নিজের একটি স্থায়ী ঠিকানা কে না চায়! সেটা ছোট-বড় শহর-গ্রাম, প্লট বা ফ্ল্যাট যা কিছুই হোক না কেন। ভূমির মালিকানা যদি নিজের না থাকে তাহলে কেউ ওই সম্পত্তির পূর্ণ মালিকানা দাবি করতে পারে না। ক্রয়কৃত সম্পত্তির মালিকানা নিজের বলে তখনই দাবি করা যায় যখন তা যথাযথ রাষ্ট্রীয় আইন ও বিধান মেনে হস্তান্তরিত হয়। ক্রয় ছাড়াও সম্পত্তি মালিকের মৃত্যু, দান, ইজারা, রেহেন, খাসজমি বন্দোবস্ত, সরকারি অধিগ্রহণ, নিলাম বিক্রি, আদালতের ডিক্রি জারি, সিলিংয়ের অতিরিক্ত জমি ধারণ ইত্যাদি কারণে জমির মালিকানা পরিবর্তন হয়। হস্তান্তরিত জমির মালিকানা পরিবর্তিত হলে খতিয়ানে পুরোনো মালিকের নাম বাদ দিয়ে নতুন মালিকের নাম প্রতিস্থাপন করাতে হয়। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় নামজারি, যা ইংরেজিতে মিউটেশন নামেই বেশি পরিচিত। মিউটেশন না করানো হলে মালিকানা পূর্ণ দাবি করার ক্ষেত্রে তৈরি হয় নানা জটিলতা। তাই সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে মালিকানা পরিবর্তন একটি অবশ্যম্ভাবী প্রক্রিয়া।
মিউটেশনের আভিধানিক অর্থ হঠাৎ পরিবর্তন। খতিয়ান শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘হিসাব’। জমি হস্তান্তরিত হলে পুরোনো মালিকের নাম বাদ দিয়ে নতুন মালিকের নাম প্রতিস্থাপন করার সাধারণ প্রক্রিয়াই মিউটেশন। এ দেশের ভূমি আইনের খতিয়ান বলতে সাধারণভাবে স্বত্ব সংরক্ষণ ও রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে জরিপ বিভাগ কর্তৃক প্রতিটি মৌজার ভূমিমালিক বা মালিকগণের নাম, পিতার নাম অথবা স্বামীর নাম, পূর্ণ ঠিকানা এবং দাগ নম্বর, জমির পরিমাাণ, শ্রেণী এবং খাজনার পরিমাণ, জেলা, থানা, মৌজার নাম, জে.এল নম্বর, স্বত্ব তালিকা বা স্বত্বের রেকর্ড প্রস্তুত করা হয় এদের প্রতিটিকে খতিয়ান বলা হয়। একে স্বত্বের রেকর্ডও বলা হয়।
অন্য কথায়, এক বা একাধিক দাগের সম্পূর্ণ বা অংশিক পরিমাণ ভূমি নিয়ে এক বা একাধিক ব্যক্তির নামে সরকার বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ যে ভূমিস্বত্ব¡ প্রস্তুত করা হয় তাকেই ‘খতিয়ান’ বলে। প্রতিটি মৌজায় কয়টি খতিয়ান আছে, তা ওই স্বত্বের রেকর্ডে পাওয়া যায়। বিক্রয়, দান, বিনিময় ইত্যাদির মাধ্যমে এ ধরনের খতিয়ানভুক্ত জমি হস্তান্তর করা হলে ওই খতিয়ান থেকে হস্তান্তরিত জমির পরিমাণ ওই খতিয়ার থেকে বাদ দিয়ে গ্রহীতার নামে খতিয়ান খুলে তাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই প্রক্রিয়াকেই নামজারি বা মিউটেশন বলা হয়।
জমি সংক্রান্ত বিষয়ে নামজারি ও জমা খারিজের হিসেবে পরিচিত। জরিপের মাধ্যমে জমির খতিয়ান সৃষ্টি করা হয়। জরিপের সময় জমির মালিককে খসড়া একটি খতিয়ান দেওয়া হয়, যা মাঠ পর্যায়ে পর্চা নামে পরিচিত। মাঠ পর্চার ওপর আপিল আপত্তি শেষ হলে মৌজাওয়ারি বই আকারে বাঁধাই করে খতিয়ান প্রকাশ করা হয়। এই বইয়ের প্রতিটি পাতা একটি খতিয়ান। দুই জরিপের মধ্যে সাধারণত ২০-২৫ বছর অতিবাহিত হয়। এর মধ্যবর্তী সময়ে বেচাকেনা, মালিকের মৃত্যুসহ নানা কারণে মালিকানায় ব্যাপক পরিবর্তন হয়। ১৯৫০-এর ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়েল, ১৯৯০-এ আলোচনা করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ এর ১৪৩ ধারায় এবং ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়েল, ১৯৯০-এর ৩০৯ থেকে ৩৩২ নং অনুচ্ছেদ পর্যন্ত নামজারি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। যদিও মিউটেশন ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা আদায়ের লক্ষ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। তথাপি মিউটেশন মালিকানা প্রতিষ্ঠার একটি অংশ। জমির মালিকদের কর পরিশোধের জন্য তহসিল বা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের একটি অ্যাকাউন্ট নম্বর হিসেবে পরিচিত। একে হোল্ডিং বা জোত নম্বরও বলা হয়। মিউটেশনের মাধ্যমে ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের উদ্দেশ্যেই এই জোত নম্বর সৃষ্টি করা হয়। যখন কোনো জমি বিক্রি হয় তখন মিউটেশনের মাধ্যমে জরিপ খতিয়ান বা পূর্ববর্তী মিউটেশন খতিয়ানের সংশোধনী আনা হয়। নতুন সৃষ্ট এই খতিয়ানকে মিউটেশন খতিয়ান বলা হয়।
হস্তান্তরিত ভূমির প্রকৃত মালিক কে এবং যার কাছ থেকে খাজনা আদায় করা হবে, তার জন্য খতিয়ান বা রাইট অব রেকর্ড প্রস্তুত করা হয়। কাজেই নামজারি না করলে সরকারি রেকর্ডে আগের স্বত্বাধিকারীর নামই থেকে যাবে, ফলে হস্তান্তর গ্রহীতার নাম অজ্ঞাত থেকে যেতে বাধ্য। বিধায় অন্তর্বর্তীকালীন রেকর্ড পরিবর্তন, সংশোধন, হালনাগাদকরণের প্রক্রিয়াকে নামজারি বলে আখ্যায়িত করা হয়।
নামজারিকরণের ক্ষমতা
ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল ১৯৯০-এর ২০ অনুচ্ছেদ বলে নামজারির দায়িত্ব সহকারী ভূমি কমিশনার ওপর ন্যস্ত।
নামজারি বা মিউটেশন সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে-
১. মূল খতিয়ানে নাম কর্তন বা যোগ করে নামজারি করা এবং
২. কোনো খতিয়ানের কোনো অংশীদার বা নতুন মালিক খতিয়ান থেকে বের হয়ে বা খারিজ হয়ে স্বতন্ত্র খতিয়ান খুলতে চাইলে স্বতন্ত্রভাবে নামজারি করতে পারে।
নামজারি অনুমোদনের আগে যেসব বিষয় তদন্ত করা আবশ্যক-
- জমিটি সরকারি সম্পত্তি কি না;
- ব্যক্তিমালিকানাধীন হলে হস্তান্তর গ্রহীতা কী পরিমাণ জমির দখলপ্রাপ্ত হয়েছেন;
- বিক্রেতার ভূমি বিক্রয়ের অধিকার ছিল কি না;
- উত্তরাধিকার সূত্রে মালিক হয়ে থাকলে অন্য কোনো বৈধ উত্তরাধিকারীকে অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে কি না;
- নামজারিতে কারও কোনো আপত্তি আছে কি না;
- জমিটির ভূমি উন্নয়ন কর বকেয়া আছে কি না কিংবা অন্য কোনো ঋণ-দায়ে আবদ্ধ কি না;
- আবেদনকারীর পরিবারের মোট জমির পরিমাণ কত এবং বর্তমান প্রাপ্ত জমিটি যুক্ত হলে তা সিলিং অতিক্রম করবে কি না;
- ওই জমিটি অর্পিত বা পরিত্যক্ত বা খাসজমির তালিকাভুক্ত কি না
নামজারির কারণ
- রেজিস্ট্রি দলিলগুলো জমি হস্তান্তরের কারণে;
- ভূমির মালিকের মৃত্যুর কারণে;
- সরকার কর্তৃক খাসজমি বন্দোবস্তের কারণে;
- কবলা, উপহার ও উইলের ক্ষেত্রে;
- সমবায় সমিতির ক্ষেত্রে নামজারি;
- খাস খতিয়ানভুক্তকরণের ফলে;
- এল এ কেসের আওতায়;
- স্বত্ব মামলায় রায় ডিক্রির মূলে নামজারি;
- খাজনা অনাদায়ে জমি বিক্রি ও তৎসংশ্লিষ্ট নামজারি;
- নদী সিস্তির কারণে খাজনা মওকুফ করা হলে;
- সার্টিফিকেট মামলা ও কোর্টে মামলার মাধ্যমে কোনো জমি নিলাম খরিদ হলেও স্বত্বাধিকার ঘোষিত হলে নামজারির প্রয়োজন হয়।
নামজারির প্রকারভেদ
- ১. উত্তরাধিকার
- ২. বিক্রি
- ৩. নিলাম খরিদ
- ৪. বাজেয়াপ্ত
- ৫. হেবা
- ৬. দান
- ৭. দেবোত্তর (যিনি দায়িত্বে থাকেন তাকে সেবায়েত)
- ৮. ওয়াকফ
- ৯. উইল
- ১০. এওজ বদল
- ১১. ট্রাস্ট
- ১২. মোকাদ্দমার মাধ্যমে মালিকানা
- ১৩. জমি অধিগ্রহণ
- ১৪. খাসজমি বন্দোবস্ত ও বিক্রি
- ১৫. মালিকানাবিহীন জমি
- ১৬. জমা ও একত্রীকরণ ও পৃথকীকরণ
- ১৭. পয়স্থি (নদী বা সমুদ্র পার্শ্ববর্তী জমি পয়স্থি হলে বা নদীগর্ভে বিলীন হলে রেকর্ড সংশোধন করে খাস খতিয়ান নিতে হয়);
মিউটেশন প্রক্রিয়া
সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে নামজারির জন্য আবেদন করতে হয়। সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে মিউটেশন সহকারী পদের একজন দায়িত্বে থাকে। নাজির পদের একজন ফি জমা নেন। তহশিলদাররা (সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার) তদন্তের দায়িত্বে থাকে। কোনো আবেদন করা হলে এ নামজারি করা জমির ওপর তদন্ত করার নিয়ম আছে। অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে তহশিলদারের অফিসে নামজারির আবেদন করে থাকে। এটা ঠিক নয়। সব সময় মিউটেশন বা নামজারির জন্য আবেদন করতে হবে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে। মিউটেশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এর তদন্ত হয়। সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রথমেই মিউটেশন রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করে তহশিলদারের কাছে পাঠান। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত হয়। তদন্তে সাধারণত যাচাই করা হয় প্রস্তাবিত জমি দখলে আছে কি নেই। এটি খাসজমি কি না, সার্টিফিকেট মোকদ্দমা আছে কি না, অধিগ্রহণ করা হয়েছে কি না, সম্পত্তির মূল পরিমাণ ঠিক আছে কি না, আদালতের রায় বা ডিক্রিমূলে কি না, মামলা-মোকদ্দমা চলছে কি না প্রভৃতি।
এ তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) তা যাচাই-বাছাই করেন। প্রয়োজনে তিনি আবারও তদন্তে প্রেরণ করতে পারেন কিংবা নিজেও তদন্ত করতে পারেন। পরে যাবতীয় কাগজপত্র, দলিল মিলিয়ে মিউটেশনের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদন হলে খতিয়ান খোলা হয়। পক্ষগণ হাজির হতে হয় এবং শুনানিকালে যাবতীয় দলিল পরীক্ষা করা হয়। এর ভিত্তিতে আবেদন মঞ্জুর বা নামঞ্জুর হয়।
খতিয়ান খোলার পর নতুন নম্বর পড়ে। খতিয়ান তহশিল অফিসে পাঠায়। তহশিলদার রেজিস্টারে নতুন জোত খুলে ছক অনুযায়ী তথ্য লিপিবদ্ধ করেন। মালিকের নামে আগে থেকে জমি থাকলে জোত নম্বরও থাকে। তাই নতুন জোত খোলার দরকার হয় না। পুরোনো জোতে জমির দাগ ও খতিয়ান লিখে জমির পরিমাণ যোগ করে ভূমি উন্নয়ন কর হিসাব করা হয়। মোট পাঁচ কপি খতিয়ান করে এক কপি আবেদনকারীকে দেওয়া হয়। অন্যান্য কপি তহশিল অফিস, সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস, জেলা প্রশাসকের রেকর্ডরুম ও জেলা জজের রেকর্ডরুমে প্রেরণ করা হয়। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী মহানগরে ৬০ কার্যদিবসের অন্যান্য ক্ষেত্রে ৪৫ কর্মদিবসের মধ্যে নামজারি জমাভাগ নিষ্পত্তি করার নিয়ম করা হয়েছে।
আবেদন নামঞ্জুর হলে
যেকোনো কারণেই নামজারি আবেদন নামঞ্জুর হতে পারে। কোনো দলিল ত্রুটির কারণে হতে পারে, আবার অন্য কোনো উদ্দেশ্যেও নামঞ্জুর হতে পারে। কিন্তু আবেদন নামঞ্জুর হলে প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে। মিউটেশন নামঞ্জুর হলে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) আদেশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) কাছে আদেশের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হবে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ আছে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের (রাজস্ব) কাছে এবং তা করতে হয় আদেশের ৩০ দিনের মধ্যে। অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের (রাজস্ব) আদেশের বিরুদ্ধে ভূমি আপিল বোর্ডে আদেশের ৯০ দিনের মধ্যে আপিল করা যায়। তবে ক্ষেত্রবিশেষে দেওয়ানি আদালতেও মামলা করা যায়।
এ ছাড়া রিভিশনের পথও খোলা রয়েছে। রিভিউ মানে পুনর্বিবেচনা করা। দলিলপত্রে কোনো ভুল পর্যবেক্ষণ হয়েছে বলে মনে করলে কিংবা আবেদন বাতিল করলে রিভিউর আবেদন করতে হয়। যে কর্মকর্তা আদেশ দিয়েছেন, তাঁর বরাবরই রিভিউ করতে হবে। ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা তাঁর নিজের ইচ্ছায় নথি তলব করে সংশোধনের আদেশ দিতে পারেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ৩০ দিনের মধ্যে তাঁর অধীন কর্মকর্তাদের আদেশ সংশোধন করতে পারবেন। অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) তিন মাসের মধ্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) আবেদন সংশোধন করতে পারেন। ভূমি আপিল বোর্ড ছয় মাসের মধ্যে তাঁর অধীন কর্মকর্তার আদেশ সংশোধন করতে পারেন।
নামজারির গুরুত্ব
সম্পত্তি ক্রয় ও হস্তান্তরজনিত ব্যাপারে নামজারির গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে খতিয়ান সংশোধনে। রেকর্ড সংশোধনের নামজারির আবেদন মঞ্জুর করার যে আদেশ তা মালিকানার হালনাগাদ রেকর্ড। নামজারির মাধ্যমে জমির আগের জোতজমা থেকে খারিজ (কর্তন) হয়ে আবেদনকারীর নামে নতুন হোল্ডিং বা জোতের সৃষ্টি করে। না হলে আগের মালিকের নামেই থেকে যায়। এতে পূর্ব মালিক বিভিন্ন সুবিধা ও জালিয়াতির সুযোগ পান। নামজারির এই প্রক্রিয়াটি ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা আদায়ের লক্ষ্যেই প্রবর্তন করা হয়েছিল। ভূমি অফিসে ভূমি করের জন্য নতুন হিসাব নম্বরও খোলা হয় এরই মাধ্যমে। তাই জমি কেনার পরপরই অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে নামজারি করানো উচিত।
সতর্কতা
নামজারি করানোর সময় নির্ধারিত জমি পরিমাপ করা উচিত। অনেক সময় মালিক তার জমির নির্দিষ্ট পরিমাণ দলিলে থাকলেও অবস্থানের কিছুটা হেরফের থাকতেই পারে নানা কারণে। জমি পরিমাপ ও স্কেচম্যাপ করে তার সবকিছু সংরক্ষণ করা উচিত।
জমির দখল থাকা জমির মালিকানার একটি শর্তই বলা চলে। তবে বন্ধক দিলেও মালিকানা বজায়ের বিষয় থাকে। তাই মালিকানা দাবি করার জন্য দখল নেওয়াটা জরুরি।
কোনো বিক্রেতা কী পরিমাণ জমি বিক্রি করলেন, তা খতিয়ে দেখতে হবে। নামজারি করা জমিটি মূল দলিলের চেয়ে বেশি দেখানো হতে পারে। অর্পিত সম্পত্তির ক্ষেত্রে পুরোনো জাল দলিল সৃষ্টি করে নামজারি দাবি করতে পারে। কোনো জাল দলিলের ভিত্তিতে নামজারি করানো হচ্ছে কি না, সতর্ক থাকতে হবে।
আবেদন করার পর জমির সহশরিক এবং ক্রেতা-বিক্রেতাকে নোটিশ দেওয়া হয়। কোনো ধরনের অভিযাগ থাকলে তখন আপত্তি দিতে হয়। কিন্তু অনেক সময় নোটিশ যথাযথভাবে পৌঁছায় না কিংবা গায়েব করে ফেলা হয়। এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
নামজারির ক্ষেত্রে ভোগান্তি আর হয়রানির শেষ নেই। একটু সতর্ক থেকে নিজের অধিকারের প্রতি সচেতন থাকলে তা ঠেকানো সম্ভব। নামজারি করাতে নির্দিষ্ট ফি আছে। কিন্তু বাস্তবে খুশি করানোর বকশিশ তার চেয়ে বহুগুণ দিতে হয়। না হলে নথি ওঠে না ঠিকমতো। আবার দালালদের উৎপাতও কম নয়। এদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
নামজারিতে অনেক সময় দাগ নম্বর ভুল হতে পারে। এটি ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত হতে পারে। অনেক সময় সঠিক তদন্তের অভাবে দাগ নম্বর ভুল হয়। এ ক্ষেত্রে যদি মনে হয় যে কর্মকর্তা ইচ্ছে করে ভুল করেছে কিংবা কোনো প্রকার দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ উত্থাপন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এ নামজারিটি বাতিল চাইতে হবে এবং নতুন করে নামজারির জন্য আবেদন করতে হবে।
আবেদনকারীর করণীয়
জমি ক্রয়ের পর ক্রেতার সর্বপ্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ক্রয়কৃত জমি নিজ নামে নামজারি করে রেকর্ড সংশোধন করা, এ জন্য করণীয় হলো:
১. কোর্ট ফি দিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর অনুমোদন করা।
২. আবেদনের সঙ্গে জমির মালিকানাসংক্রান্ত রেকর্ডপত্র সংযুক্ত করতে হবে।
৩. নামজারির জন্য ন্যূনতম ৪৫ দিন সময় হাতে নিয়ে আবেদন করা।
৪. সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্তৃক নামজারির ওপর শুনানিকালে নিজ নামে হোন্ডিং নম্বর জেনে নেওয়া। জমির মূল কাগজপত্র নিয়ে হাজির হওয়া এবং শুনানিতে অংশ নেওয়া।
৫. আবেদন মঞ্জুর হলে ডিসিআর এবং সংশোধিত খতিয়ান সংগ্রহ করা।
প্রতিনিয়তই জমি, ফ্ল্যাট, প্লট ইত্যাদির কেনাবেচা চলছে। এসব কর্মকান্ড বায়নানামা, রেজিস্ট্রি ইত্যাদি কাজগুলো করা হলেও নামজারির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ যথাসময়ে সম্পন্ন করা হয় না। সাধারণত এটা হয়ে থাকে অবহেলায়, সময়ের অভাবে অথবা না জানার কারণে। আবার ভিন্ন চিত্রও দেখা যায়। ভূমি অফিসে একই জমি বারবার নামজারি ও জাল দলিলের মাধ্যমে নামজারির অহরহ ঘটনা ঘটছে। ভূমি অফিসে জাল দলিলের মাধ্যমে ভূমি নামজারি করায় হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ ভূমির মালিকেরা। এখানের অফিস কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সহায়তায় জাল দলিলের মাধ্যমে নামজারি, দ্বৈত নামজারিসহ বিভিন্ন ভূমিসংক্রান্ত অপকর্ম ঘটছে। যদিও ভূমিব্যবস্থাপনা ডিজিটালাইজ হওয়ার পর এই সমস্যাটি অনেকটাই কমেছে তবুও খুব সাবধানে ও সতর্কতার সঙ্গে নামজারির কাজটি সম্পন্ন করতে হবে। কারণ, নিজের কেনা সম্পত্তির মূল্য কতটা তা একমাত্র আপনি ছাড়া আর কেই বা বুঝবে।
গাজী সালাউদ্দিন মোহাম্মদ
শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ল কলেজ
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫২ তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৪