ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া আর শ্বাসকষ্টের মতো প্রাণঘাতী রোগ থেকে শিশুদের বাঁচাতে আমরা সবসময় সিরাপ, ওষুধ আর ভ্যাকসিনের ওপরই ভরসা করে এসেছি। কিন্তু যদি কেবল মাথার ওপরের ঘরটার নকশা বদলে দিয়েই রোগবালাই অর্ধেক কমিয়ে দেওয়া যায়? চিকিৎসা সাময়িকী নেচার মেডিসিন-এ প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক গবেষণা ঠিক এই অবিশ্বাস্য সত্যটাই সামনে এনেছে।
তানজানিয়ায় পরিচালিত ৩ বছর মেয়াদী এক ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখা গেছে, ‘স্টার হোম’ (Star Homes) নামের বিশেষ নকশার বাড়িগুলোতে বসবাসকারী শিশুদের মধ্যে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার হার এক ধাক্কায় ৪৪ শতাংশ কমে গেছে।
পরিসংখ্যানের পাতায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন
২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তানজানিয়ার গ্রামীণ অঞ্চল এমতওয়ারার (Mtwara) ৭০টি গ্রামের ১৪,৬০০টিরও বেশি বাড়ির ওপর লটারি চালিয়ে এই গবেষণা করা হয়। ঐতিহ্যবাহী কাদা ও ছনের তৈরি ৫১৩টি বাড়ির সাথে তুলনা করা হয় ১১০টি সুপরিকল্পিত ‘স্টার হোম’-এর শিশুদের। ফলাফলে স্বাস্থ্যগত পরিবর্তনের এক অভাবনীয় ছবি ফুটে ওঠে:
- ম্যালেরিয়ার প্রকোপ হ্রাস: প্রচলিত কাদা-ছনের ঘরের তুলনায় ম্যালেরিয়া কমবেশি ৪৪% হ্রাস পেয়েছে।
- ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্ট প্রতিরোধ: শিশুদের ডায়রিয়ার সংক্রমণ ৩০% এবং তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত রোগ ১৮% কমেছে।
- শারীরিক পুষ্টি ও বিকাশ: বারবার রোগাক্রান্ত হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাওয়ায় শিশুদের অপুষ্টিজনিত শারীরিক বৃদ্ধি থমকে যাওয়া (Stunting) প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে।

ইটের খাঁচায় ভ্যাকসিনের গুণ: কী আছে এই ‘স্টার হোম’-এ?
রয়্যাল ডেনিশ একাডেমির ডিন ও স্থপতি জ্যাকব ব্র্যান্ডবার্গ কনুডসেন এবং তাঞ্জানিয়া ও আন্তর্জাতিক গবেষকদের যৌথ চিন্তার ফসল এই ‘স্টার হোম’। প্রচলিত একক তলা বাড়ির চেয়ে এটি বেশ আলাদা।
- মশার নাগালের বাইরে শোবার ঘর: অ্যানোফিলিস মশা সাধারণত মাটির কাছাকাছি নিচু দিয়ে ওড়ে। তাই এই দোতলা বাড়ির শোবার ঘরগুলোকে রাখা হয়েছে ওপরের তলায়, যাতে মশা ঘরে ঢুকতেই না পারে।
- প্যাসিভ কুলিং ও জালের দেয়াল: ওপরের তলায় বিশেষ নেটের দেয়াল ব্যবহার করা হয়েছে, যা বাতাসকে অবাধে চলাচল করতে দেয় কিন্তু মশা আটকে রাখে। ফলে প্রচণ্ড গরমেও ঘর ঠাণ্ডা থাকে এবং মশারি ছাড়াও শান্তিতে ঘুমানো যায়।
- বিশুদ্ধ পানি ও ধোঁয়া মুক্ত বাতাস: বাড়ির ছাদ থেকে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। উন্নত বায়ু চলাচলের জন্য বিশেষ ল্যাট্রিন এবং রান্নাঘরের ধোঁয়া বাইরে বের করে দেওয়ার জন্য চিমনিযুক্ত চুলা ব্যবহার করা হয়েছে।
- পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী: ঘরগুলো তৈরিতে সোলার লাইটিং ব্যবহার করা হয়েছে। সাধারণ সিমেন্ট-ব্লকের একতলা বাড়ির তুলনায় এটি তৈরিতে ২৪% কম খরচ হয় এবং এর নির্মাণে ৫৭% কম কার্বন নির্গত হয়।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে নতুন ইতিহাস
চিকিৎসা গবেষণায় যেভাবে কোনো ওষুধের ‘ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল’ করা হয়, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো বাড়ির স্থাপত্যকে ওষুধ হিসেবে বিবেচনা করে এমন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালানো হলো।
প্রজেক্টের প্রধান গবেষক ও ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভ লিন্ডসে জানান, “আমাদের এই গবেষণা প্রমাণ করে যে সুপরিকল্পিতভাবে ঘর তৈরি করতে পারলে আফ্রিকায় শিশুদের তিনটি সবচেয়ে বড় ঘাতক ব্যাধি থেকে সহজেই রক্ষা করা সম্ভব।”
আজকের যুগে যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন ও রাসায়নিক প্রতিরোধী মশার দাপট বাড়ছে, সেখানে ‘স্টার হোম’ প্রমাণ করে দিল যে জীবন বাঁচাতে কেবল বড় হাসপাতাল বা দামী ওষুধের প্রয়োজন নেই-একটি চিন্তাশীল বাস্তু-নকশাই হতে পারে রোগমুক্ত ভবিষ্যতের সেরা প্রতিষেধক।
সূত্র: ডিজেইন


















