আজীজ খান রেসিডেন্স: স্থপতি নাহাস খলিলের অনিন্দ্য সৃষ্টিকর্ম

সালটা ১৯৯০। এ সময়ে নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন স্থপতি নাহাস খলিল। দায় তখন পরিবর্তিত স্থাপত্যরীতির সঙ্গে মাটি আর প্রকৃতির সহাবস্থান নিশ্চিত করা। যদিও কাজটি অনেক কঠিন। ভিনদেশি স্থপতিরা এ কাজ করতে গিয়ে পদে পদে হয়েছেন বাধার সম্মুখীন। যখন প্রেক্ষিত  বাংলাদেশ; দৃশ্যপট কিন্তু একেবারেই ভিন্ন। এ সময়টায় রাজউকের নিয়মনীতির বালাই ছিল না বললেই চলে। নিয়মনীতির ফাঁকফোকর গলিয়ে এ সময়ে স্থাপত্যশিল্পের অবস্থান নড়বড়ে করেছিল অনেক রাজমিস্ত্রি। এমন এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে হাল ধরলেন স্থপতি নাহাস খলিল। দৃশ্যমান এ  চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখেই ইট-কংক্রিটের এ নগরে স্থাপন করলেন নতুন স্থাপত্যকর্ম। নাম যার আজীজ খান রেসিডেন্স।

আমাদের দেশে শহুরে ভাবধারা খুব একটা যে গ্রামীণ পটভূমিকে প্রশ্রয় দেয়, তা কিন্তু নয়। একজন শিল্পীকে এই শহরে থেকেই ইট-কাঠ ব্যবহারে গ্রামের শান্ত-স্নিগ্ধ রূপ ফুটিয়ে তুলতে হয়। স্থপতি নাহাস খলিলের প্রজ্ঞাবান স্থাপত্যজ্ঞান স্থাপনাটির মাঝে এনেছে নান্দনিক এক রূপ। ঢাকা শহরের ছায়াঘেরা অঞ্চলের মধ্যে ক্যান্টনমেন্ট সুপরিচিত। সেখানে এখনো গড়ে ওঠেনি ঢাকা শহরের ঘিঞ্জি পরিবেশ। আর এখানেই সনাতন গ্রামীণ আবহ সৃষ্টি করে স্থপতি পরিচয় দিয়েছেন নিজস্ব  স্থাপত্যশৈলীর।

পুরো জায়গার শতকরা ৬০ ভাগেরও বেশি জায়গা খালি রেখেছেন স্থপতি, যা চলে আসছে সেই নব্বইয়ের দশক থেকে। বিভিন্ন ধরনের গাছগাছালিসমৃদ্ধ সাইটে স্থপতির ইচ্ছে ছিল খুব কম গাছ কেটে স্থাপনাটি তৈরি করা, যাতে জীববৈচিত্র্যে কোনো ধরনের বিরূপ প্রভাব স্থাপনাটিতে না পড়ে। এ ক্ষেত্রে গৃহের বাসিন্দাদের মনোভাবের সঙ্গে সঙ্গে স্থপতির সুন্দর স্থাপনা তৈরির প্রয়াস ছিল লক্ষণীয়।

বাড়ির ভেতর আধুনিক উঠান

পুরো বাড়িটিই যেন একটি এন্ট্রেস। একটিই প্রবেশমুখ থেকে ঢুকে গাড়ি একটি সেমি শেডেড এলাকা দিয়ে ঢুকে গেছে ভেতরে। যদিও এই এন্ট্রি রাখতে গিয়ে বেশ খানিকটা সবুজ জায়গা নষ্ট হয়েছে। তবে স্থপতি সেটা পুষিয়ে দিয়েছেন বাইরে সবুজ এলাকা স্থাপনের মাধ্যমে।

বাড়িটিতে ঢুকেই রয়েছে একটি ফয়ার। এখানে একটি ছোট্ট সোফায় জুতো খুলে বাসিন্দারা প্রবেশ করতে পারবেন মূল স্থাপনায়। সোজা কথায় একটি ফরমাল লিভিং। ডান পাশে আছে একটি প্রাইভেট লিভিং এরিয়া আর বামে একটি রিডিংরুম। আর ফরমাল লিভিংয়ের পাশ দিয়ে উঠে গেছে একটি সিঁড়ি, যার সাহায্যে যাওয়া যায় বাড়িটির দোতলায়। পুরো স্থাপনাটির ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনে স্পেস একটি লক্ষণীয় বিষয়। স্টেপ আপ-ডাউনের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে স্পেসের সীমানা। ব্রিটিশ কলোনিয়াল স্থাপনাগুলোতে এ রকম ডিজাইন খুব একটা দেখা যায় না। আবার দেশীয় স্থাপনাগুলোর মধ্যে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে মাটির বাড়িতে এটা বেশ লক্ষণীয়। সাধারণ কাছারিঘর থেকে বৈঠকখানায় প্রবেশে দুটো স্টেপ বা শোবার ঘর থেকে অন্য যেকোনো ঘরে যেতে হলে দুটো স্টেপ লাগে। গ্রাম-বাংলার মানুষ এভাবেই প্রাচীনকাল থেকে বাস করে আসছে। স্থপতি তাঁর স্থাপত্যকর্মকে এখানে এমনিভাবে সুসংবদ্ধ করেছেন। প্রবেশের পথে প্রথমেই সেমি শেডেড এরিয়া রোড লেভেল থেকে ১’-১০” উচ্চতায় মনে হলেও মূল বাড়িতে প্রবেশ করতেই সেটা হয়ে গেল ২’-২”। আর ফরমাল লিভিং এরিয়ায় এটির উচ্চতা ৩’-২”। কিন্তু প্রাইভেট লিভিং এরিয়া ঠিক আগের মতোই ২’-২”, যেটা একটি বিশাল এলাকাজুড়ে অবস্থিত। আর এর পাশেই একটি ছোট্ট ডোরওয়ে, যা মূল ডাইনিং এরিয়াসংলগ্ন উচ্চতায় ৩’-২”। আর পাশেই রান্নাঘর, যার সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে যে কেউ মুগ্ধ হবেন ওঠানটা দেখে। সুন্দর ছিমছাম সেই ওঠানের বাম পাশেই গ্যারেজ। কিন্তু খাওয়ার ঘর, বসার ঘর এমনকি রান্নাঘর থেকেও ওঠানটা দেখা যায় অবলীলায়। নিচতলাতেই একটি ছোট্ট অতিথিশালা। কিন্তু থাকার মূল ব্যবস্থা ওপরতলায়।

বাড়িটির ঊর্ধ্বচিত্র (প্ল্যান)

ওপরতলায় গিয়েই প্রথমে চোখ আটকে যায় বড় ফ্যামিলি লিভিং স্পেসে। এর পাশেই সুদৃশ্য টেরেস। এতে উঠলেই দেখা যায় আশপাশেই সুন্দর সব গাছগাছালি। এখানে রয়েছে মাস্টার বেডরুম, একটা কুইন বেডরুম ও দুটো চাইল্ড বেডরুম। বেডরুমগুলোর প্রতিটির সঙ্গে রয়েছে সুদৃশ্য সব টয়লেট এবং প্রতিটিতেই আছে সুন্দর ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা।

বাড়ির সম্মুখভাগ

স্থপতি বাড়িটির ভেতর ও বাইরে এমন সব বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করেছেন, যা বাড়িটিতে বসবাসে পরিপক্বতার প্রমাণ দেয়। একটি ছোট্ট কোর্টিয়ার্ড বা ওঠান, যার চারপাশে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন আকারের ঘর যা নান্দনিকতার উৎকর্ষে অনন্য। প্রতিটি ঘরের সঙ্গে আছে দুইমুখী ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা। নাগরিক জীবনের দৈনন্দিন অনুষঙ্গ হিসেবে এয়ারকন্ডিশন ব্যবহার করাটা একধরনের ফ্যাশন হওয়ায় এই বাড়ির গায়ে যুক্ত হয়েছে অনেক এয়ারকন্ডিশন। কিন্তু বাড়িটির ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা এমন যে এখানে গরমের দিনে কোনোভাবেই তাপমাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায় না। বাড়ির স্ট্রাকচার সিস্টেম মূলত ওয়াল স্লাব হলেও মাঝে মাঝেই স্থপতি স্থাপনার প্রয়োজনেই কলাম বসিয়েছেন। ফলে পুরো বাড়িটির স্ট্রাকচালার সিস্টেমে অপূর্ব এক সমন্বয় ঘটেছে। প্রতিটি দরজা ও জানালায় স্থপতি সুইং দরজা ও জানালা ব্যবহার করেছেন। কেননা সেই সময়ে স্লাইডিং দরজা ও জানালাগুলো পুরোপুরি খুলে দিতে চাইলেও খুলে দেওয়া যেত না। অর্ধেক থাকত সব সময়। কাঠের সুপরিকল্পিত ব্যবহার এবং দরজা ও জানালায় কাঠ ও কাচের সংমিশ্রণ ঘটেছে স্থাপনার নান্দনিকতার প্রয়োজনেই। স্থপতির মননশীলতাই হোক বা চেতনা বাস্তবায়নের কারণেই হোক এই স্থাপত্যকর্ম হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ-উত্তর নব্বইয়ের দশকের শ্রেষ্ঠ আবাসিক স্থাপনা এ কথা বলাইবাহুল্য। 

প্রকাশকাল: বন্ধন ৪১ তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৩

+ posts
Scroll to Top