। গ্লোবালাইজেশনের কারণে আমরা যে আইডেনটিটি ক্রাইসিসের দিকে যাচ্ছি, তা শিক্ষার্থীকালীনই ভাবতাম কীভাবে এই সংকট থেকে বেরুনো যায় এবং সঠিক অবস্থানে আসতে পারি কি না। এটা আমাদের জন্য বিশাল একটা অ্যাসপেক্ট। এটার ব্যাপারে আমাদের কাজ করতে হবে। নতুনভাবে বলতে গেলে আবহাওয়াগত দিক থেকে পুঁজিবাদ আমাদের এমন একটা জায়গায় ঠেলে দিয়েছে, যে সভ্যতায় টিকে থাকতে আমরা সংকটে পড়ে গেছি। এই পরিস্থিতি উত্তরণে তখন আমরা শুরু করলাম গ্রিন আর্কিটেকচার; সাসটেইনেবল আর্কিটেকচার। গ্রীন আর্কিটেকচার, সাসটেইনেবল আর্কিটেকচারের দিক থেকে বাংলাদেশ খুবই সম্ভাবনাময় অবস্থানে রয়েছে। এর কারণ, আমাদের পাশ্চাত্যের দেওয়া এখনকার যে কৃত্রিম গ্রিন আর্কিটেকচার ফর্মুলা, তা অনেক আগ থেকেই আমরা আমাদের প্রাকৃতিক স্থাপত্যকৌশল দিয়ে সমাধান করে আসছি। যেমন এয়ারকন্ডিশন ব্যবহার না করেও ক্রস ভেন্টিলেশন সিস্টেমে শীতল পরিবেশ উপভোগ করতাম। টেকসই স্থাপত্য নির্মাণে সূর্যের অবস্থান, ভৌগোলিক বায়ু চলাচলের দিক নির্ণয় ইত্যাদি ব্যাপারে প্রথম থেকেই আমরা সচেতন ছিলাম। প্রকৃতিও আমাদেও এখানে যথেষ্ট সহায়ক। ইউরোপীয় দেশ বা শীতপ্রধান দেশগুলোকে তুষার থেকে বাঁচতে বিশেষভাবে বাড়িঘর নির্মাণ করতে হয়, যা আমাদের দরকার হয় না। এ দিক থেকে আমরা অনেকটাই সুবিধা পেয়েছি। খুব সহজেই একটি আবাসস্থল দাঁড় করাতে পারছি। খুব বেশি কারিগরি দিক নিয়ে আমাদের ভাবতে হচ্ছে না। এটা একটা সম্ভাবনা যে আমরা খুব বেশি সতর্ক না হয়েও টেকসই স্থাপত্য নির্মাণ করতে পারছি। কিছু ব্যাপারে ওরা অবশ্য বেশি সুবিধা পায়। যেমন তাদের দেশের জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা অত্যন্ত ভালো। ফলে তারা পাতলা দেয়াল বা খোলামেলা স্থাপত্য নির্মাণ করতে পারে কিন্তু আমদের করতে হয় ইট-কংক্রিটের মজবুত দেয়াল। অথচ টিন বা কাঠের পাতলা দেয়ালই যথেষ্ট আমাদের আবহাওয়ায়। এ দেশের তরুণ কিছু স্থপতি অবশ্য স্বকীয়তা বজায় রেখে টেকসই স্থাপত্য করার ব্যাপারে আগে থেকেই সচেতন ছিল এবং দেশীয় স্থাপত্যেও বিকাশে সব সময়ই চেষ্টা করেছে। যদিও তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তা ছাড়া টেকসই স্থাপত্যকে জানা ও বোঝার ইচ্ছা অনেকেরই রয়েছে। এখন তো সে সুযোগ আরও বেশি। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও টেকসই স্থাপত্যচর্চায় তরুণ এ স্থপতিরা অংশ নিচ্ছে। এটাই আসলে সম্ভাবনা। মোটকথা সংকট যেমনি আছে, সম্ভাবনাও আছে সমান্তরালভাবে।

টেকসই স্থাপত্য

স্থাপত্যশিক্ষায় আগ্রহী একজন শিক্ষার্থীর কী ধরনের যোগ্যতা থাকা দরকার? 

এ ব্যাপারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যত নর্মসের দিকে গিয়েছিল, আমরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ততটা দাঁড় করাতে পারিনি। প্রথমেই একটি অ্যাপটিচুডিনাল বা দক্ষতা টেস্ট নিয়ে ছাত্রদের এই বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি যদিও আমরা এখনো পারিনি, তবুও আমরা সব সময়ই সচেতন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর মধ্যে সৃজনশীলতা কতটা বিদ্যমান, তা জানতে। আসলে কিছুটা পিছিয়ে পড়া দেশ হিসেবে কিছু সমস্যা আমাদের রয়েছে। সৃজনশীলতার প্রকাশ নানাভাবে সম্ভব যেমন- ছবি আঁকা বা ভিজুয়ালাইজেশন যা ছোটবেলা আমাদের শেখানো হয় না। ইনফরমালি কিছু হলেও যেটুকু হয় তা সর্বজনীন নয়। বাবা-মায়ের ইচ্ছায় কিছু শিশু এ বিষয়ে চর্চা করে। কিন্তু আমাদের শিক্ষাপদ্ধতিতে চিত্রকলাকে জোর দেওয়া হয় না। এটাকে অবশ্যই আবশ্যিক করা উচিত। তাহলে হয়তো আমরা বুঝতে পারতাম প্রাথমিক চর্চা এদের মধ্যে কিছুটা আছে, যা টেকসই স্থাপত্য পাঠদানে খুবই ভালো হতো। তবে বিষয়টি এমন নয় যে তাকে বড় মাপের শিল্পী হতে হবে। সে যেন শিল্পের ভাষা বোঝে। একটা গাছকে কীভাবে সে ভাবে; কল্পনা ক্ষমতা; নন্দনতত্ত্বের প্রতি তার আগ্রহ কতটা, এগুলোই আসলে দেখার বিষয়। ছোটবেলা থেকে এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠলে টেকসই স্থাপত্য শিক্ষার্জন শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক সহায়ক হতো। একটা বিল্ডিং তৈরি করতে গেলে প্রথমেই তো আমাদের ড্রয়িং করতে হয়। তাই ছোটবেলা থেকেই শিল্পের এই চর্চটা যদি করা হয়, তবে টেকসই স্থাপত্যচর্চায় তা খুবই সহায়ক হয়। কিন্তু আমাদের এখন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে বুঝে নিতে হয় যে এ বিষয়ে তার আগ্রহ কতটা।

এ দেশের পাঠ্যপুস্তকে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টেকসই স্থাপত্য বিষয়টি কতটুকু গুরুত্ব পায়?

আসলে এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় স্কুলপর্যায়ে টেকসই স্থাপত্যবিষয়ক গুরুত্ব তেমন দেওয়া হয়নি। স্কুলপর্যায় থেকেই আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আর্ট বা ড্রয়িংয়ে যতটুকু গুরুত্ব দেওয়া উচিত, তা হয়নি। অথচ যা ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আমাদের নিজেদেরই তৈরি করা পাঠ্যপুস্তকে টেকসই স্থাপত্যের সামগ্রিক দিক স্বল্প পরিসরে আছে। আমরা যারা শিক্ষকতায় আছি, দায়ভারটা আমাদের ওপরই পড়ে। একটি সুদূরপ্রসারী চিন্তা নিয়ে এবং গবেষণা করে বই ও পাঠ্যক্রম তৈরি করতে হবে, এ ব্যাপারে আসলে আমরা পিছিয়ে আছি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি বিষয়টি সমাধানে সচেষ্ট হতো, তাহলে অনেক উন্নতমানের এবং আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি প্রণয়ন করা যেত। 

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগ সম্পর্কে কিছু বলুন

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটিতে স্থাপত্য বিভাগের বয়স সাত বছরের কিছু বেশি। স্থাপত্য বিভাগকে ঘিরে এই ইউনিভার্সিটির বড় একটা মিশন রয়েছে। বাংলাদেশে যত স্থাপত্য বিভাগ আছে, তাদের থেকে আমাদের স্থাপত্য বিভাগ একটা দিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বলা যায়, এটা কিছুটা মানবিক বিষয়ও। প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী, যারা দেশের বিভিন্ন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এসেছে এবং যারা কিছুটা অসচ্ছল পরিবার থেকে আসে। ডিপ্লোমাধারীদের অনেকের আকাঙ্খা থাকে স্থাপত্যে ব্যাচেলর ডিগ্রি নিতে। সে স্থপতি হিসেবে চর্চা করতে চায় কিন্তু এদের কোনো পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির সুযোগ থাকে না।  একমাত্র আমরাই তাদের এই সুযোগটা  দিচ্ছি। কিন্তু আমরা ওসব শিক্ষার্থীকে সুযোগ করে দিচ্ছি, যা কোনো ইউনিভার্সিটি দিচ্ছে না। এসব ডিপ্লোমাধারীকে আমরা ভর্তি করাচ্ছি। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের যেমন ১০টি সেমিস্টার সম্পন্ন করতে হয়, এখানেও তা-ই। কোনো অগ্রাধিকার বা ছাড় কোনোটাই এরা পায় না। বিষয়টি হয়তো অনেকের মনেই প্রশ্নের জš§ দেয় কিন্তু আমার ক্রমেই মনে হচ্ছে এ ক্ষেত্রে আমরা তো ভুল করিইনি বরং একটা সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছি, ডিপ্লোমাধারীদের স্বপ্ন পূরণ করছি। এমনকি শেষ বর্ষে থিসিসের সময় আমরা ওদের আরও বেশি সময় দিয়ে ভবিষ্যৎ পেশার জন্য সুদক্ষ করে গড়ে তুলছি। সেদিক থেকে আমি মনে করি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অন্যদের তুলনায় অনেক এগিয়ে রয়েছে এবং অসাধ্য সাধনের মতো কাজ করছে। আমরা টিউশন ফি অনেক কম নিচ্ছি, যা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় কম এবং অনেকের কাছেই সহনীয়। তাদের আমরা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছি। বিশেষ করে আমরা শিক্ষকেরা তাদের জন্য অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করেছি। একবারে ওয়ান টু ওয়ান সিস্টেমে শেখানোর চেষ্টা করছি। তাই আমি মনে করি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের পজেটিভ দিক অনেক বেশি। পাশাপাশি কিছু নেগেটিভ দিকও আমাদের রয়েছে। আমাদের আর্থিক সমস্যা রয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিরা বিভাগটির ব্যাপারে খুবই আন্তরিক এবং সব ধরনের সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো আমরাও দক্ষ শিক্ষকের অভাব বোধ করছি। কিন্তু এখানেও কিছু পজেটিভ বিষয় রয়েছে। জুনিয়র শিক্ষকসহ সবাই অত্যন্ত পরিশ্রম ও আগ্রহ নিয়ে তাঁদের সেরাটা শিক্ষার্থীদের দিতে চেষ্টা করছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি বিভিন্ন স্বনামধন্য ইউনিভার্সিটি ঘুরে দেখেছি তাদের পরীক্ষাপদ্ধতি, একাডেমিক সেশন, জুরিÑএগুলোর মানের থেকে আমরা কোনো অংশে কম তা বলা যাবে না বরং কোনো কোনো অংশে বেশ ভালো। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের প্রথম ব্যাচের থিসিস জুরিতে স্থপতি সাইফুল হক, স্থপতি কাসেফ মাহবুব, স্থপতি এহসান খানসহ বাংলাদেশের খ্যাতনামা স্থপতি এবং শিক্ষককে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাঁরা আমাদের কাজের অত্যন্ত প্রশংসা করেছেন।

শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় কি? নিলে এ থেকে অর্জনই বা কী?

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। দেশীয় একটি কোম্পানির রজতজয়ন্তী উপলক্ষে জাতীয় একটি প্রতিযোগিতায় আমরা অংশ নিয়েছিলাম। যদিও আমরা খবরটা পাই অনেক পরে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা সেখানে অংশগ্রহণ করি এবং আমাদের একটি প্রকল্প দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। এ ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে অনেক শিক্ষার্থীই বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি চলতে পারছে?

অবশ্যই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একটু বেশিই সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে। বিশেষ করে তাদের রয়েছে সুপরিসর গবেষণাগার। একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নানা সুবিধা এবং ফান্ড নিয়ে গড়ে ওঠে কিন্তু সে ক্ষেত্রে বেসরকারিগুলো অনেকটাই সুবিধাবঞ্চিত। শিক্ষকসংকট, পর্যাপ্ত স্পেসসংকট ও টিউশন ফির একটা সংকট তো রয়েছেই। কিন্তু তারপরও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে নেই, এখনকার তরুণেরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়াই আন্তর্জাতিক পর্যায়ের টেকসই স্থাপত্যশিক্ষার পরিধির দিকে নজর রাখছে। তবে এ থেকে উত্তরণের জন্য অবশ্যই আমি বলব যে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট (আইএবি)-এর দায়িত্বপ্রাপ্তরা যদি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে একটু বাড়তি নজর দিতেন, তাহলে হয়তো বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতো।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা কি মাঠপর্যায়ে (ফিল্ড ওয়ার্ক) কাজ করার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে?

আমরা এখন পর্যন্ত পয়লা বৈশাখে বিভিন্ন কার্যনৈপূণ্য দেখিয়েছি। পয়লা বৈশাখে আমাদের ইউনিভার্সিটির চারপাশ দারুণ এক রূপ নেয়। আর এই কাজগুলো সম্পন্ন করে থাকে আমাদের ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া আমরা ষোলোই ডিসেম্বর, ছাব্বিশে মার্চ, একুশে ফেব্রুয়ারিসহ বিভিন্ন বিশেষ দিবস উপলক্ষে ফিল্ড ওয়ার্ক করে থাকি। এ ছাড়া রানা প্লাজাধসের ব্যাপারেও আমাদের শিক্ষার্থীরা বিশেষ রিসার্চ করেছে।

বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সঙ্গে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগের সমন্বয় কেমন?

ব্যক্তিগতভাবে যাঁরা বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের দায়িত্বে আছেন, তাঁরা আমাদের সঙ্গে খুবই সহায়ক ভূমিকায় আছেন। বিভিন্নভাবে তাঁরা আমাদের সাহায্য করে যাচ্ছেন। 

স্থাপত্যশিক্ষার উন্নয়নে সরকারের কাছে আপনাদের প্রস্তাবিত সুপারিশ ও দাবিসমূহ কী অবস্থায় রয়েছে?

যদি স্থাপত্যশিক্ষা ব্যবস্থায় প্লানিং আসপেক্টকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে দেশের কাঠামোগত দিকসহ বেটার প্লানিং এর একটা দেশ পাওয়া যাবে। সরকারের উচিত প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়া। টেকসই স্থাপত্য বিষয়টাকে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৬তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৪

মারুফ আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top