Image

দশমিক স্থপতি

মুস্তাফিজ আল মামুন ও আঞ্জুমান আরা বেগম স্বামী-স্ত্রী। পেশায় স্থপতি। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ডিসিপ্লিন থেকে পাস করে দু’জনে মিলে গড়ে তোলেন স্থাপত্য চর্চার কর্মশালা ‘দশমিক/দশমিনা স্থপতি’। প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার কিছুদিন পর চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন স্থপতি মুস্তাফিজ। বর্তমানে চুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। শিক্ষকতার পাশাপাশি সহধর্মিণীকে নিয়ে চট্টগ্রামেই শুরু করেছেন ‘দশমিক/দশমিনা স্থপতি’-এর স্থাপত্য চর্চা। এ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ দেশের অনেক জেলাতে নির্মিত হচ্ছে নান্দনিক সব স্থাপনা। ‘দশমিক/দশমিনা স্থপতি’-এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘Space in Nature’ স্লোগানকে সঙ্গী করে। আর তাই তো প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রত্যেকটি স্থাপত্যকর্মের মধ্যে প্রাকৃতিক পরিবেশকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে স্থাপনাসমূহের পরিবেশবান্ধব সহনশীল রূপদান করেন।

মেধাবী স্থপতি দম্পতির প্রকল্পকাহন

‘বঙ্গবন্ধু মুক্ত মঞ্চ’

এক পাশ দিয়ে অবিরাম ধারায় বয়ে চলছে সাঙ্গু নদী। চারদিকে সুউচ্চ বিস্তীর্ণ পাহাড়ি ঘনসবুজ বনবনানী। সাথে শহুরে কোলাহলের মাঝে বান্দরবান শহরের জিরো পয়েন্টে পাখির ডানা মেলে দাঁড়িয়ে আছে জাতির জনকের শ্রদ্ধার্থে নির্মিত স্থাপনা ‘বঙ্গবন্ধু মুক্ত মঞ্চ’। এ ভবনটির স্থাপত্য ভাবনা এসেছে বিশাল এক পাখির মেলে ধরা ডানা থেকে। পাখিকে ওড়ার জন্য চারটি কাজ করতে হয়- (১) বাতাসে ভাসা (২) যতক্ষণ প্রয়োজন সেখানে থাকা (৩) যেদিকে পাখিটি চায় সেদিকে ওড়া (৪) নিরাপদে প্রত্যাবর্তন।

পাখির ডানার সাথে মিল রেখে এই স্থাপনার মূল কাঠামো তৈরি হয়েছে কংক্রিট স্টিল স্ট্রাকচার দিয়ে। অল্প করে বাঁকানো কংক্রিট কলামে প্রকাশ পায় পাখির পা জোড়া। যেভাবে পাখি সব বাচ্চাকে তার বিশাল ডানার নিচে রাখে তেমনি এই স্থাপনাটিও দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সংহতি প্রকাশ করে। ঘটায় তাদের মধ্যকার মেলবন্ধন, যাতে তারা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি যুক্ত হতে পারে বন্ধুস্লির অটুট বন্ধনে।

বান্দরবান পার্বত্য চট্টগ্রামে হওয়ায় প্রকৃতিগতভাবেই এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। ভারী বর্ষণের কারণে অনেক সময় এখানে কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এই প্রকল্পটিতে হালকা বা মাঝারি বৃষ্টিপাতের সময় পানি নিষ্কাশনের জন্য উইংসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বড় ওভারহ্যাং এবং ল্যুভর প্যানেল তৈরি করা হয়েছে। খোলামেলা হলেও গ্যালারিকে সর্বসাধারণের জন্য ছায়াবৃত করা হয়েছে।

বাঁশের বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে প্রকল্পটিতে। তাই বাঁশের সাহায্য নিয়ে এ স্থাপনার নির্মাণ কৌশল ও সৌন্দর্যবর্ধনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্টিল পাইপের সেকশনগুলো চতুর্ভুজাকৃতি। দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকার জন্য এক্ষেত্রে স্টিল ও কংক্রিটকে নির্বাচন করা হয়েছে। কারণ বাংলাদেশে সাধারণত সরকারি ভবনগুলো সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। পাশাপাশি একে সময়োপযোগী স্থাপত্যে রূপ দিতে আধুনিক নির্মাণ উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু বাঁশের ব্যবহার ভবনটির প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র ও ভিন্নতা এনে দিয়েছে। ২০১০ সালের শেষের দিকে এ প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হয়।

World Architectural News Award-এ মনোনয়ন

প্রকল্পটি চলমান অবস্থায় টক-এর WAN (World Architecture News) কর্তৃক পরিচালিত WAN Award-এর civic Building Award-G Unbuild Project Category-তে এটি Long List-এ ২১তম স্থান পায়।

কক্সবাজার পৌর অডিটরিয়াম এবং রেস্ট হাউস

কক্সবাজারের স্টেডিয়াম রোডে ২০০ আসনবিশিষ্ট অডিটরিয়াম, যার সাথে রয়েছে ৫০ আসন বিশিষ্ট কনফারেন্স রুম। অডিটরিয়ামের উপরে রয়েছে ভিআইপি রেস্ট হাউস, যেখানে সচিব ও অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থাকতে পারবেন। প্রকল্পটির নির্মাণকাজ ২০০৯ সালে শুরু হয়ে এখনো চলছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ কোটি টাকা।

এসবি রোকেয়া সেন্টার, কক্সবাজার

এসবি রোকেয়া সেন্টার, কক্সবাজারের প্রাণকেন্দ্রে শহরের প্রধান সড়কের পাশে অবস্থিত। এখানে রয়েছে চার তলা বিশিষ্ট শপিং ও বাণিজ্যিক স্পেস এবং উপরে ৭তলা জুড়ে রয়েছে আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট। আরো রয়েছে কমিউনিটি ফ্যাসিলিটি।

‘বৃক্ষবাড়ি’ এনায়েত বাজার, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামের ব্যস্ত এলাকা এনায়েত বাজারের রাস্তার পাশে অবস্থিত ডুপ্লেক্স বাড়ি ‘বৃক্ষবাড়ি’, যার প্রধান বৈশিষ্ট্যে প্রকৃতিবান্ধব খোলামেলা পরিসর। এর ভেতরে রয়েছে সবুজের সমারোহ, বৃষ্টিবান্ধব প্রযুক্তি, আলোকিত উন্মুক্ত সিঁড়ি ও ল্যান্ডস্কেপ। এটির নির্মাণশৈলীর বিশেষত্ব হলো চারদিকে খোলামেলা পরিবেশ, রুম লাগোয়া বারান্দা আর পুরো বিল্ডিংটি লাল ইটের তৈরি। রয়েছে একটি সূর্যঘড়ি, যেটি সকালের সূর্যালোকে উজ্জ্বল হয়ে দিনের শেষে মিশে যাবে। প্রকল্পটির নির্মাণকাল ২০১০-২০১২ সাল।

‘শুকতারা’- প্রকৃতি নিবাস

সিলেট থেকে পর্যটন কেন্দ্র জাফলং যাওয়ার পথে শাহপরান মাজার পার হয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত অবকাশকেন্দ্র বা রিসোর্ট ‘শুকতারা’- প্রকৃতি নিবাস। সিলেট খাদিম জাতীয় উদ্যানের পথে এগোলেই চোখে পড়ে এটি। যার চূড়ায় উঠতে গেলে রয়েছে টয় ট্রেন লাইন। সমতল হতে ৫০-৬০ ফুট উপরে নির্মিত রিসোর্টটি শৈল্পিক সৌন্দর্য নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। এতে রয়েছে ১০টি কটেজ, লাইব্রেরি, সেমিনার রুম, রেস্টুরেন্ট, টিলার চূড়ায় আছে পার্টি আয়োজনের ব্যবস্থা। বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য বেতের তৈরি আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী। রয়েছে অনেক প্রজাতির গাছপালা, বিভিন্ন ফুলের গাছ ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য।

তৈরি করা হয়েছে সানোর মায়া। প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাতে আরো কিছু স্থাপনা তৈরি হবে, যার মধ্যে থাকবে সুইমিংপুল, জিমনেসিয়াম, মিনি ডরমেটরি, স্টুডেন্ট ওয়ার্কশপ, যেখানে ২০-৩০ জন ছাত্রছাত্রী একসাথে থাকতে পারবে ও বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে পারবে। প্রকল্পটির মেয়াদকাল ২০১০-২০১২ সাল।

সিপিডিএল খুরশিদা ১০১, পাঁচলাইশ, চট্টগ্রাম

খুরশিদা ১০১, সিপিডিএলের একটি ডেভেলপিং প্রজেক্ট। যেটা আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং। চট্টগ্রাম শহরের আবাসিক স্থাপনাগুলোর গতানুগতিক চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে এখানে অন্য রকম স্থাপত্য তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। নয় তলা বিল্ডিংটি দুটি অংশে বিভক্ত। চারতলা পোডিয়ামের মতো করে সেখানে দুই ইউনিট আর উপরের পাঁচতলা টাওয়ারের মতো করে সিঙ্গেল লাক্সারি ইউনিট। এখানে বিভিন্ন স্তরে রয়েছে গার্ডেনসহ স্পেস ও গ্রিন ওপেন স্পেস। 

ভবিষ্যৎ প্রকল্প

ইকো গ্রিনে ইকো টাওয়ার যেখানে ১৮তলা বিল্ডিংয়ের পুরোটাই ন্যাচারাল ল্যান্ডস্কেপে করা। এখানে থাকবে পার্ক। এটি ডিজাইন করা হয়েছে ইকো ফ্রেন্ডলি আদলে। এটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন।

সিপিডিএল গ্যালেরিয়া, ফয়েজ লেক, চট্টগ্রাম। এটিও অত্যাধুনিক বাণিজ্যিক কাম স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট, যেখানে থাকবে রুফটফ সুইমিংপুল, রেস্টুরেন্ট, গেমজোন, রুফটফ ল্যান্ডস্কেপ। এটি ফয়েজ লেকের পাশে পাহাড়ি পরিবেশের মধ্যে অবস্থিত ১৭তলা বিল্ডিং।

ড্রিমিটেক হোসনা

এটি অ্যাপার্টমেন্ট, যেখানে একটি করে লাক্সারি ইউনিট রয়েছে। মোট ৮তলা বিল্ডিং। এখানে প্রাধান্য পেয়েছে প্রকৃতির সবুজ রূপ।

স্থপতি দম্পতির উল্লেখযোগ্য যত স্থাপত্যকর্ম

কক্সবাজার পৌরসভা মিলনায়তন ও ভিআইপি গেস্ট হাউস, কক্সবাজার।

‘সমুদ্র তরঙ্গ’- বাণিজ্যিক ভবন, কক্সবাজার।

এসবি রোকেয়া সেন্টার, কক্সবাজার।

‘শুকতারা’- প্রকৃতি নিবাস, খাদিম, সিলেট।

বৃক্ষবাড়ি, এনায়েত বাজার, চট্টগ্রাম।

সিপিডিএল খুরশিদা ১০১, পাঁচলাইশ, চট্টগ্রাম।

সিপিডিএল গ্যালেরিয়া, ফয়েজ লেক, চট্টগ্রাম।

ইকো গ্রিন টাওয়ার, বাহাত্তর পুল, চট্টগ্রাম।

গল্প/গলফ হাউস, নেভাল একাডেমি, পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম।

ড্রিমটেক হোসনা অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং, চট্টগ্রাম।

যোগাযোগ

দশমিক /দশমিনা স্থপতি

বাড়ি : ১০৯, রোড নং-০৫, ব্লক বি, চান্দগাঁও আ/এ, চট্টগ্রাম।

মোবাইল : ০১৭১৭৫৩১৪৬৩-৪ 

ইমেইল : doshomik@yahoo.com

মেহেদী হাসান

প্রকাশকাল: বন্ধন ৩১ তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১২

Related Posts

প্যারামেট্রিকিজম নিয়ে তুর্কি স্থপতি মেলিকের ভাবনা

সমকালীন স্থাপত্যচর্চায় প্যারামেট্রিকিজম (Parametricism) একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ও পদ্ধতিগত রূপান্তর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছ। এখানে ডিজাইন প্রক্রিয়া ক্রমশ কম্পিউটেশনাল…

ByByshuprova May 21, 2026

প্রথমবার AIA মেডেল পেলেন জাপানের স্থপতি শিগেরো ব্যান

আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেকটস (AIA)। তারা প্রতি বছরই একজন আমেরিকান স্থপতিকে সম্মাননা হিসেবে AIA গোল্ড মেডেল দিয়ে থাকে।…

আলভার আলটো একজন শিল্পী-একজন স্থপতি

হুগো আলভার হেনরিক আলটো (৩ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৮-১১ মে, ১৯৭৬), একজন ফিনিশীয় স্থপতি ও নকশাবিদ। স্থাপত্যকলায় ড্রয়িং বা স্কেচের…

স্থপতি চার্লস মার্ক কোরিয়া উপমহাদেশের স্থাপত্যকলার অগ্রদূত

স্থপতি চার্লস মার্ক কোরিয়া ভারতের তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমসাময়িক স্থাপত্য ইতিহাসের প্রবাদপুরুষ। স্বাধীনতা-উত্তরকালে তিনি ভারতের অন্যতম প্রতিভাবান স্থপতি…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

Zabun Nesa Mosq.
BRAC
Oberio Palace
Soil
“যত মানুষ ফুটবলের ভক্ত, তত মানুষ স্থাপত্য নিয়েও আগ্রহী হোক”
হাতে তৈরি পাঁচটি আইকনিক চারু ও কারি শিল্পের বাড়ি
RIAS ২০২৬ সালের বার্ষিক পুরস্কারের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা
গাছকে জড়িয়ে গড়া আমার ঠিকানা
শহরের শরীরে খোদাই করা এক গৃহকাব্য