ওয়াটারওয়ে প্রকল্পকে জনপ্রিয় করতে কমাতে হবে ভাড়া, বাড়াতে হবে ওয়াটারবাসের সংখ্যা’
অধ্যাপক ড. সাব্বির মোস্তফা
প্রধান, পানিসম্পদ কৌশল বিভাগ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
ঢাকার ওয়াটারওয়ে সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. সাব্বির মোস্তফা বলেন, যেকোনো বড় শহরে যত বেশি পরিবহনব্যবস্থা থাকবে, তত বেশি সুবিধা পাবে নগরবাসী। ঢাকার চারপাশে রয়েছে নদী। এটি আমাদের বাড়তি পাওনা। নদীপথে পরিবহন যেহেতু আরামদায়ক ও পরিবেশবান্ধব, সেহেতু আমি মনে করি এটিকে যদি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা যায়, তবে তা আরও সুন্দর হবে। তবে ঢাকা শহরের জন্য ওয়াটারওয়ে দিয়ে পরিবহনব্যবস্থা চালু করা এই মুহূর্তে যুক্তিসংগত নয়। তবে নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এটি সুফল বয়ে আনবে। নদী তীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী জনসাধারণের জন্য অন্য কোনো নদী তীরবর্তী এলাকায় পৌঁছানো সহজ হবে। আর ঢাকা শহরের এই যানজট পেরিয়ে নদীর তীরে এসে ওয়াটারবাসে উঠে গন্তব্যে গিয়ে আবারও বাসে উঠে কেউ বাড়িতে পৌঁছানোর কথা চিন্তা করবে না। বাসে যাতায়াত করলে আপনি আপনার কাংক্ষিত স্থানের নিকটে পৌঁছে যাচ্ছেন সহজেই।যেটি ওয়াটারবাসের মাধ্যমে করতে গেলে পড়তে হবে ভোগান্তিতে। আর ওয়াটারওয়ে প্রকল্পকে জনপ্রিয় করতে কমাতে হবে ভাড়া, বাড়াতে হবে ওয়াটারবাসের সংখ্যা। কোটির ওপরে জনসংখ্যার এই শহরে ওয়াটারবাস প্রকল্প খুব একটা সফল হবে বলে আমার মনে হয় না। আর সব সমস্যার সমাধান না করে এই প্রকল্পের কাছে ভালো কিছু আশা করাও ঠিক নয়।
আমাদের দেশে ওয়াটারওয়ে করার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? ঢাকার ওয়াটারওয়ের খারাপ দিক বা অসুবিধা কী কী, ঢাকায় নামানো ওয়াটারবাসে যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে? ঢাকার ওয়াটারওয়ে একটি সার্থক প্রজেক্টে রূপ দিতে কী কী করা উচিত? এসব নিয়ে আরও জানব বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পানিসম্পদ প্রকৌশল বিভাগের চার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে। তাঁরা ডব্লিউআরই ফোরামের নিয়মিত লেখক হিসেবে কাজ করছেন। তাঁরা হলেন তারিক হাসান, সোয়েলেম আফনান ইহাম, আজবীনা রহমান ও আহম্মেদ জুলফিকার রহমান।
যানজট নিরসনে ওয়াটারওয়ে একটি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পদক্ষেপ। ঢাকা ওয়াটারওয়ে একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ বলা যায়, প্রয়োজন শুধু এটা ব্যবহারে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা। ঢাকা ওয়াটারওয়েতে নৌযানের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নৌচলাচলে আরও বেশি সময়োপযোগী বিধিমালা প্রণয়ন করা উচিত। এর মাধ্যমে দুর্ঘটনার আশঙ্কা হ্রাস করা এবং সেবার মান বাড়ানো ও নিশ্চিত করা সম্ভব। ইতিমধ্যে যাত্রীদের মধ্যে সদরঘাট-আমিনবাজার রুটে ওয়াটারবাসের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। মাইকিং করে আরও বেশি যাত্রীদের ওয়াটারবাস ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। যাত্রীদের আরও বেশি নিরাপদভাবে এবং যথাসময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে ওয়াটারবাসের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অবহিত করা যেতে পারে।
তারিক হাসান
গাবতলীর আমিনবাজার থেকে সদরঘাট সড়কপথে যেতে ক্ষেত্রবিশেষে তিন ঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন হয়, সেখানে ওয়াটারবাস এই দূরত্ব পাড়ি দেবে সর্বোচ্চ ৪০ মিনিটে। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে ঢাকায়ও নদী আর খালগুলোকে নগরের অভ্যন্তরীণ পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে চমৎকারভাবে যুক্ত করা যেত। তাই দেরিতে হলেও ওয়াটারওয়ের মতো উদ্যোগ নগরের সড়ক পরিবহনব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করবে। ওয়াটারওয়ের একটি সমস্যা হচ্ছে রক্ষণাবেক্ষণ। নিয়মিত জলযান চলাচলের জন্য চ্যানেলের নাব্যতা বজায় রাখাটা বেশ ব্যয়সাপেক্ষ ব্যাপার, বিশেষত বাংলাদেশের নদীগুলোর ক্ষেত্রে সমস্যাটা বেশি। তবে এতটুকু খরচ করা গেলে যাত্রীদের জন্য অত্যন্ত উপকারী হতে পারে ওয়াটারওয়ে। বাংলাদেশে যেকোনো প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ যথাযথ তত্ত্বাবধানের অভাব। এর আগে আরও দুইবার ওয়াটারবাস চালুর উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে শুধু সরকারি তত্ত্বাবধানের অভাবে। তাই সার্থকভাবে প্রকল্পটি চালু রাখার জন্য প্রকল্পটি নজরদারিতে রাখার বিকল্প নেই। ওয়াটারওয়ে যেহেতু নগরের অভ্যন্তরীণ পরিবহনব্যবস্থা এবং মানুষ দৈনন্দিন প্রয়োজনে এটি ব্যবহার করবে, তাই যাত্রীসেবা উন্নত করাই এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির মূল উপায়। ল্যান্ডিংস্টেশনের সংখ্যা বাড়ানো, যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী ল্যান্ডিংস্টেশন নির্মাণ, ল্যান্ডিংস্টেশন পর্যন্ত পর্যাপ্ত রাস্তা নির্মাণ, রুটের সংখ্যা বৃদ্ধি ইত্যাদি পদক্ষেপ ওয়াটারবাসের প্রতি যাত্রীদের আকৃষ্ট করবে।
সোয়েলেম আফনান ইহাম
ঢাকার ওয়াটারওয়ের প্রধান অসুবিধা হলো উপযুক্ত ল্যান্ডিংস্টেশনের অভাব। এ ছাড়া ল্যান্ডিংস্টেশন থেকে বাসস্টেশনের দূরত্ব বেশি এবং ল্যান্ডিংস্টেশনের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় ওয়াটারওয়ে ব্যবহারে মানুষ আগ্রহী হয় না। ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকার খাল ভরাট কার্যক্রমও ওয়াটারওয়ের জন্য বাধাস্বরূপ। আরেকটি অসুবিধা হচ্ছে ওয়টারওয়েতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ওয়াটারবাসের অপ্রতুলতা। আগে যখন ওয়াটারওয়ে চালু করা হয়েছিল তখন অনেক যাত্রী কাউন্টারে গিয়ে লোক না পেয়ে ফেরত চলে আসে। তাই এ ব্যবস্থাকে কার্যকরী করার জন্য পরিচালনার দিকেও নজর দেওয়া উচিত। সেই সঙ্গে ওয়াটারবাসের সংখ্যাও যাতে যথাযথ থাকে। সরকারি পর্যায়ে যথাযথ বিজ্ঞপ্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ওয়াটারবাসের কাউন্টারগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করা যেতে পারে এবং বর্তমান বাস স্টপেজগুলোতে ওয়াটারবাস ব্যবহারের সুবিধা সম্পর্কে বিজ্ঞাপন দেওয়া যেতে পারে। রেডিও ও টেলিভিশন এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে প্রচারের মাধ্যমে একে জনপ্রিয় করে তোলা যেতে পারে।
আজবীনা রহমান
এই প্রকল্পটি হাতে নেওয়ার পেছনে প্রধান কারণ ঢাকার যানজট নিরসন, জলপথের ব্যবহার উজ্জীবিত করা ও বাণিজ্যের কাজে বা মালামাল বা কার্গো বহনের কাজে জলপথের ব্যবহার বৃদ্ধি করা, পরিবেশের অবস্থার উন্নতি, নদীগুলোর নাব্যতা বৃদ্ধি করা, পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন ও পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। আর এই সবই সম্ভব। আমি আশাবাদী সরকার যে কাজ হাতে নিয়েছে তা সফল হবে। যদি আরও একটু সচেতন হয়ে কাজটি সমাধান করে।
আহম্মেদ জুলফিকার রহমান
ওয়াটারওয়ের ওয়াটারবাস
বিশ্বের নানা দেশে চালু রয়েছে ওয়াটারওয়েকেন্দ্রিক ওয়াটারবাস। বছর দুয়েক আগে বাংলাদেশের ওয়াটারওয়ে ধরে চলতে শুরু করেছে ওয়াটারবাস। যাত্রার শুরুর পর থেকেই নানা বাধা পেরিয়ে আবারও চালু হয়েছে ওয়াটারওয়ে প্রকল্পের একটি অংশ ‘ওয়াটারবাস প্রকল্প’। ওয়াটারওয়ে ও ওয়াটারবাস প্রকল্পের সমস্যা, সম্ভাবনা আর ভবিষ্যৎ মূল রচনার এবারের বিবেচ্য।
সার্কুলার ওয়াটারওয়ে
ঢাকা শহরের চারদিকে রয়েছে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী নদী। আরও রয়েছে টঙ্গী খাল, যেগুলো অনেকটাই বৃত্তের মতো পুরো ঢাকা শহরকে ঘিরে রেখেছে। কিন্তু প্রতিনিয়ত শিল্পকারখানা থেকে বর্জ্য পদার্থ নিঃসরণের ফলে দূষিত হচ্ছে এই নদীগুলো। মাটি খননের কাজ নিয়মিত না করার ফলে দিন দিন নাব্যতা হারাচ্ছে নদীগুলো। ফলে একসময়ে মানুষের যাতায়াত ও বাণিজ্যের অন্যতম জনপ্রিয় ও সহজলভ্য মাধ্যম হিসেবে পরিচিত জলপথ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এই বৃত্তাকার নদীর বেষ্টনী, কালের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়ার দশায় এসে দাঁড়িয়েছে। এখন জলপথ ছেড়ে মানুষ স্থলপথে আগ্রহী হয়েছে ও এর ব্যবহারও বেড়েছে অনেক। দিন দিন বাড়তে থাকা জনসংখ্যার বর্ধিত চাহিদা মেটাতে বেড়েই চলেছে যানবাহনের পরিমাণ। বেড়েছে অসহনীয় ট্র্যাফিক জ্যাম। আর তাই ট্র্যাফিক জ্যাম বা যানজটের সমস্যা থেকে ঢাকাবাসীকে মুক্তি দিতে বিকল্প চিন্তাভাবনার অংশ হিসেবে ঢাকার ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ)-এ ঢাকার চারপাশের নদীবেষ্টনকে নতুন করে উজ্জীবিত করে পুনরায় জলপথ হিসেবে ব্যবহার করার প্রস্তাবনা পেশ করা হয়। পরবর্তী সময়ে এটি একটি প্রকল্প আকারে যাত্রা শুরু করে। প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয়, ঢাকা সার্কুলার ওয়াটারওয়ে।
শহর উন্নয়নে ওয়াটারওয়ে
এই প্রকল্প পরিকল্পনার ভিত্তিই আসলে গড়ে উঠেছে ঢাকা শহরের অন্যতম প্রধান সমস্যা যানজট নিরসনের কথা চিন্তা করে। ঢাকা শহরের যানজট সমস্যায় ভুক্তভোগী মানুষদের একটি বিকল্প সমাধান দেওয়াই ছিল এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। সে বিবেচনায় এই প্রকল্পের সফলতা ঢাকা শহরের উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। যানজটের সমস্যা অনেক কমে আসবে, জলপথে যাতায়াতে পুনরায় মানুষ অভ্যস্ত হবে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হবে, বেকার সমস্যা কমবে, ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ)-এর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে। সর্বোপরি, অর্থনৈতিক উন্নয়নেও অবদান রাখবে এই প্রকল্প। এ বিষয়ে বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, এ ধরনের প্রকল্প বিশ্বের বিভিন্ন শহরে রয়েছে। ভেনিসের সঙ্গে আমাদের ওয়াটারওয়ে তুলনা করা যায়। তারা এটিকে অনেক আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তুলেছে। আমরাও করতে পারি। সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে যদি কাজ এগিয়ে যায় তবে বলা যায় ওয়াটারওয়ে প্রকল্প এই শহরের মানুষের জন্য সুখকর হবে। আমাদের নদীগুলোতে নব্যতার সংকট রয়েছে, সেটা ঠিক করতে হবে। সাবস্টেশনগুলোকে উন্নত করতে হবে আর লিংক রোডের আধুনিকায়ন করতে হবে।
যে কারণে এই ওয়াটারওয়ে
ওয়াটারওয়ে করার বেশ কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রধানত ঢাকার যানজটকে সামনে রেখে কাজ শুরু করা হয়েছে। কেন এ ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এমন এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও পানিসম্পদ কৌশল ফোরামের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আহম্মেদ জুলফিকার রহমান বলেন, বেশ কিছু কারণ রয়েছে। যেমন-
ঢাকার যানজট নিরসন
- জলপথের ব্যবহার উজ্জীবিত করা
- বাণিজ্যের কাজে বা মালামাল বা কার্গো বহনের কাজে জলপথের ব্যবহার বাড়ানো
- পরিবেশগত অবস্থার উন্নয়ন
- নদীগুলোর নাব্যতা বৃদ্ধিকরণ
- পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
ওয়াটারওয়ের শুরুর কথা
প্রাথমিক পরিকল্পনায় পুরো প্রকল্পকে দুইভাগে ভাগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। যার মধ্যে প্রথম ভাগে প্রস্তাব করা হয় ঢাকার পশ্চিম ভাগের সদরঘাট থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত মোট ২৯ দশমিক ৫ কিমি ও দ্বিতীয় ভাগে ঢাকার পূর্বভাগের টঙ্গী থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত মোট ৪০.৫ কিমি জলপথ উন্নয়নের কাজ। কাজের দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন অথরিটি, এলজিইডি ও ঢাকা সিটি করপোরেশন। প্রথম ভাগের কাজ শুরু হয় ২০০০ সালের দিকে, কাজ শেষ হয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক উদ্বোধন করা হয় ২০০৫ সালের মার্চে। প্রথম ভাগে প্রায় ১৬.৪৮ লাখ কিউবিক মিটার মাটি ড্রেজিং করা হয়, চারটি প্রধান ল্যান্ডিংস্টেশন (সদরঘাট, সোয়ারিঘাট, খোলামুরা এবং গাবতলী) ও আটটি মাইনর ল্যান্ডিংস্টেশন (বসিলা, সিন্নিরটেক, বিরুলিয়া, আশুলিয়া ইত্যাদি) স্থাপন করা হয়। দ্বিতীয় ভাগে আরও নয়টি প্রধান ল্যান্ডিংস্টেশন (টঙ্গী, হারবিদ, ত্রিমুখ, ইশাপুর, ডেমরা, কাঁচপুর, কায়েতপাড়া ইত্যাদি) স্থাপনের পরিকল্পনা রাখা হয়। দ্বিতীয় ভাগের কাজ শুরু হয়, ২০০৮ সালে। ২০১২ সালের জুনের দিকে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মূলত প্রয়োজনীয়সংখ্যক ড্রেজার না পাওয়ায় প্রকল্প সমাপ্তির শেষ সময় এক বছর বাড়িয়ে জুন, ২০১৩-তে আনা হয়। জুনে শেষ হয় এই প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কাজ। আবারও নতুন করে চালু হয়েছে ওয়াটারবাস।
ওয়াটারওয়ে বাস্তবায়নের সুবিধা
যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন হলে তা সবাই প্রত্যক্ষ করে। আর তার সুবিধা পায় জনগণ। এই প্রকল্পটি যেহেতু শহরের নানা দিক বিবেচনা করে করা হয়েছে, সেহেতু বলা যায় এ প্রকল্পের অনেক সুবিধা পাবে জনগণ। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে
- মানুষ তার যাতায়াত ব্যবস্থার বিকল্প খুঁজে পাবে
- যানজটের হাত থেকে রেহাই পাবে
- সময়ের অপচয় কমাবে
- ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে
- দূষণ কমাতে ও সচেতনতাও বৃদ্ধি করবে।
কতটা সম্ভব ওয়াটারওয়ে বাস্তবায়ন
এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে কথা হয়, বুয়েটের পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের বেশ কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে। তাঁরা মনে করেন, ওয়াটারওয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন অবশ্যই সম্ভব। এর সুফল পেতে হলে আমাদের অনেক দিক মাথায় নিয়ে কাজ করতে হবে। শুধু পানি পথ ঠিক করে একটি শহরের ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমে ওয়াটারবাস প্রকল্প সুন্দরভাবে পরিচালনা সম্ভব না। ওয়াটারওয়ে প্রকল্পের যে প্রধান সমস্যাগুলো রয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে তাদের মতামত-
নদীতে উপযুক্ত নাব্যতা না থাকা
- নাব্যতা বাড়ানোর কাজে প্রয়োজনীয় ড্রেজারের জোগান না দেওয়া
- প্রায় ১৪টি ব্রিজের নিচ দিয়ে যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা না থাকা, বিশেষ করে যখন পানির উচ্চতা বেশি থাকে
- পর্যাপ্ত ল্যান্ডিংস্টেশন না থাকা
- আর থাকলেও সেগুলোর যথাযথ ব্যবস্থাপনা বজায় না রাখা
- ল্যান্ডিংস্টেশন থেকে প্রধান স্থলপথের লিংক রাস্তা না করা
- মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করার অভাব রয়েছে
- ওয়াটারবাসের সংখ্যা না বাড়ানো
- অপেক্ষাকৃত কম গতির ওয়াটারবাসের প্রচলন
- সিটের সংখ্যা কম ও সর্বোপরি নদীদূষণ ও তা থেকে হওয়া দুর্গন্ধ।
- এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারলে অবশ্যই এই প্রকল্প আশার আলো দেখবে।
প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা
২০০৮ সালে দ্বিতীয় ভাগের কাজ শুরুর পর পর্যাপ্ত ড্রেজারের অভাব কাজে ধীরগতি বয়ে আনে। বিআইডব্লিটিএতে থাকা ১০টি ড্রেজারই একসঙ্গে পাওয়া যাবে বিবেচনা করে কাজ সমাপ্তির সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয় ২০১২ সালের জুনে। কিন্তু ১০টির মধ্যে ড্রেজার পাওয়া যায় মাত্র চারটি। তাই কাজ শেষের সময়ও পিছিয়ে যায়। ২০১৩ সালের জুনে আপাতত দৃষ্টিতে সব কাজ শেষ হয়েছে। ওয়াটারবাস উদ্বোধন করা হয়েছে আবারও। শেষ হওয়া কাজের মধ্যে ছিল প্রায় ৪০ কিলোমিটার ড্রেজিং, ১১টি নতুন ল্যান্ডিংস্টেশনের সংস্কারকাজ, প্রায় ৭৫ সিটের নতুন চারটি ওয়াটারবাস নামানোর কাজ ও সঙ্গে পুরোনো দুটির সংস্কারকাজ, কম উচ্চতার ব্রিজগুলোর কয়েকটির সংস্কারকাজ। সবগুলো কাজ শেষ করতে না পারলেও বাস চালু করার মতো কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছিল সরকার।
তবে এবার ওয়াটারবাস প্রকল্প সফল হবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ভালো সেবা পেতে হলে ভাড়া একটু বেশিই দিতে হয়। তবে যাত্রীদের সুবিধার জন্য ভাড়া কমানো হচ্ছে। তা ছাড়া রাজধানীর যানজট নিরসনে এবং নৌপথকে নিরাপদ ও গণমুখী করতে বুড়িগঙ্গাসহ দেশের ৫৩টি নৌরুট খননের পরিকল্পনা করেছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। নৌপথ খননে কমপক্ষে ৫০টি ড্রেজার দরকার। সরকারের কাছে আছে মাত্র চারটি ড্রেজার। বেসরকারি পর্যায়ে আরও চারটি ড্রেজার সংযুক্ত হয়েছে। সরকার ১৭টি ড্রেজার কেনার সিদ্ধান্তও নিয়েছে। সরকারের পাশাপাশি নদীখননে এগিয়ে আসতে হবে বেসরকারি সংস্থাসমূহকেও।
বিআইডব্লিউটিসির ভূমিকা
সার্কুলার ওয়াটারওয়ের পুরো কাজের শুরু থেকেই দায়িত্বে ছিল মূলত বিআইডব্লিউটিএ, ঢাকা সিটি করপোরেশন ও এলজিইডি। পরবর্তী সময়ে ওয়াটারবাস প্রকল্প শুরুর থেকে যোগ দেয় বিআইডব্লিউটিসি। যদিও ওয়াটারবাস প্রকল্প শুরুর কিছুদিনের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়, তবুও বিআইডব্লিউটিসি পুনরায় ওয়াটারবাস প্রকল্প চালু করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখন ঢাকার নদীতে আবারও চলছে ওয়াটারবাস। সমস্যা ও সংকট কাটিয়ে আবারও পুনরায় যাত্রা শুরুর বিষয়ে কথা হয় প্রকল্প চেয়ারম্যানের সঙ্গে। তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে যেসব সমস্যা আমাদের সামনে এসেছে, সেগুলোকে আমরা চিহ্নিত করেছি এবং সেই সমস্যাগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান করেছি। এখন ওয়াটারওয়ে ওয়াটারবাস চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তবে আরও কিছু কাজ বাকি রয়েছে। এই বাকি কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারলে, জনসাধারণের মধ্যে ওয়াটারবাসের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে বলে আমি বিশ্বাস করি। সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। আশা করছি খুব তাড়াতাড়ি জনগণ ওয়াটারওয়ের সুফল ভোগ করবে।
ওয়াটারবাস প্রকল্প শুরু, বাধা ও বাস্তবায়ন
সার্কুলার ওয়াটারওয়ে প্রকল্পকে সফল করার অন্যতম অংশ হলো এই ওয়াটারবাস প্রকল্প। যানজট নিরসনে জলপথে জনসাধারণের যাত্রা সুনিশ্চিত করতে ব্যাংকক, জার্মানি ও পৃথিবীর অন্যান্য দেশের আদলে ঢাকার সার্কুলার পথেও নামানো হয়েছে ওয়াটারবাস। ২০১০ সালের ২৮ আগস্ট উদ্বোধন হয় এই প্রকল্পের। কিন্তু উদ্বোধনের দুই মাসের মধ্যেই চালু হওয়া ৩৫ সিটবিশিষ্ট ওয়াটারবাস দুটো বিকল হয়ে পড়ে। নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব এ প্রকল্পের বাধা প্রসঙ্গে বলেন, এই ওয়াটারওয়ে প্রকল্পটি শুধু বিআইডব্লিউটির একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। স্থানীয় সরকার, নগর পরিকল্পনাবিদ, ট্রাফিক বিভাগসহ আরও কয়েকটি বিভাগের সমন্বয়ের দরকার রয়েছে। তা না হলে এই প্রকল্প সফলতার মুখ দেখবে না। কোনো কিছু একা একা হতে পারে না বলে মনে করেন তিনি।
পর্যাপ্ত যাত্রীর অভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেরিতে ছাড়ে ওয়াটারবাস। এতে করে আরও কমে যায় যাত্রী। ফলাফল, প্রচুর টাকার লোকসান। জরিপ বলছে, জানুয়ারি ২০১১ থেকে জুন ২০১১ পর্যন্ত ওয়াটারবাস থেকে আয় হয় মাত্র ৪৯ হাজার ৪৩০ টাকা, যেখানে ওয়াটারবাস চালাতে তেল খরচই ছিল নয় লাখ ২৬ হাজার ৭৬৫ টাকা। ওয়াটারবাসের ধীরগতি, ল্যান্ডিংস্টেশনের ব্যবস্থা না থাকা, প্রয়োজনীয় লিংক রোড না থাকা, পর্যাপ্ত নাব্যতা না থাকা, সাধারণ মানুষের মধ্যে ওয়াটারবাস চালুর খবর প্রচার না করা, নদীদূষণ ও অসহনীয় গন্ধ ওয়াটারবাস প্রকল্প থমকে যাওয়ার মূল কারণ।
থেমে গেলেও এ বছর জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে আবারও চালু করা হয়েছে ওয়াটারবাস প্রকল্প। যদিও বিআইডব্লিউটিসি থেকে জানানো হয় বাসের সংখ্যা কম হওয়ায় মানুষের মধ্যে অনীহা সৃষ্টির অন্যতম কারণ। ফলে একপর্যায়ে বিআইডব্লিউটিসি সদরঘাট-গাবতলী রুটে সে সময় ওয়াটারবাস চলাচল বন্ধ করে দেয়। চালু হয় মাওয়া থেকে চর জানাজাত রুটে। দাবি করা হয় সদরঘাট-গাবতলী রুট থেকে মাওয়া-চর জানাজাতে যাত্রী সংখ্যা বেশি হবে। মাঝে ওয়াটারওয়ে শুধু কার্গো বহনের কাজে ব্যবহৃত হতো। ল্যান্ডিংস্টেশনগুলোও ব্যবহার করা হয় পরিত্যক্ত ঘর হিসেবে, যেখানে ইট, বালু, সিমেন্ট রাখা হয়। নতুন ল্যান্ডিংস্টেশন স্থাপন, প্রয়োজনীয় ড্রেজিং ও ৭৫ সিটবিশিষ্ট চারটি নতুন ওয়াটারবাস নামানো হয়েছে।
আবারও ওয়াটারবাস চালু
রাজধানীর চারপাশের ১১০ কিলোমিটার বৃত্তাকার নৌপথ চালুর জন্য উদ্যোগ নেওয়া হলেও এ পথে যাত্রীবাহী নৌসার্ভিস চালু রাখা অনিশ্চিত। এ কারণেই শুধু সদরঘাট থেকে গাবতলী পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার নৌপথে যাত্রীবাহী ওয়াটারবাস সার্ভিস চালু করা হচ্ছে। তৃতীয়বারের মতো উদ্বোধন করা হয় এই সার্ভিসের। তবে এখনো অনিশ্চিত ৯৪ কিলোমিটার নৌপথে ওয়াটারবাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ।
রাজধানীর চারপাশের বৃত্তাকার নৌপথ চালু করা হলে পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি যাত্রী পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এই নৌপথ। যাত্রী পরিবহনের জন্য দুটি ওয়াটারবাস রয়েছে। চারটি নতুন ওয়াটারবাস চালু হচ্ছে এ পথে। আরও চারটির তৈরির কাজ চলছে। ব্রিজের বিষয়টি মাথায় রেখেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৪০ তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৩