• Home
  • স্থাপত্য
  • পাথর-কাটা বিহারের স্মৃতি নিয়ে এক কংক্রিটের বাড়ি
Image

পাথর-কাটা বিহারের স্মৃতি নিয়ে এক কংক্রিটের বাড়ি

পাথর কেটে বানানো গুহাবিহারের কথা আমরা অনেকেই বইয়ে পড়েছি। সেখানে ভিক্ষুরা শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশে থাকতেন। ভারতের বালেশ্বরে সেই ধারণাকে নতুন করে ভেবে একটি বাড়ি ডিজাইন করেছে আর্কিটেকচার স্টুডিও রুমুর (Roomoor)। 

বাড়িটির নাম মনাস্টিক ফিল্ড (Monastic Field)। এটি একটি কংক্রিটের বাড়ি, এবং এর ডিজাইনে ভারতের দাক্ষিণাত্য মালভূমির (Deccan Plateau) পাথর-কাটা সন্ন্যাসী-আবাসের ছাপ আছে। 

মনাস্টিক ফিল্ড একটি কংক্রিটের বাড়ি, যা দাক্ষিণাত্য মালভূমির সন্ন্যাসীদের আবাস থেকে অনুপ্রাণিত। ছবি: ডিজেইন
মন্দির চত্বরের ভেতরে একটি বাড়ি

বাড়িটি একটি জৈন মন্দির চত্বরের মধ্যে অবস্থিত। যে পরিবার ২০০৫ সালে মন্দিরের জন্য জমি দান করেছিল, তাদের জন্যই এটি ডিজাইন করা হয়েছে। মন্দিরে প্রতিদিন কয়েকশো দর্শনার্থী আসেন। তাই স্থপতিদের সামনে প্রশ্ন ছিল, মন্দিরকে প্রধান স্থাপনা রেখে বাড়ির সামনের দিকটি কীভাবে মানানসই মাপে সাজানো যায়। 

রুমুরের সিনিয়র পার্টনার মহেন্দ্র গুসাইন ও ডিজাইন পার্টনার ধ্রুব গুসাইনের মতে, মন্দিরের এই কাছাকাছি অবস্থান তাদের বাড়িটিকে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করেছে। বাড়িটি শুধু ভৌতিকভাবে নয়, চেতনার দিক থেকেও আশপাশের সঙ্গে সাড়া দেবে, এমনটাই ছিল লক্ষ্য।

রুমুর বাড়িটিকে আয়তাকার ব্লকের একটি গুচ্ছ হিসেবে ডিজাইন করেছে। ছবি: ডিজেইন
একটি বড় কোনো বস্তু নয়, ছোট ছোট অনুভবের গুচ্ছ

স্থপতিরা বাড়িটিকে একটি বিশাল স্থাপনা হিসেবে না ভেবে বানিয়েছেন নিচু উচ্চতার কিছু আয়তাকার কংক্রিট ব্লকের গুচ্ছ হিসেবে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি বড় বস্তুর বদলে অনেকগুলো ছোট মাপের অভিজ্ঞতা তৈরি করাই ছিল মূল ভাবনা। 

বাইরে থেকে বাড়িটি অনেকটাই বন্ধ। ভেতরে আলো আসে স্কাইলাইট (ছাদের ফোকর) আর সযত্নে বসানো কিছু খোলা অংশ দিয়ে। মন্দিরে ভিড় থাকা সত্ত্বেও ভেতরে একটি আত্মমগ্ন, ধ্যানের মতো পরিবেশ তৈরির কৌশল এটাই।

কংক্রিটের পৃষ্ঠতল বাড়িটিকে একটি অখণ্ড, মনোলিথিক রূপ দিয়েছে। ছবি: ডিজেইন
বাড়ির হৃদয়: পিরামিড-ছাদের হল

বাড়ির কেন্দ্রে আছে একটি হল, যার মাথায় কংক্রিটের পিরামিড আকৃতির ছাদ। ছাদের চূড়ায় একটি স্কাইলাইট আছে, আর চার পাশে আছে ক্লেরেস্টরি জানালা। ক্লেরেস্টরি হলো দেয়ালের একেবারে উপরের দিকে বসানো জানালা, যা দিয়ে ভেতরে আলো ঢোকে। হলের নিচে বসার জায়গাটি সরু কংক্রিটের কলামে ঘেরা। এই খোলা কেন্দ্রীয় জায়গাটি থেকে সরাসরি যাওয়া যায় খাবার ঘর, লাইব্রেরি এবং বাইরের বারান্দায়।

স্থপতিরা বলেছেন, তারা অনুপ্রেরণা নিয়েছেন “বিহার” থেকে, যার অর্থ সন্ন্যাসীদের বাসস্থান। ছবি: ডিজেইন
চরকির মতো বিন্যাস

বাকি অংশ, অর্থাৎ রান্নাঘর, পড়ার ঘর, বাথরুম ও তিনটি শোবার ঘর, সাজানো হয়েছে কেন্দ্রীয় হলকে ঘিরে আয়তাকার ব্লকে। স্থপতিদের বর্ণনায় এটি পিনহুইল বা চরকির মতো বিন্যাস। অর্থাৎ ঘূর্ণির মতো করে ব্লকগুলো কেন্দ্রের চারপাশে বসানো। বাড়ির নকশা চার প্রধান দিকে প্রসারিত হয়েছে, আর কেন্দ্রটি সবসময় আকাশের সঙ্গে যুক্ত থাকে। স্থপতিরা এই গতিপথকে “স্থিরতা থেকে গতির” দিকে এগোনো বলে ব্যাখ্যা করেছেন।

স্কাইলাইট ও ক্লেরেস্টরি জানালার নিচে বসার জায়গা রাখা হয়েছে। ছবি: ডিজেইন
কেন কংক্রিট

কংক্রিট বেছে নেওয়ার পেছনে দুটি কারণ আছে। একটি হলো পাশের মন্দিরের সাদা পাথরের কাঠামোর “চিরস্থায়ী” ভাব। অন্যটি দাক্ষিণাত্যের পাথর-কাটা মন্দির ও আবাসের “মনোলিথিক” বৈশিষ্ট্য, অর্থাৎ পুরো কাঠামোটি যেন একটিই অখণ্ড পাথর থেকে খোদাই করা। 

স্থপতিরা বলেছেন, তারা অনুপ্রেরণা নিয়েছেন “বিহার” থেকে, যার অর্থ সন্ন্যাসীদের বাসস্থান। বাংলাদেশের পাঠকের কাছে শব্দটি অপরিচিত নয়। সেই ধারা ধরে বাড়িটির ভাষা হয়েছে খোলা কংক্রিটের, যেখানে ফর্ম-ফিনিশড পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে ঢালাইয়ের ফর্ম খোলার পর যে পৃষ্ঠ পাওয়া যায়, সেটিই চূড়ান্ত রূপ হিসেবে থেকে যায়।

বাড়ির কেন্দ্রস্থল একটি পিরামিড আকৃতির ছাদে আচ্ছাদিত। ছবি: ডিজেইন
উপকরণের সামঞ্জস্য

বাইরের দিকে কংক্রিটের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে লাল বেলেপাথর, যা বাগানের দেয়াল ও প্যাটিওতে দেখা যায়। ভেতরের সাজ সংযত। সেখানে আছে গাঢ় রঙের কাঠের কাজ ও পাথরের মেঝে। স্থপতিরা বলেন, তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল উপকরণ যেন পেছনে সরে যায় এবং আলোই হয়ে ওঠে প্রধান উপাদান।

এখানে দেখা মেলে স্থানীয় ঐতিহ্য থেকে ভাবনা নিয়ে সমকালীন ডিজাইনের। ছবি: ডিজেইন

মনাস্টিক ফিল্ড দেখায় যে কংক্রিটের মতো ভারী উপাদান দিয়েও শান্ত ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করা যায়। এখানে ঘরের আকার, আলোর ব্যবহার আর আশপাশের মন্দিরের প্রতি শ্রদ্ধা একসঙ্গে কাজ করেছে। স্থানীয় ঐতিহ্য থেকে ভাবনা নিয়ে সমকালীন ডিজাইন কীভাবে বানানো যায়, বাংলাদেশের স্থপতি ও শিক্ষার্থীদের জন্য এই প্রকল্প সেই ভাবনার একটি ভালো উদাহরণ।

তথ্যসূত্র
ডিজেইন

আ

ভবনের প্ল্যান ড্রয়িং। ছবি: ডিজেইন
ভবনের প্ল্যান ড্রয়িং। ছবি: ডিজেইন
ভবনের সেকশনের ড্রয়িং। ছবি: ডিজেইন
ভবনের সেকশনের ড্রয়িং। ছবি: ডিজেইন

Related Posts

ভবনের অদৃশ্য কম্পন ও স্থাপত্যের এক রহস্যময় দিক

পুরোনো কোনো ভবনে প্রবেশ করে হঠাৎ অস্বস্তি অনুভব করা, অকারণে মন খারাপ হয়ে যাওয়া কিংবা অজানা ভয়ে আক্রান্ত…

আধুনিক বাড়ির নকশায় গৃহস্থালি কাজ ও করিডরের বিবর্তন

একটি বাড়ির নকশায় করিডর বা চলাচলের পথকে সাধারণত খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বসার ঘর, শোবার ঘর,…

আধুনিক বাড়ির স্বপ্ন: মানুষকে স্বাধীন করার প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার সংকট

আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ, আরামদায়ক ও স্বাধীন করে তোলা। বিংশ শতাব্দীতে স্থপতি…

পরিবেশগত নৈতিকতার আলোকে স্থাপত্যের ১০টি প্রধান চ্যালেঞ্জ

স্থাপত্য কেবল ভবন নির্মাণ কিংবা নান্দনিক নকশা তৈরির শিল্প নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রা, প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

haunted-home
করিডোর
house
01
হাসপাতালে রোগী-কক্ষে ঘরোয়া আবহ দিচ্ছে কোয়ালুর নতুন ফার্নিচার
10
09
ফর্ম ফলোজ ফিকশন: ফাংশনের বাইরে ছয়টি ডিজাইনের অনুসন্ধান
প্রকৃতির দামও হিসাব করছে ভুটান: জিডিপির পাশে জিইপি