• Home
  • নগরায়ন
  • চট্টগ্রামে বাংলাদেশের প্রথম সাইকেল ট্র্যাক এবং কিছু কথা
Image

চট্টগ্রামে বাংলাদেশের প্রথম সাইকেল ট্র্যাক এবং কিছু কথা

গত ৯ অক্টোবর চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় বিমানবন্দর সড়কে দেশের প্রথম সাইকেল ট্র্যাক উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ২ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের এই সড়কের দুই পাশে ফুটপাত, মাঝখানে কার্বস্টোনে ঘেরা মিড আইল্যান্ড এবং এক পাশে ল্যান্ডস্কেপিং ওয়াকওয়ের সঙ্গে সাইকেল ট্র্যাক তৈরি হয়েছে। দৈর্ঘ্যের হিসাবে এটি ছোট একটি প্রকল্প। কিন্তু নগরনকশার ভাবনার দিক থেকে এর তাৎপর্য অনেক বড়।

১. সড়কের নকশায় অগ্রাধিকারের পরিবর্তন

বাংলাদেশের শহরগুলোতে সড়ক বলতে দীর্ঘদিন বোঝানো হয়েছে মোটরযানের চলাচলের পথ। পথচারী ও সাইকেলচালক সেখানে ছিলেন গৌণ, অনেক সময় অদৃশ্য। পতেঙ্গার এই সড়কে ফুটপাত, ল্যান্ডস্কেপড ওয়াকওয়ে ও সাইকেল ট্র্যাক একসঙ্গে যুক্ত হওয়া সেই ধারণায় একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। সড়ক এখানে কেবল যান চলাচলের চ্যানেলের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মানুষের ব্যবহারের উপযোগী একটি সর্বজনীন স্থান।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্যেও এই ভাবনা প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, যারা সাইকেল চালাতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য আলাদা জায়গা থাকা দরকার। নগর-নকশার ভাষায় একে বলা যায় “সবার জন্য রাস্তা” (complete streets) ধারণার দিকে যাত্রা।

চট্টগ্রামে রাস্তার পাশে ওয়াকওয়ের সঙ্গে সাইকেল ট্র্যাক তৈরি করা হয়েছে। ছবি: চসিকের সৌজন্যে
২. আলাদা ট্র্যাকের গুরুত্ব: নিরাপত্তা ও আস্থা

সাইকেলের ব্যবহার বাড়াতে হলে প্রথম শর্ত নিরাপত্তা। মেয়র শাহাদাত হোসেনও বলেছেন, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে সাইকেলের ব্যবহার বাড়বে। যে সড়কে বাস, ট্রাক ও রিকশা একই জায়গায় গাদাগাদি করে চলে, সেখানে সাইকেলচালকের ঝুঁকি অনেক। আলাদা ও সুরক্ষিত ট্র্যাক এই ঝুঁকি কমায় এবং সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ, নারী ও শিক্ষার্থীদের মনে আস্থা তৈরি করে। 

৩. ছোট ট্র্যাক দিয়ে শুরু, এবার চাই শহরজুড়ে সংযুক্ত পথ 

এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সংযুক্তি। ২ দশমিক ২ কিলোমিটারের একটি বিচ্ছিন্ন ট্র্যাক বিনোদন ও ব্যায়ামের জন্য কাজে লাগলেও যাতায়াতের বাহন হিসেবে সাইকেলকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না। সাইকেল তখনই দৈনন্দিন যাতায়াতের মাধ্যম হয়ে ওঠে, যখন বাসা, কর্মস্থল, স্কুল, বাজার ও গণপরিবহন কেন্দ্র একটি অবিচ্ছিন্ন নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকে। 

অর্থমন্ত্রী নিজেও বলেছেন, “আজকের উদ্যোগ কেবল শুরু” এবং পর্যায়ক্রমে আরও ট্র্যাক হবে। এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে একটি সুস্পষ্ট মাস্টারপ্ল্যান, যেখানে ট্র্যাকগুলো কোথায় যাবে, কীভাবে সংযুক্ত হবে এবং কত সময়ে হবে, তা নির্ধারিত থাকবে।

এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সংযুক্তি। ছবি: সংগৃহীত
৪. হাঁটার পথ ও খালের পাড়: নগরের হারানো সম্পদ

প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব এসেছে। অর্থমন্ত্রী মেয়রকে সম্ভব হলে খালের দুই পাশে হাঁটার রাস্তা নির্মাণের অনুরোধ করেছেন। চট্টগ্রামের মতো পাহাড়, নদী ও খালের শহরে এটি বিশেষ সম্ভাবনাময়। খালের পাড় সাধারণত দখল, আবর্জনা ও অবহেলার শিকার হয়। সেখানে হাঁটার পথ ও সবুজ করিডর তৈরি হলে একই সঙ্গে কয়েকটি লাভ হতে পারে:

  • খাল দখলমুক্ত ও সংরক্ষিত থাকে
  • নগরবাসী পায় নিরাপদ হাঁটা ও বিনোদনের স্থান
  • বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনে সহায়তা হয়
  • শহরের একটি নিজস্ব ও স্বতন্ত্র সৌন্দর্য গড়ে ওঠে
ছায়া ও সবুজ এখানে সৌন্দর্যের বিষয় নয়, ব্যবহারযোগ্যতার প্রাথমিক শর্ত। ছবি: সংগৃহীত
৫. সবুজ ও সামাজিক স্থান হিসেবে সড়ক

ল্যান্ডস্কেপিং ওয়াকওয়ের সঙ্গে সাইকেল ট্র্যাক যুক্ত করার সিদ্ধান্ত স্থাপত্যের দিক থেকেও লক্ষণীয়। গাছ, ছায়া ও নরম ভূদৃশ্য শহরের তাপ কমায়, বাতাসের মান উন্নত করে এবং হাঁটা ও সাইকেল চালানোকে আরামদায়ক করে। জলবায়ু বিবেচনায় বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ছায়াহীন পথ কেউ ব্যবহার করতে চান না। তাই ছায়া ও সবুজ এখানে সৌন্দর্যের বিষয় নয়, ব্যবহারযোগ্যতার প্রাথমিক শর্ত।

ল্যান্ডস্কেপিং ওয়াকওয়ের সঙ্গে সাইকেল ট্র্যাক যুক্ত করার সিদ্ধান্ত স্থাপত্যের দিক থেকেও লক্ষণীয়। ছবি: সংগৃহীত
৬. যানজট, দূষণ ও জনস্বাস্থ্য

মেয়র আশা করছেন, সাইকেলের ব্যবহার বাড়লে যানজট ও দূষণ কমবে। স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে সাইকেল ব্যবহার সড়কে চাপ কমায়। এ ছাড়া নিয়মিত হাঁটা ও সাইকেল চালানো জনস্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। ফলে নগরের অবকাঠামোতে এমন বিনিয়োগ পরিবহন, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য, তিন খাতেই প্রভাব ফেলে।

৭. যেসব বিষয় সতর্কতার দাবি রাখে
  • রক্ষণাবেক্ষণ: ট্র্যাক তৈরি যত সহজ, তা পরিষ্কার ও ব্যবহারযোগ্য রাখা তত কঠিন। ফুটপাতের মতো এটিও যেন দখল বা পার্কিংয়ের জায়গা না হয়ে যায়।
  • আইন প্রয়োগ ও সচেতনতা: মোটরযান, রিকশা ও দোকানপাট ট্র্যাকে ঢুকে পড়লে পুরো উদ্যোগ ব্যর্থ হতে পারে।
  • অবস্থান নির্বাচন: বিমানবন্দর সড়ক নতুন ও তুলনামূলক খোলামেলা, ফলে সেখানে ট্র্যাক বানানো সহজ। কিন্তু সাইকেলের সত্যিকার চাহিদা ঘনবসতিপূর্ণ পুরোনো এলাকাগুলোতে, যেখানে জায়গার সংকট সবচেয়ে তীব্র। সেখানে কী করা হবে, সেটিই হবে আসল পরীক্ষা।
  • সুবিধা ও নিরাপত্তা: সাইকেল রাখার ব্যবস্থা, রাতের আলো, নিরাপদ মোড় ও পারাপারের নকশা না থাকলে ট্র্যাক অসম্পূর্ণ থাকে।
  • সব নাগরিকের অংশগ্রহণ: প্রকল্প পরিকল্পনায় শিক্ষার্থী, নারী, শ্রমজীবী ও প্রতিবন্ধী মানুষসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর মতামত নেওয়া জরুরি।
একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে: আমরা কার জন্য শহর বানাচ্ছি? ছবি: সংগৃহীত

পতেঙ্গার সাইকেল ট্র্যাক নিজে একটি ক্ষুদ্র অবকাঠামো, কিন্তু এটি একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে: আমরা কার জন্য শহর বানাচ্ছি? গাড়ির জন্য, নাকি মানুষের জন্য? ভালো নগর-নকশার মাপকাঠি হলো, একজন শিশু, একজন বৃদ্ধ কিংবা একজন সাইকেলচালক সেখানে কতটা নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ বোধ করেন।

Related Posts

ভবনের অদৃশ্য কম্পন ও স্থাপত্যের এক রহস্যময় দিক

পুরোনো কোনো ভবনে প্রবেশ করে হঠাৎ অস্বস্তি অনুভব করা, অকারণে মন খারাপ হয়ে যাওয়া কিংবা অজানা ভয়ে আক্রান্ত…

পাথর-কাটা বিহারের স্মৃতি নিয়ে এক কংক্রিটের বাড়ি

পাথর কেটে বানানো গুহাবিহারের কথা আমরা অনেকেই বইয়ে পড়েছি। সেখানে ভিক্ষুরা শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশে থাকতেন। ভারতের বালেশ্বরে সেই…

আধুনিক বাড়ির নকশায় গৃহস্থালি কাজ ও করিডরের বিবর্তন

একটি বাড়ির নকশায় করিডর বা চলাচলের পথকে সাধারণত খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বসার ঘর, শোবার ঘর,…

আধুনিক বাড়ির স্বপ্ন: মানুষকে স্বাধীন করার প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার সংকট

আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ, আরামদায়ক ও স্বাধীন করে তোলা। বিংশ শতাব্দীতে স্থপতি…