বিদ্যুৎ ছাড়া পৃথিবী, এমন কল্পনা করতে আপনাকে বেশ বেগ পেতে হবে। বিদ্যুতের সাহায্য ছাড়া সব প্রায় অচল। আধুনিক জীবনযাত্রায় বিদ্যুৎ ছাড়া মানুষের অস্তিত্বই কল্পনা করা সম্ভব নয়। আমাদের হাতের মোবাইল ডিভাইসটি দুই দিন চার্জ না হলে একটা প্লাস্টিকের টুকরো ছাড়া কিছুই নয়। আর এই বিদ্যুৎ যেখান থেকে আমাদের ঘরে এসে পৌঁছায়, সেটাই হলো বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিদ্যুৎকেন্দ্র অনেক রকমের হতে পারে। তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র, বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র প্রভৃতি। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে তুলনামূলক কম খরচ ও নিরাপদে অধিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে। জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের আদ্যোপান্ত থাকছে এবারের মূল রচনায়। আলোচনা করছেন স্থপতি রাজীব চৌধুরী
জলবিদ্যুৎকেন্দ্র-কথন
সোজা বাংলায় পানির ¯্রােতকে কাজে লাগিয়ে ডায়নামো ঘুরিয়ে যে বিদ্যুৎ তৈরি করা হয়, সেটিই হলো জলবিদ্যুৎ। জলবিদ্যুৎ হচ্ছে একটি সূর্যালোক ঘটিত বিদ্যুৎ উৎপাদনপ্রক্রিয়া। আপনি বলতে পারেন কীভাবে? আমরা জানি যে পানির ত্রৈধ বিন্দু আছে। এর মানে হলো যেকোনো তাপমাত্রায় পানি বরফ, তরল ও বায়বীয় পদার্থ হিসেবে থাকতে পারে। আর এই বরফকে আমরা সাধারণত এই অঞ্চলে না দেখতে পেলেও তরল এবং বায়বীয় অংশকে অবশ্যই দেখতে পারি, যার ফলে দেখা যায় যে মাঠ-ঘাট-খাল-বিল থেকে যে পানি প্রতি মুহূর্তে বাষ্পীভূত হয়ে আকাশে চলে যাচ্ছে এবং এটি মধ্যাকর্ষণজনিত বলের জন্য পৃথিবীর চারপাশে মেঘ হিসেবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একসময় ভারী হয়ে সেটি আবার বৃষ্টি রূপে ধরায় ফিরে আসে। নদীগুলো সেই পানি সমুদ্রে বয়ে নিয়ে যায় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আবারও বাষ্পীভূত হয়ে সেই পানি আকাশে ফেরত যায়। এর মধ্যবর্তী যেকোনো অঞ্চলে এই পানির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়, তা-ই হলো জলবিদ্যুৎ।
আমরা সাধারণত মনে করি, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা মানেই হচ্ছে যে নদীতে একটি ড্যাম বা বাঁধ তৈরি করা এবং সে বাঁধ থেকে ধীরে ধীরে পানি নিষ্কাশনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। কিন্তু ব্যাপারটা তেমন নয়। আসলে নদীর স্বাভাবিক জলধারাকে ধরে রাখার জন্য ড্যাম তৈরি হয় বটে কিন্তু সেটি থেকে জমিয়ে পানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় শুকনো মৌসুমে। অন্য সময় এই ড্যাম থেকে জমানো পানি ব্যবহার করা হয় না। নদীর স্বাভাবিক জলধারা থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। এই জলরাশি থেকে যে পানি নিষ্কাশিত হয়, সেই পানি একটি ডায়নামোর মধ্য দিয়ে যায়, যেটি প্রচÐ শক্তিতে ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। এই বিদ্যুৎ ন্যাশনাল গ্রিডে যুক্ত করে দেওয়ার ফলে আমরা বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারি। আর শুকনো মৌসুমে ব্যবহারের জন্য নদীতে পানি কমে যায় বিধায় তখন জমিয়ে রাখা রিজার্ভ ওয়াটার সেই ডায়নামোর ওপর দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্রা ঠিক রাখা হয়।
জলবিদ্যুৎ বেশ সস্তা বিদ্যুৎ উৎপাদনপ্রক্রিয়া। বিজ্ঞানীদের মতে, এই পৃথিবীতে যে পরিমাণ পানি আছে, সেটা ধ্রæব। এটা কমবেও না, বাড়বেও না। তাই আমাদের ফেলে দেওয়া পানিটাই সূর্যের মাধ্যমে বাষ্পীভবন প্রক্রিয়ায় আকাশে মেঘ আকারে জমা হতে থাকে এবং একসময় সেটা আবার পৃথিবীর ওপর পতিত হলে আমরা পানিচক্রের মাধ্যমে এই ড্যাম থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করি। তাই পানি থেকে উৎপাদিত হলেও এটি মূলত একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রক্রিয়া।
জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের হালচাল
সারা বিশ্বে জলবিদ্যুৎ তৈরির এই প্রক্রিয়া বেশ সমাদৃত। পৃথিবীর যেসব দেশে নদী প্রবাহিত হয়েছে এবং সেটির ¯্রােত বহমান, সেই দেশ অবশ্যই কোনো না কোনোখানে বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ তৈরি করছেই। আমাদের প্রতিবেশী দেশের বাঁধের খবর প্রায়ই শুনি। যেমন- ফারাক্কা বাঁধ, টিপাইমুখ বাঁধ ইত্যাদি। এগুলো সবই বিভিন্ন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দেওয়া বাঁধ। চীন ব্রহ্মপুত্র নদে বাঁধ দেওয়ার ফলে এই নদ এখন মৃতপ্রায়। এ নিয়ে ভারত-চীনের মধ্যে লড়াই প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের মুখরোচক রসদ। আর এ রকম সব বাঁধ দেওয়া হয় সেচ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জন্যই। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে ২০১৬ সালে বিশ্বের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১৭ শতাংশ এসেছে জলবিদ্যুতের মাধ্যমে। ২০২২ সালের পরিসংখ্যান মতে, সবচেয়ে বেশি হাইড্রোপাওয়ার ব্যবহারকারী দেশ হলো চীন। এরপরেই আছে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। ভারতও এই দলে আছে, যদিও সেটা খুব একটা পেছনে নয়। দেখা যায়, এ ক্ষেত্রে মেক্সিকো, আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চল বেশ নদীপ্রবণ এলাকা বলে সেখানে অনেক ড্যাম আছে, যেগুলো প্রতিনিয়ত জলবিদ্যুৎ তৈরি করেই চলেছে।
বিশ্বে অনেক বিদ্যুৎ উৎপাদনপ্রক্রিয়া চলমান। বিভিন্ন সময়ে এই হাইড্রোপাওয়ার বা জলবিদ্যুৎ প্রক্রিয়ার ওপর বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ ধীরে ধীরে বেড়েছে। দেখা গেছে, ২০১৭ সালে সমগ্র পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ মিলে যেখানে ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করেছে, সেটাই ২০২২ সালে এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কয়লা বিদ্যুৎ, গ্যাস থেকে তৈরি বিদ্যুৎ বা নিউক্লিয়ার রি-অ্যাক্টর থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাইড্রোপাওয়ার এখন ১৬ শতাংশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। নিউক্লিয়ার রি-অ্যাক্টর বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি দিতে হয়। কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ পেতে কয়লা, গ্যাসবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ তৈরিতে প্রয়োজন গ্যাস। কিন্তু জলবিদ্যুৎকেন্দ্র একবার তৈরি করতে পারলে এরপর আর এতে কোনো জ্বালানি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না এবং এই অনুপাতও দিন দিন আরও বাড়ছে।
বাঁধের প্রকারভেদ
বাঁধের দেয়াল তৈরির সময় এটির পুরুত্ব অনেক বেশি রাখা হয়। কারণ, পানির প্রচÐ চাপে যেন বর্ষাকালে এটি কোনোভাবে ভেঙে না পড়ে। একবার যদি এতে ফাটল ধরে, তাহলে এটি থেকে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা প্রাণনাশের কারণও হতে পারে। অতিরিক্ত জমে থাকা পানি ফেলে দেওয়ার জন্য বাঁধের দেয়ালে থাকে স্পিলওয়ে। এগুলোর মাধ্যমে পানি নিচের অংশে প্রবাহিত হয়। এ ছাড়া থাকে ¯øুইসগেট, যেগুলো বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহার করা হয়।
বাঁধ তৈরির নানা প্রকার আছে। খুব সাধারণ একটা নদীতে সোজাসুজি বাঁধ তৈরি করা যায়। আবার আর্চওয়ে নির্মাণ করেও বাঁধ তৈরি করা যায়। মূলত স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করে বাঁধ চার প্রকার। গ্রাভিটি ড্যাম, আর্চ ড্যাম, বাট্রেস ড্যাম ও অ্যাম্বাঙ্কমেন্ট ড্যাম। আধুনিক সময়ে আর্চ ড্রাম বেশি দেখা গেলেও অ্যাম্বাঙ্কমেন্ট ড্যাম সময়োপযোগী ও পরিবেশবান্ধব।
জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের কাঠামো
জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের কাঠামো মূলত আরসিসি। কংক্রিটের মূল ব্যবহার হয় ড্যাম বা বাঁধ তৈরিতে। বাঁধ তৈরির আগে যে স্থানে বাঁধ দেওয়া হবে, সেই স্থান নিরীক্ষা করা হয়। যে অঞ্চলে নদীর পানিপ্রবাহ সবচেয়ে বেশি, সেখানে ড্যাম বা বাঁধ তৈরি করা হয়। এরপর করা হয় ড্যাম ফেইলিউর অ্যানালাইসিস। একটা বাঁধের বয়সকাল ধরা হয় ১০০ বছর। এর মধ্যে ড্যামের দেয়াল কতটুকু ওজন নিতে পারবে, এর দেয়ালের পুরুত্বÑ এসবের ওপর নির্ভর করে ডিজাইন শুরু করা হয়। আসলে এই বাঁধ তৈরির সঙ্গে সঙ্গে ডায়নামো প্লেসিং, সংযোগ লাইন, ডিস্ট্রিবিউশন লাইন থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক সবকিছু তৈরি করা হয়। এই ড্যাম তৈরির সময় খেয়াল রাখতে হয় যেন এর স্থাপনার স্থান একটু উঁচু হয়। উঁচু স্থান থেকে পানির নিচের দিকে প্রবাহের হার সবচেয়ে বেশি থাকে। আর খেয়াল রাখতে হয় এই বাঁধের আগে যেন কয়েকটা বেসিন এরিয়া থাকে, যেখানে পানি জমিয়ে রাখা যাবে। অপরিকল্পিত ড্যাম তৈরি করলে এই পানির ধাক্কায় গ্রামের পর গ্রাম ডুবে যেতে পারে এবং সেটা স্থায়ীভাবেই।
কনট্রোল গেট
বাঁধ তৈরির সঙ্গে সঙ্গে তৈরি করতে হয় এর কনট্রোল গেট। বাঁধের সবচেয়ে নাজুক অংশই হলো এই গেট। এর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয় বেসিনের অতিরিক্ত পানি, যা ফেলে না দিলে বন্যার আশঙ্কা থাকে। আর এই গেটগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে খোলা ও বন্ধ হওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়। পানির পরিমাণ বর্ষাকালে অনেক বেড়ে যায়। তাই তখন অনেক পানি ছেড়ে দিয়ে বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা হয়। আবার শীতকালে এই গেটগুলো বন্ধ থাকে যেন খুব কম পানি প্রবাহেও বেসিন এরিয়াগুলো থেকে পানি কমে না যায়। আবার এই বেসিন এরিয়ায় জমানো পানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়।
পেনস্টক
বাঁধে জমে থাকা পানি যেই পাইপলাইনের মধ্য দিয়ে চালনা করা হয়, সেটাই হলো পেনস্টক। এই পাইপলাইনের সঙ্গে যুক্ত থাকে টারবাইন, যেটা ঘোরার মাধ্যমে পানির কাইনেটিক এনার্জি কারেন্ট এনার্জিতে পরিণত হয়।
জেনারেটর ও পাওয়ারহাউস
পেনস্টকের পানি যেই টারবাইনের ওপর এসে পড়ে, সেটার সঙ্গে যুক্ত থাকে অনেক জেনারেটরের সঙ্গে। এই জেনারেটরগুলো থেকে ঘূর্ণন ও ঘর্ষণের ফলে সৃষ্টি হওয়া বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য প্রস্তুত হয়। কিন্তু এই পানি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ হয় অনেক উচ্চমানের। অথবা খুবই নি¤œ থাকে। এগুলোকে স্টেপ আপ অথবা স্টেপ ডাউন ট্রান্সফরমারের মাধ্যমে বাড়িয়ে বা কমিয়ে জনসাধারণের কাছে বিতরণ করা হয়।
জলবিদ্যুতের ইতিহাস
জলবিদ্যুৎ ব্যবহারের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। আমাদের কাছে এটা বেশ নতুন প্রযুক্তি মনে হলেও এটি আসলে প্রচীন একটি মাধ্যম, যার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতো। মানবজাতি প্রাচীনকাল থেকেই জলবিদ্যুৎ ব্যবহার করে আসছে। মানুষ যখনই বুঝতে পেরেছে, দুটি বস্তুর ঘর্ষণের ফলে তাপ, বিদ্যুৎ ও আগুন পেতে পারে, তখন থেকেই কীভাবে ঘর্ষণ সৃষ্টি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব এটা নিয়ে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা করেছে। ফলে আবিষ্কার করেছে যে নদীর জল কখনোই ফুরায় না। ফলত এর ¯্রােতকে কাজে লাগিয়ে কোন বস্তুকে যদি সব সময় ঘোরানো সম্ভব হয় তাহলে সেটা থেকে নিয়মিত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। আর এভাবেই স্থিরবিদ্যুৎ, প্রবাহিত বিদ্যুৎ ও জলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া মানুষ উদ্ভাবন করে যা আজকের পৃথিবীর জন্যে এক গুরুত্ব¡পূর্ণ আবিষ্কার। মিলানো, গ্রিসের এলেকট্র্রিকাস (ঊষবপঃৎরপঁং ড়ভ গধমহবংরধ) নামক বিজ্ঞানীও প্রাচীন সময়ে জলবিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রথম প্রমাণ প্রদান করেন। তিনি থাম্ব নামের একটি প্রাণীর মাধ্যমে মানবদেহে বিদ্যুৎ চালিত করতে পারতেন এবং এই বিষয়টি তার গ্রন্থ ‘ডে ওর্জানিবুস’ (উব গধমহবঃব)-এ বর্ণিত আছে। এখানে আমরা বইয়ের নামটি ইংরেজিতে দেখছি ডি ম্যাগনেটে। মানে চুম্বক। প্রাচীনকালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে চুম্বক তৈরি হওয়ার কারণে বিদ্যুতের নাম দেওয়া হয়েছিল চুম্বক। এখনো কোনো ধাতবের মধ্য দিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রবাহ করলে সেটি চুম্বকে পরিণত হয়। এটা প্রাচীনকালেই বিজ্ঞানী এলেকট্রিকাসও বুঝতে পেরেছিলেন।
প্রাচীন মিসরের বিভিন্ন দেয়াল খোদাই করা চিত্রকল্পে বিদ্যুতের নানা ব্যবহার উঠে এসেছে। এটি এর মধ্যে অন্যতম। দেখা যাচ্ছে একজন ফারো একটা বিশাল আকৃতির বস্তু নিয়েছেন। বাস্তব চিন্তা করলে এটি একটা বিশালাকার ভাল্ব হতে পারে। কারণ পাশেই যেভাবে কয়েল দেখা যায়, কাচের বাল্বের মধ্যে একই রকম দেখতে একটা কয়েলও আছে। এই ছবিটিকে ভালোভাবে দেখলে বোঝা যায়, ফারো একটা আলোকবর্তিকা তুলে ধরেছেন, যার আলোয় সাধারণ মানুষ নানা কাজকর্ম করছে। এটি সেই আমলের ফারোর গুণগানবাচক চিত্র হলেও বাকি সবকিছু আধুনিক বাল্বের সঙ্গে কাকতালীয়ভাবে মিলে যায়।
মধ্য যুগে, জলচক্রের পাশাপাশি জলের আঁধার ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করার ব্যবস্থা আরম্ভ হয়। আগের সময়ে যে উপায়ে জলচক্র উৎপন্ন করা হতো, তা এই যুগে সুপেয় পানির ব্যবহার শুরু হয়। বিপ্লবকালে, ১৯০০ শতাব্দীর শেষ অংশে, জলচক্রের পরিবর্তনে নতুন উন্নত প্রযুক্তি প্রবর্তিত হয়। ১৮৭০ সালে, মাইকেল ফ্যারাডে (গরপযধবষ ঋধৎধফধু) নামক বিজ্ঞানী তার স্বনামধন্য কেউন ডাইনামোমিটার ব্যবহার করে ডাইনামো নামক যন্ত্র তৈরি করেন, যার মাধ্যমে পরিষ্কার বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা সম্ভব হয়।
২০০০ শতাব্দীতে, জলবিদ্যুৎ উৎপন্ন করার প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন বেশ সস্তা হয়ে গেছে, পরিবেশদূষণমুক্ত এবং নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনে যেতে পেরেছে। জলবিদ্যুৎ উৎপন্নের উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবস্থা আরও বেশি সস্তা এবং পরিবেশ দূষণমুক্ত হতে চলেছে, যা পরিবেশের সমর্থন পাচ্ছে।
জলবিদ্যুতের উপকারিতা
এটি অর্থ সাশ্রয়ী, বেশ কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। বর্তমানে চট্টগ্রামে অবস্থিত কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে এক ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয় এক টাকারও কম। সে হিসাবে প্রতি ইউনিটে এখান থেকে সরকার অনেক লাভবান হচ্ছে।
জলবিদ্যুৎ পরিবেশদুষণমুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি, যা বায়ুমÐলে কার্বন ডাই-অক্সাইড বা অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের হার বৃদ্ধি করে না। তাই এটি খুবই পরিবেশবান্ধব।
জলবিদ্যুতের জন্য জল¯্রােত এবং বাঁধ সৃষ্টি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যা নদীগুলোর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে এবং নদীভাঙনের তীব্র সংকট থেকে মানব বসতিকে রক্ষা করে। যেসব অঞ্চলে বন্যার পানি প্রবেশ করে, সেখানে বাঁধ দিয়ে পানি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনও করা যায়, তাই এটি বেশ উপকারী।
জলবিদ্যুৎ একটি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনপ্রক্রিয়া। পানির প্রবাহ যত দিন থাকবে, এই বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া তত দিন থাকবে। যেহেতু পৃথিবী থেকে পানি কখনোই শেষ হবে না। তাই এই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে তৈরি হওয়া বিদ্যুৎও কোনো দিন শেষ হবে না।
জলবিদ্যুৎ প্রযুক্তি উন্নত দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অবারিত দ্বার উন্মোচন করে দেয়। অত্যন্ত সাধারণ এবং মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের উন্নত পাঠ্যপুস্তক, প্রযুক্তির পাঠবিষয়ক সেমিনার এবং প্রশিক্ষণ সরবরাহ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিজ্ঞান উন্নত করার সুযোগ প্রদান করে, যা পরোক্ষ উপকারিতা হলেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। অন্যান্য সব বিদ্যুৎ উৎপাদন জ্বালানিনির্ভর হলেও জল কখনোই শেষ হবে না বলে এর মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ খুবই গরিব জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে তাদের জীবনমান উন্নত করা হচ্ছে।
জলবিদ্যুৎ প্রযুক্তির উন্নয়ন হওয়া সঙ্গে সঙ্গে এই শিল্পে নতুন কর্মীদের জন্য রোজগারের সৃষ্টি হয়, যা অর্থনীতিতে অসমান্য গুরুত্ব পায়। রিসার্ভারে যে জল জমে, সেটার মধ্যে মাছ চাষের মাধ্যমে আমিষের বিশাল চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়। পর্যটনশিল্পে ও এই রিসার্ভারগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অনেক সময় গ্রামীণ এলাকাগুলোর বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির দ্বারা উন্নতি এবং বিকাশের সুযোগ পায়। এটি গ্রামীণ উদ্যোগ বৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধির পথ খুলে দেয়, যা গ্রামীণ অভিবাসীদের জীবনমান উন্নত করতে সাহায্য করে।
জলবিদ্যুৎ প্রযুক্তির অনেক উপকারিতা থাকলেও এর বেশ কিছু অপকারিতাও আছে। সেগুলো হচ্ছে-
জলচক্র ও জলস্তর পরিবর্তনের প্রভাব: জলবিদ্যুতের জন্য জলস্তর এবং বাঁধ নির্মাণের প্রয়োজন, যা নদীর প্রবাহে পরিবর্তন করে দেয়। জলচক্র প্রভাবিত হয়। এটি স্থানীয় শব্দদূষণ, বায়ুমÐলে গ্রিনহাউস গ্যাস স্তরের উচ্চতা এবং বায়ুদূষণের কারণ।
জীববৈচিত্র্য এবং নদী জীবনের প্রভাব: জলবিদ্যুতে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করার জন্য নদীগুলোর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন পড়ে, যা নদীর জীবন এবং প্রাণিজগতের মাধ্যমে প্রভাব ফেলতে পারে।
মানবস্বাস্থ্যের প্রভাব: বিদ্যুৎ উৎপন্ন করার প্রয়োজনে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যা নদীর জীবন এবং প্রাণিজগতের মাধ্যমে প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রাকৃতিক বিপর্যয়: পানির ওজন অনেক বেশি হওয়ায় এটি টেকটোনিক প্লেটের ওপর প্রচÐ চাপ প্রয়োগ করতে পারে, যা ভূমিকম্পসহ নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ ও জলবিদ্যুৎ
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। কিন্তু এত নদী থাকা সত্তে¡ও এ দেশে কেবল একটিই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র। আর সেটা হলো কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি ১৯৬২ সাল থেকে এখনো পর্যন্ত চলমান আছে। কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের রাঙামাটি জেলার অন্তর্গত পরিচিত। এটি কাপ্তাই লেকের ওপর নির্মিত। ১৯৫৬ সালে তার প্রথম অংশ চালু করা হয়। কাপ্তাই হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার স্টেশন এখন সর্বমোট ৯টি ইউনিট আছে, যার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। কাপ্তাই হ্রদে বৃষ্টি এর বিদ্যুৎ উৎপাদনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সময় হাজার হাজার ঘরবাড়ি ডুবে গিয়ে বেসিন এরিয়া তৈরি হয়, যা রাঙামাটি পর্যন্ত বিস্তৃত। কাপ্তাই বাঁধ বেসিন এরিয়ার জলাধারে পানি সঞ্চয় করে কর্ণফুলী নদীর নিম্নধারার বন্যার হার ৫০% পর্যন্ত কমাতে সাহায্য করে। কাপ্তাই বাঁধের দৈর্ঘ্য ৬৭০.৫৬ মিটার এবং উচ্চতা ৪৫.৭ মিটার। ভিত্তি স্তরে প্রস্থ ৪৫.৭ মিটার এবং ওপরের দিকে ক্রেস্ট স্থরে ৭.৬ মিটার। ক্রেস্ট লেভেল সাগর থেকে ৩৬ মিটার ওপরে অবস্থিত। কাপ্তাই বাঁধের জলাধারের আয়তন প্রায় ১১০০০ শস২, যার মধ্যে ২২০ শস২ চাষযোগ্য জমি ছিল।
কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রটির অপারেশন সিস্টেম বেশ প্রাচীন। ১৯০৬ সালে কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এই লক্ষ্যে সে সময় সমীক্ষা চালানো হয়েছিল। কিন্তু সে সময় ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ১৯২৩ সালে আবারও সমীক্ষা চালানো হয়। ১৯৪৬ সালে ই এ মুর বর্তমান বাঁধ থেকে ৬৫ কিলোমিটার উজানে বরকল এলাকায় বাঁধ নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। ১৯৫০ সালে মার্জ রেনডেল ভ্যাটেন নামের কনসালট্যান্সি ফার্ম ৪৮ কিলোমিটার উজানে চিডারলাকে বাঁধ নির্মাণের জন্যে পরামর্শ দেয়। অবশেষে অনেক টানাপোড়েনের পর ১৯৫১ সালে প্রধান প্রকৌশলী খাজা আজিমউদ্দিনের তত্ত¡াবধানে বর্তমান কাপ্তাই এলাকায় বাঁধ নির্মাণ করার কাজ শুরু হয়।
এই বাঁধ নির্মাণের সময়কালে বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে বিশ্বে পরিচিত ছিল। সে সময় ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশ্চর্য কীর্তি এই বাঁধ নির্মাণ। বিদেশি প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও ইউতাহ ইনকরপোরেট এই বাঁধ নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত হয়। বসানো হয় কাপলান টারবাইন জেনারেটর, যা ছিল ৪০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন। এই কাজে ২৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় বাজেট হিসাবে ধরা হয়েছিল। পরে সেটা বেড়ে ৪৮ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বিদেশি নানা সংস্থা থেকে এই টাকা সহযোগিতা হিসেবে নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮২ সালে এখানে আরও ৫০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ উৎপন্ন করার ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর স্থাপন করা হয়। ১৯৮৮ সালে আরও দুটি ৫০ মেগাওয়াটের জেনারেটর স্থাপিত হয়। ফলে এটি থেকে ২৩০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়।
এই বাঁধ নির্মাণ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অন্যতম বাঁক বদলের সাক্ষী। সে সময়েই ১ লাখ চাকমা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ ঘরচ্যুত হয়। ডুবে যায় চাকমা রাজবাড়ি। ৬৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা পানিতে নিমজ্জিত হয়। ১৮ হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুত হয় এবং ৪০ হাজারের বেশি চাকমা ও মারমা সম্প্রদায়ের মানুষ ভারতে স্থানান্তরিত হয়। জমি অধিগ্রহণ শুরু হওয়ার পর সেই এলাকায় নানা ধরনের মানুষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল। ব্যাপকভাবে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়েছিল। অনেক ধানি জমি পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল, যা আজকে আমরা কাপ্তাই রাঙামাটি লেক বলে চিনি। বন্য প্রাণী ও স্থলভাগে থাকা জীবজন্তু প্রাণ হারিয়েছিল দেদারসে। পুরো এলাকার প্রাণবৈচিত্র্য পাল্টে গিয়েছিল। এরপর এখানে সংঘাত শুরু হয় মাছ চাষ নিয়ে। যদিও এখন সেসব অতীত। কিন্তু এক জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে চট্টগ্রামের এই এলাকাকে নিয়ে অনেক সংঘাতের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল।
বাংলাদেশে আরও অনেক রকমের বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। বর্তমানে চালু হতে চলেছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও। কিন্তু জলবিদ্যুতের মতো সরল বিদ্যুৎকেন্দ্র আর একটিও স্থাপিত হয়নি। হয়তো কাপ্তাই লেকের মতো ধ্বংসাত্মক প্রকল্পের কারণে বহু ক্ষয়ক্ষতি সাধন হয়েছিল বলেই আর এই পথে হাঁটেনি কোনো সরকার। ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা হয়তো অন্য কোনো উপায়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করবেন, যাতে কোনো মানুষকে আর বাস্তুচ্যুত হতে হবে না। জীববৈচিত্র্যও রক্ষা পাবে। অন্যদিকে আমরা পাব আমাদের নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ। এখন সেই ভবিষ্যতের অপেক্ষায় বাংলাদেশ।
প্রকাশকাল: বন্ধন ১৫৭ তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০২৩